মূল : ডক্টর জাকির হোসেন
তরজমা : মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান

[উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক, সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও পরবর্তীতে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর খলিক আহমদ নেজামি (১৯২৫-১৯৯৭)। মধ্যযুগীয় ভারতীয় মুসলিম ইতিহাস, তাসাউফ ও সুফি আন্দোলন নিয়ে তাঁর গবেষণা উপমহাদেশীয় ইতিহাসচর্চায় এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক দিগন্ত উন্মোচন করে। চিশতিয়া তরিকার মাশায়েখদের জীবন, কর্ম, চিন্তা ও সমাজগঠনমূলক ভূমিকা নিয়ে রচিত তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ তারীখে মাশায়েখে চিশত সুফি ইতিহাসচর্চার এক অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত।

গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. জাকির হোসেন যিনি নিজেও আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর এবং তাবলিগ জামাতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একজন মননশীল শিক্ষাবিদ ছিলেন। তাঁর লেখা ভূমিকাটি গঠন, নৈতিক সভ্যতা, তাসাউফের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং মুসলিম সমাজের আত্মিক সংকট নিয়ে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা।
পরম্পরা ওয়েবজিনের পাঠকদের জন্য সেই মূল্যবান ভূমিকাটির বাংলা অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো। সম্পাদক

সভ্যতার সংকট ও মানুষের অন্তর্গত পতন

আধুনিকতা মানুষের হাতে অফুরন্ত তথ্যের ভাণ্ডার তুলে দিয়েছে, কিন্তু সেইসঙ্গে তার আত্মাকে করে তুলেছে এক গভীর অনাথ, আশ্রয়হীন ও নিঃসঙ্গ সত্তা।

আজকের মানুষ প্রযুক্তির জালে পরস্পরের সঙ্গে অতি নিবিড়ভাবে যুক্ত, অথচ অস্তিত্বের গভীর স্তরে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে; বাহ্যিক সাফল্যের আলোয় সে দীপ্তিমান মনে হলেও অন্তর্গতভাবে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। সমকালীন সভ্যতার সবচেয়ে গভীর সংকট সম্ভবত অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নয়; বরং এটি এক “মানুষ হারানোর সংকট” (anthropological crisis) যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের নৈতিক কেন্দ্র, আত্মিক স্থিতি ও অর্থবোধের ভিত্তি হারিয়ে ফেলছে।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

এই প্রেক্ষাপটে “সিরাতের তামির” এবং “শখসিয়তের তাশকিল” প্রশ্ন দুটি নিছক আধ্যাত্মিক অনুশীলনের বিষয় নয়; বরং সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী মৌলিক ডিসকোর্স। কারণ ব্যক্তি-অস্তিত্বের ভেতরকার নৈতিক ভাঙন একসময় সামাজিক অবক্ষয়ে রূপ নেয়, আর সমাজের অবক্ষয় শেষ পর্যন্ত সভ্যতার পতনের ভাষা তৈরি করে।

মানুষের ভেতরে প্রকৃতি যে বিপুল বৈপরীত্যের সমাবেশ ঘটিয়েছে প্রবৃত্তি ও বিবেক, কামনা ও সংযম, স্বার্থ ও নৈতিকতা, ক্ষমতা ও দায়িত্ব আত্মনির্মাণের প্রকৃত কাজ হলো এই অন্তর্গত বিশৃঙ্খলাকে এক নৈতিক সামঞ্জস্যে রূপান্তর করা। অর্থাৎ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন নফসকে শৃঙ্খলিত করা, এলোমেলো ব্যক্তিসত্তাকে “সিরাত”-এ পরিণত করা এবং সেই সিরাতকে এমন এক মূল্যবোধগত কেন্দ্রের অনুগত করা, যা ক্ষণস্থায়ী স্বার্থের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।

নৈতিক ব্যক্তিত্ব আসলে কোনো সাধারণ চারিত্রিক গুণ নয়; এটি এক ধরনের ontological refinement অস্তিত্বের পরিশুদ্ধ রূপ। এখানে মানুষ কেবল সামাজিক প্রাণী থাকে না; বরং নৈতিক সত্তায় উত্তীর্ণ হয়। এই উত্তরণই মানবমর্যাদার প্রকৃত কেন্দ্র।

সম্ভবত সমগ্র সৃষ্টি-বিন্যাসে নৈতিক ব্যক্তিত্বই সবচেয়ে বিরল সম্পদ। ফেরেশতারা মানুষের এ গুণ দেখে বিস্মিত হতে পারে, কারণ তাদের আনুগত্যে প্রবৃত্তির দ্বন্দ্ব নেই; কিন্তু মানুষের আনুগত্য সংগ্রামসঞ্জাত। মানুষ পতনের সম্ভাবনা নিয়েও উত্তরণের ইতিহাস রচনা করে। আর এখানেই মানব-অস্তিত্বের ট্র্যাজেডি ও মাহাত্ম্য একসূত্রে মিলিত হয়।

