মাইনুর ইসলাম

সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানী পবিত্র মদীনা মুনাওয়ারায় সম্ভ্রান্ত সাইয়েদ বংশে আনুমানিক ১৮৯৮/৯৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সাইয়েদ ইবরাহীম মোস্তাফা আল-মাদানী।

সাইয়েদ ইবরাহীম মোস্তাফা ছিলেন অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামী নেতা শহীদে কারবালা ইমাম হোসাইনের বংশজাত। সেইদিক থেকেই সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানী আওলাদে রসূলের অন্তর্ভুক্ত। মরহুম মাদানীর বংশপরম্পরা ঊর্ধ্বতন ২২তম পুরুষে গিয়ে শহীদে কারবালা হযরত ইমাম হোসাইন ইবনে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ইবনে আবু তালিবের সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছে। তাঁর নসবনামা নিম্নে বর্ণিত হলো:

সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানী, পিতা-সাইয়েদ ইবরাহীম মোস্তাফা আল-মাদানী, পিতা-সাইয়েদ আব্বাসুল মাদানী, পিতা-সাইয়েদ আব্দুল করীম আল-মাদানী, পিতা সাইয়েদ হাসানুসাদেক আল-মাদানী, পিতা-সাইয়েদ নাসির হোসাইন সয়ূতী, পিতা-সাইয়েদ মুহাম্মদ বারেক, পিতা-সাইয়েদ আহমদ, পিতা-সাইয়েদ মুহাম্মদ হোসাইন তারেফী, পিতা-সাইয়েদ আহমদ পিতা-আব্দুল করীম, পিতা-সাইয়েদ আলী, পিতা-সাইয়েদ হাসান, পিতা -সাইয়েদ আব্দুল আজীজ, পিতা-সাইয়েদ সালেহ্, পিতা-সাইয়েদ আব্দুল লতীফ, পিতা-সাইয়েদুনা ইমাম মূসা কাজেম, পিতা-সাইয়েদুনা ইমাম জাফর সাদেক, পিতা-সাইয়েদুনা ইমাম মুহাম্মদ বারেক, পিতা-সাইয়েদুনা ইমাম আলী ওরফে যয়নুল আবেদীন, পিতা-সাইয়েদুশ শুহাদা ওয়া সাইয়েদু শাবাবে আহলিল জান্নাহ্ সাইয়েদুনা ইমাম হোসাইন, পিতা-আসাদুল্লাহিল গালিব ইমামুল মাশরিকে ওয়াল মাগরিব আমিরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবী তালিব রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুম আজমাঈন। হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু ছিলেন দামাদ-এ সাইয়েদুল আসফিয়া আহমাদুল মোস্তাফা মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সুতরাং সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানী আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এরই বংশধর ছিলেন।

