হাসান মুহাম্মদ
লক্ষ্ণৌ নগরের অন্তরে, নবাবি ঐতিহ্যের স্নিগ্ধ আবহে একসময় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল ইউরোপীয়দের নির্মিত একটি প্রাসাদ। সময়ের প্রবাহে সেই প্রাসাদই ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় জ্ঞানের দীপ্ত কেন্দ্র পরিচিতি পায় ‘ফিরিঙ্গিমহল’ নামে।
ইতিহাসে প্রাসাদ মানেই সাধারণত ভোগ-বিলাস, ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতীক। কিন্তু ফিরিঙ্গিমহল সেই প্রচলিত ধারণাকে অতিক্রম করে এক ভিন্ন অর্থবহ সত্তায় পরিণত হয়। এটি হয়ে ওঠে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও চিন্তার এক অনন্য আশ্রয়স্থল যেখানে ইলম ও হিকমত কেবল পাঠ্য বিষয় ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল জীবন্ত বৌদ্ধিক অনুশীলন।
ফিরিঙ্গিমহলকে তাই কেবল একটি সাধারণ স্থাপনা ভাবলে ভুল হবে; এটি ছিল এক ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। এখানকার পরিমণ্ডলে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা যেমন বিকশিত হয়েছে, তেমনি সমাজ-সংস্কৃতির রূপান্তর, এমনকি রাজনৈতিক চিন্তার বীজও রোপিত হয়েছে। কখনো নীরব চিন্তায়, কখনো উচ্চকণ্ঠ আলোচনায় এই মহল এক যুগের মানসগঠন ও দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ফিরিঙ্গি মহলের অবস্থান লক্ষ্ণৌ নগরের চওক এলাকায় যা ঐতিহ্য, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির এক প্রাচীন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ‘ফিরিঙ্গি মহল’ নামটির উৎস নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকেই ধারণা করেন, এটি বুঝি ব্রিটিশদের নির্মিত কোনো প্রাসাদ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
‘ফিরিঙ্গি’ শব্দটি এখানে ব্রিটিশদের নির্দেশ করে না; বরং ফরাসি বণিকদের উপস্থিতি ও প্রভাবের স্মারক হিসেবে এই নামের উদ্ভব। একসময় এই এলাকায় ইউরোপীয় বিশেষত ফরাসি বণিকদের বসতি ও কার্যক্রম ছিল, সেখান থেকেই ‘ফিরিঙ্গি মহল’ নামটির প্রচলন ঘটে।
ফলত, নামের বাহ্যিক ইঙ্গিত সত্ত্বেও ইতিহাস স্পষ্টভাবে জানায় এই মহলের সঙ্গে ব্রিটিশ শাসকদের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। বরং এটি এক ভিন্ন ধারার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, যা পরবর্তীকালে জ্ঞানচর্চার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে।
মুঘল সম্রাট আকবর-এর শাসনামলে এই ভবনটি এক ফরাসি বণিকের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সময়ের প্রবাহে এর মালিকানা ও ব্যবহার বদলাতে থাকে। পরবর্তী সময়ে সম্রাট আওরঙ্গজেব প্রায় ১৬৯০ সালের দিকে এই ভবনটি প্রখ্যাত আলেম মাওলানা কুতুবউদ্দিন-এর পরিবারকে উপহার দেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, কোনো এক বিরোধের প্রেক্ষিতে নিজ জন্মভূমিতেই মাওলানা কুতুবউদ্দিনের ইন্তিকাল ঘটে। এরপর তাঁর সন্তানদের এই বিশাল প্রাসাদটি দান করা হয়। সমকালীন একটি সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায় মূল মালিকানা-সংক্রান্ত বিবাদে নাম জড়িয়ে পড়ায় সম্রাট এই পুরোনো ভবনটি তাদের অনুদান হিসেবে প্রদান করেন।
মাওলানা কুতুবউদ্দিনের উত্তরসূরিদের হাত ধরেই ফিরিঙ্গি মহলের ইতিহাসে সূচিত হয় এক নতুন অধ্যায় যেখানে একটি সাধারণ স্থাপনা ধীরে ধীরে রূপ নিতে শুরু করে জ্ঞানচর্চার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে।
১৭০১ সালে মাওলানা নিজামউদ্দিন ফিরিঙ্গি মহলে ‘দারুল উলুম নিজামিয়া’ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানেই তিনি টানা প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের দরস প্রদান করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এই শিক্ষাকেন্দ্রটি একটি শক্তিশালী বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠার পরবর্তী দুই শতকে ফিরিঙ্গি মহল ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি বিদ্যাপীঠ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
