মুহাম্মাদ মোশাররফ হোসাইন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ধীমান গবেষক-আলেম ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাওলানা ড. আ হ ম মুজতবা হোছাইন রহিমাহুল্লাহ। প্রথমে তাঁকে চিনতে পারি তাঁর বাবার লিখিত সীরাতগ্রন্থ পড়ে। এছাড়া তাঁর নিজের লিখিত, সংকলিত ও গবেষণামূলক বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রবন্ধও পড়া হয়েছে। চেষ্টা ছিল তাঁর সমস্ত গ্রন্থাবলী আগে সংগ্রহ করার, কিন্তু সেই সুযোগ পরে আর হয়নি।
ড. আ হ ম মুজতবা হোছাইন রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন:
আমার জীবনে কয়েকজন আলেমের যথেষ্ট প্রভাব ও অবদান রয়েছে, বিশেষ করে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহিমাহুল্লাহ-এর।
আমার আব্বা, হযরত মাওলানা তফাজ্জল হোছাইন, বড় কাটারা মাদ্রাসার শায়খুল হাদীস ছিলেন, যাঁকে মাদ্রাসার পরিভাষায় “এক নম্বর হুজুর” বলা হতো। এ কারণে হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) এবং অন্যান্য প্রবীন আলেম ও বুযুর্গগণের আদর ও স্নেহশাসন লাভের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।
আমার বয়স আট বছর, সেই সময়ের একটি ঘটনা—পুরনো ঢাকার গলিগলিতে তখন ঘোড়ার গাড়ি চলত। একদিন আমি নবাবগঞ্জ রোড থেকে চক বাজার যাওয়ার জন্য ঘোড়ার গাড়ির পিছনের কাঠের বেঞ্চে চুপি চুপি বসে পড়ি, ভাড়া না দিয়ে। কিন্তু হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) আমাকে দেখে ধরলেন। তিনি বললেন, “তুমি এক নম্বর হুজুরের ছেলে না? ভাড়া না দিয়ে কেন গাড়িতে উঠলে? পকেটে পয়সা আছে?” আমার পকেট থেকে এক পয়সা বের করে আমি চালককে দিলাম। হুজুর বললেন, “কোনদিন বিনা ভাড়ায় চলবে না।” সেই সস্নেহ শাসন ও উপদেশ আমার অন্তরে চিরস্থায়ী হয়ে গেছে।
দশ বছর বয়সে আমার আব্বা আমাকে ও আমার ছোট ভাইকে হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) এর কাছে নিয়ে যান। লালবাগ শাহী মসজিদের মিনারার কামরায় হুজুর আমাদের রূহানী ও আধ্যাত্মিক তত্ত্বের জন্য দেখাশোনা ও দু’আ করেছিলেন, যেন আমরা হযরত থানভী (রহঃ) এর সিলসিলায় যুক্ত থাকতে পারি। এরপর দাওরায়ে ফারেগ হয়ে এক বছর মুলতানে তাফসীর পড়ার সুযোগ হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় হযরত মাওলানা হাকীম আখতার ছাহেব (রহঃ) এর হাতে বাই’আত গ্রহণ করি।
আমি বড় কাটারা মাদ্রাসায় ছাত্র ছিলাম, দাওরায়ে হাদীসও পড়েছি। কিন্তু কিছুদিন লালবাগে এসে সুনানে নাসায়ী শরীফ হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) এর কাছে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। ‘৭১ সালের পর হযরত মাওলানা আতহার আলী (রহঃ) কামরাঙ্গির চরে আসলে তার সোহবতের জন্য প্রায়ই যেতাম। সেখানে হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) আমাকে বিশেষভাবে স্নেহ ও উৎসাহ দিতেন।
মেট্রিক ও আই এ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষক হওয়ার প্রস্তাব আসে। দ্বিধায় থাকা অবস্থায় হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) এর কাছে পরামর্শ চাই। তিনি বললেন, “আমাদের কারোর জন্য অবশ্যই যাওয়া উচিত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়া উচিত। প্রত্যেক লাইনে আমাদের লোক থাকা দরকার।” তাঁর এই পরামর্শে দ্বিধা দূর হয় এবং সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হয়।
হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) এর নির্দেশে আমি উনিশ শত ছেষট্টি থেকে উনিশ শত সত্তর পর্যন্ত ‘মাসিক নেয়ামত’ পত্রিকা ফরিদাবাদ থেকে পুনঃপ্রকাশ করি।
মাওলানা ড. আ হ ম মুজতবা হোছাইন রহিমাহুল্লাহ-এর তত্ত্বাবধানে রচিত কিছু গবেষণাকর্ম:
১. শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান রহিমাহুল্লাহ ও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব।
২. হাদীসশাস্ত্র চর্চায় বাংলাদেশের মুহাদ্দিসগণের অবদান (১৯৭১–২০১২)।
৩. ইমাম আবূ হানীফা (র.) এবং হাদীসশাস্ত্র।
৪. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: জীবন ও তাঁর সাহিত্যে ইসলামী ভাবধারা।
৫. বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিতচর্চা ও মূল্যায়ন।
৬. বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সুফীবাদের প্রভাব।
৭. সূরা আল-ইখলাসের আলোকে (তাওহীদ) আল্লাহর একত্ববাদ।
৮. উপমহাদেশের খ্যাতিমান আলিমদের উর্দু সাহিত্য সাধনা (১৮৫৭–১৯৪৭)।
৯. ইসলাম প্রচারে ও মুসলিম জাগরণে মসজিদের ভূমিকা: বৃহত্তর ঢাকা জেলার পরিপ্রেক্ষিত।
১০. ইসলামী দাওয়াত: পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি প্রভৃতি
মাওলানা মুজতবা হোছাইন রহিমাহুল্লাহ-এর গবেষণা কর্মের বিবরণ (ছেলের বর্ণনায়)
আমার আব্বা, মাওলানা মুজতবা হোছাইন রহিমাহুল্লাহ-এর গবেষণা কর্ম অতি বিস্তৃত ও গভীর। দাদাজান, শায়খুল হাদীস মাওলানা তফাজ্জল হোছাইন রহ., ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত তিন বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে কুরআন, সুন্নাহ, যুক্তি, আবেগ ও তথ্যভিত্তিক ১৫০০ পৃষ্ঠার বিশাল সীরাতগ্রন্থ রহমাতুল্লিল আলামিন সা. রচনা করেন।
দাদার জীবদ্দশায় গ্রন্থটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর ইন্তিকালের পর বাবা ও বড় ভাই প্রফেসর ড. মাহমূদুল হাসান ইউছুফ এবং ছাত্র ড. আবু তাহের মাঞ্জুর একত্রে গ্রন্থটির ভাষা অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন, সংশোধন ও বিয়োজন সম্পন্ন করেন। বিশেষভাবে তথ্যসূত্র এবং টীকা সংযোজনের বিষয়টিতে তারা গভীর মনোযোগ দেন। প্রতিটি তথ্যের জন্য কুরআন, হাদীস, সীরাত সাহিত্যের মূল আরবি গ্রন্থ, তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিলসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
বর্তমানে এই গ্রন্থটির নাম রাখা হয়েছে: “হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (স) – সমকালীন পরিবেশ ও জীবন; হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স) – মু’জিযার স্বরূপ ও মু’জিযা”। গ্রন্থটি বাংলাদেশ জাতীয় সীরাত কমিটি থেকে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছে।
ড. আ হ ম মুজতবা হোছাইন রহিমাহুল্লাহ-এর গবেষণামূলক প্রবন্ধসমূহ:
১. হযরত কাসেম নানুতভী (রহ.)-এর জীবনী (১৯৮২)
২. শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদ হাসান (রহ.) : শিক্ষা ও রাজনীতিতে তাঁর অবদান (১৯৮৪)
৩. উপমহাদেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও আল্লামা নানুতভী (১৯৮৫)
৪. মুহাম্মদ কাসিম নানুতভী : সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ (পরিশিষ্ট) (১৯৮৫)
৫. মাওলানা মুহাম্মদ হাসান : সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ (পরিশিষ্ট) (১৯৮৫)
৬. ড. সিরাজুল হক, ইমাম ইবনে তাইমিয়া এবং তাঁর সংস্কার (১৯৮৫)
৭. বারবারা ডালি মেটকাফ, ‘বৃটিশ ইন্ডিয়ায় ইসলামী জাগরণ : দেওবন্দ, ১৮৬০–১৯০০’ (১৯৮৬)
৮. হাদীস সংরক্ষণে স্মৃতিশক্তির ভূমিকা (১৯৯০)