সাইয়েদ ইবরাহীম মোস্তাফা আল-মাদানীর পিতা সাইয়েদ ইবরাহীম আল-মাদানী অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে যেমন কঠোর ছিলেন, তেমনি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্যে ছিল তাঁর অপরিসীম দরদ। ইসলামী মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও মুসলিম সংহতি বজায় রাখার জন্যে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। সাইয়েদ ইবরাহীম একজন রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন লোক ছিলেন। মুসলিম বিশ্বের ঝিমিয়ে পড়া অবস্থা লক্ষ্য করে পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক শক্তি যে ষড়যন্ত্রজাল বিস্তার করে চলছিল তিনি তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছিলেন। আরব তথা হেজাজ তখন বিশাল তুর্কী খেলাফতের অধীন। হেজাজের শাসক ছিলেন শরীফ হোসাইন। মুসলিম শাসনাধিপত্যের
প্রাণকেন্দ্র তুর্কী খেলাফতের বিশাল পরিধিকে নষ্ট করে কি করে মুসলিম জাহানকে টুকরো টুকরো করা যায় এবং একে একে প্রতিটি ভূখণ্ডকে গ্রাস করা চলে, এটাই ছিল বৃহৎ শক্তিগুলোর দুরভিসন্ধি। বৃটিশ সরকার মুসলমানদের জাতীয় ঐক্য-সংহতি নষ্ট করে তাদের দুর্বল করার জন্যে মুসলমানদেরকে বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন শুরু করার প্ররোচনা দেয়। শরীফ হোসাইনকে তারা বোঝাতে চেষ্টা করে যে, তুমি হচ্ছো বিশ্বমুসলিমের
আধ্যাত্মিক প্রাণকেন্দ্র মক্কা-মদীনার শাসক। তোমার দেশ তুর্কী খেলাফতের অধীনে থাকা শুধু তোমারই অবমাননা নয়, মক্কা-মদীনারও অবমাননা। এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী আরব জাতির উপর তুর্কীরা কর্তৃত্ব করবে এটা কি করে হতে পারে? তুমি তুর্কী খেলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আস। তোমার বিচ্ছিন্নতা আন্দোলনে আমরা সকল প্রকার সাহায্য করবো। তুমিই জয়যুক্ত হবে। কারণ তুর্কী খেলাফত যেভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, তোমার বিরুদ্ধে কোনরূপ সামরিক ব্যবস্থা নিলেও তাতে তারা জয়ী হতে পারবে না। মক্কার শাসনকর্তা শরীফকে বৃটিশ সরকারের এ মন্ত্র পুরোপুরিভাবে ধরেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছুকাল পর হেজাজের শাসনকর্তা শরীফ হোসাইন তুর্কী খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানীর পিতা সাইয়েদ ইবরাহীম মোস্তাফা শরীফ হোসাইনের মুসলিম সংহতি বিরোধী এই পদক্ষেপের প্রচণ্ড বিরোধিতা করেন। এমনকি এ ব্যাপারে বিদ্রোহী শরীফ হোসাইন ও তার দোসর ইংরেজদের বিরুদ্ধে তুর্কী খেলাফতের পক্ষে তিনি যুদ্ধও করেন। এক পর্যায়ে শত্রুদের অতর্কিত আক্রমণের শিকার হয়ে সাইয়েদ ইবরাহীম মোস্তাফা শাহাদাত বরণ করেন।

এমনই যোগ্য পিতার যোগ্য আওলাদ মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তফা আল-মাদানী যেমন ছিলেন একজন নির্ভেজাল খাঁটি মুসলমান, বিজ্ঞ আলেম, তেমনি ছিলেন জীবনের সর্বস্তরে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের সংগ্রামী মুজাহিদ।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

শহীদ মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানী সর্বপ্রথম তৎকালীন ভারতের ইসলামী জ্ঞান-চর্চা ও কৃষ্টিসংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র স্বাধীন রাজ্য হায়দরাবাদে আগমন করেন। এখানে আগমনের পূর্বেই তিনি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে প্রথম বিবাহ করেন। তাঁর সেই স্ত্রীর গর্ভে তাঁর প্রথম সন্তান মাসউদ মোস্তাফা আল-মাদানীর জন্ম হবার পর সে স্ত্রী মারা যান। মাওলানা মাদানী দুই বছরের শিশুপুত্র মাসউদকে সাথে নিয়েই হায়দরাবাদে আগমন করেছিলেন। হায়দরাবাদের নেজাম বাহাদুর ওসমান আলী খাঁ তাঁকে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে রাখেন। নেজাম বাহাদুরের ছেলেরা তাঁর কাছে আরবী ও দীনী শিক্ষা লাভকরতো। হায়দরাবাদে কিছুকাল অবস্থানের পর মোস্তাফা মাদানী ভারতের যুক্ত প্রদেশ (বর্তমান উত্তর প্রদেশ)-এর রায়বেরেলীতে একটি ইসলাম প্রচার মিশনের নেতা হয়ে চলে যান। তারপর সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। হিমালয়ান উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সংগ্রামী বীর মুজাহিদ শহীদে বালাকোট সাইয়েদ আহমদ শহীদের স্মৃতিবিজড়িত বেরেলীকে কেন্দ্র করেই তিনি ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন। সেখান থেকে তিনি ইসলামী শিক্ষা-আদর্শ বিস্তারকল্পে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সফর করতেন। পুত্র মাসউদ মোস্তাফাকে দেখাশোনা করার জন্য তখন তিনি খ্যাতনামা আলেম বিশিষ্ট বুজর্গ মাওলানা আবদুর রহমান আমরোহী রহ. এর কনিষ্ঠ ভ্রাতা মাওলানা হাফেজ আব্দুর রহীম মরহুমের বিধবা কন্যার সাথে দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ হন। সে সময় তাঁর নিজের বয়স যেখানে ছিল বাইশ বছর এ স্ত্রীর বয়স ছিল তখন চল্লিশ বছর। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে কোন সন্তান জন্ম নেয়নি।

