মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান
বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত পরিসরে এমন কিছু কবি আছেন, যাঁদের সৃষ্টিকর্ম তাঁদের সময়ে যথেষ্ট সমাদৃত হলেও পরবর্তী প্রজন্মের স্মৃতিতে ধীরে ধীরে তাঁরা আড়াল হয়ে গেছেন। কবি, প্রাবন্ধিক, লোকসাহিত্য-সংগ্রাহক ও গবেষক রওশন ইজদানী তেমনই এক বিস্মৃতপ্রায় অথচ গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর কবিতার সহজ, সুরেলা ও লোকজ পঙ্ক্তি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে—
“সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো বেলা গেল ঐ কোথায় গেল হাঁসগুলো তৈ তৈ তৈ।”
শিশু-কিশোরদের পরিচিত এই ছড়ার রচয়িতা রওশন ইজদানী ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। পল্লীগীতি, কিস্সা-কাহিনি, কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, জীবনী, গাঁথাকাব্য—সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ ছিল। তবে তাঁর সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে উজ্জ্বল ও স্থায়ী পরিচয় লোকসাহিত্যচর্চায়। বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকজ জীবন, মানুষের মুখের ভাষা, গান, গাথা, আচার-অনুষ্ঠান ও সমাজমানসকে তিনি গভীর মমতায় ধারণ করেছিলেন। তাঁর ‘মোমেনশাহীর লোকসাহিত্য’ ও ‘পূর্ব পাকিস্তানের লোকসাহিত্য’ এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম।
জন্ম ও বংশপরিচয়
রওশন ইজদানীর জন্ম বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকসাহিত্যের উর্বর ভূখণ্ডে। ১৩২৪ বঙ্গাব্দের ১৫ ফাল্গুন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে—কিছু সূত্রে ১৯১৭ সালও উল্লেখ করা হয়েছে—তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কেন্দুয়া থানার বিদ্যাবল্লভ গ্রামে তাঁর জন্ম। বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোয় এটি নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার অন্তর্গত।
তাঁর পিতার নাম শেখ আলী ফকির। তিনি কবিরাজি চিকিৎসা জানতেন এবং ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। রওশন ইজদানীর পারিবারিক ঐতিহ্যেও ধর্মীয় অনুরাগ ও জ্ঞানচর্চার প্রবল উপস্থিতি ছিল। তাঁর বংশের আদি পুরুষদের মধ্যে ভঙ্গ মির্দার ও পাতলা মির্দারের নাম পাওয়া যায়; কথিত আছে, তাঁরা দিল্লি থেকে এ অঞ্চলে এসেছিলেন। রওশন ইজদানী ছিলেন তাঁদের অধস্তন সপ্তম পুরুষ। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘ফসু মিয়া’।
মাতৃকুলেও ছিল ধর্মীয় ও শিক্ষিত পরিবেশ। তাঁর মা বেগম আতাফুন্নিসা ছিলেন সরল, মিষ্টভাষী ও ধর্মপরায়ণা নারী। আরবি ভাষায় তাঁর মোটামুটি জ্ঞান ছিল। মাতামহ লাবু মুন্সী ছিলেন স্থানীয়ভাবে পরিচিত মুনশী ও মোল্লা। এই পারিবারিক আবহ রওশন ইজদানীর মানসগঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
মাত্র দশ বছর বয়সে পিতাকে হারান রওশন ইজদানী। পিতৃবিয়োগের পর তাঁর মা-ই হয়ে ওঠেন সংসারের প্রধান অবলম্বন। জীবনের এই অকাল আঘাত তাঁর চরিত্রে যেমন আত্মনির্ভরতা তৈরি করেছিল, তেমনি পরবর্তী জীবনে দারিদ্র্য, বৈরাগ্য ও মানুষের প্রতি গভীর মমতার ভিতও তৈরি করেছিল।
শিক্ষা ও জ্ঞানসাধনা
রওশন ইজদানীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। গ্রামের মক্তবে তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি। পরে ফোরকানিয়া মাদ্রাসা ও ওল্ড স্কিম মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। এরপর আশুজিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য তিনি দুবার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অনাগ্রহ থাকলেও জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল অসাধারণ। আরবি-ফারসি, বাংলা-ইংরেজি—বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নিজের আগ্রহ অনুযায়ী পড়াশোনা করতেন। তিনি ছিলেন মূলত একজন স্বশিক্ষিত সাহিত্যিক।
