মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান

এক

সেদিন সকাল থেকেই শহরটার আকাশে এক ধরনের অশুভ স্থবিরতা জমে ছিল। রোদ উঠেছিল, অথচ আলোয় কোনো দীপ্তি ছিল না; যেন সূর্যেরও আলো ছড়ানোর আগে রাষ্ট্রের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। বাতাসে ধুলো ওড়ার কথা, কিন্তু বাতাসও নিশ্চল—অদৃশ্য কোনো নির্দেশের অপেক্ষায়। শহরটা যেন একটি নিষেধাজ্ঞার ভেতর জেগে উঠেছিল।

মৃত মানুষটির নাম আবদুল কাদের মজুমদার। একসময় সে ছিল সাবেক ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক। ‘একসময়’ কথাটার মধ্যে খুব দীর্ঘ কোনো ইতিহাস নেই; অথচ ক্ষমতার আয়ুতে দশ বছরও একেকটি যুগ। বছর দশেক আগেও শহরের রাস্তায় তার নাম উচ্চারিত হলে দোকানদার কথার খেই হারিয়ে ফেলত, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ঘেমে উঠতেন।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

কাদেরের বয়স তখন অল্প। মুখ থেকে কৈশোরের শেষ ছাপটুকু মুছে যাওয়ার আগেই সে শিখে ফেলেছিল, কীভাবে মানুষের মাথার ওপর দিয়ে নিজের ছায়াকে দীর্ঘ করতে হয়। সে বুঝেছিল, শুধু কর্তৃত্বই ক্ষমতা নয়; অন্যের স্বাভাবিক জীবনযাপনের ভেতর নিজের উপস্থিতিকে অনিবার্য করে তোলাও ক্ষমতা।

তারপর সময় বদলাল।

যে সময়কে কাদের নিজের সম্পত্তি বলে ভাবত, একদিন সেই সময়ই তাকে চিনতে অস্বীকার করল। দলের বড় নেতাদের কেউ বিদেশে পালিয়ে গেলেন, কেউ দেশে আত্মগোপনে চলে গেলেন, কেউ পুরোনো ছবির ওপর নতুন পরিচয়ের রং চড়াতে ব্যস্ত হলেন। কাদের প্রথমে শহরের এক আত্মীয়ের বাড়িতে, তারপর গ্রামের এক পরিত্যক্ত ঘরে, শেষে দূরসম্পর্কের এক বন্ধুর গুদামে আশ্রয় নিয়েছিল। যে ছেলেরা একদিন মোটরসাইকেলে তার পেছনে পেছনে ঘুরত, তারা যেন তাকে দেখে চিনতে পারত না। কেউ কেউ চিনেও এমন মুখ করত, যেন বহু বছর আগে কোনো বাসস্ট্যান্ডে দেখা এক অপরিচিত মানুষ—মুখটা মনে আছে, নামটা ভুলে গেছে।

ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ব্যাকরণ বোধ হয় এমনই: ক্ষমতাবানকে সবাই চেনে, ক্ষমতাহীনকে কেউ চিনতে চায় না; কেউই তাকে চেনার দায় নিতে চায় না।

মৃত্যুর আগে কাদের দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিল। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে একদিন ছেলেকে বলেছিল, ‘বাবা, মানুষের নাম বড় করার দরকার নেই। নামটা যেন মরার পরে ছোট না হয়ে যায়।’

ছেলে কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি। সে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। রাজনীতি সম্পর্কে তার ধারণা ছিল সরল—দেশের জন্য কিছু করতে হয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। তার বাবা একসময় ঠিক এই কথাগুলোই বলত। তারপর ধীরে ধীরে কথাগুলোর পাশে অস্ত্র, টেন্ডার, নিয়োগ আর থানার ওসির ব্যক্তিগত নম্বর এসে জায়গা করে নিয়েছিল। আদর্শের পাশে সুবিধা, জনসেবার পাশে আধিপত্য, মানুষের অধিকারের পাশে দলের স্বার্থ বসতে বসতে কখন যে মূল কথাগুলো হারিয়ে গিয়েছিল, কাদের নিজেও টের পায়নি।

হয়তো পেয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার সবচেয়ে বড় মোহ হলো, সে মানুষকে নিজের পতনের লক্ষণগুলো চিনতে দেয় না। যতক্ষণ চারপাশে লোকজন থাকে, ততক্ষণ নিজের একাকিত্বের শব্দ শোনা যায় না।

কাদেরের মৃত্যুর পর জানাজা নিয়ে সমস্যা দেখা দিল।

পরিবার চেয়েছিল, শহরের বড় ঈদগাহ ময়দানে জানাজা হবে। প্রশাসন অনুমতি দিল না। যুক্তি দেখানো হলো—আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে, লোকসমাগমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুক্তিগুলো নতুন ছিল না; শুধু প্রয়োগের লক্ষ্য বদলেছিল। কাদের জীবিত থাকতে অন্যদের বিরুদ্ধে প্রায় একই ভাষা ব্যবহার করত। তখন সে বলত, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে, বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না, আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। রাষ্ট্রের নামে উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য তার কাছে ন্যায়সংগত মনে হতো, কারণ রাষ্ট্রের ক্ষমতা ছিল তার পক্ষে। আজ সেই একই ভাষা তার মৃতদেহের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

ক্ষমতার ভাষা সম্ভবত কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; যে-ই ক্ষমতায় থাকে, ভাষা তখন তার হয়ে কথা বলে।

কিন্তু মৃত মানুষেরও আত্মীয় থাকে, বন্ধু থাকে, পরিচিত মুখের স্মৃতি থাকে। এমন দু-চারজন মানুষ থাকে, যারা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে তার নামটি মনে রাখে; যারা তার অপরাধের হিসাব জানে না, কিংবা জানলেও মৃত্যুর মুহূর্তে সেই হিসাবটুকু পাশে সরিয়ে রেখে শেষবারের মতো তার জন্য দোয়া করতে চায়।

