মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান

বে-নজীর আহমদ - উইকিপিডিয়া

বে-নজীর আহমদ বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্রধর্মী কবি, লেখক, সাংবাদিক ও সমাজসচেতন সাহিত্যকর্মী। তাঁর সাহিত্যিক সত্তার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল দেশপ্রেম, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক ন্যায়বোধ, মানবমুক্তির প্রত্যয় এবং কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা। কবিতা ও গদ্য—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি মানুষের জীবন, সমাজের অসংগতি এবং জাতীয় চেতনার সঙ্গে সাহিত্যের গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছেন।

তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২৯ অক্টোবর ১৯০৩ সালে। তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়—কোথাও নারায়ণগঞ্জের উল্লেখ রয়েছে, আবার কোথাও বর্তমান নরসিংদী জেলার শিবপুর থানার ধানুয়া গ্রামের কথা বলা হয়েছে। জন্মতারিখের বাংলা তারিখ হিসেবে ১২ কার্তিক ১৩১০-ও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্রোহী তারুণ্য ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন

বে-নজীর আহমদের তারুণ্য কেটেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তাল সময়ে। ছাত্রজীবনেই তাঁর মধ্যে সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়। পরবর্তীকালে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং গ্রেফতারও হন।

তাঁর জীবনের এই অধ্যায় ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিক। স্মৃতিচারণমূলক বিবরণে জানা যায়, কলকাতায় গ্রেফতারের পর পুলিশ প্রহরায় নদীপথে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি হাতকড়া অবস্থায় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। প্রবল স্রোতের মধ্যে সাঁতার কেটে শেষ পর্যন্ত একটি চরে পৌঁছান এবং এক গৃহস্থের বাড়িতে আশ্রয় নেন। কয়েক দিন পর অবশ্য পুলিশ তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করে।

তাঁর নিজের স্মৃতিচারণে এই ঘটনাকে তিনি জীবনের এক গভীর বিদ্রোহী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর তরুণ বয়সের এই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা পরবর্তী সাহিত্যজীবনের প্রতিবাদী সুরকে বুঝতে সাহায্য করে।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

তাঁর জীবন সম্পর্কে কিছু স্মৃতিচারণে ব্রিটিশবিরোধী গোপন তৎপরতা, ধনীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ এবং দুঃসাহসিক ডাকাতির ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিবরণ তাঁর জীবনের রোমাঞ্চকর ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়ের ইঙ্গিত দেয়; তবে এগুলোকে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে গ্রহণের আগে প্রাথমিক উৎস দিয়ে যাচাই করা জরুরি।

সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বে-নজীর আহমদ সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর সাংবাদিক জীবনের শুরু ‘নওরোজ’ পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশনার মাধ্যমে—এমন তথ্য বিভিন্ন জীবনীমূলক লেখায় পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে তিনি দৈনিক আজাদ ও দৈনিক নবযুগ-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। তবে কবি হিসেবে তাঁর সুস্পষ্ট আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘বন্দীর বাঁশী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। গ্রন্থটি ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয় বলে উল্লেখ করা হয়। নবীন কবি হিসেবে তাঁকে কাজী নজরুল ইসলাম ও সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দিন অভিনন্দন জানিয়েছিলেন—এমন তথ্যও জীবনীগ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে।

লেখকঃ কবি বে-নজীর আহমদ | পাঠাগার

নজরুলের প্রভাব

বে-নজীর আহমদের সাহিত্যিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর ওপর কাজী নজরুল ইসলামের গভীর প্রভাব। ‘বন্দীর বাঁশী’-তে নজরুলের বিদ্রোহী, বিপ্লবী ও সাম্যবাদী চেতনার প্রতিফলন স্পষ্ট।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসবিষয়ক আলোচনাতেও তাঁকে নজরুল-অনুসারী কবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তাঁর সাহিত্যকে কেবল নজরুলের অনুকরণ হিসেবে দেখলে তাঁর নিজস্ব সামাজিক অভিজ্ঞতা ও চিন্তার দিকটি উপেক্ষিত হয়। তিনি নজরুলের বিদ্রোহী চেতনাকে নিজের সময়, সমাজ ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে প্রকাশ করেছেন।