এই শিক্ষাকেন্দ্র থেকে যুগে যুগে অসংখ্য প্রাজ্ঞ আলেম ও পণ্ডিতের উত্থান ঘটে। মাওলানা নিজামউদ্দিন নিজেও ছিলেন একজন দূরদর্শী শিক্ষাচিন্তক, যিনি ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক রূপান্তরের সূচনা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘দারুল উলুম নিজামিয়া’ থেকেই প্রণীত হয় ‘দরসে নিজামী’ এক সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক পাঠ্যক্রম, যা জ্ঞানচর্চাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে।
এই পাঠ্যক্রমে হাদিস ও ফিকহের পাশাপাশি গণিত, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন ও ব্যাকরণসহ বিভিন্ন জ্ঞানশাখাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যা তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থায় এক নবতর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। পরবর্তীকালে ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি এবং অন্যান্য আলেম এই পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন সাধন করেন। এর ফলে, প্রবর্তনের প্রায় তিন শতক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ‘দরসে নিজামী’ দক্ষিণ এশিয়ার অসংখ্য মাদ্রাসায় প্রধান পাঠ্যক্রম হিসেবে বহাল রয়েছে; এবং এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, এটি কেবল একটি পাঠ্যক্রম নয় বরং একটি জীবন্ত জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, যা সময়ের প্রবাহে নিজেকে নবায়ন করে আজও জ্ঞানচর্চার অগ্রভাগে অবস্থান করছে।
ফিরিঙ্গি মহলের আলেমগণ কেবল পাঠদানে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তাঁরা জ্ঞানসাধনাকে রূপ দিয়েছেন সৃজনশীল রচনায়, প্রসারিত করেছেন চিন্তার দিগন্ত। আরবি ও ফারসি ভাষায় তাঁদের রচিত অসংখ্য গ্রন্থ একসময় সমগ্র মুসলিম বিশ্বে পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং আজও তা সমান গুরুত্বে অধ্যয়ন করা হয়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মাওলানা আবদুল হাই লাখনৌবি যিনি এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই প্রায় একশত গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক রচনা ফিকহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের ওপর নিবেদিত, যা তাঁর গবেষণার গভীরতা ও পরিসরের পরিচায়ক।
‘ফিরিঙ্গি মহলি’ উপাধিধারী এই আলেমগণের রচনাবলি আজও মুসলিম জগতে সমাদৃত; তাঁদের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞানচর্চার এক উজ্জ্বল ধারাবাহিকতা হিসেবে বহমান রয়েছে।
শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার পাশাপাশি ফিরিঙ্গি মহল ছিল উপমহাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রও। এর প্রভাব কেবল ধর্মীয় পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ভারতের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসেও এর সরাসরি ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়।
১৯১৯ সালে ফিরিঙ্গি মহলের মাওলানা আবদুল বারী ‘অল ইন্ডিয়া সম্মেলন’ আয়োজন করেন। এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় সমগ্র ভারতজুড়ে কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটি গঠিত হয়। আবদুল বারী হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ধারণাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও খিলাফত-সংগ্রামকে একসঙ্গে অগ্রসর করার চেষ্টা করেন।
মাওলানা আবদুল বারীর উদ্যোগ ও পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় একই বছরের মার্চ মাসে মহাত্মা গান্ধী প্রথমবারের মতো ফিরিঙ্গি মহলে আগমন করেন। তখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে ভারতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছিলেন এবং ইতিমধ্যেই একটি উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন অর্জন করেছিলেন।