তারা ঈদগাহের সামনের রাস্তায় এসে জড়ো হয়েছিল। কারও হাতে ফুল ছিল না, ব্যানার ছিল না, মাইক্রোফোন ছিল না। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিও ছিল না। কয়েকজন মানুষ শুধু একজন মৃত মানুষের জন্য প্রার্থনা করতে এসেছিল।

কিন্তু রাষ্ট্র তাদের জমায়েতের মধ্যে সম্ভাব্য বিপদ দেখতে পেল।

পুলিশ তাদের সরে যেতে বলল। কথা-কাটাকাটি হলো, তারপর ধাক্কাধাক্কি। একজন বৃদ্ধ পড়ে গেলেন। আরেকজন যুবককে কলার ধরে গাড়িতে তোলা হলো। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তার গায়ে লাঠির আঘাত পড়ল। দৃশ্যটা এমন, যেন রাষ্ট্র তার কর্তৃত্বের শেষ প্রমাণটুকু আদায় করতে এসেছে এমন একজনের কাছ থেকে, যে আর কোনো প্রতিবাদ করতে পারবে না।

বৃদ্ধ লোকটি মাটি থেকে উঠে বসে বললেন, ‘বাবারা, লোকটা মরে গেছে। আর কত শাস্তি দেবে?’

কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল। পুলিশের কেউ উত্তর দিল না। আশপাশের মানুষও নীরব। নীরবতা কখনো সম্মতির লক্ষণ, কখনো ভয়ের; আবার কখনো এমন অসহায়তার প্রকাশ, যেখানে প্রতিবাদ করার ভাষাটুকুও মানুষ হারিয়ে ফেলে।

রাষ্ট্রের কিছু প্রশ্ন থাকে, যার উত্তর দেওয়ার জন্য কোনো কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় না। কারণ সেসব প্রশ্ন প্রশাসনিক নয়, নৈতিক; সেগুলোর মীমাংসা আদেশে হয় না, পরিপত্রে হয় না, লাঠি দিয়েও নয়। সেগুলো রাষ্ট্রের সামনে এসে দাঁড়ায় তার নিজের চরিত্রের সাক্ষ্য হয়ে।

সেদিন, একটি জানাজার পথে, রাষ্ট্র যেন নিজেরই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল।

দুই

বাড়ির উঠানে শোকাহত মানুষের ভিড়। কেউ বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে, কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে নিচু স্বরে কথা বলছে। ঘরের ভেতর থেকে মাঝেমধ্যে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। উঠানের এক পাশে সাদা কাপড়ে ঢাকা জানাজার খাটিয়া। কাদেরের কয়েকজন আত্মীয় বারবার ফোন করছেন—কোথায় জানাজা হবে, কীভাবে সবাইকে নিয়ে যাওয়া যাবে, প্রশাসনের সঙ্গে আর কথা বলা যায় কি না। কোনো প্রশ্নেরই স্থির উত্তর মিলছে না।

নওশীন বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। বয়স সতেরো। রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই—অন্তত এত দিন সে নিজেকে এই বিশ্বাসেই নিরাপদ রেখেছে। আগামী বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কথা। ইংরেজি সাহিত্য পড়তে চায়। তার ঘরে ভার্জিনিয়া উলফের একটি বই, রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ আর বাবার পুরোনো একটি ছবি।

কিন্তু আজ বই কিংবা ভবিষ্যতের কথা মনে করার অবকাশ নেই। বাড়ির প্রতিটি মুখে একই প্রশ্ন, প্রতিটি ফোনালাপে একই অনিশ্চয়তা। তার বাবা মারা গেছেন; অথচ শেষবারের মতো তাঁর জন্য দোয়া করার জায়গাটুকুও নিশ্চিত নয়।

নওশীনের চোখ পড়ল বসার ঘরের দেয়ালে টাঙানো ছবিটির দিকে। ছবিতে কাদের হাসছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরও কয়েকজন যুবক। তাদের চোখেমুখে ভবিষ্যৎ জয়ের প্রত্যয়—যেন পৃথিবীটা তাদের জন্যই অপেক্ষা করছে, ইতিহাসের পরবর্তী পৃষ্ঠায় কী লেখা হবে, তা-ও তাদের জানা।

সেই মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে নওশীনের মনে প্রশ্ন জাগল, মানুষ কি জন্ম থেকেই এমন হয়? ক্ষমতা কি তাকে বদলে দেয়, নাকি মানুষের ভেতরে সুপ্ত অন্ধকারটুকুকেই আরও দৃশ্যমান করে তোলে? ক্ষমতা কি মানুষকে নতুন করে নির্মাণ করে, নাকি তার প্রকৃত স্বরূপের ওপর থেকে সংযমের শেষ আবরণটুকু সরিয়ে দেয়?

মা ভিড় ঠেলে তার কাছে এলেন। চোখ লাল, মুখে আতঙ্ক। কী করবেন বুঝতে না পেরে একবার মেয়ের হাত ধরলেন, আবার ছেড়ে দিলেন। তাঁর পেছনে একজন আত্মীয় এসে বললেন, ‘আপা, ওরা বলছে ঈদগাহে জানাজা হতে দেবে না।’

মা কোনো উত্তর দিলেন না। লোকটি চলে গেলে তিনি নওশীনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোর বাবার জানাজায়ও মানুষকে মারছে!’

কথাটা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ ভেঙে গেল। নওশীন মায়ের হাত ধরল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। উঠানের অন্য প্রান্তে কেউ কাঁদছিল, কেউ ফোনে কারও কাছে অনুনয় করছিল। এই সমস্ত শব্দের মধ্যে নওশীনের মনে হলো, তার মায়ের কান্নার চেয়েও গভীরে আরেকটি প্রশ্ন জমে আছে।

মা ফিসফিস করে বললেন, ‘মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কী করে?’

