মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান
![]()
বাংলার মুসলিম সমাজ, ধর্মীয় শিক্ষা, রাজনীতি ও জনজীবনের ইতিহাসে মাওলানা আবুল হাসানাত মোহাম্মদ আবদুল হাই একটি বহুমাত্রিক ও স্মরণীয় নাম। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন আলেম, শিক্ষক, লেখক, সুফিসাধক, সমাজসংস্কারক ও রাজনীতিক। তাঁর দীর্ঘ জীবনজুড়ে জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মুসলিম সমাজের কল্যাণচিন্তা পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও সাধননিষ্ঠ; জনজীবনে ছিলেন সক্রিয়, দৃঢ়চেতা ও সংগঠক; আর চিন্তা ও লেখায় প্রকাশ পেয়েছে ইসলামী সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনাদর্শের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ।
১৯০১ সালে নোয়াখালীর হাতিয়া অঞ্চলের চর ঈশ্বরের তালুকদার গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর জন্মভূমি ছিল নদী-ভাঙন, জোয়ার-ভাটা ও প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রামরত এক জনপদ। সেই পরিবেশেই গড়ে ওঠে তাঁর শৈশব। কিন্তু পারিবারিক পরিবেশ তাঁকে সাধারণ গ্রামীণ জীবনের গণ্ডি অতিক্রম করে জ্ঞান ও মননের বৃহত্তর জগতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। তাঁর পিতা মৌলভী আবদুল গণি ছিলেন বিদ্বান আলেম ও শিক্ষক। বরিশাল সরকারি জেলা স্কুলে তিনি আরবি-ফারসি পড়িয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে মেদিনীপুরের একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকতা করেছেন। শেষ জীবনে নিজ এলাকার মসজিদে ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে মানুষের সেবা করেছেন।
মাওলানা আবদুল হাইয়ের মাতা আফিফা খাতুনও ছিলেন শিক্ষিত ও বিদুষী নারী। তিনি স্থানীয় মক্তবে ধর্মশিক্ষা দিতেন এবং আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। পুত্র যখন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত, তখন তাঁর সঙ্গে ফারসি ভাষায় পত্রালাপ করতেন—এ তথ্য থেকে তাঁর জ্ঞানচর্চার পরিসর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কোরআন ও তাফসির পাঠেও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। এমন একটি পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে আবদুল হাইয়ের শৈশব থেকেই ধর্মীয় শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও নৈতিক মূল্যবোধের ভিত দৃঢ় হয়।
জ্ঞানসাধনার পথে
ছাত্রজীবনেই আবদুল হাই তাঁর মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দেন। প্রাথমিক ও প্রথাগত ধর্মীয় শিক্ষার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। ১৯২৮ সালে সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে কামিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই শিক্ষাজীবন তাঁর চিন্তার জগৎকে বিস্তৃত করে এবং ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখায় তাঁকে সুদৃঢ় ভিত্তি প্রদান করে।
তাঁর শিক্ষাজীবনের বৈশিষ্ট্য ছিল কেবল পাঠ্যজ্ঞান অর্জন নয়; জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা। হাদিস, তাফসির, ফিকহ, উসুল, বালাগাত ও ইসলামী ইতিহাস-ঐতিহ্যের পাশাপাশি তিনি সমাজ ও রাজনীতির বাস্তবতা সম্পর্কেও সচেতন হয়ে ওঠেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর বহুমুখী কর্মকাণ্ডের পেছনে এই বিস্তৃত শিক্ষাভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করেন। রামগতির নূরিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা এবং হাতিয়ার আফাজিয়া মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। প্রায় এক দশক ধরে শিক্ষাদানের মাধ্যমে তিনি বহু শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে হাতিয়া, সন্দ্বীপ ও রামগতি অঞ্চলে কাজীর দায়িত্বও পালন করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষক ও বিচার-পরামর্শদাতা হিসেবে স্থানীয় সমাজে মর্যাদার আসন লাভ করেন।
সুফিসাধনা ও আধ্যাত্মিক জীবন
মাওলানা আবদুল হাইয়ের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর সুফিসাধনা। তিনি পীর ও কামেল মাওলানা হাফেজ আবদুর রব জৌনপুরীর মুরিদ হন। তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনে এই সম্পর্ক ছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। জৌনপুরীর সাহচর্যে তিনি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন এবং তাঁর প্রধান মুফতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই সময় তিনি শুধু ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা নয়, জিকির-আজকার, মোরাকাবা-মুশাহাদা এবং আত্মশুদ্ধির সাধনায়ও নিজেকে নিয়োজিত করেন। পরবর্তীকালে পীরের কাছ থেকে খেলাফত লাভ করে তিনি বাংলা ও আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় দাওয়াত ও ওয়াজ-নসিহতের কাজে অংশগ্রহণ করেন।
