মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান

একটি সমাজ তার কৃতী মানুষদের কীভাবে স্মরণ করে, তা দিয়ে সেই সমাজের মানসিক অবস্থা অনেকটাই বোঝা যায়। যে সমাজ তার জ্ঞানী, সাধক, শিক্ষানুরাগী, সংস্কারক, কবি, চিন্তক, সমাজনির্মাতা ও জননেতাদের মনে রাখে, সে সমাজ নিজের শিকড়ের সঙ্গেও সম্পর্ক রক্ষা করে। আর যে সমাজ তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ভুলে যায়, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতি হারায়, আত্মপরিচয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তিও হারাতে থাকে। বাংলার মুসলিম সমাজের ইতিহাসে এই বেদনাদায়ক সত্য গভীরভাবে প্রযোজ্য। এখানে বহু কৃতী মনীষী জন্মেছেন, যাঁরা ধর্মীয় জাগরণ, শিক্ষার প্রসার, সাহিত্যচর্চা, সামাজিক পুনর্গঠন, রাজনৈতিক বোধ, আত্মমর্যাদা এবং জনগণের মানসিক জাগরণে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু সময়ের প্রবাহে তাঁদের বড় একটি অংশ আজ বিস্মৃত, উপেক্ষিত কিংবা সীমিত পরিসরের নাম হয়ে গেছেন।

এই বিস্মৃতি কেবল সময়ের স্বাভাবিক পরিণতি নয়। এর পেছনে আছে বহুবিধ ঐতিহাসিক, সামাজিক, শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক এবং মানসিক কারণ। একটি জাতির স্মৃতি কখনো শূন্যে তৈরি হয় না; তা গড়ে ওঠে ক্ষমতার বিন্যাস, শিক্ষাব্যবস্থা, ইতিহাস রচনার ধারা, পাঠাভ্যাস, সামাজিক অভ্যাস, সাংস্কৃতিক প্রবণতা এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনের ভিতর দিয়ে। বাংলার বহু কৃতী মুসলমান কেন বিস্মৃত হলেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাতে হবে।

এক. রাজনৈতিক পতনের সঙ্গে স্মৃতির ক্ষয়

বাংলার মুসলিম সমাজের স্মৃতিচ্যুতির ইতিহাস বুঝতে হলে প্রথমেই মনে রাখতে হবে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রাধান্য হারানোর পর মুসলিম সমাজ কেবল ক্ষমতাই হারায়নি, আত্মবিশ্বাসও হারিয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরে যাওয়া কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি মানসিক অভিঘাতও বটে। শাসক থেকে শাসিত, কেন্দ্র থেকে প্রান্ত, নিয়ন্ত্রক থেকে নির্ভরশীল এই রূপান্তর মানুষের আত্মবোধকে নাড়িয়ে দেয়। বাংলার মুসলমানদের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছিল।

যখন একটি সমাজ রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তার নিজস্ব ইতিহাস সংরক্ষণের শক্তিও কমে যায়। আগে যে সমাজ নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাকেন্দ্র, ভাষিক রীতি, পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্মৃতি-সংরক্ষণের উপায় নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, পতনের পর সে সমাজ সেগুলো একে একে হারাতে থাকে। ফলে তার কৃতী মানুষদের জীবন, কাজ ও প্রভাব সংরক্ষণ করার মতো সাংগঠনিক শক্তি আর থাকে না। কারও স্মরণসভা হয় না, কারও রচনাবলি সংগ্রহ করা হয় না, কারও চিঠিপত্র বাঁচিয়ে রাখা হয় না, কারও জীবন নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা গড়ে ওঠে না। স্মৃতি তখন ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত মুখে মুখে ঘোরে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় না। আর মুখের স্মৃতি সবচেয়ে দ্রুত হারিয়ে যায়।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

