মুফতি মুহাম্মদ আশরাফুর রহমান
দাওরায়ে হাদিস পড়ার পর সাধারণত আমাদের দেশের তালিবুল ইলমরা ইফতা, উলূমুল হাদীস পড়তে আসে। দাখেলা পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের নির্বাচন করা হয়। অধম প্রায় দশ বছরের বেশি সময় ইফতা বিভাগের সাথে সম্পর্ক থাকার সুবাদে দাখেলা পরীক্ষা নেওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করি। তার আলোকে কয়েকটি কথা আহলে ইলম উলামায়ে কেরামের সমীপে আরজ করছি—
১. ইমলার ভুল প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। একজন তালিবুল ইলম ممتاز এর বানান লিখেছে ممتاج। এখানে আমি আরবী قواعد الإملاء এর কথা বলছি না, বরং সাধারণ বানান ভুলের কথা বলছি। এবং এটা শুধু আরবি বানানই নয়, বাংলা বানানও একই অবস্থা। সুতরাং একজন উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহীর জন্য এই দুর্বলতা দূর করা আবশ্যক।
২. হাতের লেখা সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন আছে কি না, তা দেখা। এই দুর্বলতা থাকলে তা দূর করার চেষ্টা করা।
৩. বিশুদ্ধভাবে আরবি ইবারত [টেক্সট] পড়তে পারে কি না, সেটা যাচাই করা। (যে কোনো সহজ আরবী কিতাব থেকে তা দেখা যেতে পারে।) এরপর যে শাস্ত্রে দাখেলা নিতে এসেছে, সে বিষয়ের কিতাব থেকে পরীক্ষা নেওয়া। এখানে উচ্চ যোগ্যতা عالي استعداد কে প্রাধান্য দিয়ে ভর্তির সুযোগ দেওয়া। আর نازل استعداد কে ভর্তি করানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষ্য রাখা—অন্তত যেন خلاصة الفتاوى ও الفتاوى الهندية এর মতো কিতাবাদি বিশুদ্ধভাবে পড়ে তরজমা ও মর্ম উদ্ধারে সক্ষমতা যাচাই করা। এর নিচের ইস্তিদাদসম্পন্নকে কোনোভাবেই ভর্তির সুযোগ না দেওয়া। তাকে আদব আরবি পড়ার পরামর্শ দেওয়া।
৪. আরবি দক্ষতা যাচাই করা। একজন উচ্চশিক্ষার্থীর জন্য আদবে আরবিতে দক্ষতা অপরিহার্য। কারণ এখানে দুটি বিষয় অপরিহার্য—
(ক) প্রচুর পরিমাণে উলুমে আলিয়া—উচ্চশিক্ষা বিষয়ক—কিতাব মুতালাআর প্রয়োজন পড়ে।
(খ) السرعة في المطالعة তথা দ্রুত মুতালাআ।
আর উক্ত দুটি বিষয়ের জন্য আরবি ভাষায় দক্ষতা অপরিহার্য। এজন্য একজন উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহীর জন্য অন্ততপক্ষে ১ বছর আরবি ভাষা নিয়ে পড়াশোনা জরুরি।
স্মর্তব্য—মুমতায ছাত্র হওয়া এবং নাহু-ছরফে যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়া এক বিষয়, আর আরবি ভাষায় দক্ষতা থাকা আরেকটি বিষয়। উপরোক্ত দুটি বিষয়ের পাশাপাশি আরবি ভাষায় দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি।
৫. বাংলা দক্ষতা থাকা একজন গবেষক আলেমের জন্য খুবই জরুরি। অতএব একজন উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারীর জন্য অন্ততপক্ষে বিশুদ্ধ বানান ও মোটামুটি ব্যাকরণ জ্ঞান থাকা উচিত।
৬. উর্দু ভাষায় দক্ষতা অন্তত একজন ফিকহের তালিবুল ইলমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ এখানে উর্দু ফাতাওয়ার কিতাবাদি প্রচুর পরিমাণে মুতালাআ করতে হয়। দুটি কারণে—
(ক) উর্দু ভাষায় ফিকহ-ফাতাওয়ার চর্চা বেশি হওয়ার কারণে।