ঐ সময় তাঁর লক্ষ্ণৌ সফরের সংবাদ পূর্বেই জানানো হয়। মাওলানা মোহাম্মদ আলী টেলিগ্রামের মাধ্যমে এই তথ্য মাওলানা আবদুল বারীর কাছে পৌঁছে দেন। এরপর আবদুল বারী নিজ উদ্যোগে গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তাঁকে ফিরিঙ্গি মহলে নিয়ে আসেন। পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে আবদুল বারীর উদ্যোগে তিনি খিলাফত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন, যা ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করে।
পরবর্তী সময়ে গান্ধী ফিরিঙ্গি মহলে একাধিকবার আগমন করেন এবং সেখানে অবস্থানও করেন। সেই সময় উপমহাদেশে অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলন একই সঙ্গে চলমান ছিল। ফিরিঙ্গি মহলের মুসলিম নেতৃত্বের সঙ্গে গান্ধীর এই ঘনিষ্ঠতা রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ তৈরি করে, যা ব্রিটিশ প্রশাসনের দৃষ্টিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করেছিল কারণ এতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোটের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
ফিরিঙ্গি মহলের আলেম ও চিন্তাবিদরা কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির সংবিধান প্রণয়নে অংশ নেন এবং ১৯২০ সালের এলাহাবাদ সম্মেলনে অহিংস প্রতিবাদের নীতিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে কলকাতা কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ এবং সর্বভারতীয় শান্তি ও সমন্বয়ের রাজনৈতিক ভাবধারা গঠনে তাদের সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায়।
এসব অবদানের ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে ফিরিঙ্গি মহলের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয় এবং মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন আন্দোলনেও এর প্রভাব ও গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
ঐতিহাসিক পরম্পরায় ফিরিঙ্গি মহল ধর্মীয় সহনশীলতারও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়ে এসেছে। লক্ষ্ণৌ তথা তৎকালীন আওধ (অযোধ্যা) অঞ্চলের শিয়া নবাবরা এই প্রতিষ্ঠানের আলেমদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং প্রশাসনিক কাঠামোতেও তাঁদের ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতেন বিশেষ করে কাজি ও বিভিন্ন বিচারিক দায়িত্বে তাঁদের নিয়োগের নজির পাওয়া যায়।
এছাড়া অনেক শিয়া তরুণও ফিরিঙ্গি মহলে এসে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। এখানে মতভেদকে সংঘাতের উৎস হিসেবে না দেখে বরং জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক পরিসর হিসেবে গ্রহণ করার একটি উদার জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। ফলে বিভিন্ন চিন্তাধারার মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার একটি সহনশীল সংস্কৃতি বিকশিত হয়।
ফিরিঙ্গি মহলের পণ্ডিতগণ তাঁদের সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ধারণাকে তাত্ত্বিকভাবে সমর্থন ও প্রচার করতেন। পাশাপাশি অহিংস সামাজিক আচরণ ও সহাবস্থানের মূল্যবোধকেও গুরুত্ব দিতেন। এই ধারাবাহিকতাতেই ফিরিঙ্গি মহল ধীরে ধীরে লক্ষ্ণৌর বিখ্যাত ‘গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতি’র এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক সংহতির একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য গড়ে তোলে।
ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে এসে ভাষা-শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন ফিরিঙ্গি মহলের ঐতিহ্যগত অবস্থানকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তোলে। ভাষা-রাজনীতির রূপান্তর, নতুন শিক্ষানীতির প্রভাব এবং ধর্মীয় বিভাজনের উত্তাপ—সব মিলিয়ে এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠ তার পূর্বের বৌদ্ধিক জৌলুস ক্রমশ হারাতে থাকে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মুসলিম সমাজে আরবি ও ফারসি শিক্ষার চর্চা তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ায় ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নানা কাঠামোগত চাপে পড়ে যায়। একই সঙ্গে যে ফিরিঙ্গি মহল একসময় ধর্মীয় সহনশীলতা ও বৌদ্ধিক সংলাপের প্রতীক ছিল, সেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিয়া–সুন্নি সামাজিক টানাপোড়েনও কিছুটা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ফলে তার ঐতিহ্যগত সমন্বয়মূলক পরিবেশ আগের মতো অটুট থাকেনি।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ফিরিঙ্গি মহলের আভিজাত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ে। ইতিহাসের একসময়কার গৌরবময় এই কেন্দ্রের অনেক স্থাপত্য ও অংশও সময়ের প্রবাহে হারিয়ে যায় বা ভিন্ন ব্যবহারে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে মূল স্থাপনার কেবল সীমিত অংশই টিকে আছে।
ফলস্বরূপ পাঠদান ব্যবস্থাও আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারেনি; আধুনিক ও নতুন কাঠামোর অনেক প্রতিষ্ঠানের দিকে শিক্ষার্থীদের ঝোঁক বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি স্বাধীনতা-পরবর্তী শিক্ষানীতির পরিবর্তন, প্রশাসনিক রূপান্তর এবং আর্থিক সংকট সব মিলিয়ে ফিরিঙ্গি মহল তার ঐতিহাসিক শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।
বর্তমানে ফিরিঙ্গি মহলের নেতৃত্বে আছেন ইমাম খালিদ রশীদ। ২০০১ সালে তাঁর পিতার নির্মিত ঈদগাহে ফিরিঙ্গি মহলের বর্তমান কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয়। সেই নতুন পরিসরে গড়ে ওঠে ‘ইসলামিক সেন্টার অব ইন্ডিয়া’ যা একটি বেসরকারি ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে কাজ করছে। এর অধীনে রয়েছে ‘দারুল উলুম ফিরিঙ্গি মহল’ নামের একটি মাদ্রাসা, একটি দারুল ইফতা (ফতোয়া প্রদান কেন্দ্র) এবং একটি দারুল কজা (ইসলামি বিচার ও বিরোধ নিষ্পত্তির কেন্দ্র)।
এই কাঠামোর মাধ্যমে ফিরিঙ্গি মহলের ঐতিহ্য ও শিক্ষা-পরম্পরাকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মাওলানা খালিদ রশীদ এই ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তাঁর উদ্যোগে ‘ইসলামিক সেন্টার অব ইন্ডিয়া’-র মাধ্যমে আধুনিক ও যুগোপযোগী পাঠদান পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। পুরনো ‘দারুল উলুম নিজামিয়া’ পাঠ্যধারাকে পুনর্গঠিত করে সেখানে সমকালীন প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইংরেজি ও কম্পিউটার শিক্ষাসহ আধুনিক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র থেকে সময়ের ব্যবধানে ফিরিঙ্গি মহল তার আগের ব্যাপক প্রভাব ও মর্যাদা হারালেও এটি এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে আছে। যদিও তার পুরনো আভিজাত্য ও বিস্তৃতি অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে, তবুও এটি এখনও এক ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত।
বর্তমানে ফিরিঙ্গি মহলের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্ণৌসহ ভারতের মুসলিম সমাজে লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন সমসাময়িক জাতীয় ইস্যুতে, বিশেষ করে ওয়াকফ আইন সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনায় তাদের অবস্থান ও মতামত প্রকাশ পায়। সব মিলিয়ে ফিরিঙ্গি মহল আজও এক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, যা শিক্ষা, সমাজ ও রাজনীতির নানা স্তরে তার প্রভাব ও উপস্থিতি বহন করে চলেছে।
ফিরিঙ্গি মহল নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন মোহাম্মদ এনায়েতুল্লাহ আনসারী রচিত ‘তাজকিরায়ে উলামায়ে ফিরিঙ্গি মহল’ ও ফ্রান্সিস রবিনসনের The Ulama of Farangi Mahall and Islamic Culture in South Asia।


