মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান
ভূমিকা
ব্রিটিশ শাসন ও ঔপনিবেশিক শোষণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা অঞ্চলের মুসলিম সমাজ যখন শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকারসহ নানা ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদতার সম্মুখীন, তখন জাতিকে জাগিয়ে তোলা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে যে কয়েকজন মনীষী নিরলসভাবে কাজ করেছিলেন, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী তাঁদের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন আলেম, রাজনীতিক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সমাজসংস্কারক, ধর্মপ্রচারক ও আইনসভার সদস্য। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, শিক্ষা, ধর্মপ্রচার, সমাজসংস্কার ও রাজনৈতিক আন্দোলন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর দূরদর্শী চিন্তা, তীক্ষ্ণ মেধা ও সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
তাঁর কর্মজীবনের বৈশিষ্ট্য ছিল বহুমুখিতা। সাহিত্যের আসর থেকে রাজনীতির ময়দান, মাদ্রাসা ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে সংবাদপত্র সম্পাদনা, ধর্মপ্রচার থেকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম—বিচিত্র কর্মক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ছিলেন। বিশেষত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, মুসলিম সমাজের শিক্ষা বিস্তার, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা, নারীশিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং আলেম সমাজকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের অবিভক্ত পটিয়া থানার আড়ালিয়া, বর্তমান বাইনজুরি গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সুনির্দিষ্ট জন্মতারিখ জানা যায়নি। প্রাচীন চট্টগ্রামের নাম ‘ইসলামাবাদ’-এর স্মরণে তিনি তাঁর নামের শেষে ‘ইসলামাবাদী’ শব্দটি গ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা ছিলেন মুন্সি মতিউল্লাহ পণ্ডিত। পারিবারিক পরিবেশেই তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। পিতার উদ্যোগে তিনি একজন গৃহশিক্ষক মৌলভির তত্ত্বাবধানে স্বগৃহে আরবি শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর পিতা তাঁকে হুগলিতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে তিনি হুগলি মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে হুগলি মাদ্রাসার সর্বশেষ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম বিভাগে জামায়াতে উলা পাস করেন।
শিক্ষাজীবনেই তাঁর চিন্তাজগতে কয়েকজন বিশিষ্ট মুসলিম মনীষীর গভীর প্রভাব পড়ে। মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরীর আদর্শে তিনি ইসলাম প্রচারে, স্যার সৈয়দ আহমদ খানের চিন্তায় মুসলিম জাগরণে, নওয়াব আবদুল লতিফের আদর্শে শিক্ষা বিস্তারে এবং জামালউদ্দিন আফগানির চিন্তায় ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধে অনুপ্রাণিত হন। পরবর্তী কর্মজীবনে এই প্রভাবগুলো তাঁর শিক্ষা, সমাজসংস্কার, ধর্মপ্রচার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় তাঁর যথেষ্ট পাণ্ডিত্য ছিল। শিক্ষাজীবন শেষে স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহের লক্ষ্যে তিনি রেভিনিউ আইন অধ্যয়ন এবং মোক্তারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
শিক্ষকতা ও শিক্ষা বিস্তার
শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। তিনি রংপুর শহরের মুনশীপাড়া জুনিয়র মাদ্রাসায় হেড মৌলভি পদে যোগদান করেন এবং ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত সেখানে শিক্ষকতা করেন। এরপর পীরগঞ্জ উপজেলার কুমেদপুর হারাগাছি সিনিয়র মাদ্রাসায় হেড মৌলভি পদে ১৯০০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মাদ্রাসাটি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং মৌলভি আবদুল আজিজ প্রতিষ্ঠিত মুসলিম বোর্ডিংয়ে প্রায় ছয় মাস সুপারিন্টেনডেন্ট হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি সীতাকুণ্ড সিনিয়র মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বাংলা ও আসামের বিভিন্ন স্থানে স্কুল-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল জাতীয় জাগরণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তিনি মনে করতেন, প্রকৃত শিক্ষা ব্যতীত অজ্ঞতা ও পশ্চাৎপদতায় নিমজ্জিত সমাজকে উন্নতির পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
এই চিন্তা থেকেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও দর্শন শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বসিরহাটের একটি সাহিত্য সম্মেলনে তিনি বলেন—
“প্রত্যেক জেলায় বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতির শাখা গঠন, তাতে পুস্তকালয় ও পাঠাগার স্থাপন আবশ্যক। জেলার ইতিহাস, প্রাচীন কীর্তির তত্ত্ব, ওলি ও সাহিত্যিক বর্গের জীবনী সংগ্রহ ফলপ্রদ হইবে। … মাদ্রাসার কোন উচ্চ লক্ষ্য নাই, তাই সকল মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, ভূগোল, ইতিহাস, আধুনিক দর্শন, বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক। মাতৃভাষা বাংলার চর্চা করা আবশ্যক। অন্ততঃ একদল ছাত্রকে রাজভাষা ইংরেজি শিক্ষা দিবার বিশেষ প্রয়োজন আছে।”
প্রাথমিক শিক্ষাকে তিনি সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর ‘নিম্নশিক্ষা ও শিক্ষাকর’ (১৯৪০) পুস্তিকায় তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারের কথা উল্লেখ করে ভারতের পশ্চাৎপদ শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন—