তাঁর কবিতার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ‘বন্দীর বাঁশী’-র বক্তব্যের সঙ্গে ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জাক রুশোর স্বাধীনতা-চিন্তারও সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে তিনি তাঁর কাব্যচিন্তার কেন্দ্রে স্থান দিয়েছিলেন।

‘জীবনের জন্য শিল্প’

বে-নজীর আহমদ বিশ্বাস করতেন ‘জীবনের জন্য শিল্প’-এ। ফলে তাঁর কবিতায় নিছক নান্দনিকতা নয়, জীবনের বাস্তবতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

‘বন্দীর বাঁশী’-র কবিতায় যেমন রয়েছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তেমনি পরবর্তী কাব্যপর্বে বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মানুষের দুর্দশা তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে।

চল্লিশের দশকের মন্বন্তর তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। ‘কঙ্কাল’ কবিতায় সেই দুর্ভিক্ষের মর্মান্তিক অভিঘাত প্রকাশ পেয়েছে বলে সাহিত্য-আলোচনায় উল্লেখ করা হয়। বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিচ্ছবিও তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে।

তাঁর কাব্যগ্রন্থ

তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • বন্দীর বাঁশী — ১৯৩২
  • বৈশাখী — ১৯৪৫
  • জিন্দেগী
  • হেমন্তিকা

তবে তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন লেখায় ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। কোথাও ‘বন্দীর বাঁশী’ ও ‘বৈশাখী’-কে তাঁর প্রধান প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার অন্য তালিকায় আরও কয়েকটি গ্রন্থের নাম রয়েছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থপঞ্জি প্রস্তুত করতে গ্রন্থাগারিক বা প্রকাশনা-ভিত্তিক উৎস যাচাই করা বাঞ্ছনীয়।

প্রবন্ধ, গবেষণা ও চিন্তামূলক রচনা

বে-নজীর আহমদের সাহিত্যিক পরিচয় কবিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, সাহিত্য ও জাতীয় চরিত্র নিয়ে তিনি প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী রচনাও লিখেছেন।

উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে—

  • প্রবন্ধ মালা
  • ইসলাম ও কমিউনিজম
  • বিপ্লব সাধনায় কামাল
  • ইকবাল-কাব্যে স্বদেশপ্রেম
  • নজরুলকে যেমন দেখিয়াছি ও জানিয়াছি
  • নজরুল সাহিত্যের পটভূমি
  • সাহিত্যে দুর্নীতি ও জাতীয় চরিত্রে তার প্রভাব
  • অক্রূর চন্দ্রের কাব্য সাধনা

এগুলোর মধ্যে নজরুলবিষয়ক রচনাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘নজরুলকে যেমন দেখিয়াছি ও জানিয়াছি’-তে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও প্রত্যক্ষ পরিচয়ের দিকটি যেমন রয়েছে, তেমনি ‘নজরুল সাহিত্যের পটভূমি’-তে নজরুলের সাহিত্য ও তার সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনার প্রচেষ্টা দেখা যায়।

‘বে-নজীর’ নামের প্রসঙ্গ

‘বে-নজীর’ নামটির অর্থ তুলনাহীন বা যার তুলনা নেই। স্মৃতিচারণমূলক লেখায় দাবি করা হয়েছে যে তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল ‘বেনু মিয়া’ এবং কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাহস, মানবিকতা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে ‘বে-নজীর আহমদ’ নামে অভিহিত করেন।

এই তথ্যটি তাঁর জীবনীচর্চায় অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও, এটিও প্রাথমিক দলিল বা প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক সূত্র দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