নওশীন মুখ তুলল। তার চোখে ক্ষোভের চেয়ে সংশয়ই বেশি—এমন এক সংশয়, যা বাইরের পৃথিবীকে নয়, নিজের আশ্রয়কেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

‘আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম, তখন কি আমরা নিষ্ঠুর ছিলাম না?’

মায়ের হাত তার হাতের মধ্যে স্থির হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, তিনি মেয়ের কথাটি বুঝতে পারেননি।

‘তুই নিজের বাবার কথা বলছিস?’

‘আমি বাবার কথা বলছি না, মা। আমি কাজগুলোর কথা বলছি।’

মা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। উত্তর দিলেন না। উঠানের ভিড়ের মধ্যে কেউ আবার তাঁকে ডাকল। তিনি সেদিকে এগিয়ে গেলেন, কিন্তু কয়েক পা গিয়েই থামলেন। একবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে আবার আত্মীয়দের কাছে ফিরে গেলেন।

নওশীন বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। সামনে সাদা কাপড়ে ঢাকা খাটিয়া, চারপাশে উৎকণ্ঠিত মুখ, আর দেয়ালে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা তার বাবা। একই মানুষ—একদিকে জীবনের সমস্ত স্মৃতি, অন্যদিকে এমন এক অতীত, যার হিসাব সে কখনো জানতে চায়নি, অথচ আজ তা এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই।

বাইরে থেকে লোকজনের কথা ভেসে আসছিল। কোথাও ফোনে অনুরোধ, কোথাও ক্ষোভ, কোথাও অসহায় দীর্ঘশ্বাস। নওশীন বুঝতে পারল, কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষ দিতে পারে না বলে নীরব হয়; কিছু প্রশ্নের উত্তর সে জানে বলেই নীরবতাকে আশ্রয় করে।

তার মা কোন নীরবতার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছেন, সে জানে না।

শুধু জানে, আজ বাবার জানাজা আটকে গেছে। আর সেই আটকে যাওয়া পথের সামনে দাঁড়িয়ে তার নিজের ভেতরেও এমন একটি দরজা খুলে গেছে, যা এত দিন বন্ধ ছিল।

তিন

কাদেরের বড় ছেলে সাদিকের কাছে বাবার রাজনৈতিক অতীত ছিল গর্বের উত্তরাধিকার। সে বিশ্বাস করত, ক্ষমতা একবার হারালেও চিরতরে হারায় না। ইতিহাসের মঞ্চে কেউ স্থায়ী বিজয়ী নয়, কেউ চিরকাল পরাজিতও নয়। আজ যারা তাদের অপমান করছে, কাল তাদেরও পালানোর সময় আসবে। ইতিহাসের চাকা ঘুরবে, ক্ষমতার আসন বদলাবে, আর তখন প্রতিটি অপমানের জবাব দেওয়া হবে।

সাদিকের কাছে রাজনীতির ভবিষ্যৎ মানে ছিল অতীতের হিসাব মেটানোর এক অনিবার্য প্রতিশ্রুতি।

তার বন্ধু রায়হান একদিন প্রশ্ন করেছিল, ‘তুই সব সময় প্রতিশোধের কথা বলিস কেন? রাজনীতি কি শুধু হিসাব মেটানোর নাম?’

সাদিক হেসে উঠেছিল। সে হাসিতে আত্মবিশ্বাস ছিল, সঙ্গে এমন এক অবজ্ঞা, যা নিজের অভিজ্ঞতাকেই পৃথিবীর একমাত্র সত্য বলে মনে করে।

‘তুই বুঝবি না। তোর বাবা কখনো রাজনীতি করেনি।’

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, ‘সেই জন্যই হয়তো বুঝি। আমার বাবা রাজনীতি করেনি, তবু রাজনীতির শাস্তি তাকে পেতে হয়েছে। তোর বাবার লোকেরা একবার তাকে মিছিলে যেতে বলেছিল। সে রাজি হয়নি বলে তার দোকানে হামলা হয়েছিল। পরে অন্য দলের লোকেরা এসে বলেছিল, আমি তাদের দলে নাম লেখালে দোকান নিরাপদ থাকবে। বাবা দোকান বাঁচাতে ছেলে বিকিয়ে দিতে রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত দোকানও বাঁচেনি, আমিও রাজনীতিতে নাম লেখাইনি।’

কথাগুলো শুনে সাদিক হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। তার কাছে রায়হানের অভিজ্ঞতা ছিল বড়জোর এক দুর্ভাগা পরিবারের ব্যক্তিগত বিপর্যয়; রাজনীতির প্রকৃত ইতিহাস নয়। ক্ষমতার কাছাকাছি বেড়ে ওঠা মানুষেরা প্রায়ই ভুলে যায়, তাদের কাছে যে ঘটনা কৌশল কিংবা ক্ষমতার সমীকরণ, অন্য কারও জীবনে তা হয়ে উঠতে পারে জীবিকার বিনাশ, নিরাপত্তার অবসান কিংবা সারাজীবনের অপমান।

ক্ষমতার উত্তরাধিকারীরা অনেক সময় সাধারণ মানুষের ক্ষতকে দুর্বলতা বলে ভুল করে। সেই ক্ষতের মূল্য যে তাদেরও একদিন দিতে হতে পারে, সে কথা তারা বেমালুম ভুলে যায়।

এখন সাদিক নিজেই দাঁড়িয়ে আছে অসহায়তার সেই প্রান্তে, যেখান থেকে একদিন অন্যের বিপর্যয়কে সে তুচ্ছ করেছিল। বাবার মৃত্যুর পর ব্যাংকের হিসাব আটকে গেছে, ব্যবসার অংশীদার উধাও, পুরোনো বন্ধুরা ক্রমশ দূরে সরে গেছে। যাদের সঙ্গে একসময় একই টেবিলে বসে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা হতো, তারা এখন ফোন ধরতেও দ্বিধা করে।