ঢাকায় অবস্থানকালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। শহীদুল্লাহর বেগমবাজারের পারিবারিক গ্রন্থাগার তাঁর জন্য উন্মুক্ত ছিল। পাটুয়াটুলির রামমোহন লাইব্রেরিতেও তিনি নিয়মিত যেতেন। বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণী মানুষের সংস্পর্শ তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।
তাঁর ব্যক্তিগত নোট ও ডায়েরি থেকে বোঝা যায়, তিনি আজীবন নিজেকে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচনা করতেন। একটি খাতায় তাঁর নিজের হাতে লেখা ছিল—
“নিজের অজ্ঞতাকে উপলব্ধি করার ক্ষমতাই জ্ঞানীর পরিচায়ক।”
নিজ গ্রাম বিদ্যাবল্লভে তাঁর একটি সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারও ছিল। প্রত্যন্ত পল্লিতে বসে বই পড়া, তথ্য সংগ্রহ, নোট নেওয়া এবং সাহিত্যচর্চার যে সাধনা তিনি চালিয়ে গেছেন, তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর।
শুধু নিজের শিক্ষায় নয়, শিক্ষাবিস্তারের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। নিজ গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তী জীবনে গ্রামের একটি জুনিয়র হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি উদ্যোগী ছিলেন।
বৈরাগ্য, বাউলজীবন ও সংসারে প্রত্যাবর্তন
১৮-১৯ বছর বয়সে রওশন ইজদানীর জীবনে আসে আরেক গভীর আঘাত—মাতৃবিয়োগ। তাঁর মা ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের ১৪ চৈত্র, ২৮ মার্চ ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
মায়ের মৃত্যুর পর তিনি সংসারের প্রতি গভীরভাবে উদাসীন হয়ে পড়েন। বাউলদের প্রতি আকৃষ্ট হন, তাঁদের আসরে যোগ দেন এবং এসরাজ বাজিয়ে গান গাইতেন। কিছুদিন তাঁর জীবন ছিল একপ্রকার বাউল-বৈরাগ্যের জীবন। এই সময়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সাহিত্যজীবনে তাঁর লোকজ জীবনবোধকে আরও গভীর করে।
পরবর্তীকালে আত্মীয়স্বজনের অনুরোধে তিনি ধীরে ধীরে সেই জীবন থেকে ফিরে আসেন এবং ১৩৪৬ বঙ্গাব্দে জুবায়দা আখতার খাতুনকে বিবাহ করেন। তাঁদের সংসারে পাঁচ পুত্র ও দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁদের চার সন্তান শৈশবেই মৃত্যুবরণ করে। জীবনের এই ব্যক্তিগত বেদনা তাঁর অন্তর্জগতে গভীর রেখাপাত করেছিল।
কর্মজীবন: চাকরি নয়, সাহিত্যই ছিল প্রধান সাধনা
রওশন ইজদানীর কর্মজীবন ছিল বিচিত্র। প্রথম দিকে গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরে ঋণ সালিশি বোর্ডে কেরানির চাকরি করেন। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত এই চাকরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়।
কিছু সময় গ্রামেই কাটে। এ সময় সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের স্থানীয় কার্যক্রম, গ্রামীণ সালিশ-দরবার প্রভৃতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
১৯৪৮ সালের শেষ দিকে তিনি ঢাকায় এসে দৈনিক আজাদ-এর বার্তা বিভাগে যোগ দেন। কিন্তু চাকরিকে তিনি কখনো জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখেননি। তাঁর নিজের ভাষায়, আজাদে চাকরি গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্য ও শিক্ষা-সংক্রান্ত কাজের সুযোগ তৈরি করা।
প্রায় সাত বছর আজাদে কাজ করার পর ১৯৫৪ সালের শেষ দিকে অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যয়সংকোচনের কারণে চাকরি হারান। এরপর জীবিকার জন্য লেখালেখি ও পাঠ্যপুস্তক রচনার ওপর নির্ভর করতে হয়।
১৯৫৮ সালের ১৮ নভেম্বর তিনি ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশন্সে প্রুফরিডার, গ্রেড-১ পদে যোগ দেন। কিন্তু ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে এই চাকরিও বেশিদিন করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত শহরের জীবন ছেড়ে তিনি ফিরে যান তাঁর প্রিয় গ্রাম বিদ্যাবল্লভে।
শহরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তাঁর সামনে এসেছিল। এমনকি ঢাকার কলাবাগানে তাঁর জন্য জমিও কেনা হয়েছিল। কিন্তু শহুরে জীবন তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। বাড়িসহ জমি বিক্রি করে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন গ্রামে। এই প্রত্যাবর্তন ছিল কেবল ভৌগোলিক নয়; এটি ছিল তাঁর জীবনদর্শনেরও প্রত্যাবর্তন—মাটি, মানুষ ও পল্লীর কাছে।
ছত্রিশ বছরের সাহিত্যসাধনা
রওশন ইজদানীর সৃষ্টিশীল সাহিত্যজীবন প্রায় ছত্রিশ বছরব্যাপী। ত্রিশের দশক থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখেছেন। কবিতা, গান, কিস্সা-কাহিনি, গল্প, প্রবন্ধ, জীবনী, শিশুসাহিত্য এবং লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর কর্মপ্রয়াসের পরিচয় পাওয়া যায়।
তাঁর সাহিত্যজীবনকে মোটামুটি তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়।
প্রথম পর্যায়ে তিনি পল্লীগীতি, ছড়া, সারি, জারি, পালা ও কিস্সা-কাহিনি রচনা করতেন। পল্লীর মানুষের মুখের ভাষা ও সুর ছিল তাঁর স্বাভাবিক আশ্রয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের প্রভাবে আধুনিক কবিতা রচনার দিকে অগ্রসর হন। কলকাতায় নজরুলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। নজরুল তাঁর কবিতা পড়ে তাঁকে উৎসাহিত করেন। নজরুলের প্রেরণায় রচিত ‘ফজলুল হক’ কবিতাটি তাঁর সাহিত্যজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ‘বজ্রবাণী’ ও ‘রাহগীর’ প্রভৃতি গ্রন্থে এই পর্যায়ের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
তৃতীয় এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তিনি সচেতনভাবে লোকসাহিত্য সংগ্রহ, গবেষণা ও লোকজ জীবনভিত্তিক সাহিত্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। এই পর্যায়েই তাঁর প্রকৃত সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
লোকসাহিত্যের নিবেদিত সাধক
রওশন ইজদানীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে লোকসাহিত্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৃহত্তর ময়মনসিংহের নদী, বিল, হাওর, মাঠ, কৃষিজীবন, ঋতুচক্র এবং মানুষের সুখ-দুঃখ—সবকিছু মিলে এখানে তৈরি হয়েছিল এক সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি।
চন্দ্রকুমার দে, যিনি ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র সংগ্রাহক হিসেবে খ্যাত, ছিলেন রওশন ইজদানীর নিকট প্রতিবেশী। তাঁর প্রভাব রওশন ইজদানীর লোকসাহিত্যচর্চাকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। লোকসাহিত্যপ্রেমী সিরাজউদ্দীন কাশেমপুরীও তাঁকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। পরবর্তীকালে কবি ফররুখ আহমদও তাঁকে পল্লীসাহিত্যের নিজস্ব জগতে থেকেই সাহিত্যচর্চা করার পরামর্শ দেন।
রওশন ইজদানী নিজেই লিখেছিলেন—
“পল্লীকে জানতে হলে যেমন সাধনার দরকার, তেমন প্রয়োজন এর অধিবাসীদের নিবিড় সান্নিধ্য ও সাহচর্য লাভ করা।”
এই কথার বাস্তব প্রমাণ তাঁর জীবনেই পাওয়া যায়। তিনি দীর্ঘদিন গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, মানুষের সঙ্গে থেকেছেন, গানের আসরে বসেছেন, রাত কাটিয়েছেন এবং তাঁদের মুখ থেকে লোকসাহিত্যের উপাদান সংগ্রহ করেছেন। তাঁর ‘মোমেনশাহীর লোকসাহিত্য’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি দীর্ঘ বারো বছর ধরে এই কাজ করার কথা উল্লেখ করেছেন।
তাঁর গবেষণায় লোকসাহিত্য কেবল সংগ্রহযোগ্য উপাদান ছিল না; এটি ছিল মানুষের জীবন, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও সমাজমানসের জীবন্ত দলিল।
‘আমি কাদের কবি’
রওশন ইজদানীর জীবনদর্শনের অন্যতম সুন্দর প্রকাশ তাঁর ‘আমি কাদের কবি’ কবিতায়—
