ঈশ্বরসিং হোটেলের কামরায় পা রাখতেই কুলবন্ত কাউর আচমকা পালং থেকে উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে খিল এঁটে দিল সে। তারপর ফিরে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল ঈশ্বরসিংয়ের সামনে। তার চোখে এমন এক তীক্ষ্ণ অনুসন্ধান—যেন দীর্ঘ অনুপস্থিতির প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব সে এখন ওই মুখখানা পড়েই বুঝে নিতে চায়।
রাত তখন বারোটা পেরিয়ে গেছে। বাইরে নিস্তব্ধ শহর। দূরে কোথাও হয়তো কোনো অচেনা শব্দ ভেসে আসছে, তারপর সেটিও মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের গভীরে। চারপাশের সেই নিস্তব্ধতা যেন কামরাটার ভেতরেও এসে জমাট বেঁধেছে।
কিছুক্ষণ ঈশ্বরসিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার পর কুলবন্ত ধপ করে পালংয়ের ওপর বসে পড়ল।
ঈশ্বরসিং তখনও ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে। হাতে কৃপাণ। কিন্তু তার ভঙ্গিতে আজ কোনো দৃঢ়তা নেই। মনে হয়, বহুক্ষণ ধরে তাকে তাড়িয়ে বেড়ানো কোনো অদৃশ্য, অসহনীয় চিন্তা থেকে সে নিজেকেই মুক্ত করার চেষ্টা করছে। চোখ নিচু। ঠোঁট বন্ধ। মুখে ক্লান্তির ছায়া।
সময় কেটে যেতে লাগল।
কুলবন্ত পালংয়ের কিনারায় বসে দুটো পা নিচে ঝুলিয়ে দিল। ধীরে ধীরে পা দোলাতে লাগল সে। যেন এই সামান্য নড়াচড়ার মধ্যেই জমে থাকা অস্থিরতাকে সামলাতে চাইছে। কিন্তু ঈশ্বরসিংয়ের কাছ থেকে কোনো শব্দ এল না।
কুলবন্ত কাউর ছিল মোটাসোটা, বলিষ্ঠ গড়নের নারী। তার উজ্জ্বল চোখ দুটোতে ছিল এক অদ্ভুত তেজ। ওপরের ঠোঁটের কাছে সূক্ষ্ম গোঁফের রেখা। মুখের দিকে একবার তাকালেই বোঝা যায়—এই নারীকে সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তার উপস্থিতির মধ্যেই ছিল এক ধরনের কর্তৃত্ব, এক ধরনের দাবিদার শক্তি।
আর ঈশ্বরসিং?
একসময় যে মানুষটির শরীরের গড়ন ও উচ্চতা দেখে শক্তসমর্থ যুবকের কথা মনে হতো, সেই ঈশ্বরসিং আজ যেন নিজেরই ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার পাগড়ি আলগা হয়ে কপালের দিকে নেমে এসেছে। মুঠোয় ধরা কৃপাণের ফলাও যেন তার হাতের শক্তি হারিয়ে ধীরে ধীরে নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে।
কামরার ভেতর শুধু নীরবতা।
একজন অপেক্ষা করছে উত্তরের জন্য। আর অন্যজন যেন কোনো উত্তরই খুঁজে পাচ্ছে না।
হঠাৎ কুলবন্তের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সে নীরবতা ভেঙে ডাকল,
—ঈশ্বর সিয়া!
ঈশ্বরসিং ধীরে ধীরে চোখ তুলল।
এক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখে চোখ পড়ল। কুলবন্তের দৃষ্টিতে ছিল প্রশ্ন, অভিমান আর রাগের মিশেল। সেই দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে ঈশ্বরসিং আবার মুখ ফিরিয়ে নিল।
কুলবন্ত এবার আরও জোরে ডাকল,
—ঈশ্বর সিয়া!
তার কণ্ঠে এবার আর শুধু ডাক ছিল না—ছিল জমে থাকা ক্ষোভের ধার।
সে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ঈশ্বরসিংয়ের কাছে গিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—এতদিন কোথায় ছিলে?
