মূল : ড. মাওলানা আবদুল হালিম নোমানি চিশতি আল আজহারী রহ.
তরজমা : হাসান আবদুল্লাহ

আবদুল আজিজ ছিল তাঁর প্রকৃত নাম। তৎকালীন রীতি অনুযায়ী জন্মসনের সাংকেতিক নির্দেশক হিসেবে তাঁর নাম নির্ধারিত হয়েছিল ‘গোলাম হালিম’। বংশমর্যাদার দিক থেকে তিনি ছিলেন এক সুপ্রতিষ্ঠিত ফারুকী পরিবারের সন্তান; তাঁর বংশধারা হযরত উমর ফারুক রাদিআল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।

তিনি ১১৫৯ হিজরির ২৫ রমজান মোতাবেক ১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে এক জুমার দিনে দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহপ্রদত্ত অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী এই মনীষী শৈশবেই কুরআন মাজিদ ও ফারসি ভাষার শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এগারো বছর বয়সে তাঁর আরবি শিক্ষার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় এবং মাত্র পনেরো বছর বয়সেই তিনি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সকল প্রধান জ্ঞানশাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন।

যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনশাস্ত্রের শিক্ষা তিনি তাঁর পিতা ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ.-এর বিশিষ্ট শিষ্যদের নিকট লাভ করেন; আর হাদিস ও ফিকহ সরাসরি পিতার কাছেই অধ্যয়ন করেন। কিন্তু মাত্র সতেরো বছর বয়সে পিতার ইন্তেকাল হলে তিনি শাহ ওয়ালিউল্লাহর প্রখ্যাত শিষ্য শায়খ মুহাম্মদ আশেক ফুলাতী-এর নিকট অবশিষ্ট শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

জ্যেষ্ঠ পুত্র হওয়ায় এবং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও যোগ্যতায় ভাইদের মধ্যে সর্বাধিক অগ্রগণ্য হওয়ায় পিতার শিক্ষা, ইরশাদ ও খেলাফতের আসন তাঁরই হাতে অর্পিত হয়। এরপর তিনি পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান, দাওয়াত ও ইরশাদ, গ্রন্থরচনা ও গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

শাহ আবদুল আজিজ ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। প্রচলিত সকল ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, বর্ণনামূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্যায় তাঁর ছিল গভীর পাণ্ডিত্য। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল বিস্ময়কর আর বক্তৃতা ছিল অর্থবহ, প্রভাবসঞ্চারী, সুসংবদ্ধ ও হৃদয়গ্রাহী। ফলে তিনি দ্রুতই সাধারণ মানুষ ও বিদ্বজ্জন—উভয় শ্রেণির কাছে আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

তাঁর উচ্চ সনদ ও বিশুদ্ধ জ্ঞান-ঐতিহ্যের কারণে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাঁর দরসে অংশগ্রহণ করত এবং তাঁর নিকট থেকে সনদ লাভ করাকে গৌরবের বিষয় মনে করত। তিনি একযোগে পাঠদান, ফতোয়া প্রদান, গ্রন্থরচনা, সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি, নসিহত ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা এবং ছাত্রদের জ্ঞান ও চরিত্রগঠনের কাজে নিরলসভাবে নিয়োজিত ছিলেন।

তাঁর ব্যক্তিত্ব ও কর্মধারার প্রভাবে সমগ্র ভারতবর্ষে ইসলামি জ্ঞানচর্চা, বিশেষত হাদিস ও তাফসির অধ্যয়নের এক ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর ইলমি নেতৃত্ব, সংস্কারধর্মী প্রচেষ্টা এবং আধ্যাত্মিক প্রভাব মুসলিম সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করে। সমকালীন নানা বিভ্রান্তি ও ফিতনার মোকাবিলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টা, হৃদয়নিঃসৃত দাওয়াত ও নিবিড় তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা শিষ্য ও মুরিদগণ মুসলিম সমাজে এক নবজাগরণধর্মী চেতনার জন্ম দেন।