“নীচের তলায় আমি থাকি নীচের তলার কবি, নীচের তলায় বইসে আঁকি নীচের তলার ছবি।”
তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে পল্লী কোনো রোমান্টিক দৃশ্যপট ছিল না; পল্লী ছিল তাঁর নিজের জীবন, নিজের মানুষ, নিজের আত্মপরিচয়।
তিনি লিখেছিলেন—
“এদের মুখে ফুটলে হাসি, আমিও হাসি তাই, এদের মুখে লাগলে কালি, আমারও হয় ছাই।”
এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতেই তাঁর সাহিত্যদর্শনের মূল সুর ধরা পড়ে। তিনি ওপরতলার দূরবর্তী পর্যবেক্ষক হতে চাননি; সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেছিলেন।
তাঁর আরেকটি আত্মপরিচয় ছিল আরও স্পষ্ট—
“আমি এক অনাখ্যাত, অনাদৃত ‘পল্লী দুলাল’।”
এই আত্মপরিচয়ের মধ্যেই তাঁর গৌরব। কারণ তিনি পল্লীকে বাইরে থেকে দেখেননি; পল্লীর ভেতরে দাঁড়িয়ে পল্লীর মানুষের ভাষায় তাদের জীবনকে প্রকাশ করেছেন।
আঞ্চলিক ভাষা ও লোকজ রীতির প্রতি আস্থা
রওশন ইজদানী মনে করতেন, সাহিত্যিক ভাষার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবন্ত ভাষার সম্পর্ক থাকা জরুরি। শহরকেন্দ্রিক, কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষার পরিবর্তে তিনি লোকজ ভাষা ও পুঁথিসাহিত্যের ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর মতে, যে ভাষা সাধারণ মানুষ বোঝে না বা বলে না, সেটিকে মানুষের সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন। তাই তাঁর কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ, পল্লীজীবনের উপমা, কথ্যভঙ্গি এবং লোকগানের সুর স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে।
এই কারণেই তাঁর সাহিত্য একদিকে যেমন সহজবোধ্য, অন্যদিকে তেমনি একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দলিল।
‘খাতামুন নবীঈন’: খ্যাতির শীর্ষে
রওশন ইজদানীর সাহিত্যজীবনের সর্বাধিক আলোচিত গ্রন্থ ‘খাতামুন নবীঈন’। ১৯৫৬ সাল থেকে তিনি এই রচনা শুরু করেন। এতে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে পল্লীকাব্যের আঙ্গিকে রূপায়িত করা হয়েছে।
এই গ্রন্থ রচনায় কবি ফররুখ আহমদ তাঁকে উৎসাহ ও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। গ্রন্থটির প্রকাশনায়ও কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী আর্থিক সহায়তা করেন।
‘খাতামুন নবীঈন’ রওশন ইজদানীর সাহিত্যিক প্রতিভাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৬০ সালে এই গ্রন্থের জন্য তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। আদমজী সাহিত্য পুরস্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর এই সম্মাননা তাঁর সাহিত্যিক মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করে।
সাহিত্যিক সখ্য ও সমকাল
রওশন ইজদানী ছিলেন স্বভাবতই মিশুক, রসিক ও সুধীজনপ্রিয়। তাঁর সাহিত্যিক জীবনে কাজী নজরুল ইসলাম, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, কবি সুফিয়া কামাল, আহসান হাবীব, আশরাফ সিদ্দিকী, তালিম হোসেন, আবদুর রশীদ খান, আবদুর রশীদ ওয়াসেকপুরী, বেনজীর আহমদ, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ প্রমুখের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।
ঢাকার পঞ্চাশের দশকের সাহিত্যিক আড্ডাগুলোতেও তাঁর সরব উপস্থিতি ছিল। গোলাম মোস্তফার বাসার সাহিত্যসভা কিংবা বিভিন্ন রেস্তোরাঁর আড্ডায় তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ।
তাঁর বন্ধুত্ব ছিল লোকসাহিত্য-সংগ্রাহক অধ্যাপক মনসুরউদ্দীনের সঙ্গেও। জ্ঞানী-গুণী মানুষের সান্নিধ্য তাঁর চিন্তা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিল।
তিনি একজন দক্ষ প্রুফরিডার হিসেবেও খ্যাত ছিলেন। শব্দের বানান ও ভাষার শুদ্ধতার প্রতি তাঁর বিশেষ নজর ছিল। তাঁর সুন্দর হাতের লেখাও সমকালীনদের প্রশংসা অর্জন করেছিল।