সাদিক প্রথমবার বুঝতে শুরু করেছে, ক্ষমতার ছায়ায় যে সম্পর্কগুলোকে আশ্রয় বলে মনে হয়, তার অনেকগুলোই সুবিধার সাময়িক বিন্যাস।

যে নেতা একসময় কাদেরকে নিজের ছোট ভাই বলে পরিচয় দিতেন, তিনিই সংবাদমাধ্যমে জানালেন, কাদেরের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ বহু আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বক্তব্যটি ছিল সংক্ষিপ্ত, পরিমিত এবং আত্মরক্ষার উপযোগী। সেখানে অতীতের কোনো ছবি ছিল না, কোনো স্মৃতির দায় ছিল না; ছিল না এমন কোনো বাক্য, যা বর্তমানের নিরাপত্তাকে সামান্য হলেও বিপন্ন করতে পারে।

রাজনীতিতে স্মৃতি যত দিন উপকারী, তত দিন তাকে ইতিহাস বলা হয়; প্রয়োজন ফুরোলেই সেই ইতিহাস হয়ে ওঠে অস্বীকারযোগ্য অতীত।

সাদিক টেলিভিশনের সামনে বসে খবরটি শুনল। তারপর ফোন বের করে নেতার সঙ্গে বাবার একটি পুরোনো ছবি খুঁজে বের করল। ছবিতে নেতা কাদেরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। দুজনের মুখেই বিজয়ীর হাসি। পেছনে বিশাল ব্যানারে লেখা—‘জনগণের মুক্তি, গণতন্ত্রের বিজয়।’

সাদিক ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল। একসময় এই ছবিই ছিল তাদের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার দৃশ্যমান প্রমাণ; আজ যেন তা হয়ে উঠেছে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে নীরব সাক্ষ্য। ব্যানারের শব্দগুলোও তার চোখে অচেনা ঠেকল। জনগণের মুক্তি, গণতন্ত্রের বিজয়—যে স্লোগান একদিন ক্ষমতার বৈধতা নির্মাণ করেছিল, আজ সেই স্লোগানের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিই নিজের অতীত থেকে মুক্তি পেতে চাইছেন।

ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে গিয়েও সাদিক থেমে গেল। কী লাভ? একটি ছবি কি কাউকে তার অতীতের কাছে ফিরিয়ে নিতে পারে? যে মানুষ নিজের সুবিধার প্রয়োজনে স্মৃতি অস্বীকার করে, তার কাছে প্রমাণও শেষ পর্যন্ত কেবল একটি পুরোনো কাগজ—যার ওপর মুখগুলো রয়ে যায়, অথচ সম্পর্কের সত্য মুছে যায়।

সাদিক ফোনটা রেখে দিল। কিন্তু ছবিটি তার চোখ থেকে মুছে গেল না।

প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, ইতিহাসের চাকা ঘুরে প্রতিশোধের সুযোগ ফিরিয়ে আনতে পারে, ক্ষমতাও ফিরিয়ে দিতে পারে; কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন কি মানুষের হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে? নাকি ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সে আবারও সেই একই চক্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যে চক্র একদিন তার বাবাকে অন্যের ওপর দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছিল, আর আজ তাদের নিজেদের দাঁড়ানোর মাটিটুকুও কেড়ে নিয়েছে?

চার

পরের সপ্তাহে শহরের পুরোনো স্টেডিয়ামে নতুন ক্ষমতাসীন দলের সমাবেশ হলো। দুপুরের আগেই মাঠ ভরে উঠল। মঞ্চের সামনে সারি সারি চেয়ার, মাথার ওপর রঙিন পতাকা, আর পেছনে বিশাল ব্যানার—‘আইনের শাসন, গণতন্ত্রের অঙ্গীকার।’

মঞ্চে উঠে নেতা হাত তুলতেই হাততালি শুরু হলো। তিনি মাইক্রোফোনের কাছে ঝুঁকে বললেন, ‘আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না। আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব।’

সামনের সারিতে বসে থাকা সাংবাদিক মাহবুব হোসেন নোটবুকে বাক্যগুলো লিখলেন। তারপর কলম থামিয়ে মাঠের বাইরে তাকালেন। তাঁর সামনে দিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য হেঁটে যাচ্ছিলেন। একজনের হাতে লাঠি, অন্যজনের কাঁধে বন্দুক। রাস্তার ওপারে একটা চায়ের দোকানে দুজন লোক তর্ক করছিল। মাইকের শব্দে তাদের কথা শোনা যাচ্ছিল না।

মাহবুব বহু বছর ধরে এই শহরের রাজনৈতিক সমাবেশে আসছেন। একই মাঠে তিনি বহু নেতাকে একই রকম প্রতিশ্রুতি দিতে শুনেছেন। শুধু মুখগুলো বদলেছে, ব্যানারের রং বদলেছে, স্লোগানের শব্দ বদলেছে। তাঁর নোটবুকের পুরোনো পাতাগুলোতে প্রায় একই বাক্য ছড়িয়ে আছে।

তিনি একটি পাতা উল্টালেন। কয়েক বছর আগের এক নেতার বক্তব্যের নিচে লেখা—‘প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার।’ তারও আগের পাতায়—‘জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেব।’

তিনি কলমের মুখ দিয়ে পুরোনো লেখাটার ওপর একবার দাগ টানলেন। তারপর নোটবুক বন্ধ করে দিলেন।

সমাবেশ শেষ হতে বিকেল গড়িয়ে গেল। নেতা গাড়িতে উঠলেন। চারদিকে স্লোগান উঠল, কর্মীরা গাড়ির পেছনে ছুটল। পুলিশের ব্যারিকেড সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করা হচ্ছিল। ঠিক তখনই ফুটপাতের এক পাশে দাঁড়ানো তরুণটিকে মাহবুবের চোখে পড়ল।

তার হাতে সাদা প্ল্যাকার্ড। কালো অক্ষরে লেখা—‘বিচার চাই, প্রতিশোধ নয়।’

তরুণটির বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি হবে না। পরনে সাধারণ শার্ট, কাঁধে পুরোনো ব্যাগ। সে কাউকে ডাকছিল না, স্লোগানও দিচ্ছিল না। শুধু প্ল্যাকার্ডটা বুকের সামনে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।

একজন পুলিশ সদস্য তার সামনে এসে থামল।

‘এখানে দাঁড়ানো যাবে না। সরে যান।’

‘আমি তো রাস্তার ওপর দাঁড়াইনি।’

‘কথা বাড়াবেন না। সরে যান।’

তরুণটি রাস্তার দিকে তাকাল। ‘আমি কোনো বাধা দিচ্ছি না।’

পুলিশ সদস্যটি লাঠিটা হাত বদল করে ধরল। ‘আপনাকে কি বুঝিয়ে বলতে হবে?’

