মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান

মনিরউদ্দীন ইউসুফ | কিশোরগঞ্জ ডট কম

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু সাহিত্যিক আছেন, যাঁদের কৃতিত্ব তাঁদের রচনার সংখ্যায় নয়, বরং তাঁরা যে সাংস্কৃতিক পরিসর বাংলা ভাষার সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন তার ব্যাপ্তিতে। মনিরউদ্দীন ইউসুফ (১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ – ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭) সেই বিরলপ্রজ সাহিত্যিকদের একজন। কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সম্পাদক ও অনুবাদক—বহু পরিচয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল তাঁর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যে কীর্তি তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন দিয়েছে, তা হলো ফারসি মহাকবি ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’ এবং মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির ‘মসনবী’-র বাংলা ভাষায় উপস্থাপন।

‘শাহনামা’র অনুবাদের অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তাঁকে ‘বাংলার ফেরদৌসী’ বলা হয়। আর ‘রুমীর মসনবী’ অনুবাদের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের সামনে উন্মোচন করেছেন রুমির মরমি দর্শন, মানবতত্ত্ব, প্রেম, আত্মসন্ধান ও নৈতিকতার এক বিস্ময়কর জগৎ। তাঁর অনুবাদকর্ম তাই এক ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আরেক ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর সেতুবন্ধন।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

জন্ম, পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিক্ষাজীবন

মনিরউদ্দীন ইউসুফ ১৯১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কিশোরগঞ্জ মহকুমার তাড়াইলের জাওয়ার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মিসবাহউদ্দীন আহমদ, যিনি মৌলবি মিসবাহ নামে পরিচিত ছিলেন, কিশোরগঞ্জের বৌলাই গ্রামের জমিদার ছিলেন। তাঁর মাতা সানজিদা খাতুন।

তাঁদের পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। ফলে শৈশবেই উর্দুভাষী ওস্তাদের কাছে তাঁর শিক্ষার সূচনা হয়। এই পারিবারিক পরিবেশ পরবর্তীকালে তাঁর ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ভিত নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফারসি-উর্দু সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তার শিকড় অনুসন্ধান করলে এই প্রাথমিক ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কথা স্মরণ করতে হয়।

প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি স্থানীয় মধ্য ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে কিশোরগঞ্জের রামানন্দ হাইস্কুল এবং ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে অধ্যয়ন করেন। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে ১৯৩৮ সালে এন্ট্রান্স এবং ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ১৯৪০ সালে আইএ পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হলেও ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়ে কলকাতা হয়ে দিল্লি চলে যান।

এই অসম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন তাঁর জ্ঞানচর্চার পথে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং তাঁর পরবর্তী জীবন ছিল এক দীর্ঘ স্বশিক্ষা, পাঠ, অনুবাদ, গবেষণা ও সাহিত্যসাধনার জীবন।

কর্মজীবন : জীবিকার পাশাপাশি সাহিত্যসাধনা

দিল্লি যাওয়ার পর তিনি চাকরি নিয়ে মুম্বাই চলে যান। সেখানে প্রায় নয় মাস অবস্থান করে দেশে ফিরে আসেন এবং কিছুদিন ব্যবসা করেন। পরে ঢাকায় এসে প্রথমে ডেইলি অবজারভার এবং পরে দৈনিক সংবাদ-এ কাজ করেন।

পরবর্তীকালে তাঁর ছোটবেলার বন্ধু সাংবাদিক সৈয়দ নুরুদ্দিনের আমন্ত্রণে কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের জনসংযোগ বিভাগে এ.ডি.সি পদে যোগ দেন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনা ‘কৃষি সমাচার’-এর সম্পাদক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

কর্মজীবনের নানা ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর সাহিত্যসাধনা থেমে থাকেনি। বরং জীবিকার অভিজ্ঞতা, সমাজবাস্তবতার প্রত্যক্ষ পরিচয় এবং বিস্তৃত পাঠ তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ

মনিরউদ্দীন ইউসুফের সাহিত্যিক পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিলেন কবি। চল্লিশের দশকের সাহিত্যিক পরিবেশে তাঁর কবিসত্তার বিকাশ। ছাত্রজীবনেই তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘উপয়ন’ প্রকাশিত হয় ১৯৪১ সালে।

পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘রাত্রি নয় কলাপী ময়ূর নয়’ (১৯৭৬), ‘বেতস পাতা জলের ধারা’ (১৯৮৪) এবং ‘এক ঝাঁক পায়রা’ (১৯৮৮)। তাঁর অগ্রন্থিত কবিতাও পরবর্তীকালে সংকলিত হয়েছে। ২০১৩ সালে বেলাল চৌধুরী তাঁর কবিতাগুলো সম্পাদনা করে ‘কাব্যসমগ্র’ প্রকাশ করেন।

আধুনিক রোমান্টিক কবি হিসেবে তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম, সৌন্দর্য ও মানবমনের নানা অনুষঙ্গ প্রকাশ পেয়েছে। বাংলা ভাষায় গজলধর্মী কবিতা রচনারও তিনি চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর কবিতার প্রকৃতি, ভাষা ও নন্দনচেতনা নিয়ে আরও নিবিড় গবেষণা বাংলা কবিতার ইতিহাসে তাঁর অবস্থানকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

প্রাবন্ধিক ও গবেষক

মনিরউদ্দীন ইউসুফের সাহিত্যিক মনন কেবল কবিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন গভীর পাঠসম্পন্ন প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামি ইতিহাস, সংস্কৃতি, সুফিবাদ, বাংলা সাহিত্য, উর্দু সাহিত্য এবং বৃহত্তর ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল তাঁর আগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘উর্দু সাহিত্যের ইতিহাস’, ‘বাংলা সাহিত্যে সুফী প্রভাব’, ‘আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’, ‘কারবালা: একটি সামাজিক ঘূর্ণাবর্ত, সংস্কৃতি চর্চা’, ‘বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতির লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব’ এবং ‘নব মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ’।

বিশেষত ‘বাংলা সাহিত্যে সুফী প্রভাব’ তাঁর সাহিত্য-ইতিহাসচেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বাংলা সাহিত্য যে বহুসাংস্কৃতিক ও বহুধারার সম্মিলনে গড়ে উঠেছে, সুফি ঐতিহ্যের প্রভাব বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সম্পর্কের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের দর্শন ও মরমিবাদের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। ‘নব মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ’-এ রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের কবিতার দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক অনুরণন তিনি উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন। ‘প্রথম দিনের সূর্য’ কিংবা ‘তোমার সৃষ্টির পথ’-এর মতো কবিতায় যে অস্তিত্বজিজ্ঞাসা, সৃষ্টির রহস্য ও আত্মিক অনুসন্ধান প্রকাশ পেয়েছে, তার অন্তর্লীন সুর তিনি ধরতে পেরেছিলেন।

এখানেই তাঁর রবীন্দ্রপাঠের পরিপক্বতা। তিনি রবীন্দ্রনাথকে শুধু নন্দনস্রষ্টা হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন একজন গভীর আত্মসন্ধানী ও মরমি কবি হিসেবেও।

‘রুমীর মসনবী’ : মরমি সাহিত্যের এক অনন্য বাংলা ভাষান্তর

মনিরউদ্দীন ইউসুফের অনুবাদকর্মের আলোচনা ‘শাহনামা’ ছাড়া যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি ‘রুমীর মসনবী’ ছাড়াও তাঁর সাহিত্যিক সত্তার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না।

জালালউদ্দিন রুমি (১২০৭–১২৭৩) ফারসি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও সুফি সাধক। তাঁর ‘মসনবী’ প্রায় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি চরণের এক সুবিশাল কাব্য, যা ছয়টি অসমান খণ্ডে বিভক্ত। দীর্ঘ সময় ধরে রচিত হওয়ায় এর বিভিন্ন অংশে বিষয় ও রচনাভঙ্গির বৈচিত্র্য স্বাভাবিক।

ফারসি কাব্যরীতিতে ‘মসনবী’ একটি বিশেষ ধরনের দীর্ঘ কবিতা। শব্দটির মূল অর্থ দ্বিচরণিক—দুই চরণের সমন্বয়ে গঠিত পদ বা শ্লোক। অসংখ্য এমন দ্বিচরণ মিলেই একটি দীর্ঘ মসনবী গড়ে ওঠে। বাংলা পয়ার-ছন্দের সঙ্গে এর কাঠামোগত একটি তুলনা করা যায়।