সাধারণ মানুষের ‘কবি সাব’
রওশন ইজদানীর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের আপনজন। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধাভরে ‘কবি সাব’ বলে ডাকত।
তিনি ছিলেন বিলাসবিমুখ। অর্থসম্পদের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল না। নিজের উপার্জন ও সুযোগ-সুবিধার চেয়ে সাহিত্য, মানুষ এবং গ্রামের প্রতি তাঁর টান ছিল বেশি।
পরোপকার তাঁর চরিত্রের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। গ্রামের মানুষের সমস্যা, শিক্ষা বিস্তার, সাহিত্যসভা কিংবা সামাজিক উদ্যোগ—যেখানে তাঁর সামান্য ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল, সেখানেই তিনি এগিয়ে যেতেন।
পল্লীসাহিত্যের জন্য তাঁর স্বপ্ন
জীবনের শেষ পর্যায়েও রওশন ইজদানীর চিন্তার কেন্দ্র ছিল পল্লীসাহিত্য। ১৯৬৬ সালে আঠারোবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের এক সাহিত্যসভায় প্রদত্ত ভাষণে তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহের পল্লীকবিদের নিয়ে একটি সুসংগঠিত সাহিত্যভুবন গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা বলেন।
তাঁর পরিকল্পনার মধ্যে ছিল—
- ময়মনসিংহের পল্লীকবিদের জীবনী সংগ্রহ ও প্রকাশ;
- তাঁদের গীতিগানের পূর্ণাঙ্গ সংকলন প্রকাশ;
- ‘মোমেনশাহীর লোকসাহিত্য’সহ লোকসাহিত্যের বিভিন্ন সংগ্রহ প্রকাশ;
- পল্লী কবি-সাহিত্যিকদের রচনা নিয়ে একটি সাহিত্যবার্ষিকী প্রকাশ;
- ময়মনসিংহ অঞ্চলের পল্লীকবিদের একটি বৃহৎ পরিমণ্ডলে সংগঠিত করা এবং নতুন প্রতিভাকে উৎসাহিত করা।
এই স্বপ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর সাহিত্যকে স্মরণ করার সর্বোত্তম উপায় কেবল স্মরণসভা নয়; বরং তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দ্বারপ্রান্তে
জীবনের শেষ দিকে তাঁর সাহিত্যকর্ম দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও পরিচিত হতে শুরু করেছিল। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক লোকসাহিত্য সম্মেলনে পাকিস্তানের লোকসাহিত্য সম্পর্কে প্রবন্ধ পাঠের জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু তখন তিনি গুরুতর অসুস্থ। ফলে তাঁর পক্ষে সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
অসুস্থতার মধ্যেও তিনি গ্রামের শিক্ষা ও সাহিত্য নিয়ে চিন্তা করতেন। মৃত্যুর অল্প আগে লেখা তাঁর চিঠিপত্রে যেমন নিজের শারীরিক দুরবস্থার কথা আছে, তেমনি আছে গ্রামের নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করার উদ্বেগ। এতে বোঝা যায়, জীবনের অন্তিম পর্যায়েও তিনি নিজের ব্যক্তিগত সংকটের চেয়ে বৃহত্তর সমাজের স্বপ্নকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
রোগ, দারিদ্র্য ও জীবনের শেষ অধ্যায়
রওশন ইজদানীর জীবন ছিল দারিদ্র্য ও অসুস্থতায় জর্জরিত। ১৯৫৬ সালে তিনি টাইফয়েডে আক্রান্ত হন। এরপর তাঁর স্বাস্থ্য আর পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
পরবর্তী সময়ে অসুস্থতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ১৯৬৬-৬৭ সালে তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। মুখে ঘা ও গুরুতর অসুস্থতার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরে তাঁর ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কথাও সমকালীন চিঠিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও দেশের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মহল তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল। বাংলা একাডেমি তাঁকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। কবি ফররুখ আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, কবি সুফিয়া কামাল, বেনজীর আহমদ, তালিম হোসেন, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহসহ বহু গুণীজন তাঁর অসুস্থতার সময় তাঁকে দেখতে যান।