বাংলার বহু মুসলিম মনীষী এমন এক সময়ে কাজ করেছেন, যখন তাঁদের সমাজ একদিকে পশ্চাৎপদতা, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছিল। ফলে তাঁদের কীর্তি সেই অর্থে জাতীয় সম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়নি। তাঁরা কাজ করেছেন, প্রভাব ফেলেছেন, কিন্তু তাঁদের কাজকে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে পরিণত করার মতো সংগঠিত প্রয়াস গড়ে ওঠেনি।

দুই. ঔপনিবেশিক শাসন ও স্মৃতির নতুন বিন্যাস

বাংলার মুসলিম কৃতীদের বিস্মৃত হওয়ার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শাসন একটি কেন্দ্রীয় কারণ। ঔপনিবেশিকতা কেবল দেশের শাসনব্যবস্থা বদলায়নি; বদলে দিয়েছে জ্ঞানচর্চার ধরন, শিক্ষার কাঠামো, সামাজিক মর্যাদার মানদণ্ড এবং কোন অতীতকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হবে—সেই সিদ্ধান্তও। শাসকগোষ্ঠী সব সময়ই এমন এক ইতিহাস নির্মাণ করতে চায়, যা তার শাসনকে বৈধতা দেয় এবং পূর্ববর্তী শক্তিগুলোর প্রভাবকে দুর্বল দেখায়। ফলে অতীতের বহু চরিত্রকে হয় ছোট করে দেখা হয়, নয়তো পুরোপুরি আড়ালে ঠেলে দেওয়া হয়।

ঔপনিবেশিক জ্ঞানব্যবস্থা বাংলার মুসলিম সমাজকে প্রায়ই একটি ‘পশ্চাৎপদ’, ‘অযোগ্য’ বা ‘অতীতনির্ভর’ জনগোষ্ঠী হিসেবে চিত্রিত করেছে। এর ফলে মুসলিম সমাজের ভিতর থেকে উঠে আসা বহু চিন্তক, সংস্কারক ও জাগরণপুরুষকে বৃহত্তর বৌদ্ধিক পরিসরে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এমনকি যাঁরা তাঁদের সমাজকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছেন, যাঁরা শিক্ষা বিস্তারে কাজ করেছেন কিংবা ধর্মীয় ও সামাজিক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাঁদেরও অনেকে মূলধারার ইতিহাসে প্রান্তিক চরিত্র হয়ে থেকেছেন।

ঔপনিবেশিক শাসনের আরেকটি বড় প্রভাব ছিল, নতুন শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে নিজেদের অতীতকে দেখার দৃষ্টিও বদলে যায়। শাসকের ভাষা, শাসকের শিক্ষারীতি, শাসকের ইতিহাসবোধ এবং শাসকের মূল্যায়নকাঠামো অনেকের মনে প্রভাব ফেলে। ফলে নিজেদের সমাজের বহু মনীষীকে নিজেরা চিনতেও দেরি হয়, আর চিনলেও তাঁদের বিচার করা হয় বাইরের মানদণ্ড দিয়ে। এতে করে বহু মানুষ নিজের সমাজের জাগরণপুরুষদের আর কেন্দ্রীয় বলে মনে করেনি; বরং তাঁদের পুরোনো সময়ের সীমাবদ্ধ মানুষ ভেবে পাশ কাটিয়েছে।

তিন. শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন এবং মুসলিম সমাজের পিছিয়ে পড়া

শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির স্মৃতি নির্মাণের সবচেয়ে বড় মাধ্যমগুলোর একটি। পাঠ্যপুস্তকে যাঁরা থাকেন, তাঁরা টিকে যান; যাঁরা বাদ পড়েন, তাঁরা ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে পড়েন। বাংলার বহু মুসলিম কৃতী মানুষ পাঠ্যপুস্তক, সাধারণ পাঠক্রম এবং জনশিক্ষার আলোচনায় যথেষ্ট স্থান পাননি। এর ফলে নতুন প্রজন্ম তাঁদের সম্পর্কে জানার সুযোগই পায়নি।