নজরুলের সঙ্গে সম্পর্ক

বে-নজীর আহমদের জীবনে নজরুল কেবল সাহিত্যিক প্রভাবের উৎস ছিলেন না; ব্যক্তিগত যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিলেন।

এক স্মৃতিচারণে ১৯৭৫ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সে সময় লেখক নজরুলের দেখাশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নজরুলকে কেন্দ্র করে একটি দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন। বে-নজীর আহমদ সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যথাসময়ে কবি ভবনে উপস্থিত হয়েছিলেন।

এই ঘটনাটি তাঁদের দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের একটি মানবিক স্মারক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ফররুখ আহমদের প্রতি শ্রদ্ধা

বে-নজীর আহমদের মানবিকতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে ফররুখ আহমদের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্মৃতিচারণ উল্লেখযোগ্য। কথিত আছে, ফররুখ আহমদের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে বে-নজীর আহমদ উদ্যোগী হয়ে তাঁকে নিজের প্রথম স্ত্রী জনুরা বেগমের কবরের পাশে দাফনের ব্যবস্থা করেন।

এই ঘটনাটি বে-নজীরের কবি-সহমর্মিতা এবং সাহিত্যিক সহযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে এসেছে।

উত্তরাধিকার ও স্বীকৃতি

বে-নজীর আহমদের সাহিত্যকর্মের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর রচনার অন্তর্ভুক্তি। তাঁর বিভিন্ন লেখা বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে স্থান পেয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে তাঁর সাহিত্য একাধিক প্রজন্মের শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ লাভ করে।

তাঁর পুরস্কার ও সম্মাননা সম্পর্কেও আপনার দেওয়া উপকরণে দুটি তথ্য রয়েছে—১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৭৯ সালে একুশে পদক। ১৯৭৯ সালের একুশে পদকের তথ্যটি তাঁর জীবনীতে বহুল উল্লেখিত; ১৯৬৪ সালের বাংলা একাডেমি পুরস্কারের তথ্যটি অবশ্য পৃথকভাবে যাচাই করে নেওয়া ভালো।

মৃত্যু

বে-নজীর আহমদ ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ মৃত্যুবরণ করেন। একটি স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে, তিনি শনিবার দিবাগত রাত ৯টার দিকে ইন্তেকাল করেন এবং পরদিন পারিবারিক গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের এক সাহসী, সমাজমনস্ক ও নজরুল-প্রভাবিত সাহিত্যিক জীবনের অবসান ঘটে।

মূল্যায়ন

বে-নজীর আহমদকে শুধু ‘নজরুল-অনুসারী কবি’ বলে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় পূর্ণ হয় না। তাঁর জীবনে কবিতা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, সমাজসচেতনতা এবং মানবিক দায়বদ্ধতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহ এসেছে, কিন্তু সেই বিদ্রোহের কেন্দ্রে ছিল মানুষের মুক্তি; তাঁর দেশপ্রেমের সঙ্গে যুক্ত ছিল সামাজিক ন্যায়বোধ; আর তাঁর নজরুল-চেতনা তাঁকে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দিয়েছে।

তাঁর জীবন যেমন ছিল ঘটনাবহুল, তেমনি তাঁর সাহিত্যও ছিল সময়সচেতন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সমাজের বৈষম্য, মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় এবং নজরুলের বিদ্রোহী মানবতাবাদ—সব মিলিয়ে বে-নজীর আহমদের সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছিল।

আজ তাঁর নাম তুলনামূলকভাবে কম উচ্চারিত হলেও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি এমন একজন কবি, যাঁর সাহিত্যকে নজরুল-চেতনা, সমাজসচেতনতা, মানবিকতা ও প্রতিবাদী জীবনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে পুনরায় পাঠ করা যেতে পারে। তাঁকে স্মরণ করার অর্থ বাংলা সাহিত্যের এমন একটি ধারাকে পুনরাবিষ্কার করা, যেখানে কবিতা মানুষের জীবন ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.