কিন্তু রুমির ‘মসনবী’র গুরুত্ব শুধু তার বিপুল আকারে নয়। মানবজীবনের গভীরতম প্রশ্ন—আমি কে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী, আত্মা কোথায়, প্রেম কী, জ্ঞান ও বুদ্ধির সীমা কোথায়, ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী এবং মানুষ কীভাবে নিজের ক্ষুদ্র অহং অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক ও আত্মিক সত্যে পৌঁছাতে পারে—এসব প্রশ্নের গভীর অনুসন্ধান এতে রয়েছে।

মনিরউদ্দীন ইউসুফ এই বিশাল কাব্যকে গদ্যভাষ্যে বাংলায় উপস্থাপন করেন এবং নাম দেন ‘রুমীর মসনবী’। এর আগে বিভিন্ন সময়ে অনেকে ‘মসনবী’র খণ্ডিত অংশ অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু ক্লাসিক ফারসি ভাষা থেকে বৃহৎ পরিসরে এর বাংলা উপস্থাপন ছিল এক অসাধারণ সাধনা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইউসুফ কেবল অনুবাদ করেননি; ‘মসনবী’র ভাবজগতকে বুঝতে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিও প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভূমিকা ও ব্যাখ্যাগুলো পাঠকের জন্য রুমির দর্শনে প্রবেশের এক মূল্যবান চাবিকাঠি।

তিনি মানুষের দুটি রূপের কথা বলেছেন—ব্যক্তি মানুষ এবং সমাজ মানুষ। তাঁর মতে, রুমি ব্যক্তি মানুষের মধ্যে মানবহৃদয়ের অনবদ্যতা, ঊর্ধ্বগামিতা ও রহস্যের সন্ধান করেছেন; আর সমাজ মানুষের মধ্যে দেখেছেন ধর্ম, নৈতিকতা, কল্যাণ ও করুণাকে। এই দুই রূপের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠাই মানবতার চর্চা এবং এই প্রবণতাগুলোর সীমা নির্ধারণই আত্মিক সাধনা বা মারেফতের পরিণতি।

এই ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে ইউসুফ রুমির দর্শনকে জীবনবিমুখ কোনো রহস্যবাদ হিসেবে দেখেননি; বরং ব্যক্তি ও সমাজ, আত্মিকতা ও দায়িত্ব, প্রেম ও মানবতার সমন্বিত দর্শন হিসেবে দেখেছেন।

রুমির কবিসত্তা ও দার্শনিক সত্তা

ইউসুফ যথার্থই লক্ষ করেছিলেন যে রুমি নানা উপাখ্যানের মধ্য দিয়ে তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করলেও তিনি মূলত কবি ও গীতিকবি। কাহিনির ফাঁকে ফাঁকে তাঁর আবেগময় কবিমানসের উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে রুমি একজন দার্শনিক।

এই দ্বৈত পরিচয়ই ‘মসনবী’র শক্তি। কাহিনি এখানে কেবল কাহিনি নয়; উপাখ্যান হয়ে ওঠে দর্শনের বাহন, আর দর্শন কবিতার আবেগে প্রাণ পায়।

File:MuniruddinYusuf.jpg - Banglapedia

কর্মফলের দর্শন

ইউসুফ রুমির একটি গভীর জীবনদর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন—

“প্রাচীরের ছায়া যেমন দীর্ঘতর হইয়া পুনরায় ছোট হইতে হইতে প্রাচীরের নিচেই ফিরিয়া আসে, কণ্ঠস্বর যেমন পর্বতের গাত্রে প্রতিহত হওয়া উচ্চারণকারীর কাছেই প্রত্যাবৃত্ত হয়, তেমন প্রত্যেক কর্মের প্রতিফলও কর্মীর কাছে ফিরিয়া আসিবে।”

এই উপলব্ধি নৈতিক জীবনের এক মৌলিক সত্যকে সামনে আনে—মানুষের কাজ তার কাছেই কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে।

বুদ্ধির সীমা ও সম্ভাবনা

রুমির বুদ্ধিচিন্তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউসুফ জিবরাইলের সঙ্গে বুদ্ধির তুলনার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় বুদ্ধি সত্যের সংবাদ বহন করে এবং মানুষকে পথ দেখায়; কিন্তু মানবাত্মার চূড়ান্ত সম্ভাবনার সামনে তার একটি সীমা রয়েছে।

এখানে রুমির দর্শনের একটি সূক্ষ্ম দিক উন্মোচিত হয়। আধ্যাত্মিকতা বুদ্ধিকে অস্বীকার করে না; বরং বুদ্ধিকে তার যথার্থ সীমা ও মর্যাদার মধ্যে স্থাপন করে।