তরুণটি আর কথা বলল না। এক পা পিছিয়ে ফুটপাতের কিনারায় দাঁড়াল। পুলিশ সদস্যটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে অন্যদিকে চলে গেল।

মাহবুব দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিলেন। নোটবুক বের করে কিছু লিখতে গিয়েও থেমে গেলেন। তরুণটির প্ল্যাকার্ডে চোখ পড়তেই তাঁর মনে হলো, বাক্যটি তিনি আগে কোথাও দেখেছেন—কোনো পুরোনো সংবাদে, আদালত চত্বরে কিংবা কোনো নিহত মানুষের বাড়ির সামনে।

তখনই তরুণটির ফোন বেজে উঠল। সে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে বলল, ‘হ্যাঁ, বাবা।’

ওপাশ থেকে কী বলা হলো, মাহবুব শুনতে পেলেন না। শুধু দেখলেন, তরুণটি রাস্তার পাশের একটা বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে বসে পড়েছে।

‘না, কিছু হয়নি। সমাবেশ শেষ হচ্ছে। এখনই ফিরব।’

আবার নীরবতা।

‘তুমি ওষুধ খেয়েছ?’

কথা বলতে বলতে সে প্ল্যাকার্ডটা হাঁটুর ওপর নামিয়ে রাখল। বাতাসে কাগজের এক কোণ উল্টে যাচ্ছিল। সে হাত দিয়ে চেপে ধরল।

মাহবুব নোটবুক হাতে নিয়ে তার কাছে এগিয়ে গেলেন।

‘আপনি কি কোনো সংগঠনের লোক?’

‘না।’

‘তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’

‘একটা কথা জানাতে।’

‘কাকে?’

‘যারা শুনতে চায় না, তাদের।’

মাহবুব আর প্রশ্ন করলেন না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চা-ওয়ালা গ্লাস ধুচ্ছিল। সে তরুণটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবা, এসব করে কী হবে? ঘরে যাও। তোমার বয়সে আমারও অনেক রাগ ছিল।’

‘আপনার রাগ কমেছে?’

চা-ওয়ালা গ্লাসটা নামিয়ে রাখল। ‘রাগ কমেনি। শুধু কথা বলা কমেছে।’

তরুণটি আর কিছু বলল না।

তার বাবা একসময় বিরোধী দলের কর্মী ছিলেন। একটি রাজনৈতিক মামলায় কয়েক মাস জেল খেটেছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পর আর কোনো মিছিলে যাননি। ছোট একটা দোকান চালাতেন। ছেলেকে প্রায়ই বলতেন, ‘জেল খেটে বুঝেছি, রাজনীতি মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করে।’

ছেলেটি বাবার কথা পুরোপুরি মানতে পারেনি। তার মনে হতো, রাজনীতি যদি মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করে, তবে সেই খেলার নিয়ম বদলানোর চেষ্টা না করে সরে দাঁড়ানোই বা কীভাবে সমাধান হতে পারে? কিন্তু বাবার হাতের পুরোনো দাগগুলো দেখলে সে আর তর্ক করত না। জেলের কথা উঠলে বাবা কখনো বিস্তারিত বলতেন না। শুধু একদিন বলেছিলেন, ‘ভেতরে থাকতে সবচেয়ে কষ্ট হতো, তোর মা দেখা করতে এসে ফিরে গেলে। আমি জানতাম না, সে বাসায় গিয়ে কীভাবে রাত কাটাবে।’

সেদিনের পর থেকে ছেলেটি বাবার রাজনৈতিক অতীত নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন করেনি। তবু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ইচ্ছেটা তার ভেতরে থেকে গিয়েছিল।

রাস্তার ওপাশে হঠাৎ হৈচৈ শুরু হলো। কয়েকজন তরুণ পুলিশের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি করছিল। একজনের হাতে মোবাইল ফোন, সে ভিডিও করছিল। পুলিশ সদস্যটি তার ফোন নামাতে বলল। তরুণটি কিছু একটা বলতেই লাঠি উঁচিয়ে এগিয়ে গেলেন তিনি।

প্ল্যাকার্ড হাতে থাকা তরুণটি উঠে দাঁড়াল। মাহবুবও এগিয়ে গেলেন।

‘কী হয়েছে?’ মাহবুব জিজ্ঞেস করলেন।

কেউ উত্তর দিল না। যে তরুণটি ভিডিও করছিল, সে ইতিমধ্যে ফুটপাতের দিকে সরে গেছে। পুলিশ সদস্যটি ফিরে এসে প্ল্যাকার্ডধারী তরুণটির দিকে তাকাল।

‘আপনাকে না সরে যেতে বলেছি?’

‘আমি তো সরে এসেছি।’

‘আবার এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’

‘আমি বাসায় যাব।’

‘তাহলে যান।’

তরুণটি প্ল্যাকার্ডটা বুকে চেপে ধরে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক পা যেতেই পেছন থেকে পুলিশ সদস্যের গলা শোনা গেল, ‘এই যে, শোনেন!’

সে থামল।

‘ওটা নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?’

‘এটা?’

‘হ্যাঁ। নামিয়ে রেখে যান।’

‘কেন?’