ঐ সময়ই একবার তিনি মাওলানা আব্দুর রউফ জৌনপুরীর সাথে প্রথম বাংলাদেশের আগমন করেন। সে থেকে প্রতি বছর তিনি শুষ্ক ঋতুতে ইসলাম প্রচারের খাতিরে বাংলা ও আসাম সফরে আসতেন। সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানী যেখানেই যেতেন স্থানীয় মুসলমানগণ তাঁর প্রতি নবী বংশধর ও একজন আলেম হিসেবে যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন। তাঁর চেহারা দর্শনে প্রিয়নবীর স্মৃতিই মুসলমানদের মনে জাগ্রত হয়ে উঠত। মানুষ তন্ময় হয়ে তাঁর কথাবার্তা শুনত। তাঁর তাবলীগী সফরে বিভিন্ন ওয়াজ-নসীহতের দ্বারা বহু পথহারা মানুষ পথের দিশা পেয়ে আল্লাহ তা’আলার পরহেযগার বান্দা বনেছে। বিশেষ করে মাওলানা মাদানী কুরআন-হাদীস ও অন্যান্য জ্ঞানশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন বলে দল-মত-নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর ওলামা-ই-কিরামের কাছেই শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।

সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানীর ধমনীতে যেই মহাপুরুষদের রক্তধারা প্রবহমান ছিল, তাঁর পক্ষে বিদেশ বিভূয়ে এসেও ইসলাম ও মুসলমানের শত্রুতা মুখ বুজে সহ্য করা সম্ভব ছিল না। ভারতে মুসলিম আধিপত্য ছিনতাইকারী বৃটিশ সরকারের প্রতি তাঁর আক্রোশ ছিল সহজাত। কারণ মুসলিম সংহতির একনিষ্ঠ সেবক তাঁর পিতা সাইয়েদ ইবরাহীম মোস্তাফা বৃটিশ সৈনিক ও তাদের তাবেদার হেজাজের শাসনকর্তা শরীফ হোসাইনের সৈন্যদের হাতেই শাহাদত বরণ করেছিলেন। সুতরাং ভারতকে ইংরেজের কবল থেকে মুক্ত করার যে-কোন সংগ্রামের সাথে তাঁর সহযোগিতা ছিলো এক স্বাভাবিক ব্যাপার। স্বাধীনতা ও বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের সাথে তিনি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিলেন। প্রথমে হিন্দু মুসলিম উভয় জাতির সমন্বয়ে গঠিত বৃটিশ বিরোধী ও ভারতের স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রামরত কংগ্রেসের সাথে মিশে তিনি কাজ করেন। পরবর্তীতে জমিয়তের ব্রাহ্মণ্যবাদী চিন্তাচেতনার কারণে ১৯৩১ সালে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ থেকে বের হয়ে আসেন। ভারতেও তাঁকে বৃটিশ সরকার, ব্রাহ্মণ্যবাদী ও কংগ্রেসী মৌলভীদের বিরাগভাজন হতে হয়। এভাবে ১৯৪৬ সন পর্যন্ত ভারতীয় এলাকায় তিনি আযাদী সংগ্রাম করেন। নবী-বংশের একজন উত্তরাধিকারী হিসেবেই উপমহাদেশের সর্বত্র তিনি পরিচিত হয়ে পড়েন। ইংরেজ সরকারের কাছে তাঁর ইংরেজ-বিরোধী তৎপরতা ও সঠিক পরিচয় গোপন না থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনরূপ ব্যবস্থা গ্রহণে তারা সাহস পায়নি। কারণ এতে এখানে ইংরেজ শাসনবিরোধী মুসলিমচিত্ত আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠাকে তারা বেশী ভয় করতো। চতুর ইংরেজ সরকার সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তফা আল-মাদানীকে গ্রেফতার না করে কৌশলে তাঁকে তাঁর অবস্থানকেন্দ্র ত্যাগে বাধ্য করার চক্রান্ত করে। ১৯৪৫ সালের ঠিক মাঝামাঝি সময় তাঁর অবস্থানকেন্দ্র বেরেলীতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা দেখা দেয়। তখনই তাঁর এদেশে আগমন ঘটে।