মানুষের আত্মবিকাশ

ইউসুফের ভাষায়—

“ফল যেমন কুঁড়ি হইতে পুষ্প পরাগে বিকশিত হইয়া নিজেকে সফল করে, মানুষকেও তেমনি হইতে হইবে।”

মানুষের বিকাশ তাঁর কাছে কেবল বাহ্যিক সাফল্য নয়; অন্তরের সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ। ফুল যেমন স্বভাবের নিয়মে বিকশিত হয়, মানুষকেও তার মানবিক ও আত্মিক সম্ভাবনার দিকে অগ্রসর হতে হয়।

বৈরাগ্য নয়, জীবনমুখী আত্মিকতা

রুমির ইসলামি জীবনদর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউসুফের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য—

“বৈরাগ্য ও ভোগবাদ এই দুই মনোভাবের একটিও ইসলামী মনোভাব নয়।”

এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি দেখিয়েছেন, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও সার্বজনীন দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে গিয়েই মানুষ তার ক্ষুদ্র অহং থেকে মুক্ত হতে পারে। সেই মুক্তির মধ্য দিয়ে জীবন সম্পর্কে এক বিশ্বজনীন অনুভূতির জন্ম হয়।

অর্থাৎ আত্মিক সাধনা জীবনের পরিপন্থী নয়; বরং জীবনকে গভীরতর অর্থে গ্রহণ করার সাধনা।

বিরহ : মসনবীর অন্তঃসুর

‘মসনবী’র সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলোর একটি হলো বিরহ। ইউসুফ লিখেছেন—

“চির অশান্ত মানবাত্মার এই বিরহবোধ যার মধ্যে জাগিয়াছে, মসনবী কাব্য তারই জন্য।”

এই বিরহ কেবল কোনো ব্যক্তির প্রতি ব্যক্তিগত আকুলতা নয়। এটি আত্মার পরম সত্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা। এই কারণেই ‘মসনবী’র অসংখ্য কাহিনি, উপমা, প্রতীক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার অন্তরে একটি গভীর অনুসন্ধান কাজ করে—মানুষ কোথা থেকে এসেছে এবং তার প্রকৃত গন্তব্য কোথায়?

রুমির অমর পঙক্তি—

সীনা খাহাম শরহে শারহা আয ফেরাক তা বগোয়ম শরহে দরদে ইশতিয়াক।

অর্থাৎ—

বুক আমার বিচ্ছেদে ছিন্নভিন্ন ও মুক্ত হোক, তবেই তো বেদনার ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হব।

এই বিরহই রুমির কবিতার প্রাণ; আর মনিরউদ্দীন ইউসুফের ব্যাখ্যায় সেই বিরহ হয়ে ওঠে আত্মিক অনুসন্ধানের এক মহৎ প্রতীক।

‘শাহনামা’ : জাতীয় স্মৃতি থেকে বিশ্বসাহিত্য

ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’ ইরানের জাতীয় মহাকাব্য। প্রাচীন ইরানের ইতিহাস, কিংবদন্তি, রাজবংশ, যুদ্ধ, বীরত্ব, প্রেম, বিরহ, লোকবিশ্বাস, পৌরাণিক কাহিনি এবং মানুষের সুখ-দুঃখের বিস্তৃত সমাহার এতে রয়েছে।

প্রায় চার হাজার বছরের ইরানি জাতীয় স্মৃতি ও ঐতিহ্যের নানা উপাদান এই মহাকাব্যের পটভূমিতে কাজ করেছে। ফেরদৌসী এসব কাহিনি শূন্য থেকে সৃষ্টি করেননি; প্রাচীন ইরানি ঐতিহ্যে প্রচলিত উপাদানকে তিনি অসামান্য কাব্যপ্রতিভায় মহিমান্বিত করেছেন।

রাজা-বাদশাহদের উত্থান-পতন, বীরদের বীরত্ব, যুদ্ধ ও প্রেম, মানুষের আশা ও হতাশা—সব মিলিয়ে ‘শাহনামা’ এক জাতির স্মৃতি, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার মহাকাব্যিক দলিল।