ঔপনিবেশিক শাসনের পর যে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো, তাতে বাংলার মুসলমানদের বড় একটি অংশ প্রথম দিকে অংশ নিতে পারেনি বা নিতে চায়নি। ফলে তারা শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়ে। এই পিছিয়ে পড়ার অর্থ শুধু চাকরি-বাকরিতে পিছিয়ে পড়া নয়; এর অর্থ হলো জ্ঞান উৎপাদনেও পিছিয়ে পড়া। যারা শিক্ষার নতুন কাঠামোয় প্রবেশ করতে পারে, তারাই সাধারণত বই লেখে, জীবনচরিত রচনা করে, সংবাদপত্র চালায়, পাঠ্যবই তৈরি করে, গবেষণা প্রতিষ্ঠা করে এবং স্মৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। মুসলিম সমাজ যখন শিক্ষায় পিছিয়ে রইল, তখন তাদের নিজেদের কৃতী মানুষদের নিয়ে নিজেরাই যথেষ্ট কাজ করতে পারল না।

ফলে দেখা গেল, যে সমাজে কীর্তিমান মানুষ ছিলেন, সেই সমাজের হাতে তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণের উপযুক্ত সামর্থ্য ছিল না। অনেক মনীষীর জীবন ছিল ঘটনাবহুল, প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, কিন্তু তাঁদের বিষয়ে সুসংহত দলিল, সংকলিত রচনা, যাচাইকৃত জীবনপঞ্জি কিংবা বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ তৈরি হয়নি। কেউ কারও নাম শুনেছে, কেউ কারও একটি ঘটনা জানে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পরিচয় আর গড়ে ওঠেনি।

চার. পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাস রচনায় বাছাই

কোন ব্যক্তি ‘ইতিহাসের মানুষ’ হবেন, তা সব সময় তাঁর অবদানের মাপ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; অনেক সময় নির্ধারিত হয় তাঁকে ঘিরে যে বয়ান তৈরি করা হচ্ছে, তার প্রয়োজন দিয়ে। ইতিহাস রচনার মধ্যে বাছাই থাকে; পাঠ্যপুস্তক রচনার মধ্যে তো আরও বেশি। বাংলার বহু মুসলিম মনীষী এই বাছাইয়ের শিকার হয়েছেন।

পাঠ্যপুস্তকে সাধারণত এমন চরিত্রকে জায়গা দেওয়া হয়, যাঁদের জীবনকে খুব সহজে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা জাতীয় বয়ানে বসানো যায়। কিন্তু অনেক মুসলিম মনীষীর জীবন ছিল বহুমাত্রিক। তাঁরা একদিকে ধর্মীয়, অন্যদিকে সামাজিক; একদিকে সংস্কারক, অন্যদিকে প্রতিরোধী; একদিকে শিক্ষানুরাগী, অন্যদিকে নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারক। এই জটিলতা পাঠ্যপুস্তকের সরল কাঠামোয় অনেক সময় স্থান পায় না। ফলে তাঁদের নিয়ে গভীর আলোচনা বাদ যায়, তাঁদের নামও হারিয়ে যায়।

এ ছাড়া ইতিহাসের মূলস্রোতে সাধারণত বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনা, যুদ্ধ, আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন, ভাষা-সংগ্রাম, জাতীয়তাবোধের দৃশ্যমান ধারা—এসব বেশি স্থান পায়। কিন্তু সমাজের গভীরে যে মানুষগুলো ধীরে ধীরে মানসগঠন করেছেন, ধর্মীয় সংস্কার এনেছেন, শিক্ষার পথ খুলেছেন, সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় মনন তৈরি করেছেন—তাঁদের প্রভাব অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি হলেও তাৎক্ষণিকভাবে নাটকীয় নয়। তাই তাঁরা ইতিহাসের জনপথে নয়, গলিপথে পড়ে থাকেন।

পাঁচ. মুসলিম সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি-সংরক্ষণের অভাব