মাওলানা মাদানী তখন মুসলমানদের স্বতন্ত্র মুসলিম জাতীয়তাবোধের ভিত্তিতে কাজ করতে থাকেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনের সংগ্রামী বীর মুজাহিদ আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সাথে সক্রিয়ভাবে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা ও পাকিস্তান আন্দোলনের এই অবিশ্রান্ত কর্মী সিলেট গণভোট অনুষ্ঠানেও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেন। অনেক বিজ্ঞ লোকের মতে একজন আরবী মুহাজির হয়েও মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানী পাকিস্তানের পক্ষে ঈমানী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যে কাজ করেছেন এবং পাক-ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা, পাকিস্তানের স্থায়িত্ব ও সংহতির পক্ষে তাঁর যে অবদান রয়েছে, জন্মগত পাকিস্তানী নেতাদের দু’চারজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি ছাড়া অনেক নেতার জীবনেও তেমন দৃষ্টান্ত বিরল।

অবিভক্ত পাকিস্তানে ইসলামী শাসন ও ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে তাঁর বিরাট অবদান রয়েছে। তিনি দেশের সর্বত্র বিরাট বিরাট সভা-সমিতি করে ইসলামী শাসনতন্ত্র রচনা ও দেশকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার অনুকূলে জনমত সৃষ্টির জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানী তদানীন্তন নিখিল পাকিস্তান মারকাযী জমিয়তে ওলামা-ই-ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ ও কাউন্সিলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া মাওলানা মাদানী ছিলেন দলের সাবেক পূর্ব পাকিস্তান শাখার আজীবন সহকারী সভাপতি। মাওলানা মাদানী রাজনৈতিক জীবনে কোন দিন ক্ষমতা বা পদের লোভদেখাননি। জানা যায়, ১৯৬৯ সনের আগস্ট মাসে করাচীতে অনুষ্ঠিত উক্ত মারকাযী জমিয়তের কাউন্সিল অধিবশনে তাঁকে দলের সভাপতির পদ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হলে তিনি বিনয় সহকারে সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আমি অতবড় দায়িত্বপূর্ণ পদ নিতে চাই না। পদের বাইরে থেকেই ইসলামী আন্দোলনের কাজ করবো। এমনকি ইসলাম ও পাকিস্তানের জন্য আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে দিতে আমি প্রস্তুত রয়েছি।” ইসলামের জন্যে নিবেদিতপ্রাণ এই মর্দে মুজাহিদ যে-কোন প্রতিকূল পরিবেশেও ইসলামের সপক্ষে বলিষ্ঠ বক্তব্য রাখতে কোনরূপ পরোয়া করতেন না। আল্লাহর দেয়া জানকে ইসলামের জন্যে উৎসর্গ করে দেয়ার মধ্যেই যে মুমিন জীবনের চরম সফলতা, এ বাস্তবতাকে খোদাপ্রেমিক মাওলানা মোস্তাফা আল-মাদানী অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। এজন্যেই দেখা যায়, ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১২ই আগস্ট ইসলামী ছাত্রসংঘ নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের নামকরা ছাত্র শহীদ আবদুল মালেক যখন তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিক্ষক মিলনায়তনে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিবাদ করতে গিয়ে দুষ্কৃতিকারীদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন, তখন তাঁর জানাযা শেষে মুনাযাতের মধ্যে মাওলানা মাদানী বলেছেন, “হে আল্লাহ্ শহীদ আবদুল মালেকের ন্যায় আমাকেও তোমার দীনের জন্যে শাহাদাত বরণ করার তওফীক দাও।” একথা সেদিন কে জানতো যে আওলাদে রাসূলের এ দোয়া আল্লাহ্ তা’আলা কবুল করে নিয়েছেন এবং তার এক বছর পর একই মাসে আল্লাহ্ পাক তাঁকে তাঁর পিতা ইবরাহীম এবং পূর্বপুরুষ শহীদে কারবালা ইমাম হোসাইনের মতো শহীদী মর্যাদায় ভূষিত করবেন।