ঈশ্বরসিংয়ের শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট নড়ল। সে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। মনে হলো, কথাগুলো তার গলার ভেতর কোথাও আটকে আছে। অনেক কষ্টে সে বলল,
—জানি না।
কুলবন্ত যেন বিশ্বাসই করতে পারল না।
তার চোখে মুহূর্তেই আগুন জ্বলে উঠল।
—জানি না?
সে আরও কাছে এগিয়ে এল।
—এটা কি কোনো উত্তর হলো?
ঈশ্বরসিং আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। হাতের কৃপাণটা একপাশে ছুড়ে দিয়ে সে খাটের ওপর সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, বহুদিন ধরে কোনো অদৃশ্য অসুখ তার শরীর ও মন—দুটোকেই ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিচ্ছে।
কুলবন্ত কিছুক্ষণ স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটাকে যেন হঠাৎ তার অচেনা মনে হলো। যে ঈশ্বরসিংকে সে জানত, তার মধ্যে ছিল প্রাণের উচ্ছ্বাস, শরীরের শক্তি, চোখে ছিল একরকম দুরন্ত আত্মবিশ্বাস। অথচ আজ সেই মানুষটি নিস্তেজ হয়ে খাটের ওপর পড়ে আছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, মুখে বিবর্ণতা, আর সমস্ত শরীরজুড়ে এক অদ্ভুত ভাঙাচোরা অবসাদ।
কুলবন্তের বুকের ভেতর হঠাৎ মায়া জেগে উঠল।
সে ধীরে ধীরে খাটের কাছে গিয়ে বসল। তারপর স্নেহভরে ঈশ্বরসিংয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম স্বরে বলল,
—তোমার কী হয়েছে বলো তো?
ঈশ্বরসিং কোনো উত্তর দিল না। ছাদের দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল সে। যেন ছাদের ওপারে এমন কোনো দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে, যা এই ঘরের কেউ দেখতে পায় না।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে কুলবন্তের দিকে তাকাল। দীর্ঘক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে রইল। যেন পরিচিত এই মুখটির মধ্যেও আজ সে কোনো আশ্রয় খুঁজছে।
তারপর বিষণ্ন কণ্ঠে ডাকল,
—কুলবন্ত…
কুলবন্তের চোখে মুহূর্তেই কোমলতার আলো ফুটে উঠল।
—জী, বলো।
ঈশ্বরসিং মাথার পাগড়িটা খুলে ফেলল। পাগড়ির আড়াল থেকে এলোমেলো চুল বেরিয়ে এল। সে কুলবন্তের দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকাল, যেন বহুদিন পর কোনো নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান পেয়েছে।
হঠাৎ নিজের মাংসল পেটে জোরে এক চড় মারল সে। তারপর মাথাটা ঝাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—মাথাটা বিগড়ে গেছে…
মাথা ঝাঁকাতেই চুলের বাঁধন খুলে গেল। কুলবন্ত আর কিছু না বলে আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে তার চুল আঁচড়াতে লাগল। সেই স্পর্শে ছিল অভিমান ভুলে যাওয়া এক নারীর নিঃশব্দ মমতা।
কিছুক্ষণ স্বামীর চুলে আঙুল চালিয়ে যেতে যেতে সে আবার নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
—ঈশ্বরসিং, এতদিন কোথায় ছিলে?
ঈশ্বরসিং তার দিকে তাকাল। চোখে ভয়, ক্লান্তি আর এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব।
—কবিরে…
কথাটা যেন তার গলা থেকেই ঠিকমতো বেরোল না।
হঠাৎ সে দুহাতে কুলবন্তের দুই বাহু আঁকড়ে ধরল। কণ্ঠে অদ্ভুত এক বিষণ্নতা মিশিয়ে বলল,
—গুরুর দিব্যি, তুমি বড় বাজে মেয়ে!