পুলিশ সদস্যটি তার কাছে এগিয়ে এল। ‘সব কথার উত্তর দিতে হবে?’

তরুণটি কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে প্ল্যাকার্ডটা নামিয়ে ফেলল। পুলিশ সদস্যটি সেটি কেড়ে নিয়ে পাশে রাখা ব্যারিকেডের ওপর ছুড়ে দিল। কাগজটা একবার উল্টে মাটিতে পড়ল।

তরুণটি ঝুঁকে সেটি তুলে নিল।

‘যান, যান!’ পুলিশ সদস্যটি বিরক্ত হয়ে হাত নাড়ল।

তরুণটি আর দাঁড়াল না।

মাহবুব লক্ষ করলেন, পুলিশ সদস্যটির মুখে কোনো উন্মত্ত ক্রোধ নেই। সে ওয়্যারলেসে কথা বলছে, মাঝেমধ্যে ঘড়ি দেখছে। কিছুক্ষণ পর পকেট থেকে ফোন বের করে কারও সঙ্গে কথা বলল।

‘হ্যাঁ, বের হয়েছি। না, এখনো আসতে পারব না। তুমি ওকে খাইয়ে দাও।’

ওপাশ থেকে শিশুর কান্নার শব্দ ভেসে এল কি না, মাহবুব বুঝতে পারলেন না। পুলিশ সদস্যটি বলল, ‘আচ্ছা, রাখছি,’ তারপর ফোন পকেটে ঢুকিয়ে নিল।

একজন সহকর্মী এসে তার কাঁধে হাত রাখল।

‘কী রে, আজও দেরি হবে?’

‘আর বলিস না। বাসায় বাচ্চার জ্বর।’

‘তাহলে তাড়াতাড়ি শেষ কর।’

দুজনেই ব্যারিকেডের দিকে চলে গেল।

মাহবুব দাঁড়িয়ে রইলেন। একটু আগে যে হাতটি প্ল্যাকার্ড কেড়ে নিয়েছিল, সেই হাতেই এখন শিশুর জ্বরের খবর নেওয়ার ফোন ধরা হয়েছিল। লোকটি হয়তো বাড়ি ফিরে সন্তানের কপালে হাত রাখবে, ওষুধ খাওয়াবে, স্ত্রীর কাছে জানতে চাইবে সারা দিন কী হয়েছে। অথচ এই কয়েক মিনিটের মধ্যে সে একজন তরুণের হাত থেকে একটি বাক্য কেড়ে নিয়েছে—যে বাক্যে কারও শাস্তি দাবি করা হয়নি; শুধু বিচার আর প্রতিশোধের মধ্যে পার্থক্য রাখার আবেদন ছিল।

মাহবুব নোটবুক খুললেন। লিখলেন, ‘এক তরুণের প্ল্যাকার্ড পুলিশ কেড়ে নিয়েছে।’ তারপর কলম থামালেন। বাক্যটির নিচে আরেকটি বাক্য লিখতে গিয়েও লিখলেন না।

তরুণটি তখন রাস্তার মোড়ে পৌঁছে গেছে। একবার পেছন ফিরে তাকাল। তারপর প্ল্যাকার্ডটা ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।

মাহবুবের ফোন বেজে উঠল। পত্রিকার সম্পাদক জানতে চাইলেন, সমাবেশের খবর তৈরি হয়েছে কি না।

‘হচ্ছে,’ তিনি বললেন।

‘নেতার বক্তব্যটা ঠিকমতো দিয়ো। আইনের শাসন আর প্রতিহিংসা না করার কথাটা যেন বাদ না যায়।’

‘আচ্ছা।’

কল কেটে মাহবুব মঞ্চের দিকে তাকালেন। কর্মীরা ব্যানার নামাচ্ছিল। এক পাশে কয়েকটি চেয়ার উল্টে পড়ে ছিল। মাইক্রোফোনের তার গুটিয়ে রাখা হচ্ছিল। মাঠের মাঝখানে পড়ে থাকা কাগজগুলো বাতাসে গড়িয়ে বেড়াচ্ছিল।

তিনি নোটবুকের পাতায় নেতার বক্তব্যের নিচে তরুণটির কথাটি লিখলেন—‘বিচার চাই, প্রতিশোধ নয়।’ তারপর কিছুক্ষণ ভেবে দুটো বাক্যের মাঝখানে একটি ফাঁকা জায়গা রাখলেন।

বাড়ি ফেরার পথে মাহবুব দেখলেন, ফুটপাতের এক দোকানে টেলিভিশন চলছে। পর্দায় নেতার মুখ। নিচে সংবাদ শিরোনাম—‘প্রতিহিংসামুক্ত গণতন্ত্র গড়ার অঙ্গীকার।’

দোকানদার রিমোট দিয়ে শব্দ কমিয়ে দিল। তারপর ক্রেতার দিকে ফিরে বলল, ‘চা দেব?’

মাহবুব থেমে গেলেন। নোটবুকের ভেতর থেকে বাতাসে একটা পাতা নড়ছিল। তিনি সেটি চেপে ধরে হাঁটতে শুরু করলেন।

রাতে সংবাদ লিখতে বসে তিনি নেতার বক্তব্য, সমাবেশের ভিড়, হাততালি আর নিরাপত্তাব্যবস্থার কথা লিখলেন। তরুণের কথাটিও লিখলেন। কিন্তু প্ল্যাকার্ড কেড়ে নেওয়ার ঘটনাটি কোথায় রাখবেন, বুঝতে পারলেন না। খবরের ভাষায় ঘটনাটি খুব ছোট—একজন পুলিশ একজন তরুণকে সরিয়ে দিয়েছে। শহরে প্রতিদিন এমন কত ঘটনা ঘটে।