শহীদ মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানীর অন্তর ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল। তাঁর মধ্যে কোন প্রকার সংকীর্ণতার লেশমাত্র ছিল না। ইসলামের জন্যে যে যেখানে কাজ করতো তার প্রতিই মাওলানা মাদানীর সমর্থন থাকতো। অপর একটি ইসলামী দলের দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত থাকলেও তাঁর রাজনৈতিক সমর্থন ছিল দলীয় গণ্ডির ঊর্ধ্বে। ইসলামী আন্দোলনে তৎপর যে-কোন সভায় তিনি সভাপতিত্ব করতেন ও বক্তৃতা দিতেন। তাঁর এই উদার নীতি প্রতিটি ইসলামী দলের নেতা ও কর্মীকেই অভিভূত করতো। এ কারণে সকল দলের লোকই তাঁর প্রতি আলাদাভাবে শ্রদ্ধাশীল ছিল। এটা তাঁর রাজনৈতিক মতের অস্থিরতার ফল ছিল না বরং এ নীতি ছিল ইসলামী আন্দোলনকে ব্যাপক ও জোরদার করার পবিত্রতম প্রেরণাসঞ্জাত।

ইসলামকে যেসব মহাপুরুষ মানব জাতির সার্বিক কল্যাণ ও মুক্তির একমাত্র পথ হিসাবে বেছে নিয়েছেন, তাঁরা জীবনের সকল কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এরই শিক্ষা আদর্শের প্রচার প্রসার ও স্থায়িত্বের জন্য তৎপর থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। জনগণের সেবা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। জনসেবার যতগুলো দিক রয়েছে তন্মধ্যে সবচাইতে বড় দিক হলো তাদের মধ্যে মানবীয় সৎ গুণাবলীর বিকাশ দান। শহীদ মাওলানা মাহমূদ মোস্তাফা আল-মাদানী এ মহৎ উদ্দেশ্যে ইসলাম প্রচারের সুমহান লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এদেশে আগমন করেছিলেন। এজন্য তিনি তাঁর নির্ধারিত তাবলীগী ওয়াজ -নসীহত ছাড়াও বাংলাদেশে জনসেবার প্রধান কাজ মানুষের অজ্ঞতা দূরীকরণ এবং সুশিক্ষার দ্বারা তাদের মানবীয় গুণাবলীর বিকাশ ও উৎকর্ষতা বিধানে বিরাট ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অসংখ্য জনহিতকর কাজের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান হলো, তিনি প্রায় তিনশত মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশে বহু প্রথম শ্রেণীর দীনী মাদ্রাসার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। যেমন জামেয়া-এ-এমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ, পটিয়া জামিরিয়া, হাটহাজারীর মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা, জামেয়া-এ-কোরআনিয়া লালবাগ (ঢাকা), বড়কাটরা আশরাফুল উলুম মাদ্রাসা (ঢাকা), ফরিদাবাদ এমদাদুল উলুম মাদ্রাসা (ঢাকা) প্রভৃতি নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শহীদ মাওলানা মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানী ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে বরিশাল মাহমুদিয়া মাদ্রাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বরিশাল মাহমুদিয়া মাদ্রাসাটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রসিদ্ধ ইসলামী প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে প্রতি বছরই বহু ছাত্র শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর ইসলামী জীবনাদর্শের প্রচার ও প্রসার দানের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আল-মাদানী তাঁর প্রায় বক্তৃতার শুরুতেই তওহীদের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে নিজের বক্তব্য শুরু করতেন। ঢাকা জেলার মীরকাদিম এলাকার আবদুল্লাহপুর গ্রামেও একইভাবে ১৯৭১ সালের ১০ই আগস্ট এক ধর্মসভায় ওয়াজ-নসীহত করছিলেন। তিনি কালেমা-ই-তাইয়েবা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’র ব্যাখ্যা এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। রাত পৌনে আটটায় ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমন এদেশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী ও তাদের প্ররোচিত কতিপয় বিভ্রান্ত তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা বাঙালীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলী ছোঁড়ে। আওলাদে রাসূল ইসলামের মহান খাদিম মাওলানা মাদানী তখনই সভামঞ্চে ঢলে পড়েন এবং কালেমা পড়তে পড়তে শাহাদাত বরণ করেন।

মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তফা আল-মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি শাহাদাতে যারা শোক প্রকাশ করেন:

‘হযরত মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আলমাদানী ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র মদীনা শরীফে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সরওয়ারে দোজাহাঁ সাইয়েদুল মুরসালীন প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম -এর বংশধর ছিলেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আলমাদানী ইসলামের সুমহান শিক্ষা-আদর্শের তাবলীগ করার উদ্দেশ্যে এই উপমহাদেশে আগমন করেছিলেন। কেবল পাক-ভারতেই নয়, মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশের মুসলমানদের নিকট তিনি প্রিয় নবীর সুযোগ্য বংশধর ও একজন ইসলাম প্রচারক হিসাবে পরিচিত। কুরআন-হাদীস ও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। ইসলাম প্রচারের সুবিধার্থে তিনি তাঁর মাতৃভাষা ছাড়াও উর্দু, ফারসী ও বাংলা ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন। এসব ভাষায় তিনি অনর্গল বক্তৃতা দিতেন। শহীদ হযরত মাওলানা মাহমুদ অনর্গল বক্তৃতা দিতেন। শহীদ হযরত মাওলানা মাহমুদ মোস্তাফা আল মাদানী রহ. ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এর বাকেরগঞ্জ জেলায় বসতি স্থাপন করেন। অতঃপর তিনি বাংলা ও আসামের সর্বত্র সভা-সমিতি করে ইসলাম প্রচার করেন। মাওলানা মাদানী পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী (র)-এর নেতৃত্বে বাংলার পীর-ওলামা মাশায়েখ যখন মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের সপক্ষে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন, তিনিও সে সময় সিলেট, আসাম সহ সারা বাংলাদেশে পাকিস্তানের সপক্ষে সভা-সমিতির উদ্দেশ্যে ঝটিকা সফর করেন।

শহীদ হযরত মাওলানা মাহমুদ মোস্তাফা আলমাদানী ব্যক্তিগতভাবে একদিকে যেমন অত্যন্ত শরীফ ও অমায়িক ছিলেন, অপরদিকে বাতিলের বিরুদ্ধে ছিলেন নির্ভীক। তিনি ন্যায় এবং সত্য কথা বলতে কোন প্রকার ভয়-ভীতির পরওয়া করতেন না। তিনি যে শহীদ-এ-কারবালা হযরত ইমাম হুসাইন (রা)-এর বংশধর এবং তাঁর ধমনীতে যে হুসাইনী রক্তধারা প্রবাহিত ছিল, বাতিলের বিরুদ্ধে তাঁর আপোসহীন মনোভাবের মাধ্যমে তিনি নিজের জীবনের একাধিক ঘটনার দ্বারা তা প্রমাণ করে গিয়েছেন। পাকিস্তানে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন এবং আইয়ুব সরকারের আমলে ডঃ ফজলুর রহমানের ইসলামের নামে অনৈসলামিক মতবাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর বিরাট ভূমিকা ছিল। ইসলাম-বিরোধী যাবতীয় বাতিল মতাদর্শের বিরুদ্ধাচরণ ও পাকিস্তানকে একটি খাঁটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য তিনি প্রবল আগ্রহী ছিলেন।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে মার্চ, বিদেশী চরেরা নাটোরে তাঁকে ও তাঁর সহচরদের উনিশ দিন যাবত বন্দী করে রেখেছিল। সেখান থেকে কোন প্রকারে ছাড়া পেয়ে ঈশ্বরদী পর্যন্ত পৌছুলে এখানেও সেই চরেরা তাঁকে আটক করে সর্বস্ব লুট করে নেয় এবং তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। কিন্তু তাঁর পরিচিত সেখানকার ভক্ত অনুরক্তদের চেষ্টায় সেবারের মতো তাঁর জীবন রক্ষা পায়।