কুলবন্ত এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে নিল। চোখে আবার সেই পুরোনো রাগের ঝিলিক ফিরে এল।
—আমার দিব্যি, সত্যি করে বলো—কোথায় ছিলে? শহরে গিয়েছিলে?
ঈশ্বরসিং নিজের চুল গুছিয়ে বাঁধতে বাঁধতে নিচু স্বরে বলল,
—কোথাও না।
কুলবন্ত তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকাল।
—মিথ্যে বলছ। নিশ্চয়ই শহরে গিয়েছিলে। অনেক টাকা-পয়সা লুটেছ। এখন আমার কাছেই সেসব লুকোতে চাইছ!
ঈশ্বরসিংয়ের মুখে হালকা বিরক্তির ছায়া ফুটে উঠল। সে বলল,
—বাপের জন্মে যদি তোমার সঙ্গে মিথ্যে বলে থাকি!
কথাটা শুনে কুলবন্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন তার রাগের ভেতরেও সন্দেহটা পুরোপুরি মরল না।
তারপর হঠাৎ আবার উত্তেজিত হয়ে উঠল সে।
—কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। সেদিন রাতে তোমার কী হয়েছিল? তখন তো বেশ ভালোই ছিলে। শহর থেকে লুট করে আনা কত গয়নাগাটি আমার গায়ে। তুমি নিজেই তো কত খুশি ছিলে!
কথা বলতে বলতে কুলবন্তের চোখে সেই রাতের দৃশ্য যেন আবার ভেসে উঠল।
—তারপর হঠাৎ কী হলো জানি না! তুমি এক লাফে উঠে দাঁড়ালে। জামাকাপড় পরলে। তারপর কিছু না বলেই কোথায় যেন বেরিয়ে গেলে। আমি কত ডাকলাম—একবারও ফিরে তাকালে না।
ঈশ্বরসিংয়ের মুখের রঙ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
কুলবন্তের চোখ এড়াল না সেই পরিবর্তন।
সে একটু ঝুঁকে এসে ঈশ্বরসিংয়ের মুখের দিকে তাকাল।
—দেখলে? তোমার চেহারার রঙ কীভাবে বদলে গেল!
তার কণ্ঠে এবার রাগের চেয়ে কৌতূহল বেশি। কিন্তু সেই কৌতূহলের আড়ালে ছিল এক গভীর আশঙ্কা।
সে ধীরে ধীরে বলল,
—ঈশ্বর সিয়া, গুরুর দিব্যি… নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে। তুমি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ।
—তোমার মাথার দিব্যি দিয়ে বলছি, সত্যিই কিছু হয়নি।
ঈশ্বরসিংয়ের কণ্ঠে কোনো জোর ছিল না। কথাগুলো যেন বুকের গভীর থেকে নয়, নিঃশেষ হয়ে আসা কোনো প্রাণহীন স্থান থেকে বেরিয়ে এল।
কিন্তু তার সেই নিষ্প্রাণ স্বরেই কুলবন্তের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলো। সে ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দৃঢ় স্বরে বলল,
—ঈশ্বর সিয়া, ব্যাপারটা কী বলো তো? আট দিন আগে তোমাকে যেমন দেখেছি, এখন তো তুমি আর তেমন নেই।
ঈশ্বরসিং হঠাৎ উঠে বসল। যেন অদৃশ্য কোনো আঘাত তাকে চমকে দিয়েছে। তারপর কুলবন্তকে পাশে বসিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,
—কুলবন্ত, আমার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
কিন্তু কুলবন্ত থামল না। এতদিনের জমে থাকা প্রশ্ন যেন একে একে তার ঠোঁটের কাছে এসে ভিড় করছে।
—তাহলে সেদিন রাতে বাইরে গিয়েছিলে কেন? জাহান্নামে যাও! এতক্ষণ ধরে কীসের ভান করছ? বলছ না কেন?