রুবেন লেভির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফেরদৌসীর কাছে ইরানের রাজাদের ইতিহাসসংবলিত একটি গদ্যগ্রন্থ ছিল এবং সম্ভবত পদ্যরূপেও কিছু উপাদান তাঁর হাতে ছিল। বিভিন্ন সময়ে রচিত কাহিনি ও পর্ব পরবর্তীকালে রাজাদের রাজত্বকাল অনুসারে সাজিয়ে মহাকাব্যিক কাঠামো লাভ করে।

পৃথিবী সৃষ্টির পৌরাণিক সময় থেকে শুরু করে আরব মুসলমানদের হাতে ইরানের পতন পর্যন্ত নানা ঘটনা এতে ধারাবাহিকভাবে স্থান পেয়েছে।

‘শাহনামা’র বাংলা অনুবাদ : সতেরো বছরের মহাসাধনা

ফারসি থেকে ‘শাহনামা’ বাংলায় অনুবাদ করা ছিল মনিরউদ্দীন ইউসুফের জীবনের অন্যতম বৃহৎ সাহিত্যিক সাধনা। তিনি প্রায় সতেরো বছর ধরে এই অনুবাদে শ্রম দিয়েছেন। ১৯৭৬ সালে অনুবাদকর্ম সম্পন্ন হয়।

বাংলা একাডেমি থেকে এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৭৯ সালে। পরবর্তীকালে পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ ছয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়; ১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমি ছয় খণ্ডে ‘শাহনামা’ প্রকাশ করে। ২০১২ সালের জুনে এর পুনর্মুদ্রণও প্রকাশিত হয়।

এই অনুবাদ নিছক শব্দান্তর নয়। মূল মহাকাব্যের গাম্ভীর্য, বীরত্ব, আবেগ, কাব্যিকতা ও নাটকীয়তা বাংলা ভাষায় ধরে রাখার জন্য ইউসুফ তাঁর নিজস্ব কবিসত্তাকে কাজে লাগিয়েছেন। ফলে তাঁর ‘শাহনামা’ গদ্যে অনূদিত হলেও তার ভাষায় কাব্যের সুর রয়েছে। গদ্যের ভেতরে ছন্দ, আবেগ ও কাব্যিক সৌন্দর্যের যে প্রবাহ তিনি সৃষ্টি করেছেন, সেটিই তাঁর অনুবাদের স্বাতন্ত্র্য। বাংলা ভাষায় এত বিপুল পরিসরের একটি ফারসি মহাকাব্য অনুবাদ করতে যে ভাষাজ্ঞান, অধ্যবসায়, ধৈর্য ও সাহিত্যিক দক্ষতা প্রয়োজন, ইউসুফের সতেরো বছরের সাধনা তারই প্রমাণ।

এই অসামান্য কীর্তির জন্য তাঁকে ‘বাংলার ফেরদৌসী’ বলা শুধু প্রশংসাসূচক অভিধা নয়; বাংলা ভাষায় ফেরদৌসীর মহাকাব্যকে নতুন জীবন দেওয়ার স্বীকৃতিও বটে।

গালিব, ইকবাল ও ফারসি-উর্দু ঐতিহ্যের আরেক সেতু

ফেরদৌসী ও রুমির পাশাপাশি মির্জা গালিব ও আল্লামা ইকবালের রচনাও মনিরউদ্দীন ইউসুফ বাংলায় অনুবাদ করেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থ—

  • ইকবালের কাব্য সঞ্চয়ন — ১৯৬০
  • দীওয়ান-ই-গালিব — ১৯৬৪
  • কালামে রাগিব — ১৯৬৬
  • রুমীর মসনবী
  • শাহনামা

এই অনুবাদগুলোর মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষার পাঠককে ফারসি-উর্দু সাহিত্যের উচ্চাঙ্গ কাব্যরসের সঙ্গে পরিচিত করেছেন।

বিশেষত গালিবের জটিল রূপক, ইকবালের দার্শনিক ও জাতীয়তাবোধ, রুমির মরমি প্রেম এবং ফেরদৌসীর মহাকাব্যিক বীরত্ব—প্রতিটি সাহিত্যিক জগতের নিজস্ব ভাষা ও স্বর রয়েছে। এসবকে বাংলায় ধারণ করা অনুবাদকের জন্য সহজ কাজ নয়। ইউসুফের কৃতিত্ব হলো তিনি ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যিক স্বরকে বাংলা ভাষায় স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন।

ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার

মনিরউদ্দীন ইউসুফের সাহিত্যিক প্রতিভার আরেকটি দিক তাঁর উপন্যাস ও নাটক। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ঝড়ের রাতের শেষে’ ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয়। এতে সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে। পরবর্তী উপন্যাস ‘পনসের কাঁটা’ এবং ‘ওর বয়েস যখন এগারো’ (উভয়ই ১৯৮১) বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার পটভূমিতে রচিত।

যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজ, সাম্প্রদায়িকতা, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সম্পর্ক, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠুরতা, দারিদ্র্য, ভূমিহীন মানুষের দুর্দশা এবং মানুষের ব্যক্তিগত বিপর্যয় তাঁর উপন্যাসে বাস্তব ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।এই কারণে তাঁর উপন্যাসগুলোকে বাংলাদেশের একটি সংকটময় সময়ের সামাজিক দলিল হিসেবেও পাঠ করা যায়।

তাঁর নাট্যরচনার উল্লেখযোগ্য নিদর্শন ‘ঈশা খাঁ’ (১৯৬৮)।

ইসলামি ঐতিহ্য ও কিশোরসাহিত্য

ইসলামি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ জীবনী ও কিশোরসাহিত্যের রচনাতেও প্রতিফলিত হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ—

  • হযরত ফাতেমা — ১৯৬৪
  • হযরত আয়েশা — ১৯৬৮
  • ইসলাম ও মুহম্মদ
  • ছোটদের ইসলাম পরিচয়
  • ছোটদের রসুল চরিত্র
  • মহাকবি ফেরদৌসী — ১৯৮৮
  • চল যাই ছড়ার দেশে — ২০০৩

শিশু-কিশোরদের উপযোগী ভাষায় ধর্মীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মহৎ ব্যক্তিত্বের জীবন তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্যকে শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার সঙ্গেও যুক্ত করেছিলেন।

আত্মজীবন ও স্মৃতির দলিল

তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমার জীবন আমার অভিজ্ঞতা’ ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়। মৃত্যুর পর প্রকাশিত এই গ্রন্থ তাঁর জীবন ও অভিজ্ঞতার মূল্যবান দলিল।

তাঁর জীবনকে দেখলে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা তাঁকে জ্ঞানসাধনা থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। বরং নিজের পাঠ, ভাষাজ্ঞান, অনুবাদ ও চিন্তার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেই নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছিলেন।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে মনিরউদ্দীন ইউসুফ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। উল্লেখযোগ্য—

  • গভর্নর স্বর্ণপদক — ১৯৬৮
  • হাবিব ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার — ১৯৬৮
  • বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার — ১৯৭৮
  • আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার — ১৯৮৫
  • একুশে পদক — ১৯৯৩, মরণোত্তর

১৯৭৮ সালের বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৯৩ সালের মরণোত্তর একুশে পদক তাঁর সাহিত্যিক অবদানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

উত্তরাধিকার : কেন আজও মনিরউদ্দীন ইউসুফ প্রাসঙ্গিক

মনিরউদ্দীন ইউসুফের সাহিত্যকর্মকে আজকের সময়ে নতুন করে পাঠ করার একটি বিশেষ কারণ আছে। তিনি এমন এক সময়ে ফারসি ও উর্দু সাহিত্যকে বাংলায় নিয়ে এসেছিলেন, যখন ভাষা ও সংস্কৃতির নানা বিভাজন সাহিত্যপাঠের ক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করে রাখত।

তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা ভিন্ন হলেও মানুষের মৌলিক প্রশ্নগুলো ভিন্ন নয়।

ফেরদৌসীর বীরের প্রশ্ন, রুমির আত্মার প্রশ্ন, গালিবের অস্তিত্বজিজ্ঞাসা, ইকবালের আত্মমর্যাদা ও মানবিকতার আহ্বান—সবই শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রশ্ন।

আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে মানুষ বাহ্যিকভাবে অভূতপূর্বভাবে সংযুক্ত; অথচ অন্তর্গত বিচ্ছিন্নতাও অনেক সময় তীব্র। এই বিচ্ছিন্নতার ভেতরেই রুমির ‘মসনবী’র বিরহবোধ নতুন অর্থে ফিরে আসতে পারে।

মানুষ যত বেশি নিজের অন্তর্জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, ততই তার আত্মপরিচয়, প্রেম, নৈতিকতা ও পরম সত্যের প্রশ্ন নতুনভাবে সামনে আসবে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে রুমি যেমন প্রাসঙ্গিক, তেমনি রুমিকে বাংলা ভাষায় বোঝার ক্ষেত্রে মনিরউদ্দীন ইউসুফও প্রাসঙ্গিক।