তাঁর খেলাফতনামায় তাঁকে হাদিস, তাফসির, ফিকহ, উসুল, বালাগাত ও ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্রে শিক্ষিত, চরিত্রবান ও যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ওয়াজ-নসিহত, তওবা, বায়াত ও জিকির-আজকারের শিক্ষা দেওয়ার অধিকার প্রদান করা হয়। এ দায়িত্ব তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের পাশাপাশি সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাকেও আরও বিস্তৃত করে।
তাঁর আধ্যাত্মিক পরম্পরা নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া তরিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী, ইমাম আহমদ সিরহিন্দী মুজাদ্দেদে আলফেসানী প্রমুখ মনীষীর ধারার সঙ্গে তাঁর পীর-পরম্পরার সম্পর্ক ছিল। ধর্মীয় সাধনা তাঁর কাছে নিছক ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির বিষয় ছিল না; বরং মানুষের নৈতিক উন্নতি, সামাজিক কল্যাণ ও সত্যনিষ্ঠ জীবনযাপনের সঙ্গেও তা সম্পর্কিত ছিল।
রাজনীতিতে প্রবেশ
আবদুল হাইয়ের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ছাত্রাবস্থায়। তিনি বঙ্গীয় স্টুডেন্টস মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৩০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৪০-এর দশকে তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মুসলমানদের সামাজিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষণ এবং ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রজীবন পরিচালনার আকাঙ্ক্ষা। তৎকালীন উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি মুসলিম লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার উপায় হিসেবে দেখেছিলেন। ব্রিটিশ শাসন ও কংগ্রেস-মুসলিম লীগ দ্বন্দ্বের জটিল সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও সেই সময়ের মুসলিম লীগের বৃহত্তর রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চল থেকে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি কেবল ধর্মীয় নেতা হিসেবে নয়, জনসমাজে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের বিভাজন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বাপর রাজনৈতিক ঘটনাবলিতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। বিশেষত সিলেটের গণভোটে পাকিস্তানের পক্ষে তাঁর ভূমিকার কথা বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও মাওলানা আবদুল হাই সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি পূর্ববঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সে সময় পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের ব্যাপক পরাজয় ঘটলেও তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় বিজয়ী হন। এটি তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
একই সময় তিনি পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক জীবনের এই পর্যায়ে তিনি দলীয় আদর্শের প্রতি দৃঢ় আনুগত্য প্রদর্শন করেন। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে নিজ অবস্থান পরিবর্তন কিংবা দলবদলের রাজনীতিতে তিনি আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দর্শন মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণে কার্যকর হতে পারে।
১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি হওয়া পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। এরপরও তিনি জনজীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হননি। বরং ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর মনোযোগ আরও বাড়তে থাকে।
জাতীয় পরিষদ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
১৯৬৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি নোয়াখালী থেকে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশনেই তাঁকে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ডের চিফ হুইপ নির্বাচিত করা হয়। একই সময়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর ভূমিকার আরেকটি দিক ছিল ইসলামী আইন ও সামাজিক বিধিবিধান নিয়ে কাজ করা। মুসলিম পারিবারিক আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত কমিটিতে তিনি সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। ইসলামী আদর্শকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়—এ প্রশ্ন তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
১৯৬৩ সালে তিনি পাকিস্তান সরকারের ইসলামিক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। এই কমিটির কাজ ছিল মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে ইসলামী আদর্শের প্রয়োগের বাস্তব দিক নির্ণয় এবং ইসলামী আইন-কানুনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রদান। এ দায়িত্ব তাঁর ধর্মীয় জ্ঞান ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার একটি স্বাভাবিক সমন্বয় ঘটায়।