ঈশ্বরসিং চোখ নামিয়ে বলল,
—কিছু হলে তো বলব।
কুলবন্তের চোখ জ্বলে উঠল।
—আমাকে নিজের হাতে পুড়িয়ে মারবে, যদি মিথ্যে বলে থাকো!
ঈশ্বরসিং এবার কোনো উত্তর দিল না। হঠাৎ দুহাতে কুলবন্তকে জড়িয়ে ধরল। তার মুখটা কুলবন্তের কানের কাছে নিয়ে গিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে কী যেন বলল।
কথাগুলো এতই গোপন, এতই নরম ছিল যে কুলবন্তের কানে পৌঁছানোর আগেই ঈশ্বরসিংয়ের গোঁফের কেশরাশি তার নাকে সুড়সুড়ি দিল।
কুলবন্ত হাঁচি দিয়ে উঠল।
পরক্ষণেই দুজনেই হেসে ফেলল।
হাসির সেই ক্ষণিক আলোয় যেন ঘরের সমস্ত অস্বস্তি খানিকটা দূরে সরে গেল।
ঈশ্বরসিং মমতাভরা চোখে কুলবন্তের দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে ছিল ক্লান্ত স্নেহ, আবার কোথাও যেন এক গভীর আড়ালও।
সে ধীরে ধীরে বলল,
—যা হয়ে গেছে, তা ভুলে যাও এখন।
কুলবন্তের ওপরের ঠোঁটে তখন শিশিরবিন্দুর মতো ছোট ছোট ঘামের দানা ফুটে উঠেছে। সে অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে চোখের পুতলি ঘুরিয়ে ঈশ্বরসিংয়ের দিকে তাকাল। তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি এনে বলল,
—চলো, সন্ধি করি।
ঈশ্বরসিং তার সুডৌল বাহু ধরে একটু জোরে চাপ দিল।
কুলবন্ত সঙ্গে সঙ্গে ছটফট করে একদিকে সরে গেল।
—সরে যাও, ঈশ্বর সিয়া! ব্যথা পাচ্ছি।
কিন্তু ঈশ্বরসিং তাকে ছাড়ল না। আবার কাছে টেনে নিয়ে পাশে বসাল। তারপর মিষ্টি স্বরে নানা কথা বলতে লাগল—কখনো আদর, কখনো রসিকতা, কখনো এমন সব কথা, যার উদ্দেশ্য একটাই—কুলবন্তের অভিমানটুকু গলিয়ে দেওয়া।
কুলবন্তও বেশিক্ষণ কঠিন থাকতে পারল না।
তার রাগ ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল। অভিমান গলে গেল মোমের মতো। মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির আভা।
কিন্তু সেই কোমল মুহূর্তের আড়ালেও ঈশ্বরসিংয়ের চোখে যেন অন্য কোনো ছায়া ঘন হয়ে উঠছিল।
কুলবন্তের ওপরের ঠোঁট তখনও মৃদু কাঁপছিল।
ঈশ্বরসিংয়ের ভেতরে হঠাৎ এক অদ্ভুত, হিংস্র আবেগ জেগে উঠল। সে সজোরে কুলবন্তের বাহু চেপে ধরে বলল,
—কুলবন্ত, গুরুজির দিব্যি করে বলছি—তুমি বড় ভালো মেয়ে।
কুলবন্ত তার বাহুতে আঙুলের চাপের লালচে দাগগুলোর দিকে তাকিয়ে অভিমানভরা স্বরে বলল,
—তুমি বড় নিষ্ঠুর, ঈশ্বর সিয়া।
ঈশ্বরসিং ঘন কালো গোঁফের আড়ালে মৃদু হাসল।
—তুমিও তো কোনো অংশে কম নও।
কথাটা শুনে কুলবন্ত যেন মুহূর্তেই জ্বলে উঠল। তার মুখে রাগের লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল—যেন আগুনে বসানো কড়াই হঠাৎ টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছে।
কিন্তু ঈশ্বরসিং তখন অন্য কোথাও হারিয়ে গেছে।
তার চোখ স্থির, অথচ দৃষ্টি যেন এই ঘরের দেয়াল ভেদ করে বহুদূরে চলে গেছে। কুলবন্ত পাশে বসে আছে—সেটুকুও যেন সে ভুলে গেছে। কোনো এক অদৃশ্য চিন্তা তাকে ভেতর থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
কুলবন্ত নিচু গলায় ডাকল,
—ঈশ্বর সিয়া… কোন জগতে বিচরণ করছ?