এর ফলস্বরূপ মুসলমানদের ধর্মীয়, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক জীবনে এমন এক ইতিবাচক রূপান্তর সাধিত হয় যে, অনেকের কাছে তা ইসলামের স্বর্ণযুগ তথা খাইরুল কুরূনের স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল বলে প্রতীয়মান হয়।

শাহ আবদুল আজিজের পাণ্ডিত্য কেবল হাদিস, ফিকহ, তাফসির ও কালামশাস্ত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, সাহিত্য ও কাব্যচর্চাতেও তিনি ছিলেন সমানভাবে দক্ষ। তাঁর বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি সমকালীনদের কাছে কিংবদন্তিতুল্য ছিল। হাদিসশাস্ত্রে তাঁর প্রগাঢ় দখলের পরিচয় দিতে গিয়ে হাকিমুল উম্মত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানবি রহ. তাঁর গ্রন্থ ‘আল-ইফাদাতুল ইয়াওমিয়্যাহ’তে ইমাম শাহ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ.-এর শাগরেদ শায়খ মুহাম্মদ থানবি রহ-এর সূত্রে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বলতেন—শাহ আবদুল আজিজের প্রায় ছয় হাজার হাদিসের ‘মতন’ মুখস্থ ছিল। (আল-ইফাদাতুল ইয়াওমিয়্যাহ মিন আল-ইফাদাত আল-কাওমিয়্যাহ, ইদারাতুল আশরাফিয়া, করাচি, পাকিস্তান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৭০)

শাইখ মুহসিন ইবনে ইয়াহইয়া রহ. তাঁর ‘আল-ইয়ানিউল জানি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “তিনি এমন পূর্ণতা ও খ্যাতির স্তরে উপনীত হয়েছিলেন যে, ভারতের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলের মানুষ তাঁর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ককে গর্বের বিষয় মনে করত। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হওয়া বা তাঁর ছাত্র-শিষ্যদের ধারায় অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে তারা বিশেষ মর্যাদার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করত।

তাঁর উত্তম চরিত্র, মহৎ গুণাবলি ও নৈতিক উৎকর্ষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সমকালীন অধিকাংশ মানুষ তাঁর সমকক্ষতা অর্জনে সক্ষম হয়নি। যারা তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিল, তারা শেষ পর্যন্ত তাঁরই প্রভাববলয়ে এসে তাঁর পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে বাধ্য হয়েছে।

তাঁর একটি বিশেষ গুণ ছিল ভাষা-শৈলী ও সাহিত্যিক প্রকাশভঙ্গির অসাধারণ দক্ষতা। তিনি বাক্যগঠন, অলংকারপ্রয়োগ ও রচনাশৈলীতে এমন পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন যে, সমকালীন সাহিত্যিকরাও তাঁকে নিজেদের মধ্যে অগ্রগণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সাহিত্য প্রতিযোগিতায় তিনি অগ্রবর্তী অবস্থান লাভ করেন এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব সর্বজনস্বীকৃত হয়ে ওঠে।

এছাড়া তাঁর অন্তর্দৃষ্টি বা ফিরাসাত ছিল অত্যন্ত প্রখর, যার মাধ্যমে তিনি স্বপ্ন ব্যাখ্যায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তাঁর দেওয়া ব্যাখ্যা বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো এবং অনেক সময় এমনভাবে সঠিক প্রতীয়মান হতো যেন তিনি বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন।

এ ধরনের গুণাবলি সাধারণত সেইসব পবিত্র ও পরিশুদ্ধ অন্তরের মানুষের মধ্যেই প্রকাশ পায়, যারা আত্মিক কলুষতা ও প্রবৃত্তির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকেন। তাঁর অসংখ্য উত্তম গুণাবলি বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”

নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান কনৌজি রহ. লিখেছেন, “শাহ আবদুল আজিজ ইবনে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি (রহ.) যিনি আবার শাইখ আবদুর রহীম উমরী (রহ.)-এর বংশধর, তিনি ছিলেন “উস্তাযুল আসাতিযা”, “ইমামুন নুক্কাদ”, “বাকিয়্যাতুস সালাফ” এবং উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষ মর্যাদাসম্পন্ন হাদিস ও তাফসির বিশেষজ্ঞ।