৯. মাওলানা আকরম খাঁ : সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান (১৯৯২)
১০. উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মাওলানা মাহমুদ হাসানের ভূমিকা (১৯৯৩)
১১. হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী : ইলমে তাসাওউফে তাঁর অবদান (১৯৯৪)
১২. মাওলানা আকরম খাঁ : সীরাত সাহিত্যে তাঁর অবদান (১৯৯৪)
১৩. শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান : ইসলামী সাহিত্যে তাঁর অবদান (১৯৯৮)
১৪. শেষ নবীর আবির্ভাব আরবে কেন? (১৯৯৮)
১৫. ওহুদ যুদ্ধ : ফলাফল ও নৈতিক শিক্ষা (১৯৯৮)
১৬. মওকাফুল ইসলামি লিহাল্লিল মুশকিলাতি মু’আসিরাত (১৯৯৮)
১৭. শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসানের সাংগঠনিক কার্যক্রম (১৯৯৯)
১৮. শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান : স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর কূটনৈতিক তৎপরতা (১৯৯৯)
১৯. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইসলাম প্রচার (১৯৯৯)
২০. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াত-পূর্ব মু’জিযা (২০০০)
ড. আ হ ম মুজতবা হোছাইন রহিমাহুল্লাহ-এর সম্পাদনা ও প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ
সম্পাদনা:
১. বাংলায় অনূদিত মাবাদিউল আরাবিয়া (সরফ অংশ – ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ের বিএ-অনার্স সিলেবাসভুক্ত আরবি ব্যাকরণ) (১৯৮১)
২. বাংলায় অনূদিত মুনশা’ইব (আরবি ব্যাকরণ) (১৯৮২)
৩. ইমাম তাহাভী (র.) : জীবন ও কর্ম এবং হাদীস শাস্ত্রে তাঁর অবদান (১৯৯৮)
৪. হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম : সমকালীন পরিবেশ ও জীবন (১৯৯৮)
৫. হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম : মু’জিযার স্বরূপ ও মু’জিযা (১৯৯৯)
লিখিত গ্রন্থাবলী:
১. মাবাদিউল আরাবিয়্যা (অনুবাদ)
২. তাজবীদ ও আল কুরআন আল-আদাবুল আরাবী (১৯৮২)
উপরের তালিকাটি মাওলানা ড. আ হ ম মুজতবা হোছাইন রহিমাহুল্লাহ-এর সাহেবজাদার লেখা থেকে নেওয়া হয়েছে। তাঁর লেখালেখি ও গবেষণামূলক কাজ এ তালিকায় উল্লেখিতগুলো ছাড়াও আরও বিস্তৃত। এটি কোনো পরিপূর্ণ তালিকা নয়।
ড. আ হ ম মুজতবা হোছাইন রহিমাহুল্লাহ ছিলেন এক অনন্য আলেম, গবেষক ও শিক্ষাবিদ, যিনি ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা, সীরাতচর্চা, হাদীসশাস্ত্র ও উপমহাদেশীয় আলেম সমাজের ইতিহাস নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছেন। তাঁর লেখা, সম্পাদনা ও গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলো প্রমাণ করে, তিনি তথ্যভিত্তিক ও বিশ্লেষণমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসলামী জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন।
শৈশব থেকে হাফেজ্জী হুজুরের সস্নেহ শাসন, পিতার অনুশাসন ও বিভিন্ন আকাবির আলেমের দিকনির্দেশনা তাঁকে একজন প্রকৃত শিক্ষানুরাগী ও গবেষক হিসেবে গড়ে তুলেছে। তাঁর কর্মজীবন ও সাহিত্যিক অবদান বাংলাদেশের মুসলিম জ্ঞান-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য দিশারী হিসেবে কাজ করবে।
ড. মুজতবা হোছাইন রহিমাহুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় সম্পন্ন প্রতিটি রচনা ও গবেষণা একটি দৃষ্টান্ত, যা শেখায় কিভাবে সততা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে একজন ধীমান আলেম ও গবেষক হওয়া যায়। তাঁর লেখা ও সম্পাদনা আজও শিক্ষাব্যবস্থা ও ইসলামী গবেষণার জন্য একটি অমূল্য সম্পদ।