সেই উৎপীড়ন ও বন্দীশালা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কোনরূপ ভীত না হয়েই পুনরায় তিনি ইসলাম প্রচারে বের হন। গত পরশু ঢাকা জেলার মীরকাদিমে এমনি ভাবের একটি ইসলামী জলসায় ওয়ায করা অবস্থায়ই তিনি ইসলাম ও মুসলমানদের জাতশত্রুদের গুলীতে শাহাদত বরণ করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান মারকাযী জমিয়তে ওলামা-ই-ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির সহ-সভাপতি ছিলেন।

শহীদ হযরত মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আলমাদানী বাকেরগঞ্জ মাহমুদিয়া আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবন এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি এ প্রদেশের শত শত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কায়েম ও পরিচালনায় সাহায্য-সহযোগিতা করে গেছেন। এই উপমহাদেশে বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর লক্ষ লক্ষ আধ্যাত্মিক শাগরেদ রয়েছে। [দৈনিক সংগ্রাম, ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ আগস্ট, ১৯৭১ ইং]

দৈনিক আলাদ-এর সম্পাদকীয় মন্তব্য:

মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আলমাদানী শাহাদাত বরণ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজেউন)। মাওলানা মাদানী মুন্সিগঞ্জ মহকুমার আবদুল্লাহপুর গ্রামে এক জমায়েতে বক্তৃতা দানকালে হিন্দুস্তানী এজেন্টদের দ্বারা গুলীবিদ্ধ হন এবং কলেমায়ে শাহাদত উচ্চারণ করতে করতে ঘটনাস্থলেই ইন্তেকাল করেন। মাওলানা সাহেবের শাহাদাতের সংবাদটি আকস্মিক ও মর্মান্তিক হইলেও এই জন্য শোক প্রকাশের অবকাশ নাই। মাওলানা সাহেবের পাক রূহ জান্নাতবাসী হইয়াছে। তিনি দুনিয়ার যে নেক কাজের জের রাখিয়া গিয়াছেন স্বয়ং আল্লাহই ইহার সাক্ষী।

অজ্ঞাতশত্রু বলিতে যাহা বুঝায় মাওলানা মোস্তাফা আলমাদানী সত্যিকার অর্থে তাহাই ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তাঁহার কোনো শত্রু ছিল না; দীনী শিক্ষার আলো বিস্তারের উদ্দেশ্যে তিনি নিজের উদ্যমে একাধিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন।

সুগভীর পাণ্ডিত্যের জন্য পাক-ভারত উপমহাদেশে তিনি মশহুর ছিলেন। ইসলামের সুমহান বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে তিনি এই উপমহাদেশে আগমন করেন। এই উপমহাদেশের মুসলিম জাগরণের নকীবদের মধ্যে তিনিও একজন। সাবেক নিখিল ভারত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের সহিত তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং ইন্তেকালের সময় তিনি নেজামে ইসলামের সহ-সভাপতি ছিলেন। প্রায় বত্রিশ বৎসর পূর্বে তিনি বরিশাল জেলায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। তাঁহার বাগ্মিতা ও তেজস্বিতার সাথে পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যেকটি লোকই পরিচিত। তিনি তাঁহার ধর্মপ্রাণতার জন্য এখানকার মানুষের নিকট একান্ত আপন হইয়া উঠিতে পারিয়াছিলেন।

তাঁহার শাহাদাতের সংবাদ পৌছুলে সারা ঢাকা বিস্ময়ে হতবাক ও শোকে মুহ্যমান হইয়া পড়িয়াছিল। এমন মহান ব্যক্তির বুকে কেহ গুলী বিদ্ধ করিতে পারে ইহা কাহারও বিশ্বাস হইতে চাহে নাই। মাওলানা মাহমুদ মোস্তাফা আলমাদানীর সাথে ব্যক্তিগতভাবে কাহারও শত্রুতা না থাকিলেও তাঁহার মতাদর্শের দুশমনের অভাব ছিল না। তিনি ছিলেন ইসলামের খাঁটি থাদেম। ইসলামের খেদমত করিতে করিতে তিনি দুশমনের হাতে প্রাণ দান করিয়াছেন। সত্যিকারের শহীদের গৌরব তিনি লাভকরিয়াছেন। এমন মৃত্যু গৌরবের মৃত্যু, এমন মৃত্যু সৌভাগ্যের মৃত্যু। শাহাদাতের সৌভাগ্যে গৌরবোজ্জ্বল মৃত্যুর সাথে মাওলানা মাদানী আল্লাহর অতি কামনীয় সান্নিধ্যে গমন করিয়াছেন। আল্লাহ তাঁহার পরিবারবর্গের প্রতি নেগাহ্বান থাকিবেন। তিনি তাহাদের সহায়ক। [দৈনিক আজাদ, ঢাকা, শুক্রবার ১৩ই আগস্ট, ১৯৭১ ইং]