কোনো জাতির কৃতী মানুষেরা টিকে থাকেন প্রতিষ্ঠান, পত্রপত্রিকা, গ্রন্থাগার, আর্কাইভ, গবেষণাকেন্দ্র, স্মারকগ্রন্থ, জন্মজয়ন্তী উদ্‌যাপন, পুনর্মুদ্রণ, গ্রন্থসংগ্রহ, নথি সংরক্ষণ এবং শিক্ষাক্রমের ভেতর দিয়ে। বাংলার মুসলিম সমাজে এই প্রাতিষ্ঠানিক ধারাটি দীর্ঘ সময় দুর্বল ছিল। ফলে অনেক মনীষীর কাজ ছিল বিশাল, কিন্তু তার দলিল ছিল অরক্ষিত।

কত মানুষ আছেন, যাঁদের লেখা সাময়িকপত্রের পাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়নি। কত মানুষের বক্তৃতা যুগকে নেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়নি। কত মানুষের চিঠিপত্র, ব্যক্তিগত দলিল, সমসাময়িক মূল্যায়ন, শিষ্যদের স্মৃতিচারণ সবই নষ্ট হয়ে গেছে অসংরক্ষণের কারণে। কেউ পরিবারের সিন্দুকে রইল, কেউ আর্দ্রতায় নষ্ট হলো, কেউ উত্তরাধিকারীদের অমনোযোগে হারাল, কেউ প্রতিষ্ঠানহীনতায় বিলুপ্ত হলো। ফলে পরের প্রজন্ম যখন তাঁদের নিয়ে জানতে চাইল, তখন দেখল হাতে খুব সামান্য উপকরণ আছে।

স্মৃতির এই অপচয় কেবল বস্তুগত নয়; এটি সাংস্কৃতিকও। অনেক সমাজে কৃতী মানুষদের নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার সংস্কৃতি থাকে। তাঁদের জন্মদিনে আলোচনা হয়, তাঁদের বই পুনর্মুদ্রিত হয়, তাঁদের ওপর নতুন প্রজন্ম গবেষণা করে, তাঁদের নিয়ে নাটক-চিত্রনাট্য-প্রবন্ধ-সেমিনার হয়। বাংলার মুসলিম সমাজে এই ধারা সীমিত ছিল। ফলে কৃতী মানুষরা ধীরে ধীরে বিশেষজ্ঞদের ছোট ঘরে বন্দী হয়ে গেছেন; সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাননি।

ছয়. ভাষাগত দূরত্ব এবং পাঠের অস্বস্তি

বিস্মৃতির আরেকটি কারণ ভাষাগত। বাংলার মুসলিম মনীষীদের অনেকে এমন ভাষায় লিখেছেন, যা আজকের পাঠকের কাছে কঠিন মনে হয়। কারও ভাষা ছিল তৎকালীন সাধুভাষা, কারও ভাষায় ছিল আরবি-ফারসি প্রভাব, কারও লেখার ধরন ছিল প্রবন্ধধর্মী, তর্কনির্ভর বা ধর্মীয় পরিভাষায় সমৃদ্ধ। আবার অনেকে উর্দু, ফারসি বা আরবি ভাষায়ও লিখেছেন। ফলে নতুন বাংলা-শিক্ষিত পাঠকের কাছে তাঁরা দূরের মানুষ হয়ে ওঠেন।

যে লেখককে পড়তে কষ্ট হয়, তাকে মানুষ কম পড়ে; যাকে কম পড়ে, তাকে কম মনে রাখে। ফলে বহু মনীষী তাঁদের নিজের কৃতিত্বের কারণে নয়, ভাষার দূরত্বের কারণে বিস্মৃত হয়ে গেছেন। তাঁদের জীবন নিয়ে সহজ ভাষায় বই হয়নি, তাঁদের রচনার ভাষান্তর হয়নি, তাঁদের ভাবনা নতুন প্রজন্মের জন্য ব্যাখ্যা করা হয়নি। ফলে তাঁরা গবেষণাগারের মানুষ হয়ে রইলেন, পাঠকের মানুষ হতে পারলেন না।

এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। বহু মুসলিম মনীষী এমন প্রশ্ন নিয়ে লিখেছেন, যা তাঁদের সময়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল—ধর্মীয় সংস্কার, সমাজের পশ্চাৎপদতা, শিক্ষার অবনতি, ধর্মপ্রচার, উপনিবেশ, আত্মমর্যাদা, সাংস্কৃতিক সংকট। কিন্তু পরের প্রজন্ম যদি সেই প্রশ্নগুলোর ঐতিহাসিক তাৎপর্য বুঝে না, তাহলে সেই লেখা আর তার কাছে জীবন্ত থাকে না। ফলে মানুষটি যেমন দূরে সরে যায়, তাঁর কর্মও তেমনি প্রাসঙ্গিকতার আলো হারায়।

সাত. নগরকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জাগরণের অবমূল্যায়ন

বাংলার মুসলিম সমাজের বহু গুরুত্বপূর্ণ জাগরণপুরুষ কাজ করেছেন গ্রামবাংলায়, মফস্বলে, জনসমাজের ভিতর, মসজিদ-মাদ্রাসা-হাট-বাজার-আলোচনা-সমাবেশ ইত্যাদি জগতে। কিন্তু ইতিহাস রচনা ও সাহিত্যচর্চার বড় অংশ দীর্ঘদিন নগরকেন্দ্রিক ছিল। ফলে যাঁরা নগরের বুদ্ধিবৃত্তিক মঞ্চে ছিলেন না, বরং সমাজের তৃণমূল স্তরে কাজ করেছেন, তাঁদের অবদান যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি।

গ্রামীণ সমাজে কাজ করা মানুষদের প্রভাব অনেক সময় গভীর হয়, কিন্তু সেই প্রভাব সবসময় লেখায় ধরা পড়ে না। তাঁরা হয়তো হাজার মানুষের চেতনা বদলেছেন, ধর্মীয় আচরণে পরিবর্তন এনেছেন, কৃষকসমাজকে সংগঠিত করেছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু তাঁদের কাজকে শহুরে ইতিহাসকারেরা সবসময় গুরুত্ব দেননি। কারণ গ্রামবাংলার রূপান্তর অনেক সময় ধীর, অপ্রদর্শনশীল এবং তথাকথিত “উচ্চ” সংস্কৃতির চোখে কম দৃশ্যমান।

এই অবমূল্যায়নের ফলে বাংলার বহু কৃতী মুসলমান, বিশেষত তৃণমূলভিত্তিক সমাজসংস্কারক, ওয়াজ-আলোচক, জননেতা, ধর্মীয় সংগঠক ও শিক্ষাপ্রচারক, বিস্মৃতির অন্ধকারে চলে গেছেন। তাঁদের জীবন মাটির খুব কাছে ছিল বলেই হয়তো তা কাগজের খুব কাছে আসেনি।

আট. মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজন

একটি সমাজের অভ্যন্তরে মত, পথ, পদ্ধতি, নেতৃত্ব, ব্যাখ্যা ও অগ্রাধিকারের ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভিন্নতা যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা দলগত সংকীর্ণতায় রূপ নেয়, তখন অনেক কৃতী মানুষকে ন্যায্যভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলার মুসলিম সমাজেও নানা সময়ে এমন হয়েছে।