তাঁর ‘মসনবী’ পাঠে যে মরমি ইসলাম প্রতিভাত হয়, তা নিছক বৈরাগ্যের ইসলাম নয়; আবার অন্ধ ভোগবাদেরও নয়। সেখানে আত্মিকতা ও ইহজাগতিক দায়িত্বের সমন্বয় রয়েছে, ব্যক্তিমানুষ ও সমাজমানুষের মধ্যে ভারসাম্য রয়েছে, প্রেম ও নৈতিকতার সহাবস্থান রয়েছে।

এই জীবনদর্শনের সঙ্গে সুফি ঐতিহ্যের গভীর সংযোগ রয়েছে—আহলে সুফ্ফার আত্মশুদ্ধি, প্রেম, সংযম, মানবসেবা ও অন্তর্জাগরণের ঐতিহ্য থেকে শুরু করে রিয়াজুল জান্নার প্রতীকী আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা পর্যন্ত যার বিস্তৃত পরিসর।

শেষকথা

মনিরউদ্দীন ইউসুফের জীবন ছিল বহুমুখী সাহিত্যসাধনার জীবন। তিনি কবিতা লিখেছেন, উপন্যাস লিখেছেন, নাটক রচনা করেছেন, প্রবন্ধ ও গবেষণা করেছেন, জীবনী ও কিশোরসাহিত্য লিখেছেন, আত্মজীবনী রচনা করেছেন। কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ হলো তাঁর অনুবাদ।

‘শাহনামা’ তাঁকে দিয়েছে ‘বাংলার ফেরদৌসী’র মর্যাদা। ‘রুমীর মসনবী’ তাঁকে করে তুলেছে বাংলা ভাষায় রুমির মরমি দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্যকার। গালিব ও ইকবাল-এর অনুবাদ তাঁকে যুক্ত করেছে উপমহাদেশের ফারসি-উর্দু কাব্যঐতিহ্যের সঙ্গে।

তাঁর অনুবাদে আমরা কেবল অন্য ভাষার সাহিত্যকে বাংলায় দেখতে পাই না; দেখতে পাই একজন গভীর পাঠকের নিজস্ব উপলব্ধি। তাঁর কবিসত্তা অনুবাদের ভাষায় প্রাণ সঞ্চার করেছে, তাঁর গবেষণামনস্কতা দিয়েছে ব্যাখ্যার গভীরতা, আর তাঁর সাংস্কৃতিক চেতনা দিয়েছে বৃহত্তর মানবিক পরিসর।

এই কারণেই মনিরউদ্দীন ইউসুফকে শুধু কবি, শুধু অনুবাদক, শুধু গবেষক বা শুধু ঔপন্যাসিক—কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষায় ফারসি-উর্দু সাহিত্য ও ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের এক অসাধারণ সেতুবন্ধনকারী মনীষী।

তাঁর জীবন ও সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি ভাষা তখনই সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ হয়, যখন সে অন্য ভাষার শ্রেষ্ঠ সম্পদকে গ্রহণ করে নিজের সৃজনশীল শক্তিতে নতুন জীবন দিতে পারে।

মনিরউদ্দীন ইউসুফ সেই কাজটিই করে গেছেন।

তাঁর ‘শাহনামা’ বাংলা ভাষায় ফেরদৌসীর মহাকাব্যিক স্মৃতিকে অমর করেছে; তাঁর ‘রুমীর মসনবী’ রুমির প্রেম, বিরহ ও আত্মসন্ধানের মরমি জগতকে বাংলার পাঠকের অন্তরে পৌঁছে দিয়েছে। আর তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্ম প্রমাণ করেছে—সত্যিকারের সাহিত্যিকের মৃত্যু হয় না; তাঁর ভাষান্তরিত শব্দ, তাঁর ভাবনা, তাঁর কাব্যিক স্বপ্ন এবং তাঁর নির্মিত সাংস্কৃতিক সেতু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অতিক্রম করে যায়।

মনীষী মনিরউদ্দীন ইউসুফ তাই স্মরণীয় শুধু তাঁর রচনার জন্য নয়—তিনি স্মরণীয় বাংলা ভাষার দিগন্ত প্রসারিত করার জন্য।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.