তিনি তাফসির, হাদিস ও বিভিন্ন ইসলামি শাস্ত্রে তাঁর যুগের আলিম ও মাশায়েখদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স ও আশ্রয়স্থল ছিলেন। প্রচলিত ও অপ্রচলিত উভয় প্রকার জ্ঞানশাখায়, তা যুক্তিবিদ্যা (উলূমে আকলিয়্যাহ) হোক বা বর্ণনাভিত্তিক শাস্ত্র (উলূমে নকলিয়্যাহ), তাঁর দখল ও প্রজ্ঞা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

তিনি হিফজ ও ইলমে ব্যাপকতা, স্বপ্ন ব্যাখ্যার দক্ষতা, ওয়াজ-নসিহতের প্রভাবশালী ভাষা, সাহিত্যিক রচনাশৈলী, গভীর গবেষণা এবং বিতর্ক ও মুনাজারা সব ক্ষেত্রেই সমকালীনদের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করেছিলেন। অনুরাগী ও বিরোধী উভয় পক্ষই তাঁর জ্ঞান ও ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল।

তিনি সারাজীবন শিক্ষা-দীক্ষা, ফতোয়া প্রদান, বিচার-ফয়সালা, ওয়াজ-নসিহত, মুরিদদের আত্মশুদ্ধি এবং ছাত্রদের প্রশিক্ষণেই নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক পূর্ণতার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা ও বাহ্যিক সম্মানও সর্বত্র স্বীকৃত ছিল।

মুজাহিদ নেতা সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (রহ.) তাঁর নিকট থেকেই তরিকতের বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। উপমহাদেশে তাঁর ও তাঁর পরিবারের মাধ্যমে ইলম ও আমলের নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এমনকি দেশের বাইরেও এই পরিবারের তাদরিস ও তাজকিয়ার প্রভাব বিস্তৃত ছিল।

তাঁর ছাত্র ও অনুমোদিত হাদিস বর্ণনাকারীদের সংখ্যা ছিল বিপুল এবং তাঁর রচনাবলি উলামায়ে কেরামের নিকট অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত। তাঁর পরিবার বিশেষভাবে “হাদিস ও ফিকহে হানাফি” চর্চার ধারক-বাহক হিসেবে পরিচিত। তাঁর পিতার মাধ্যমে উপমহাদেশে হাদিসভিত্তিক আমলের যে বীজ রোপিত হয়েছিল, শাহ আবদুল আজিজ (রহ.) তা বিকশিত ও সমৃদ্ধ করেন।” (ইতহাফুল নুবালা আল-মুত্তাকীন বি-ইহইয়া মা’আসির আল-ফুকাহা আল-মুহাদ্দিসীন, মুদ্রণ: মাতবাআ নিজামিয়া, কানপুর, ১২৮৮ হিজরি, পৃষ্ঠা ২৯৬)

মাওলানা সাইয়িদ আবদুল হাই হাসানি লখনভী (রহ.) তাঁর নুযহাতুল খাওয়াতির (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৬৮)-এ তাঁর আলোচনা এভাবে শুরু করেছেন

“الشيخ الإمام العالم الكبير العلامة المحدث عبد العزيز بن ولي الله بن عبد الرحيم العمري الدهلوي سيد علماء نا في زمانه وابن سيدهم، لقبه بعضهم “سراج الهند وبعضهم حجة الله”.

তিনি আরও লিখেছেন,

“আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন তিনি ছিলেন দুনিয়ার মধ্যে বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন; আদব-শিষ্টাচার, ইলম, বুদ্ধিমত্তা, গভীর অনুধাবনশক্তি এবং দ্রুত স্মরণশক্তিতে তিনি ছিলেন অনন্য।

তিনি মাত্র পনেরো বছর বয়স থেকেই অধ্যয়ন ও অধ্যাপনায় নিযুক্ত হন, পাঠদান করেন এবং জ্ঞান বিতরণ করতে থাকেন এমনকি অবশেষে তিনি সমগ্র ভারতে একক ও বিশিষ্ট আলিম হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং বহু জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্ররা কেবল তাঁর কাছেই পড়ার উদ্দেশ্যে আসত এবং তারা তাঁর কাছে এমনভাবে ভিড় করত যেমন তৃষ্ণার্ত মানুষ পানির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