রওশন ইজদানী ১৯৬৭ সালের ৮ মে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। ক্যান্সার ওয়ার্ডে ২৯ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। সেখানে আরও ১৩ দিন জীবিত ছিলেন।
অবশেষে ২০ জুন ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ, ৫ আষাঢ় ১৩৭৪ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে নিজ গ্রাম বিদ্যাবল্লভে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল প্রায় পঞ্চাশ বছর। এত অল্প বয়সে তাঁর প্রয়াণ বাংলা লোকসাহিত্যের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।
নির্বাচিত গ্রন্থ ও রচনা
রওশন ইজদানীর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
কাব্য ও কবিতা: ‘ভাঙ্গাবীনা’, ‘নীল দরিয়া’, ‘বন্ধের বাঁশী’, ‘বজ্রবাণী’, ‘রাহগীর’, ‘রঙ্গিলা বন্ধু’, ‘চিনু বিবি’, ‘তারানা-ই-ইজদানী’, ‘কয়েকটি কবিতা’, ‘খাতামুন নবীঈন’, ‘মৌলিক গণতন্ত্রের গান’, ‘পাকিস্তানের জঙ্গনামা’, ‘নয়া জামানা’, ‘মরুর কাফেলা’, ‘ফরিয়াদ’ প্রভৃতি।
প্রবন্ধ ও গবেষণা: ‘পাকিস্তান পরিকল্পনা’, ‘মোমেনশাহীর লোকসাহিত্য’, ‘পূর্ব পাকিস্তানের লোকসাহিত্য’, ‘মোমেনশাহীর প্রাচীন পল্লী ও সমাজজীবন’ প্রভৃতি।
জীবনী: ‘ইসলাম জাহানের দুই সেতারা’।
গল্প: ‘চলতি দুনিয়া’, ‘ইসলামী কথা’ প্রভৃতি।
শিশুসাহিত্য: ‘ছোটদের গল্প’, ‘এড়ি ও সোহাগী’ প্রভৃতি।
এ ছাড়া ‘ইউসুফ জুলেখা’, ‘দুলী’, ‘আইয়ুব খানের জারি’, ‘কলঙ্কিনীরূপী’ প্রভৃতি রচনা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
উত্তরাধিকার
রওশন ইজদানীর জীবন ও সাহিত্যকে একসূত্রে বাঁধলে যে চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো—তিনি ছিলেন মাটির কাছাকাছি থাকা এক নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যসাধক। তাঁর জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের চেয়ে সৃষ্টিশীলতার গুরুত্ব ছিল বেশি; আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল মূল্যবান; শহুরে প্রতিষ্ঠার চেয়ে পল্লীর মাটি ছিল অধিক আপন।
তিনি নিজেকে কখনো কেবল কবি হিসেবে দেখেননি। তিনি ছিলেন পল্লীর মানুষের ভাষার ধারক, লোকস্মৃতির সংগ্রাহক এবং এক হারিয়ে যেতে বসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিবেদিত রক্ষক।
তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—লোকসাহিত্য কোনো নিম্নস্তরের সাহিত্য নয়; এটি একটি জাতির মানুষের দীর্ঘদিনের জীবনবোধ, স্মৃতি, বিশ্বাস, আনন্দ-বেদনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের আধার।
রওশন ইজদানী সেই আধারের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। তাঁর কলমে পল্লী কেবল দৃশ্য হয়ে ওঠেনি, হয়ে উঠেছে আত্মপরিচয়। তাই তাঁর নিজের কথাই যেন তাঁর সমগ্র সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে যথার্থ পরিচয়—
“এ পল্লী আমার, আমি এ পল্লীর।”
আজ যখন লোকজ ঐতিহ্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে, মানুষের মুখের গান ও কথকতার অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে, তখন রওশন ইজদানীর সাহিত্যকর্ম নতুন করে পাঠ ও মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাঁর রচনাবলি সংরক্ষণ, পুনর্মুদ্রণ, সম্পাদনা ও গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
বিস্মৃতির আড়াল থেকে রওশন ইজদানীকে পুনরাবিষ্কার করা তাই কেবল একজন কবিকে স্মরণ করা নয়—এ দেশের পল্লীজীবন, লোকস্মৃতি ও মাটির মানুষের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে নতুন করে আবিষ্কার করা।
রওশন ইজদানী বেঁচে থাকুন তাঁর কবিতায়, তাঁর সংগ্রহ করা লোকগানে, তাঁর গবেষণায় এবং সেই পল্লীর মানুষের স্মৃতিতে—যাদের তিনি সারাজীবন নিজের মানুষ বলে জেনেছিলেন।