মুফতীয়ে আযম মুহাম্মদ শফী রহমতুল্লাহি আলাইহি:

পাকিস্তানের মুফতীয়ে আযম মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী এক বিবৃতিতে মাওলানা সাইয়েদ মোস্তাফা আল-মাদানীর শাহাদাতকে এক বিরাট দুর্ঘটনা আখ্যা দিয়ে বলেন, আমি তাঁর শাহাদাতের সংবাদে গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছি। তাঁর এই শাহাদাত শুধু তাঁর পরিবারবর্গেরই দুঃখ ও ক্ষতির কারণ নয় বরং তাঁর এই শাহাদাত একটা জাতীয় দুর্ঘটনা। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে, বিদেশী স্বার্থে নিয়োজিত সন্ত্রাসবাদীদের এত সাহস যে, উন্মুক্ত জনসভায় মাওলানা সাইয়েদ মোস্তাফা মাদানীকে তারা শহীদ করেছে।

মাওলানা মওদূদী :

পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী এক বিবৃতিতে বলেন, মাওলানা সাইয়েদ মাদানী মদীনা থেকে এসেছেন এবং ইসলাম প্রচারকে জীবনের মিশন হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তানের এই অংশে ভারতীয় প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে ইসলাম-বিরোধী শক্তি এখান হতে ইসলামকেই নির্মূল করতে চায়, শহীদ মাওলানা মাহমুদ মোস্তাফা আলমাদানীর শাহাদাত তারই প্রমাণ।

মাওলানা জাফর আহমদ আনসারী:

করাচী হতে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদের সদস্য মাওলানা জাফর আহমদ আনছারী এক বিবৃতিতে বলেন, মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আলমাদানীর শাহাদাতের সংবাদে আমি গভীর ব্যথা ও উদ্বেগ বোধ করছি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, তাঁর রক্ত বৃথা যাবে না। কেননা শাহাদাতের রক্ত কোন দিনই বৃথা যায়নি।

মাওলানা এহতেশামুল হক থানভী রহ:

পাকিস্তানের বিশিষ্ট ও নেতৃস্থানীয় আলেম মাওলানা এহতেশামুল হক থানভী বলেন, রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিক্ষা ও আদর্শের অনুসরণ ত্যাগ করার ফলে আমরা আঞ্চলিকতার অভিশাপে জড়িয়ে পড়েছি। পূর্ব পাকিস্তানে সম্প্রতি যা কিছু ঘটছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। মারকাযী জামিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির একজন বিশিষ্ট নেতা মাওলানা সাইয়েদ মাহমুদ মোস্তাফা আলমাদানীর শাহাদাতে মুসলিম জাহানের এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো। আমি তাঁর শাহাদাতের সাথে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বনের দাবী জানাচ্ছি।

নওয়াবজাদা নাছরুল্লাহ খান:

সাবেক পশ্চিম পাকিস্তান পিডিপি প্রধান নওয়াবজাদা নাছরুল্লাহ্ খানও মাওলানা সাইয়েদ আলমাদানীর শাহাদাতে গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর রূহের মাগফেরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

পীর মুহসিনুদ্দীন রহ. :

সাবেক পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের (হাযারভী-মাহমুদ গ্রুপ) সভাপতি মাওলানা পীর মুহসেনুদ্দীন এক বিবৃতিতে মাওলানা সাইয়েদ মাদানীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, মাওলানা সাইয়েদ মাদানীর এই হত্যাকাণ্ড দেশের প্রতিটি মুসলমানের অনুভূতিকে নির্মমভাবে আহত করেছে। তাঁর মৃত্যুতে সারা মুসলিম জাহানের অপূরণীয় ক্ষতি হলো।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.