আর আশ্চর্যের বিষয় হলো কষ্টদায়ক রোগ ও দুঃখজনক শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল, দ্রুত উত্তরদাতা, মিষ্টভাষী, অত্যন্ত ফসীহ ও প্রাঞ্জল বক্তা, বিনয়ী এবং একই সঙ্গে প্রাণবন্ত ও মর্যাদাবান।

তাঁর এসব গুণের পূর্ণ বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মজলিসসমূহ ছিল বুদ্ধি ও চিন্তার আনন্দভূমি। তাঁর বর্ণিত ঘটনাবলি শ্রোতাদের কানে মধুর লাগত, তাঁর সুশৃঙ্খল কবিতা হৃদয়কে আনন্দ দিত। দূরদেশের কাহিনি ও সেখানকার মানুষের বর্ণনাও তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যেন তিনি নিজ চোখে তা দেখেছেন।

শ্রোতারা ধারণা করত যে তিনি যেন সবকিছু স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করেছেন; অথচ বাস্তবে তিনি কলকাতা ছাড়া তেমন কোথাও ভ্রমণ করেননি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন, শক্তিশালী কল্পনাশক্তির অধিকারী এবং বাস্তব সত্য অনুধাবনে গভীর সক্ষমতা সম্পন্ন।

তিনি এসব তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন এমন লোকদের কাছ থেকে, যারা দূরদূরান্ত থেকে দিল্লিতে আসত।”

মৌলবি আবদুল কাদিরের বক্তব্য অনুযায়ী “মাওলানা শাহ আবদুল আজিজ ছিলেন তাফসির, হাদিস, ফিকহ, সিরাত ও ইতিহাসশাস্ত্রে সর্বজনস্বীকৃত খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী আলিম। একই সঙ্গে তিনি জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি, জ্যোতিষ যন্ত্রবিদ্যা, প্রকৌশলবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, বিতর্কশাস্ত্র, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদের পার্থক্য-সমন্বয় বিশ্লেষণ এবং জটিল ও সংশয়পূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা-সমাধানে অসাধারণ দক্ষতার অধিকারী ছিলেন। এসব ক্ষেত্রে তিনি স্বীয় যুগে অনন্য ও ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থান অর্জন করেছিলেন।

তিনি খুব উঁচু মাপের সাহিত্য ও কাব্যসমঝদার ছিলেন। তিনি শরঈ আলোচনার ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদিসের দলিলের মাধ্যমে প্রমাণ উপস্থাপন করতেন আর যুক্তিভিত্তিক আলোচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ ব্যবহার করতেন। তবে তিনি অন্ধভাবে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো, অ্যারিস্টটল কিংবা মুসলিম কালামবিদ ফখরুদ্দীন রাযীর মতো মনীষীদের মতামতের অনুসরণ করতেন না; বরং নিজস্ব গবেষণা ও যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে স্পষ্ট ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করতেন।” (ইলম ও আমল, ওয়াকাঈ‘ আবদুল কাদির খানি’, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৬, একাডেমি অব এডুকেশনাল রিসার্চ, করাচি, ১৯৬০ খ্রি.)

স্যার সৈয়দ আহমদ খান তাঁর ‘আসারুস সানাদীদ’-এ শাহ আবদুল আজিজ দেহলবি (রহ.) সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চমর্যাদাপূর্ণ ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন যে, শাহ আবদুল আজিজ ছিলেন জ্ঞানীদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী, গুণীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গুণী, পূর্ণতার অধিকারীদের মধ্যে সর্বাধিক পূর্ণতাসম্পন্ন এবং আরেফদের মধ্যে সর্বাধিক অভিজ্ঞ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। তিনি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের শোভা, সম্মানিতদের গৌরব, পূর্বসূরিদের জন্য ঈর্ষার বিষয় এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক অনন্য আদর্শ ছিলেন। মুহাদ্দিসদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বোত্তম এবং আল্লাহভীরু আলিমদের মধ্যে ছিলেন এক বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব।

