আতাউল্লাহ মাহমুদ
স্কুলে ওঠার পর থেকেই বিকেলগুলো আসেমের কাছে এক অদ্ভুত, প্রায় অবাস্তব অনুভূতির মতো মনে হতো।
ছোটবেলা থেকেই সে দেখে আসছে, বিকেল নামলেই তেহরানের আকাশ ঢেকে যায় নানান রঙের ঘুড়িতে। বড়রা ছাদে ছাদে দাঁড়িয়ে কাটাকাটি খেলেন। আকাশ তখন আর আকাশ থাকে না, যেন একখণ্ড জীবন্ত রঙিন কাগজের ক্যানভাস।
সেই দৃশ্য থেকেই আসেমের মনে ঘুড়ির প্রতি এক গভীর ও নীরব আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়।
স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তার সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়। বাবা মহল্লার দোকান থেকে তার জন্য একটি ঢাউস সাইজের ঘুড়ি কিনে আনেন। লাল রঙের, দৃষ্টিনন্দন সেই ঘুড়িটি যেন তার শিশুমনের প্রথম বড় বিস্ময়।
এরপর থেকে মাঝেমধ্যে সে বন্ধুদের ঘুড়িও কেটে দিতে পারে। তখন তার ভেতর এক ধরনের তীক্ষ্ণ আনন্দ কাজ করে যেন আকাশের সঙ্গে সে এক গোপন খেলায় জিতে যাচ্ছে।
কিন্তু হঠাৎ করেই যুদ্ধ শুরু হলে আসেমদের জীবনের ছন্দ বদলে যায়।
সবকিছু প্রায় থেমে যায়। স্কুল বন্ধ, ছাদে ওঠা বন্ধ, খেলা বন্ধ। ঘরে বসে অঙ্ক কষতে কষতে সময় যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে।
আকাশে এখন আর ঘুড়ি ওড়ে না। সেখানে ঘুরে বেড়ায় বোমারু বিমান আর ধোঁয়ার ঘন স্তর।
আসেমের বাবা সাংবাদিক। ফলে সারাদিন বাসায় খবরের শব্দ ভেসে আসে। রাতে বাবা-মা নিচু গলায় নানা বিষয়ে কথা বলেন। আসেম সবটা বোঝে না, কিন্তু শব্দগুলোর ভেতরের ভয় সে অনুভব করে।
তার ছাদে যাওয়া এবং ঘুড়ি ওড়ানোর ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ অঞ্চলে বিমান তুলনামূলক কম হলেও বাবা বলেন, আমেরিকার ড্রোন নাকি খুব ভয়ংকর সন্দেহ হলেই মৃত্যু।
জানালার ফাঁক দিয়ে আসেম কয়েকবার ড্রোন দেখেছে। তার কাছে সেগুলো কেবল ছোট কাগজের প্লেনের মতো মনে হয়। দেখতে সুন্দর। কখনো কখনো তার ইচ্ছে করে এগুলোকে ছুঁয়ে দেখতে।
একদিন দুপুরে আম্মু তাকে পাশের দোকানে লবণ আনতে পাঠান। সেখানে গিয়ে তার দেখা হয় হাসিব আলীর সঙ্গে। তারা একই স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। কাছাকাছি বাসায় থাকায় তাদের মধ্যে বন্ধুত্বও গড়ে উঠেছে।
হাসিব জানায়, সে নাকি মাঝে মাঝে আম্মুকে ফাঁকি দিয়ে ছাদে ওঠে। সেখানে দাঁড়িয়ে প্লেন আর ড্রোনের উড়াউড়ি দেখতে তার ভালো লাগে।
তারপর সে প্রস্তাব দেয় আজ বিকেলে আসেম আর সে মিলে ছাদে উঠবে, আর ঘুড়ি ওড়াবে।
আসেমের ভেতর আনন্দের ঢেউ ওঠে। বহুদিন পর সে ঘুড়ি ওড়াবে যুদ্ধ তখন তার কাছে যেন একটি দূরবর্তী বাস্তবতা।
কোনোভাবে আম্মুকে ফাঁকি দিয়ে সে ছাদে ওঠে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে হাসিব নেই।
সে আসেনি।
আসেম জানে, হাসিব মিথ্যা বলে না। তাই তার মনে হয়, নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে।
ছাদের এক কোণে বসে সে অপেক্ষা করে। কিন্তু সময় গড়িয়ে যায়, হাসিব আর আসে না।
শেষে সে নিজেই মনে মনে বলে
“যেহেতু এসেছি, একাই কিছুক্ষণ ঘুড়ি ওড়াই।”
লাল ঘুড়ির নাটাই থেকে সুতা ছাড়তেই ঘুড়িটি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে সে ওপরে উঠে যায়। আকাশে তখন আসেমই একমাত্র রাজা—কিছু ড্রোন ছাড়া আর কিছু নেই।
আসেম যখন লাল ঘুড়িটি ওড়াচ্ছিল, তখন দূর থেকে ভেসে আসছিল মাছির ডানার মতো ভনভন শব্দ। সে ভাবল, আকাশের কোনো কাগজের প্লেন বুঝি তার ঘুড়ির সঙ্গে কাটাকাটি খেলতে আসছে।
কিন্তু আসেম জানত না, তার লাল ঘুড়ি আর মাথার টুপি দেখে অনেক আগেই ড্রোন তাকে ভুলভাবে চিহ্নিত করেছে একজন সন্দেহভাজন লক্ষ্য হিসেবে।
হঠাৎই প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো ছাদ।
তারপর
এক মুহূর্ত।
সব শব্দ থেমে গেল।
সব আলো নিভে গেল।
শুধু ছাদের এক কোণে পড়ে রইল একটি লাল ঘুড়ি। যেন বারুদের ভেতর হারিয়ে যাওয়া কোনো অসমাপ্ত কবিতা।
ধূসর ছাদের উপর রক্ত ছড়িয়ে আছে। ছিন্ন নাটাই গড়িয়ে পড়েছে একপাশে। আর রক্তে ভেজা লাল ঘুড়িটা বাতাসে সামান্য কেঁপে কেঁপে উঠছে—যেন নিহত শিশুর শেষ বিস্ময় এখনও আকাশ ছাড়তে পারেনি।
আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.