কেউ একটি বিশেষ ধারার মানুষ বলে অন্য ধারার লোকেরা তাঁকে গুরুত্ব দেয়নি। কেউ ধর্মীয়, তাই তথাকথিত আধুনিকেরা তাঁকে উপেক্ষা করেছে। কেউ আধুনিক শিক্ষানুরাগী, তাই রক্ষণশীলরা তাঁর পূর্ণ মূল্য দেয়নি। কেউ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, তাই তাঁকে কেবল রাজনীতির খোপে বন্দী করা হয়েছে। কেউ সাহিত্যিক, তাই তাঁর ধর্মীয় বা সামাজিক ভূমিকা আড়ালে গেছে। আবার কেউ ধর্মীয় সংস্কারক, তাই তাঁকে কেবল মতবিরোধের আলোকে দেখা হয়েছে, তাঁর বৃহত্তর সামাজিক অবদান বিবেচনায় আনা হয়নি।

এই দলগত দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে খণ্ডিত করে। ফলে একজন পূর্ণ মানুষ আর পূর্ণভাবে দেখা যায় না। তাঁর জীবন ও কর্মের বিস্তার হারিয়ে যায়, রয়ে যায় কেবল আংশিক পরিচয়। আর আংশিক পরিচয় খুব দ্রুত ভুলে যাওয়া যায়।

নয়. নতুন যুগের দ্রুততা এবং স্মৃতির সংকোচন

আধুনিক যুগে মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমেছে, পাঠ কমেছে, গভীর অধ্যয়ন সীমিত হয়েছে। দ্রুত তথ্য, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, চটকদার ঘটনা, দৃশ্যমান সাফল্য এসব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে এমন মানুষদের স্মরণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে, যাঁদের অবদান বুঝতে ধৈর্য, প্রেক্ষাপটজ্ঞান এবং মনোযোগ দরকার।

বাংলার বহু মুসলিম মনীষীকে জানার জন্য কেবল নাম জানা যথেষ্ট নয়; জানতে হয় তাঁদের সময়, তাঁদের ভাষা, তাঁদের প্রতিপক্ষ, তাঁদের সংগ্রাম, তাঁদের সীমাবদ্ধতা এবং তাঁদের সমাজের অবস্থা। কিন্তু আজকের দ্রুতগতির যুগে অনেক পাঠক সেই সময় নিয়ে চিন্তা করতে চায় না। ফলে ইতিহাস থেকে টিকে যায় কয়েকটি বহুলপ্রচারিত নাম; বাকিরা ছিটকে পড়ে।

স্মৃতি এখন অনেকাংশে বাজারনির্ভরও। যাঁদের নিয়ে অনুষ্ঠান হয়, দৃশ্যমান প্রচার হয়, পুনর্মুদ্রণ হয়, সামাজিক মাধ্যমে উদ্ধৃতি ঘোরে তাঁদের নাম টিকে যায়। যাঁদের নিয়ে কোনো ধারাবাহিক প্রচার নেই, তাঁরা যত বড় মনীষীই হোন, নীরবে হারিয়ে যান। এই নতুন বাস্তবতাও বিস্মৃতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দশ. পরিবার ও উত্তরসূরিদের অমনোযোগ

অনেক কৃতী মানুষের স্মৃতি তাঁদের পরিবার, শিষ্য, অনুসারী, প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় সমাজ বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু যখন এই উত্তরসূরি-সমাজ নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন স্মৃতি দ্রুত ক্ষয়ে যায়। বাংলার বহু মুসলিম মনীষীর ক্ষেত্রে এই দুঃখজনক বাস্তবতা দেখা যায়।

অনেক পরিবার তাঁদের পূর্বপুরুষের দলিলপত্র, চিঠি, ছবি, পাণ্ডুলিপি, ব্যক্তিগত নোট, স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করেনি। কেউ গুরুত্ব বুঝেনি, কেউ সামর্থ্য পায়নি, কেউ আগ্রহ হারিয়েছে। আবার অনেক সময় স্থানীয় সমাজও নিজেদের কৃতী সন্তানকে নিয়ে টেকসই কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে জীবন শেষ হওয়ার পর কয়েক বছর আলোচনা হয়েছে, তারপর ধীরে ধীরে সব স্তিমিত হয়ে গেছে।