শাহ আবদুল আজিজ দেহলবি (রহ.)-এর সমগ্র সত্তা ছিল ফয়েজ ও বরকতের প্রতিমূর্তি। যদিও তিনি যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যার মতো বিভিন্ন জ্ঞানশাখায় দক্ষ ছিলেন, তবুও তিনি এসব শাস্ত্রকে ধর্মীয় জ্ঞানের সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর মূল মনোযোগ ও পরিশ্রম নিবদ্ধ ছিল হাদিসে নববী ও কুরআনুল কারিমের গভীর অনুধাবন, ব্যাখ্যা ও শরিয়তের বিধানসমূহকে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপনের দিকে।

তিনি অল্প বয়সেই, চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সে নিজ পিতা শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি (রহ.)-এর সান্নিধ্যে যুক্তিবিদ্যা ও শরঈ জ্ঞানসহ আধ্যাত্মিক পূর্ণতা অর্জন করেন। আশির কাছাকাছি বয়সে উপনীত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল বিস্ময়করভাবে তীক্ষ্ণ। শারীরিক দুর্বলতা ও রোগব্যাধি থাকা সত্ত্বেও, যখনই তিনি ধর্মীয় বিষয় বা সূক্ষ্ম জ্ঞানগত আলোচনা শুরু করতেন, তখন তাঁর বর্ণনা হয়ে উঠত এক প্রবহমান জ্ঞানসমুদ্রের মতো। তাঁর বক্তব্য ও ব্যাখ্যায় উপস্থিত শ্রোতারা গভীর আত্মমগ্নতা ও বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তেন।

সপ্তাহে দুই দিন তাঁর ওয়াজ-মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো। সেখানে সত্যনিষ্ঠ আকিদাসম্পন্ন ও পবিত্র মন-মানসিকতার অধিকারী সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ পর্যন্ত বিপুল সংখ্যায় উপস্থিত হতেন—ভিড় দেখে মনে হতো যেন পিপীলিকা ও পঙ্গপালের সমাগম। সকলে তাঁর নসিহত ও হিদায়াতপূর্ণ বক্তব্য থেকে আধ্যাত্মিকভাবে উপকৃত হতো।

অবশেষে তিনি ৯ শাওয়াল, ১২৩৯ হিজরিতে এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করে পরকালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

তাঁর সম্পর্কে একটি কাব্যাংশে বলা হয়েছে

তিনি ছিলেন এক অনুচ্চারিত আলোকরেখা,
শব্দের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা নীরব ঘোষণা
হুজ্জাতুল্লাহ, সময়ের বুকে খোদাই করা এক সাক্ষ্য।

শাহ আবদুল আজিজ
নামটি যেন পুরোনো কোনো প্রার্থনার ভাঁজে জমে থাকা সুগন্ধ,
যুগের গৌরবের ভেতর জ্বলে থাকা ধীর আগুন।

শনিবারের নরম অন্ধকারে,
শাওয়ালের সপ্তম দিন যেন হঠাৎ থমকে গেল
আর তিনি পা রাখলেন অন্য এক ভোরে,
যেখানে মৃত্যু নেই, আছে কেবল উত্তরণের নীল বিস্তার।

জ্ঞানের সব দরজা তাঁর সামনে ছিল নত,
শাস্ত্রগুলো যেন দাঁড়িয়ে থাকত শিশুদের মতো বিস্ময়ে।
আর আত্মার আকাশে তিনি ছিলেন পূর্ণিমার চাঁদ
যার আলোতে রাতও ভুলে যায় নিজের অন্ধকার পরিচয়।

তাঁর জীবন
এক দীর্ঘ আয়াত,
যেখানে ইতিহাস কাঁদে না,
বরং ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে করুণার কবিতা।

তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই
মাটির ভেতর দিয়ে বয়ে যায় এক নরম বাতাস
যেন রহমত নিজেই
মানুষের স্মৃতিতে এসে বসে থাকে কিছুক্ষণ চুপচাপ।