শব্দগুলো কানে যেতেই ঈশ্বরসিং যেন আচমকা ঘোর থেকে জেগে উঠল।
তার মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল। মনে হলো, কেউ যেন হঠাৎ তার হাতের সব তাস ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। সে ভীত, সন্ত্রস্ত চোখে একবার ডানে, একবার বাঁয়ে তাকাতে লাগল।
কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ল। চুলের গোড়ায় চিকচিকে ঘামের আস্তরণ জমে উঠল।
কুলবন্ত বারবার তার দৃষ্টি নিজের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ঈশ্বরসিং যেন তার উপস্থিতিই ভুলে গেছে।
শেষ পর্যন্ত কুলবন্ত খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। রাগে তার নাসারন্ধ্র ফুলে উঠেছে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—ঈশ্বর সিয়া, বলো! কোন হারামজাদির কাছে ছিলে এতদিন? কে তোমাকে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল?
ঈশ্বরসিং কোনো উত্তর দিল না। সে পালঙ্কে গা এলিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘ হাই তুলল।
এই উদাসীনতা কুলবন্তের ক্রোধকে আরও উসকে দিল।
—আমি জিজ্ঞাসা করছি—সে কে? কে?
ঘরের নীরবতা ভেঙে ঈশ্বরসিংয়ের কণ্ঠ ভেসে এল। কণ্ঠে কোনো প্রাণ নেই।
—কেউ না, কুলবন্ত… কেউ না।
কুলবন্ত কোমরে দুহাত রেখে তার সামনে দাঁড়াল। চোখে তখন আর শুধু রাগ নেই—ছিল জেদ, সন্দেহ আর অপমানের আগুন।
—ঈশ্বর সিয়া, আজ আমি সত্য-মিথ্যা যাচাই করেই ছাড়ব। গুরুজির দিব্যি করে বলো—তোমার কল্পনার জগতে কি কোনো নারীর মুখ নেই?
ঈশ্বরসিং কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলল।
কিন্তু তাকে সুযোগ দিল না কুলবন্ত।
সে গর্জে উঠল,
—কসম খাওয়ার আগে ভালো করে ভেবে নাও। আমিও সরদার নেহালসিংয়ের মেয়ে। মিথ্যে বললে তোমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলব।
তার চোখ তখন জ্বলছে।
—নাও, এবার গুরুজির কসম খাও। বলো—তোমার এই চিন্তা, এই অস্থিরতা… কোনো নারীকে ঘিরে কি না?
ঈশ্বরসিং দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
একটি মাত্র শব্দ।
কিন্তু সেই শব্দ যেন কুলবন্তের বুকের ভেতর বিস্ফোরণের মতো আঘাত করল।
এক মুহূর্তের জন্য সে যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলল।
হঠাৎ লাফ দিয়ে ঘরের কোণায় ছুড়ে রাখা কৃপাণটি তুলে নিল। খাপটি এক ঝটকায় খুলে দূরে ছুড়ে ফেলল।
তারপর আর কোনো কথা নয়।
উন্মত্ত ক্রোধে কৃপাণটি ঈশ্বরসিংয়ের ঘাড়ের দিকে ঝলসে উঠল।
পরক্ষণেই ঘরের নিস্তব্ধতা ছিন্ন করে রক্ত ছিটকে উঠল।
কিন্তু এতেও কুলবন্তের ক্রোধ যেন মেটে না। সে ঈশ্বরসিংয়ের এলোমেলো চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে সেই অদৃশ্য নারীর উদ্দেশে একের পর এক তীব্র, কটু কথা ছুড়ে দিতে লাগল।
ঈশ্বরসিং কিছুক্ষণ পর দুর্বল স্বরে বলল,
—কুলবন্ত… ওসব ভুলে যাও।
তার কণ্ঠে এমন গভীর বিষাদ ছিল, যেন কথাগুলোর নিচে কোনো অতল অন্ধকার চাপা পড়ে আছে।
কুলবন্ত ধীরে ধীরে পেছনে সরে দাঁড়াল।
ঈশ্বরসিংয়ের গলার ক্ষত থেকে টাটকা রক্ত ঝরে পড়ছে। এক ফোঁটা গড়িয়ে এসে তার ঘন গোঁফের ওপর আটকে রইল। রক্তাক্ত মুখ তুলে সে কুলবন্তের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল কৃতজ্ঞতা, আবার অভিযোগও—দুটো অনুভূতি যেন একই সঙ্গে চোখের গভীরে জড়িয়ে আছে।
সে মৃদু স্বরে বলল,
—কুলবন্ত… তুমি এত তাড়াতাড়ি এমন করে ফেললে!