তাসাউফ : আত্মার উপর সভ্যতার কাজ

শখসিয়ত নির্মাণের এই দুঃসাধ্য প্রকল্পকে ইসলামের আকাবির সুফিগণ যে একাগ্রতা, রিয়াজত, মুজাহাদা ও ইশকের সঙ্গে আঞ্জাম দিয়েছেন, মানব ইতিহাসে তার দ্বিতীয় নজির বিরল। তাঁরা নিছক কিছু আধ্যাত্মিক আচারবিধির উদ্ভাবক ছিলেন না; বরং তাঁরা ছিলেন মানব-অন্তর্জগতের সূক্ষ্মতম স্থপতি।

তাঁদের খানকাহ কেবল ইবাদতের স্থান ছিল, ব্যাপারটা এমন নয়; বরং তাঁদের সেই খানকাগুলো ছিল ethical laboratory—যেখানে মানুষের নফস, রূহ, ইরাদা ও আখলাক নিয়ে গভীর কাজ হতো। তাঁরা জানতেন, সমাজ পরিবর্তনের আগে মানুষকে পরিবর্তন করতে হয়; আর মানুষকে পরিবর্তন করতে হলে তার অন্তর্গত ভাঙাচোরা সত্তাকে পুনর্গঠন করতে হয়।

এই কারণেই তাঁদের সমস্ত তালীম ও তরবিয়তের কেন্দ্রবিন্দু ছিল “ইনসান” সে মানুষ, যে প্রবৃত্তির দাসত্ব অতিক্রম করে নৈতিক স্বাধীনতার মর্যাদায় পৌঁছতে চায়।

তাসাউফকে যারা কেবল জিকির, খানকাহ কিংবা অলৌকিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখে, তারা আসলে এর সভ্যতাগত চরিত্র বুঝতে ব্যর্থ হয়। প্রকৃতপক্ষে তাসাউফ ছিল মুসলিম সভ্যতার নৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের এক বিশাল ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। মুসলিম সমাজের ভেতরে যে আখলাকি ভারসাম্য, মানবিক কোমলতা, সামাজিক সহমর্মিতা ও আধ্যাত্মিক গভীরতা তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে সুফি তরিকার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক শ্রম কাজ করেছে।

কারামাতের কুয়াশা ও ইতিহাসের পুনরুদ্ধার

জাতির অবক্ষয়ের যুগে একটি ট্র্যাজেডি বারবার ঘটে: জাতি তার মহান মানুষদেরও নিজের পতিত মানসিকতার স্তরে নামিয়ে আনে। ফলে আউলিয়ায়ে কেরামের স্মরণ মানে হয়ে দাঁড়ায় অলৌকিকতার বাজার গরম করা, আবেগঘন কিংবদন্তি প্রচার করা এবং লোকবিশ্বাসকে ধর্মীয় চেতনার বিকল্প বানিয়ে ফেলা।

অথচ তাঁদের প্রকৃত মহিমা ছিল চিন্তার গভীরতায়, চরিত্রের দীপ্তিতে, নৈতিক সাহসে এবং মানুষ গঠনের সেই বিরল মেথডোলজিতে, যার দ্বারা তাঁরা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন।

আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, আমরা তাঁদের ফিকর ও আমলের সেই মহামূল্যবান ভাণ্ডারের দিকে তাকাইও না; বরং হীরের বাজারে কঙ্করের গুণগান করতে ব্যস্ত থাকি। যে উত্তরাধিকার মানবাত্মাকে সমৃদ্ধ করতে পারত, তাকে আমরা লোককথার অন্ধকারে নির্বাসিত করেছি।

কিন্তু ইতিহাসের গভীরে সবসময়ই এক প্রতিস্রোত কাজ করে। সময়ের ক্লান্ত মানুষ একসময় আবার সত্যের দিকে ফিরে তাকায়। বর্তমান যুগে সুফিয়ায়ে কেরামের জীবনকে “কাশফ-কারামাত” এর কুহেলিকা থেকে বের করে এনে একটি সুস্থ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পুনঃপাঠ করার প্রয়োজন তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।

খলিক আহমদ নেজামি : ইতিহাসচর্চার ভেতরে সভ্যতার পুনর্নির্মাণ

এই জায়গাতেই খলিক আহমদ নেজামির কাজ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তিনি কেবল একজন ইতিহাসবিদই নন; বরং মুসলিম সভ্যতার নৈতিক স্মৃতি উদ্ধারকারী একজন বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমিক।

চিশতিয়া তরিকার ইতিহাসকে পাঁচ খণ্ডে বিন্যস্ত করার তাঁর এই উদ্যোগ নিছক ‘তাযকিরা’ রচনা নয়; বরং ভারতীয় মুসলিম সভ্যতার অন্তর্লীন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক স্থাপত্যকে পুনরাবিষ্কারের এক গভীর একাডেমিক প্রচেষ্টা।

এই প্রকল্প সম্পূর্ণ হলে ভারতীয় মধ্যযুগীয় সভ্যতার ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুদিন অবহেলিত দিক নতুন আলোকমণ্ডলে উদ্ভাসিত হবে। কারণ চিশতিয়া সিলসিলা উপমহাদেশীয় মুসলিম সমাজের নৈতিক মনস্তত্ত্ব, সামাজিক সংবেদন, আধ্যাত্মিক গণচেতনা এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তরেরও ইতিহাস; নিছক খানকাহর ইতিহাস নয়।