প্রখ্যাত উর্দু কবি হাকিম মোমিন খাঁ মোমিন শাহ আবদুল আজিজ (রহ.)-এর ওফাতের সাল নির্দেশ করে একটি অত্যন্ত চমৎকার তারিখি কবিতাংশ রচনা করেছেন

মৃত্যুর নির্মম ও নিষ্ঠুর হাতের আঘাতে সবকিছুই যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল;
ফক্‌র ও দ্বীন, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, সৌন্দর্য ও গুণ, দয়া ও অনুগ্রহ, ইলম ও আমল সবই যেন একসঙ্গে অনাথ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল।

ইলমে হাদিসের ক্ষেত্রে শাহ আবদুল আজিজ (রহ.)-এর রচিত দুটি গ্রন্থ “বুস্তানুল মুহাদ্দিসীন” এবং “আল-উজালা আন-নাফেআ” অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য রচনা হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে প্রথম গ্রন্থটি হাদিসশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহ এবং সেগুলোর রচয়িতাদের জীবন ও পরিচিতি নিয়ে সংকলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। পরবর্তীতে এর একটি সুললিত ও সহজবোধ্য উর্দু অনুবাদ দারুল উলূম দেওবন্দের প্রখ্যাত শিক্ষক মরহুম মাওলানা আবদুস সামী ‘শায়ফতা’ কর্তৃক সম্পাদিত ও অনূদিত হয়, যা প্রথমে কানপুরের মুদ্রণালয় “মাতবাআ কাসিমী” থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এ অনুবাদটি করাচির নূর মুহাম্মদ আহসানুল মাতবাআ’ ও কারখানায়ে তিজারত-ই-কুতুব কর্তৃক পুনর্মুদ্রিত হয়।

দ্বিতীয় গ্রন্থ “আল-উজালা আন-নাফেআ” তাঁর একটি সংক্ষিপ্ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ রচনা, যা হাদিস-সংক্রান্ত বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ের একটি পরিচায়ক ও সংক্ষিপ্ত আলোচনামূলক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

শাহ আবদুল আজিজ (রহ.)-এর কয়েকটি প্রসিদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ রচনা নিম্নরূপ

১. তাফসিরুল কুরআনুল কারিম (ফতহুল আজিজ): এটি তাঁর একটি বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ। তিনি অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেও এটি ইমলা করিয়ে রচনা করেন। গ্রন্থটি একাধিক খণ্ডে বিভক্ত ছিল; তবে ১৯৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে এর অধিকাংশ নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে এর প্রথম ও শেষ অংশ মিলিয়ে মাত্র দুই খণ্ড অবশিষ্ট রয়েছে।

২. আল-ফাতাওয়া ফি মাসায়িলিল মুশকিলা: এটি একটি বৃহৎ ফতোয়া-সংকলন। যদিও মূল গ্রন্থটি বেশ বিস্তৃত ছিল, বর্তমানে এর সংক্ষিপ্ত রূপ দুই খণ্ডে পাওয়া যায়।

৩. তুহফাতুল ইসনা আশারিয়া: শিয়া মতবাদের খণ্ডনে রচিত একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও প্রভাবশালী গ্রন্থ।

৪. বুস্তানুল মুহাদ্দিসীন: হাদিসের কিতাবসমূহ ও মুহাদ্দিসদের পরিচিতি ও বিবরণসংবলিত একটি গ্রন্থ; তবে এটি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

৫. আল-উজালা আন-নাফেআ: এটি মূলত উসূলুল হাদিস বিষয়ে রচিত একটি ফারসি পুস্তিকা; একই সঙ্গে হাদিস শিক্ষার্থীদের মুখস্থ ও সহায়ক পাঠ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

৬. মিজানুল বালাগাত: বালাগাত বা অলংকারশাস্ত্র বিষয়ে রচিত একটি উৎকৃষ্ট পাঠ্যগ্রন্থ।

৭. মিজানুল কালাম: ইলমে কালাম বা ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

৮. আস-সতরুল জালিল ফি মাসআলাতিত তাফদিল: এতে খোলাফায়ে রাশেদীনের মর্যাদার পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