একটু থেমে আবার বলল,
—যাক… যা হওয়ার হয়ে গেছে।
কিন্তু কুলবন্তের ক্রোধ তখনও প্রশমিত হয়নি।
—কিন্তু সে কে? তোমার কোন আত্মীয়া বলো!
ঈশ্বরসিংয়ের মুখ বেয়ে এবার রক্ত নেমে এসে ঠোঁট ছুঁল। সে অন্যমনস্কভাবে জিহ্বা দিয়ে রক্তের স্বাদ অনুভব করল।
সেই মুহূর্তে তার সারা শরীর কেঁপে উঠল।
তার মনে হঠাৎ ঝলকে উঠল আরেকটি দৃশ্য—
এই কৃপাণ দিয়েই সে ছয়জন মানুষকে হত্যা করেছে।
সে যেন নিজের কাছেই নিঃশব্দে স্বীকার করল,
আর আমি… আমি এই কৃপাণ দিয়েই ছয়জনকে খুন করেছি।
কিন্তু কুলবন্তের মাথায় তখন শুধু সেই অদৃশ্য দ্বিতীয় নারীর ছবি।
সে আবার জিজ্ঞেস করল,
—আমি জানতে চাই, সে কে?
ঈশ্বরসিংয়ের চোখ তখন ভারী হয়ে আসছে। তবু মুখে অদ্ভুত এক ম্লান আলো ফুটে উঠল। সে ধীরে বলল,
—সেই নিষ্পাপটাকে আর গাল দিও না।
কুলবন্ত চিৎকার করে উঠল,
—আমি জানতে চাই, সে কে!
ঈশ্বরসিংয়ের গলা আরও জড়িয়ে এল।
—বলছি…
সে নিজের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে আনল। আঙুলে লেগে থাকা টাটকা রক্তের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।
মানুষ সত্যিই এক বিচিত্র জীব।
কুলবন্ত তখনও অধীর হয়ে তার উত্তরের অপেক্ষায়।
—ঈশ্বর সিয়া, ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলো না। কাজের কথা বলো।
ঈশ্বরসিং রক্তমাখা গোঁফের আড়াল থেকে আবার মৃদু হাসল।
—কাজের কথাই তো বলছি। আমার গলা ধরে আসছে… এখন ধীরে ধীরে সব বলব।
কথা বলতে বলতে তার কপালে, চুলের গোড়ায় শীতল ঘামের আস্তরণ ফুটে উঠল।
সে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইল। তারপর অত্যন্ত ধীরে বলল,
—কুলবন্ত… আমার প্রিয়… তোমাকে বোঝাতে পারব না, আমার কী হয়েছে। মানুষ বড় বিচিত্র জীব।
কণ্ঠে ক্লান্তি, চোখে স্মৃতির ভার।
—শহরে যখন লুটতরাজ শুরু হলো, আমিও তাতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলাম। গয়না, টাকা-পয়সা—যা কিছু লুটে এনেছিলাম, সব তোমার হাতে তুলে দিয়েছি। কিন্তু একটা কথা… একটা কথা তোমাকে কখনো বলিনি।
কথা বলতে বলতে ঘাড়ের ক্ষতটায় আবার যন্ত্রণা উঠল। ঈশ্বরসিং হঠাৎ শরীরটা কুঁকড়ে নিল।
কিন্তু কুলবন্তের চোখে তখন কোনো মায়া নেই।
সে রূঢ় স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—কোন কথা?