তবে জীবনের শেষভাগে তিনি রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে হতাশ হন। দলীয় আদর্শ থেকে বিচ্যুতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রবণতা তাঁকে ব্যথিত করেছিল। ১৯৬৮ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তাঁর জীবনের প্রধান মনোযোগ নিবদ্ধ হয় ধর্মীয় শিক্ষা, লেখালেখি, সমাজসেবা ও আধ্যাত্মিক সাধনায়।
আন্তর্জাতিক পরিসরে
মাওলানা আবদুল হাইয়ের কর্মকাণ্ড কেবল স্থানীয় বা আঞ্চলিক পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৫৫ সালে মক্কা মুকাররমায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব মুসলিম সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। এ সফর তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে বিস্তৃত করে। সে সময় তিনি জর্দান, সিরিয়া, ইরাক, বাহরাইন, লেবানন ও মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করেন।
১৯৬২ সালে বাগদাদ ও আল-কিন্দি নগরীর সহস্রতম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ইরাক সরকারের আমন্ত্রণও তাঁর জ্ঞান ও ধর্মীয় নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। একজন ধর্মীয় নেতা ও শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর প্রতি যে সম্মান প্রদর্শিত হয়েছিল, তা তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে।
শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণ
মাওলানা আবদুল হাই বিশ্বাস করতেন, কোনো সমাজের স্থায়ী উন্নতির জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। বিশেষ করে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানচর্চার সমন্বয় ঘটানো তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই বিশ্বাস থেকেই ১৯৪৬ সালে নিজ জন্মভূমি চর ঈশ্বরের তালুকদার গ্রামে তিনি ‘দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠানটি হাতিয়ার ধর্মীয় ও শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিজের বাড়ির সম্মুখে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল তাঁর সমাজের প্রতি স্থায়ী অবদানের অন্যতম নিদর্শন।
তিনি আফাজিয়া হাইস্কুল ও হাতিয়া মডেল হাইস্কুলের পরিচালনা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। তাঁর সহযোগিতায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়। শিক্ষার বিস্তার, ধর্মীয় জ্ঞানের প্রসার এবং নতুন প্রজন্মকে নৈতিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার প্রতি তাঁর যে আগ্রহ ছিল, এসব কর্মকাণ্ড তারই বাস্তব প্রতিফলন।
লেখক ও মনীষী
মাওলানা আবদুল হাই ছিলেন বহুভাষী ও সুলেখক। আরবি, উর্দু, ফারসি ও বাংলায় তাঁর জ্ঞান ছিল। ইসলামী কৃষ্টি, ধর্মদর্শন, সুফিসাধনা ও মুসলিম সমাজের নানা বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে—‘অজিফা ভাণ্ডার’, ‘মোরশেদ চরিত্র’, ‘তাজকেরায়ে কারামাতিয়া’, ‘মৌলুদ ও কেয়াম সমস্যা’, ‘ওয়াজ রত্ন’, ‘মোরশেদ ভক্তি’ এবং ‘মুসলিম জাতির কল্যাণ’। এসব গ্রন্থে ধর্মীয় শিক্ষা, আধ্যাত্মিক সাধনা, ইসলামী ঐতিহ্য ও মুসলিম সমাজের নৈতিক উন্নতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ প্রতিফলিত হয়েছে।
তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মীয় বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে উপস্থাপন করা। তিনি শুধু পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের জন্য লেখেননি; বরং পাঠককে ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথে উদ্বুদ্ধ করাই ছিল তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য। ফলে তাঁর লেখকসত্তা তাঁর আলেম ও সমাজকর্মী পরিচয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।
ব্যক্তি আবদুল হাই
জনজীবনে দীর্ঘকাল সক্রিয় থাকার পরও ব্যক্তিগত জীবনে মাওলানা আবদুল হাই ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও সংযমী। তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জ্ঞান ও সাধনার সঙ্গে কর্মের সমন্বয়। তিনি একদিকে ধর্মীয় শিক্ষায় নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন, অন্যদিকে মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন।
তাঁর কাছে ধর্ম ছিল কেবল আচার নয়—এটি ছিল চরিত্র নির্মাণ ও সমাজকল্যাণের পথ। তাই তাঁর ওয়াজ-নসিহতে নৈতিকতা, আত্মসংযম, আল্লাহভীতি ও মানবিক দায়িত্বের কথা গুরুত্ব পেত। তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডেও একই মূল্যবোধের প্রতিফলন দেখা যায়।
জীবনে তিনি তিনবার হজ পালন করেন। তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন ও ধর্মীয় সাধনা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে যেমন সমৃদ্ধ করেছিল, তেমনি তাঁর অনুসারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও ধর্মীয় অনুরাগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিল।