বর্তমান খণ্ডে (প্রথম খন্ডে) আঠারো ও উনিশ শতকের মাশায়েখে চিশতের জীবন ও কর্ম গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে সন্নিবেশিত হয়েছে। লেখক তাঁদের জীবনকে পবিত্র স্মৃতিচারণ হিসেবে দেখেছেন তো বটেই, একইসঙ্গে তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক সংকট এবং সভ্যতাগত পরিবর্তনের আয়নায় তাঁদের কি ভূমিকা ছিল, তাও বিশ্লেষণ করেছেন।

ফলে এই বুজুর্গদের প্রকৃত “খত্‌-ও-খাল” তাঁদের বাস্তব অবয়ব, মানসিক গঠন এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এখানে সুফিবাদকে রহস্যময়তার আবরণে নয়, বরং ইতিহাসের জীবন্ত শক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। বোঝা গেছে, তাঁরা নিছক জিকিরে মশগুল দরবেশ ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন সময়ের গভীরতম নৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী প্রতিরোধ।

তাঁদের খানকাহ ছিল ক্ষমতাহীন মানুষের আশ্রয়, তাঁদের তরবিয়ত ছিল আত্মিক শৃঙ্খলার বিদ্যালয়, আর তাঁদের উপস্থিতি ছিল সমাজের নৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী এক অদৃশ্য শক্তি।

তাসাউফের বুদ্ধিবৃত্তিক পুনঃপাঠ : ব্যক্তি থেকে সভ্যতা

গ্রন্থটির প্রারম্ভিক অধ্যায়গুলোতে তাসাউফে ইসলামের প্রকৃতি, তার ঐতিহাসিক বিবর্তন, মাশায়েখে কেরামের জীবনদর্শন, তাঁদের ইসলাহ ও তরবিয়তের পদ্ধতি এবং দাওয়াহ ও ইশাআতের স্বতন্ত্র রীতিনীতি নিয়ে যে আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে, তা একটি পূর্ণাঙ্গ epistemic framework নির্মাণের প্রচেষ্টা।

এখানে তাসাউফকে কেবল আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং মুসলিম সমাজের নৈতিক নির্মাণ, সাংস্কৃতিক গঠন ও মানবিক চেতনার দীর্ঘ ইতিহাসের ভেতরে স্থাপন করে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

মাশায়েখদের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রচলিত অধিকাংশ সাহিত্য হয় অতিরঞ্জিত ভক্তির আবরণে আবৃত, নয়তো শুষ্ক তথ্যভিত্তিক জীবনীতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই গ্রন্থে তাঁদের জীবন, তাঁদের নৈতিক শিক্ষা, তাঁদের ইসলাহি মেথডোলজি এবং মানবগঠনের প্রকল্পকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ব্যক্তি, সমাজ ও ইতিহাস—তিনটি স্তর একে অপরের সঙ্গে জটিল সংলাপে আবদ্ধ হয়েছে।

ফলে পাঠক কেবল “বুজুর্গদের কাহিনি” পড়েন না; বরং উপলব্ধি করতে পারেন, কীভাবে তাঁরা মানুষ গড়তেন, সমাজকে নৈতিক ভারসাম্য দিতেন এবং ইতিহাসের অন্তঃস্রোতে কাজ করতেন।

আত্মিক দারিদ্র্যের যুগে নৈতিক পুনর্জাগরণের প্রশ্ন

আজকের যুগে মানুষ তথ্যের আধিক্যে জর্জরিত, কিন্তু চরিত্রের দিক থেকে শূন্য। সভ্যতা বাহ্যিকভাবে যত উন্নত হয়েছে, অন্তর্গতভাবে তত ভঙ্গুর হয়েছে। ফলে আত্মিক ও নৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন আবারও কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে।

এই ধরনের গবেষণা তাই একদিকে যেমন অতীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, তেমনিভাবে বর্তমানের আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দারিদ্র্যকেও চিনতে শেখায়।

কারণ ইতিহাসের কিছু কাজ শুধু অতীতকে সংরক্ষণ করেই ক্ষান্ত হয় না; বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য মানসিক ও নৈতিক অবকাঠামো প্রস্তুত করে। আর যে জাতি তার নৈতিক নির্মাতাদের সঠিকভাবে চিনতে শেখে, সে জাতি একদিন নিজের ভাঙা আত্মাকেও পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়।

লেখক : ড. জাকির হোসেন (১৮৯৭-১৯৬৯)। ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি (১৯৬৭-৬৯)। সাবেক উপরাষ্ট্রপতি (১৯৬২-৬৭)। বিহারের সাবেক গভর্নর (১৯৫৭-৬২)। সাবেক রাজ্যসভা সদস্য (১৯৫২-৫৭)৷ সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৪৮-১৯৫৬)। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া দিল্লি (১৯২৬-১৯৪৮)।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.