তিনি বাক্যটি মুছে দিলেন। আবার লিখলেন। তারপর আবার মুছে দিলেন।

শেষ পর্যন্ত নোটবুক বন্ধ করে জানালার পাশে দাঁড়ালেন। দূরে কোনো এক বাড়িতে শিশুর কান্না শোনা যাচ্ছিল। পাশের ঘর থেকে তাঁর মেয়ের পড়ার শব্দ আসছিল। টেবিলের ওপর স্ত্রীর রেখে যাওয়া ওষুধের পাতা।

তিনি ফিরে এসে কম্পিউটারের পর্দায় নেতার বক্তব্যের শেষ লাইনটি লিখলেন—‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।’

কিছুক্ষণ পর লাইনটির নিচে আরেকটি বাক্য লিখলেন—‘সমাবেশ শেষে এক তরুণের প্ল্যাকার্ড পুলিশ কেড়ে নেয়।’

এবার তিনি বাক্যটি মুছলেন না।

পাঁচ

বাড়ি ছাড়ার আগের রাতে নওশীন বাবার ছবিটি আবার বের করেছিল। ছবির পেছনে সেই পরিচিত বাক্য—‘একদিন আমাদের সময় আসবে।’

একসময় বাক্যটি তার কাছে প্রতিশ্রুতির মতো মনে হতো। এখন মনে হয়, এটি এমন এক প্রশ্নের শুরু, যার উত্তর তার বাবা কোনো দিন খুঁজেছিলেন কি না, সে জানে না।

মা পাশের ঘরে জিনিসপত্র গুছাচ্ছিলেন। আলমারির পাল্লা খোলা, মেঝেতে কয়েকটি কার্টন, বিছানার ওপর ভাঁজ করা কাপড়। যে বাড়ির দরজায় একসময় মানুষের ভিড় লেগে থাকত, সেই বাড়ি এখন বিক্রির অপেক্ষায়। দেয়ালে ছবির জায়গাগুলো ফ্যাকাশে হয়ে আছে। বসার ঘরের এক কোণে পড়ে আছে বাবার পুরোনো চেয়ার। কেউ সেটি নিতে চায়নি।

নওশীন ছবিটি হাতে নিয়ে মায়ের কাছে গেল।

‘মা, বাবা কি জানতেন, একদিন এমন হবে?’

‘কী এমন?’

‘সবাই চলে যাবে। বাড়িটা বিক্রি হয়ে যাবে। তাঁর নাম শুনলে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে।’

মা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘মানুষ যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন ভাবে সবাই তার পাশে আছে। আসলে অনেকেই পাশে থাকে না, ক্ষমতার পাশে থাকে।’

‘আর যারা অন্যায়ের শিকার হয়?’

মা এবার মেয়ের দিকে তাকালেন।

‘তাদের কথা আমরা তখন কতটা ভেবেছিলাম, সেই হিসাবও তো করতে হবে।’

নওশীন আর প্রশ্ন করল না। মায়ের কণ্ঠে আত্মপক্ষসমর্থন ছিল না, আবার সম্পূর্ণ স্বীকারোক্তিও ছিল না। ছিল বহুদিনের জমে থাকা এমন এক ক্লান্তি, যার ভেতরে মানুষ নিজের ভুলের মুখোমুখি হতে চায়, অথচ সব কথা উচ্চারণ করার সাহস পায় না।

নওশীন ছবিটি খামে ঢুকিয়ে নিজের ব্যাগে রাখল। বাবাকে সে মুছে ফেলতে পারবে না। কিন্তু তাঁর স্মৃতিকে এমন একটি ঘরে বন্দী করেও রাখতে চায় না, যেখানে কোনো প্রশ্নের প্রবেশাধিকার নেই।

ছয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনাচক্রে সেদিন এক ছাত্র তাকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিল।

‘আপনার বাবা ক্ষমতায় থাকার সময় অন্যায় করে থাকলে, আপনি কি তাঁর বিচার চান?’

নওশীন উত্তর দিতে গিয়ে একটু থেমেছিল। হলঘরের জানালা দিয়ে বিকেলের আলো ঢুকছিল। সামনের সারিতে বসা কয়েকজন তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

‘হ্যাঁ,’ সে বলেছিল। ‘অভিযোগের প্রমাণ থাকলে তাঁরও বিচার হওয়া উচিত। তিনি আমার বাবা—এ কারণে তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন।’

‘তাহলে তাঁর জানাজায় বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ করছেন কেন?’

‘কারণ বিচার আর প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। একজনের অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁকে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া যায়। কিন্তু তাঁর মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর পরিবারকে অপমান করার অধিকার কারও নেই। তাঁর অপরাধের দায় তাঁর সন্তানদের ওপর চাপানো যায় না।’

‘কিন্তু আপনার বাবার রাজনীতিতে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাদের ক্ষোভ?’

‘তাদের ক্ষোভেরও বিচার হওয়া দরকার। তারা যে অন্যায়ের শিকার হয়েছে, তার জবাবদিহি চাইতে পারে। কিন্তু তাদের ক্ষত সারানোর নামে নতুন কাউকে একই ক্ষত দেওয়া হলে ন্যায়বিচার কোথায় থাকে?’

কেউ কিছু বলল না। নওশীন এবার একটু সামনে ঝুঁকল।

‘আমরা যখন নিজেদের পক্ষের মানুষকে বিচার থেকে বাঁচাতে চাই, তখন অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াই। আবার প্রতিপক্ষকে অপমান করাকেই যখন ন্যায়বিচার মনে করি, তখনও অন্যায়ের পক্ষেই দাঁড়াই। পার্থক্য শুধু এই যে, একবার অন্যায়কে ভালোবাসার নাম দিই, আরেকবার প্রতিশোধের।’

আলোচনাটি সেদিন আরও কিছুক্ষণ চলেছিল। কেউ তার সঙ্গে একমত হয়েছিল, কেউ হয়নি। কিন্তু ফেরার পথে নওশীনের মনে হয়েছিল, বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ তাঁর নাম অস্বীকার করা নয়; বরং তাঁর নামের আড়ালে যে প্রশ্নগুলো এত দিন চাপা পড়ে ছিল, সেগুলোকে সামনে নিয়ে আসা।