ঈশ্বরসিং গোঁফে জমে থাকা রক্তে ফুঁ দিয়ে তা সরিয়ে নিল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
—যে বাড়িটায়… লুট করার উদ্দেশ্যে আমি ঢুকেছিলাম… সেখানে সাতজন মানুষ ছিল।
একটু থামল সে।
—ছয়জনকে আমি এই কৃপাণ দিয়ে হত্যা করি।
তার চোখ একবার কৃপাণটির দিকে চলে গেল।
—যেটা দিয়ে তুমি আমাকে…
কথাটা শেষ করল না।
—থাক, সে কথা বাদ দাও। শোনো… সেখানে একটি সুন্দরী মেয়ে ছিল। তাকে আমি তুলে নিয়ে এলাম সঙ্গে।
কুলবন্ত নিশ্চুপ।
সে শুধু শুনছে।
ঈশ্বরসিং আবার বলল,
—কী বলব… মেয়েটা অসম্ভব সুন্দর ছিল। তাকেও হত্যা করতাম। কিন্তু… হায়…
তার কণ্ঠ হঠাৎ নরম হয়ে গেল।
—আমি তার রূপে মজে গেলাম।
কুলবন্তের ঠোঁট নড়ল।
—হুঁ।
ঈশ্বরসিং যেন সেই রাতটাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।
—তারপর তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে লাগলাম। কী যেন বলছিলাম… হ্যাঁ, রাস্তায়… নদীর ধারে একটা গাছের ছায়া পেলাম। সেখানে তাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে শুইয়ে রাখলাম।
কথা বলতে বলতে তার গলা শুকিয়ে গেল।
কুলবন্ত অধীর হয়ে উঠল।
—তারপর?
ঈশ্বরসিং ঠোঁট নাড়ল। কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না।
কুলবন্ত এবার ধমকের সুরে বলল,
—তারপর কী হলো?
ঈশ্বরসিং ধীরে ধীরে চোখ মেলল। চোখের পাতাগুলো ভারী। তবু সেই দৃষ্টির মধ্যে এমন এক যন্ত্রণা ছিল, যা কুলবন্ত আগে কখনো দেখেনি।
তার ঠোঁট কাঁপল।
—কিন্তু…
শব্দটি যেন গলার গভীরে ডুবে গেল।
একটু পর অতিকষ্টে বলল,
—আসলে… সে মরে গিয়েছিল।
কুলবন্ত স্থির হয়ে গেল।
ঈশ্বরসিংয়ের কণ্ঠ আরও ক্ষীণ হয়ে এল।
—সে ছিল… একটা মৃতদেহ।
এক মুহূর্তের জন্য যেন ঘরের সব শব্দ থেমে গেল।
তারপর ঈশ্বরসিং ফিসফিস করে বলল,
—যেন… ঠান্ডা গোশত…
সে কুলবন্তের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
—কুলবন্ত… আমাকে তোমার হাতটা ধরতে দাও।
কুলবন্ত কিছু বলল না।
ধীরে ধীরে নিজের হাতটি ঈশ্বরসিংয়ের হাতে রাখল।
ঈশ্বরসিংয়ের আঙুলগুলো সেই হাতটিকে আঁকড়ে ধরল।
কুলবন্ত শিউরে উঠল।
তার হাত বরফের চেয়েও ঠান্ডা।
অস্বাভাবিক, প্রাণহীন ঠান্ডা।
যেন সত্যিই…
ঠান্ডা গোশত।