স্মৃতি বাঁচে সম্পর্কের ভেতর; সম্পর্ক ছিন্ন হলে স্মৃতি শুকিয়ে যায়। একজন মানুষ যত বড়ই হোন, তাঁকে ধরে রাখার জন্য পরবর্তী প্রজন্মের সচেতনতা দরকার। তা না হলে বিস্মৃতি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

এগারো. মুসলিম আত্মপরিচয়ের সংকট

বাংলার মুসলিম কৃতীদের বিস্মৃত হওয়ার পেছনে আরও একটি গভীর কারণ হলো আত্মপরিচয়ের সংকট। মুসলিম সমাজ বহুদিন ধরে এক জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে তার পরিচয় কী, তার ঐতিহ্য কী, তার ভাষা কী, তার ভবিষ্যৎ কোথায়, এবং সে নিজের ইতিহাসকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে? এই প্রশ্নগুলোর সুস্থ সমাধান না হলে অতীতের মানুষদেরও সুস্থভাবে দেখা যায় না।

যে সমাজ নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, সে সমাজ নিজের মনীষীদেরও দ্বিধাগ্রস্তভাবে দেখে। কখনও তাদের অস্বস্তিকর মনে হয়, কখনও অপ্রাসঙ্গিক, কখনও অতিরিক্ত ধর্মীয়, কখনও অতিরিক্ত সামাজিক, কখনও অতিরিক্ত আঞ্চলিক, কখনও যথেষ্ট আধুনিক নয়, কখনও আবার খুবই স্বতন্ত্র। ফলে তাঁদের নিয়ে স্পষ্ট স্মৃতিবোধ গড়ে ওঠে না।

আত্মপরিচয়ের সুস্থ বিকাশ না হলে ইতিহাসও বিচ্ছিন্ন খণ্ডে ভেঙে যায়। তখন পূর্বসূরিদের জীবনকে উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, বিচ্ছিন্ন তথ্য হিসেবে দেখা হয়। এভাবেই বিস্মৃতি গভীর হয়।

বারো. কৃতিত্বের চেয়ে কিংবদন্তির প্রতি আকর্ষণ

আরেকটি সমস্যা হলো, আমাদের সমাজে অনেক সময় দলিলসমৃদ্ধ কৃতিত্বের চেয়ে মুখে মুখে প্রচলিত কিংবদন্তি বেশি জনপ্রিয় হয়। ফলে যাঁদের জীবন বাস্তব সংগ্রাম, শিক্ষা বিস্তার, চিন্তাচর্চা, সাংগঠনিক ধৈর্য, লেখালেখি, জনসেবা—এসবের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তাঁরা তুলনামূলক কম আলোচিত হন। বরং চমকপ্রদ গল্প, অলৌকিকতা, নাটকীয়তা বা সংঘর্ষের মানুষ বেশি আলো পায়।

বাংলার বহু মুসলিম মনীষী ছিলেন নির্মাতা-প্রকৃতির মানুষ। তাঁরা সমাজকে বদলেছেন ধীরে, জ্ঞানের মাধ্যমে, শ্রমের মাধ্যমে, প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, কলমের মাধ্যমে। কিন্তু ধীর নির্মাণের গল্প সবসময় জনপ্রিয় হয় না। ফলে তাঁদের প্রকৃত অবদান ইতিহাসের ভিত গড়লেও, জনস্মৃতির মঞ্চে তাঁরা সামনে আসেন না।

তেরো. গবেষণার ঘাটতি ও পুনর্মূল্যায়নের অভাব

যে মানুষদের নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা হয়, তাঁরা বারবার আলোচনায় আসেন। যে মানুষদের নিয়ে কাজ থেমে যায়, তাঁরা আবার বিস্মৃত হন। বাংলার বহু মুসলিম মনীষীর ক্ষেত্রে এই পুনর্মূল্যায়নের কাজ সীমিত। তাঁদের নিয়ে একবার-দুবার লেখা হয়েছে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে নতুন করে পড়া হয়নি। ফলে তাঁদের অবদান নতুন প্রজন্মের প্রশ্নের আলোয় ব্যাখ্যা করা হয়নি।