(খ) এখনো পর্যন্ত পাক-ভারতের উলামায়ে কেরামের গবেষণার ঊর্ধ্বে বাংলাদেশের উলামায়ে কেরাম উঠতে না পারার কারণে।
দুঃখজনক সত্য হলো, আমরা উর্দু চর্চা কমিয়েছি আরবি ও বাংলা ভাষার দক্ষতার দাবি নিয়ে; কিন্তু না আরবি ভাষায় দক্ষতায় সক্ষম, না বাংলায় পারদর্শী। সব মিলিয়ে এখন সবকটিতেই দুর্বল।
৭. উর্দু পড়তে পারার সাথে সাথে লেখার যোগ্যতাও জরুরি। কারণ ফাতাওয়া প্রদানকালে প্রয়োজনীয় উর্দু হাওলাও লিখতে হয়। এজন্য লেখায় দক্ষতাও অপরিহার্য।
৮. তিলাওয়াতের বিশুদ্ধতা। অন্তত ما يجوز به الصلاة তথা নামায বৈধ হওয়ার পরিমাণ বিশুদ্ধ তিলাওয়াতের অধিকারী হওয়া।
৯. উচ্চশিক্ষা গ্রহণে মাতা-পিতার অনুমতি আছে কি না—থাকলে ভর্তি করা, অন্যথা ভর্তি সুযোগ না দেওয়া। কারণ দাওরা পর্যন্ত পড়াশোনা ছিল জরুরি ইলম। এরপর ইলম অর্জন ইস্তেহবাবী পর্যায়ের। অপরদিকে মাতা-পিতার খেদমত করাটা ফরজ। অতএব তাদের অনুমতি জরুরি।
১০. ব্যক্তিগত অসুস্থতা বা পারিবারিক এমন সমস্যা, যার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন মেহনতে অসুবিধা হয়—তাকে সুযোগ না দিয়ে তালিমি মুরুব্বির তত্ত্বাবধানে মুতালাআর পরামর্শ দেওয়া।
১১. সুপারিশের ভিত্তিতে ভর্তি না করা। কারণ অযোগ্যকে এই মহান জায়গায় বসানো—এটা চরম পর্যায়ের ইলমী খেয়ানত। إذا وسد الأمر إلى غير أهله فانتظر الساعة—হাদীসের শিক্ষা হিসেবে।
এ পর্যন্ত আলোচনা ছিল উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রাথমিক যোগ্যতা নিয়ে; অর্থাৎ যাদের নাহু-ছরফের যোগ্যতা রয়েছে, আরবি ভাষায় দক্ষতা আছে, উর্দু পড়ে বুঝার যোগ্যতা আছে, ইমলা ও বানান সম্পর্কে স্বচ্ছতা আছে, আরবি, বাংলা ও উর্দু হাতের লেখা সুন্দর, বিশুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে পারে, নিরবিচ্ছিন্ন মেহনত করতে পারেতারাই উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেতে পারেন।
এবার আসুন, মৌলিক যোগ্যতা নিয়ে যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেতে পারেন
১. যারা মাধ্যমিক স্তর থেকেই তালীমী মুরুব্বির তত্ত্বাবধানে যে ফন্ন তথা শাস্ত্র নিয়ে গবেষণাধর্মী পড়াশোনা করতে ইচ্ছা রাখেন সে বিষয়ে কিছু কিছু প্রাথমিক পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন। যাতে তাদের উক্ত কাঙ্ক্ষিত ফন্নে একটি মৌলিক ধারণা তৈরি হয়, বিষয়বস্তু স্পষ্ট হয়, সে ফন্নের রিজাল সম্পর্কে জানাশোনা তৈরি হয়।
২. নির্ধারিত কোর্স সমাপ্ত করার পরও সে বিষয়ে পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা রাখেন—এবং চালিয়ে নেন। অনেক বছর পর্যন্ত মেহনত করে পাণ্ডিত্য অর্জন করার দৃঢ় প্রত্যয় রাখেন।
৩. নিজেকে তৈরি করার পাশাপাশি জাতিকে সে ফন্ন থেকে তাজদিদী কাজ করে নতুন কিছু উপহার দিতে আগ্রহী হন তারাই উচ্চশিক্ষা বিভাগে ভর্তি হওয়ার অধিক উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন।
আল্লাহ তাআলা এই উম্মাহকে রিজালুল ইলম এবং রিজালুল আমল দ্বারা উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন!
লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস ও প্রধান মুফতি, জামিয়াতুল মানহাল আল কওমিয়া, উত্তরা, ঢাকা