৯. সিররুশ শাহাদাতাইন: হযরত হাসান ও হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহুমক-এর শাহাদাত বিষয়ে রচিত একটি পুস্তিকা।

এছাড়া তাঁর রচিত আরও কয়েকটি পুস্তিকা রয়েছে, যেমন একটি নসব বা বংশপরিচয় বিষয়ে, আরেকটি স্বপ্ন ব্যাখ্যা (তাবির) সংক্রান্ত ইত্যাদি।

ইলমে মানতিক ও হিকমত বিষয়ে তাঁর অবদান:

১০. “মিরজাহিদ”, “মুল্লা জালাল”, “শরহে মাওয়াকিফ” এবং “হাশিয়াতু মুল্লা কাতি” প্রভৃতি গ্রন্থে তাঁর টীকা ও ব্যাখ্যা বিদ্যমান, যা “আজিজিয়া” নামে পরিচিত।

১১. তিনি সদরুশ শারিয়া শিরাজী রচিত “হিদায়াতুল হিকমা” গ্রন্থের উপরও টীকা রচনা করেছেন।

১২. এছাড়া “আরজুযা ইসমাঈল” শীর্ষক একটি গ্রন্থের ব্যাখ্যাও তাঁর রচনার অন্তর্ভুক্ত।

লেখক পরিচিতি : ড. মাওলানা আবদুল হালিম চিশতী আল আজহারী রহ.। প্রখ্যাত হাদিসবেত্তা মাওলানা আবদুর রশিদ নোমানী রহ.-এর সহোদর অনুজ। জন্ম ১৯২৯ সালের ১৬ এপ্রিল ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে, মৃত্যু ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর পাকিস্তানের করাচিতে; করাচি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাঁর কবর। শাইখুল ইসলাম মাওলানা সাইয়িদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর শাগরেদ। সাবেক বিভাগীয় প্রধান, উলুমুল হাদিস, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউন পাকিস্তান। ‘লাইব্রেরি সাইন্সে’ পাকিস্তানের সর্বপ্রথম পিএইচডি ডিগ্রি লাভকারী। পড়াশোনা : মাদ্রাসা তালিমুল ইসলাম জয়পুর (১৯৪০), জামিয়া নিজামিয়া হায়দরাবাদ, দারুল উলুম দেওবন্দ (১৩৬৩-৬৯ হিজরি)। এমএ, ইসলামিক স্টাডিজ, করাচি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৭) ; এমএ, লাইব্রেরি সাইন্স, করাচি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭০); পিএইচডি, লাইব্রেরি সাইন্স, করাচি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮১)। কর্মজীবন : রেডিও পাকিস্তান (১৯৪৯-৫১)। লিয়াকত ন্যাশনাল লাইব্রেরি (১৪ বছর)। খতিব, করাচি বিশ্ববিদ্যালয় জামে মসজিদ। সিনিয়র ক্যাটালগার, বায়েরো ইউনিভার্সিটি ক্যানো লাইব্রেরি, নাইজেরিয়া (১৯৭৭-৮৭)। ১৯৯১-২০২০ : মুহাদ্দিস ও মুশরিফ, উলুমুল হাদিস, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউন পাকিস্তান। রচনাবলি : البضاعة المزجاة لمن يطالع المرقاة في شرح المشکاة (আরবি ও উর্দু), عہدِ نبوی ﷺ میں صحابہ کرام ؓ کی فقہی تربیت,, فوائدِ جامعہ شرح عجالۂ نافعہ , حیات وحید الزمان, اسلامی کتب خانے, لمحات من التربیة الفقھیة في خیر القرون زمن الرسالة وعصرالصحابة والتابعین, ما لا یستغني عنه المحدث والفقیه, مکی دور میں رسول اللہ ﷺ کے تعلیمی کارنامے, سید احمد شہیدؒ کی اردو تصانیف و اردو ادب پر ان کی تحریک کا اثر اور سید شہیدؒ کا فقہی مسلک, تذکرۂ علامہ جلال الدین سیوطیؒ ইত্যাদি।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.