শেষ অধ্যায়
রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পর মাওলানা আবদুল হাই তাঁর জীবনের অবশিষ্ট সময় ধর্মীয় শিক্ষা, লেখালেখি, সমাজসেবা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় অতিবাহিত করেন। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের শেষে ১৯৮৩ সালের ২৯ নভেম্বর মঙ্গলবার ঢাকার একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। ফজরের নামাজের আজান চলাকালে তাঁর ইন্তেকালের কথা পারিবারিক স্মৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
তাঁর অন্তিম ইচ্ছা অনুসারে তাঁকে হাতিয়ার চর ঈশ্বরের তালুকদার গ্রামের নিজ বাড়ির সম্মুখস্থ জামে মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সেখানে তিনি আজও তাঁর জন্মভূমির মাটির সঙ্গে মিশে আছেন—যে মাটি থেকে তাঁর জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
উত্তরাধিকার
মাওলানা আবুল হাসানাত মোহাম্মদ আবদুল হাইয়ের জীবনকে একক কোনো পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা কঠিন। তিনি শুধু একজন আলেম ছিলেন না, শুধু একজন রাজনীতিকও ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার জীবনে ধর্মীয় জ্ঞান, আধ্যাত্মিক সাধনা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা বিস্তার, সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবা একই স্রোতে এসে মিলিত হয়েছিল।
তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে নানা আলোচনার বিষয় হতে পারে; তাঁর সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, মুসলিম লীগের ভূমিকা এবং পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটও ইতিহাসের নিজস্ব আলোচনার বিষয়। কিন্তু এসব ঐতিহাসিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে তাঁর ব্যক্তিগত নিষ্ঠা, জ্ঞানসাধনা, শিক্ষাবিস্তারের প্রচেষ্টা এবং নিজ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
বিশেষত প্রত্যন্ত হাতিয়ার মতো অঞ্চলে একটি উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা ছিল দূরদর্শী উদ্যোগ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বহু মানুষের শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলেছে। তাঁর লেখাগুলো ধর্মীয় জ্ঞান ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চায় পাঠকদের উদ্বুদ্ধ করেছে। তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারও অনুসারীদের মধ্যে বহমান থেকেছে।
একজন মানুষের জীবন তখনই বৃহত্তর অর্থ লাভ করে, যখন তাঁর ব্যক্তিগত সাধনা সমাজের কল্যাণে রূপান্তরিত হয়। মাওলানা আবদুল হাইয়ের জীবন সেই অর্থে একটি শিক্ষণীয় জীবন। জ্ঞান অর্জন করেছেন, তা মানুষকে দিয়েছেন; ধর্মীয় সাধনা করেছেন, তা নৈতিক জীবনচর্চার সঙ্গে যুক্ত করেছেন; রাজনীতিতে গিয়েছেন, নিজের বিশ্বাস ও আদর্শকে সামনে রেখেছেন; আর অবসরের পরও মানুষের শিক্ষা ও ধর্মীয় জীবনের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
আজ তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরও তাঁর নাম স্মরণ করলে একটি যুগের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে—ঔপনিবেশিক ভারতের শেষ পর্ব, মুসলিম লীগের উত্থান, পাকিস্তান আন্দোলন, পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তন, পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার নানা পর্যায় এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতা। এই দীর্ঘ ও পরিবর্তনশীল ইতিহাসের মধ্য দিয়ে মাওলানা আবুল হাই তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস, সাধনা ও কর্মের ছাপ রেখে গেছেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এই যে, জ্ঞানকে যদি কর্মের সঙ্গে এবং বিশ্বাসকে যদি মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে একটি জীবন তার ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করে সমাজের সম্পদে পরিণত হয়। মাওলানা আবুল হাসানাত মোহাম্মদ আবদুল হাই সেই অর্থে একটি সময়ের প্রতিনিধি, একটি জনপদের স্মৃতি এবং জ্ঞান, সাধনা ও জনসেবার এক নিবেদিত উত্তরাধিকার।
তাঁর জন্মভূমির মাটি, প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রচিত গ্রন্থ এবং তাঁর হাতে শিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত মানুষের স্মৃতির মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন আজও বেঁচে আছে। সময়ের প্রবাহে মানুষের নাম বিস্মৃত হতে পারে, কিন্তু যে মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করেন, জ্ঞান বিতরণ করেন এবং মানুষের কল্যাণে নিজের জীবন ব্যয় করেন—তাঁর কর্মের আলো সহজে নিভে যায় না।
মাওলানা আবুল হাসানাত মোহাম্মদ আবদুল হাইয়ের জীবন তাই আমাদের কাছে জ্ঞানচর্চা, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও সমাজসেবার এক দীর্ঘ সাধনার স্মারক। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।