সাত

কয়েক দিন পর বৃষ্টিভেজা এক সন্ধ্যায় নওশীন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখল, শ্রমিকেরা একটি পুরোনো পোস্টারের ওপর নতুন পোস্টার লাগাচ্ছে। নতুন নেতার হাসিমুখ, নিচে বড় অক্ষরে লেখা—‘নতুন দিনের অঙ্গীকার।’

একজন শ্রমিক ছেঁড়া পোস্টারের কোণ টেনে নামাল। কাগজ উঠে এল, কিন্তু দেয়ালের কালচে দাগ রয়ে গেল। সে হাতের তালু দিয়ে দাগ ঘষে দেখল। তারপর আর চেষ্টা না করে নতুন পোস্টারটি সেঁটে দিল।

নওশীনের ফোন বেজে উঠল। সাদিক।

‘দেখেছিস, ওরা আবার সব সাজাচ্ছে?’

‘দেখেছি।’

‘বাবার পুরোনো লোকজনও ফিরছে। সময় বেশি লাগবে না। একদিন সব আমাদের হাতে আসবে।’

‘তারপর?’

‘তারপর আবার শুরু করব।’

‘কী শুরু করবি, ভাইয়া?’

‘রাজনীতি। বাবার সম্মান ফিরিয়ে আনব।’

‘বাবার সম্মান ফিরিয়ে আনার মানে কী? তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে, সেগুলোর বিচার হতে দেওয়া? নাকি যারা তাঁকে অপমান করেছে, তাদের অপমান করা?’

সাদিক বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুই সবকিছু এত জটিল করিস কেন? ক্ষমতায় ফিরতে পারলে অনেক কিছু ঠিক করা যাবে।’

‘ক্ষমতায় থাকার সময় কী ঠিক করেছিলাম, সেটা না ভেবেই আবার ক্ষমতায় ফিরতে চাই কেন?’

ওপাশে নীরবতা।

‘তুই বাবাকে ভুলে গেছিস।’

‘না। আমি শুধু চাই না, বাবার নামে আবার সেই ভুলগুলো করি।’

‘তুই বুঝবি না।’

‘হয়তো বুঝব না। কিন্তু একটা কথা বুঝি—আমাদের হাতে ক্ষমতা এলেই আমাদের কাজ ন্যায় হয়ে যাবে না।’

সাদিক ফোন কেটে দিল।

নওশীন ফোনটি ব্যাগে রাখল। রাস্তার ওপারে পোস্টার লাগানো শেষ হয়েছে। শ্রমিকেরা মই নিয়ে চলে যাচ্ছে। নতুন নেতার মুখটি বৃষ্টিতে চকচক করছে। পোস্টারের নিচে পুরোনো দেয়ালের দাগ আর দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু দাগগুলো মুছে যায়নি।

আট

বাড়ি ছাড়ার পর নতুন ঘরে প্রথম কয়েকটি সকাল নওশীনের কাছে অচেনা লেগেছিল। জানালার ওপাশে ছিল অন্য একটি বাড়ির দেয়াল; রোদ উঠত, কিন্তু ঘরে এসে পৌঁছাত না।

এক সকালে বই গোছাতে গিয়ে সে বাবার ছবিটি আবার বের করল। ছবির পেছনে সেই পরিচিত বাক্য—‘একদিন আমাদের সময় আসবে।’

নওশীন ছবিটা ছিঁড়ল না, আবার যত্ন করে তুলে রাখলও না। বাক্যটির ওপর আঙুল বুলিয়ে সে অনেকক্ষণ বসে রইল। তারপর ছবিটা বইয়ের ভাঁজে রেখে দিল।

জানালার বাইরে সকাল হয়ে এসেছে। পাশের বাড়ির দেয়ালে রোদ উঠেছে, অথচ তাদের ঘরে আলো ঢোকার পথ নেই। দূরে কোথাও মসজিদ থেকে মাইকে জানাজার ঘোষণা ভেসে আসছে। নওশীনের মনে পড়ল সেই জানাজার কথা—সাদা কাফনে মোড়ানো বাবার নিথর শরীর, বন্ধ ঈদগাহের ফটক, ব্যারিকেডের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো। আর সেই বৃদ্ধের কণ্ঠ, যা এত দিন পরও তার ভেতরে কেঁপে ওঠে—

‘বাবারা, লোকটা মরে গেছে। আর কত শাস্তি দেবে?’

সে বই খুলল। পাতার ওপর কলম ছোঁয়াল, কিন্তু কিছু লিখল না। শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের একটুখানি নীল দেখতে চেষ্টা করল।

শহরে তখন নতুন পোস্টার লাগানো হচ্ছে। পুরোনো মুখের ওপর উঠে আসছে নতুন মুখ, পুরোনো প্রতিশ্রুতির ওপর নতুন প্রতিশ্রুতি। আঠা শুকিয়ে যাবে, কাগজের রং ফিকে হবে, একদিন সেগুলোও ছিঁড়ে পড়বে। দেয়ালটা থেকে যাবে—পরবর্তী কোনো নতুন মুখের অপেক্ষায়।

নওশীন বই বন্ধ করে দিল। তার মনে হলো, সময় বুঝি সত্যিই ফিরে আসে; শুধু মানুষগুলো খেয়াল করে না, ফিরে আসার পথে তারা কী কী ফেলে এসেছিল।

দূরে কোথাও একটা জানাজার খাটিয়া কাঁধে উঠল। চারজন মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল সরু গলি দিয়ে। তাদের সামনে কোনো ব্যারিকেড ছিল না। তবু নওশীনের মনে হলো, পৃথিবীর সব পথ যে খোলা, তা নয়—কিছু পথ আটকে থাকে মানুষের বুকের ভেতর।

আর সেই পথের শেষ মাথায়, বহুদিন ধরে, কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে—একটি মৃত মানুষের জন্য দরজা খুলে দেওয়ার অপেক্ষায়।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.