সমাজ বদলায়, প্রশ্ন বদলায়, মূল্যায়নের ভাষাও বদলায়। তাই অতীতের মনীষীদের বারবার নতুন করে পড়তে হয়। একসময় যাঁকে শুধু ধর্মীয় নেতা বলা হয়েছে, পরে দেখা যেতে পারে তিনি ছিলেন সমাজসংগঠকও। যাঁকে কেবল কবি বলা হয়েছে, পরে দেখা যেতে পারে তিনি সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের নির্মাতাও। যাঁকে কেবল শিক্ষা-সংস্কারক বলা হয়েছে, পরে বোঝা যেতে পারে তিনি আসলে এক মানসিক বিপ্লবের সূচনাকারী। এই পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া মনীষীরা ধীরে ধীরে একমাত্রিক হয়ে যান, তারপর বিস্মৃত হয়ে পড়েন।

চৌদ্দ. বিস্মৃতি কি শেষ সত্য?

তবে এখানেই শেষ কথা নয়। বিস্মৃতি যত গভীরই হোক, তা অপরিবর্তনীয় নয়। বরং বিস্মৃত মানুষের পুনরাবিষ্কারই অনেক সময় একটি সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। যখন আমরা বাংলার বহু কৃতী মুসলমানের জীবন ফিরে দেখি, তখন আমরা কেবল কিছু ব্যক্তির নাম উদ্ধার করি না; উদ্ধার করি একটি সমাজের লুকানো শক্তি, বেদনা, সংগ্রাম, অভিযোজন, আত্মমর্যাদা এবং পুনর্গঠনের ইতিহাস।

এই মানুষগুলোকে স্মরণ করার অর্থ কেবল অতীতকে সম্মান জানানো নয়; বরং বর্তমানকে সমৃদ্ধ করা। কারণ আজও আমাদের সমাজ শিক্ষা, নৈতিকতা, নেতৃত্ব, আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বোধ, সামাজিক দায়িত্ব এবং মানসিক জাগরণের প্রশ্নে সংগ্রাম করছে। এই সংগ্রামের ভেতর অতীতের সেই মনীষীরা পথ দেখাতে পারেন, যাঁরা নিজেদের সময়ের অন্ধকারে আলো জ্বালাতে চেষ্টা করেছিলেন।

যাহোক, তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, বাংলার বহু কৃতী মুসলমান বিস্মৃত হয়েছেন একক কোনো কারণে নয়; বরং রাজনৈতিক পতন, ঔপনিবেশিক প্রভাব, শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা, পাঠ্যপুস্তকে অনুপস্থিতি, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির অভাব, ভাষাগত দূরত্ব, নগরকেন্দ্রিক দৃষ্টি, অভ্যন্তরীণ বিভাজন, বাজারনির্ভর স্মৃতি, উত্তরসূরিদের অমনোযোগ এবং আত্মপরিচয়ের সংকট এসবের সমষ্টিগত প্রভাবে। তাঁরা বিস্মৃত হয়েছেন বলে তাঁদের কৃতিত্ব ছোট হয়ে যায়নি; বরং আমাদের স্মৃতির দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।

কাজেই তাঁদের পুনরাবিষ্কার করা মানে ইতিহাসের একটি ঋণ শোধ করা। এর চেয়ে বেশি, এটি আত্মপরিচয়ের কাজে ফিরে যাওয়া। বাংলার মুসলিম সমাজকে বুঝতে হলে কেবল তার পরাজয় নয়, তার নির্মাতাদেরও জানতে হবে; কেবল তার দুর্বলতা নয়, তার জাগরণপুরুষদেরও চিনতে হবে। কারণ যে সমাজ তার বিস্মৃত মনীষীদের ফিরে পায়, সে সমাজ নিজেকেও কিছুটা ফিরে পায়।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.