“পৃথিবীর যত সভ্য দেশ আছে প্রায় সর্বত্রই প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক। জাপান, আমেরিকা ও ইউরোপের জার্মানী ইত্যাদি স্থানে নিম্নশিক্ষা বাধ্যতামূলক; সেখানে শতকরা ১০০ জন লোক লিখিতে পড়িতে জানে। … হতভাগ্য ভারতের অবস্থা স্বতন্ত্র।”
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য তিনি একটি জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চিন্তা, যুক্তিবাদ, পরিশ্রম, সংযম ও স্বাধীনতাকামী মানসিকতা গড়ে তোলা এবং তাঁদের বৃহত্তর সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে তোলা।
চট্টগ্রামের দক্ষিণ মহকুমায় কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী দেয়াং পাহাড়ে এই জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তিনি দীর্ঘদিন লালন করেন। ১৯১৫ সালে এ উদ্দেশ্যে তিনি সরকারের কাছ থেকে ৬০০ বিঘা জমি এবং ওই এলাকার জমিদার আলী খানের কাছ থেকে রেজিস্ট্রি মূলে ৫০০ কানি ভূমি গ্রহণ করেন। মুসলিম রাজনীতিক ও শিক্ষাবিদ মাওলানা শওকত আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপন করেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা আকরম খাঁ, মুন্সি রিয়াজউদ্দিন আহমদ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলী ওই স্থান পরিদর্শন করে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। কিন্তু নানা কারণে তাঁর জীবদ্দশায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি নারীশিক্ষারও বিশেষ গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে নারীর শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়; পরিবার, সমাজ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য। ‘আল-এসলাম’ পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন—
“যখন পুত্র কন্যার মা হইবে, তখন সর্বদা তাহাদিগকে শুধু অলংকার পরাইবার চেষ্টায় লাগিয়ে থাকিও না। যে অলংকার স্থায়ী নহে, তাহাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করিও, সভ্যতা শিক্ষা দিও।”
উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করার জন্য তিনি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর উদ্যোগে চট্টগ্রামে কদম মোবারক এম. ওয়াই. উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা এবং বরকল এস. জেড. উচ্চ বিদ্যালয়ও উল্লেখযোগ্য। ১৯৩০ সালে তিনি চট্টগ্রামে কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
সাংবাদিকতা ও মুসলিম সমাজের জাগরণ
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর কর্মজীবনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ছিল সাংবাদিকতা। তাঁর সাংবাদিকতার সূচনা সাপ্তাহিক ‘সোলতান’ পত্রিকার মাধ্যমে। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর সঙ্গে কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক ‘সোলতান’ প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে পত্রিকাটি দৈনিক ‘সোলতান’-এ উন্নীত হয় এবং তিনি এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি আঞ্জুমানে ওলামায়ে ইসলাম বাংলা ও আসামের মুখপত্র ‘আল-ইসলাম’-এর সম্পাদকও ছিলেন। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে মাওলানা ইসলামাবাদী ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রচেষ্টায় আঞ্জুমানে উলামায়ে বাংলা প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ‘আল-এসলাম’ ১৯১৫ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় এবং এটি তাঁর সম্পাদিত প্রথম স্বাধীন পত্রিকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ফারসি ভাষায় প্রকাশিত বিশ্বখ্যাত দৈনিক ‘হাবলুল মতিন’-এর বাংলা সংস্করণের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। আল্লামা জামালউদ্দিন আফগানির শিষ্য আগা মঈদুল ইসলামের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে ইংরেজিতে ‘মিল্লাত’ এবং উর্দু-ফারসিতে দৈনিক ‘হাবলুল মতিন’ প্রকাশিত হতো। ‘হাবলুল মতিন’-এর বাংলা সংস্করণের সম্পাদক ছিলেন মাওলানা ইসলামাবাদী। এ কারণে তাঁকে বাংলায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক পত্রিকার প্রথম মুসলমান সম্পাদক হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পিছিয়ে থাকা মুসলমানদের মধ্যে আত্মজাগরণ, শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক সচেতনতার বাণী প্রচার করেন। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল নিছক সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাতীয় চেতনা, সামাজিক সংস্কার, শিক্ষা বিস্তার ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
মুসলিম সংগঠন ও আলেম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ
মুসলমানদের সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ইসলামাবাদী উপলব্ধি করেন যে বিভিন্ন মত ও ধারার আলেমদের ঐক্যবদ্ধ করা ছাড়া মুসলিম সমাজের পুনর্গঠন কঠিন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ফুরফুরার পীর মাওলানা আবু বকর ছিদ্দিকী, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মাওলানা রুহুল আমিন, দৈনিক আজাদের মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ এবং আহলে হাদিসের মাওলানা আবদুল্লাহিল বাকীকে সঙ্গে নিয়ে ‘আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাংলা’ গড়ে তোলেন।
১৯০৩ সালে তিনি অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম কনফারেন্সের আয়োজন করেন। তিনি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বঙ্গীয় প্রাদেশিক শাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং নিখিল বঙ্গ জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতিও ছিলেন। ১৯০৬ সালে ‘মুসলিম সাহিত্য সমিতি’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯২৯ সালে মাদ্রাসা ছাত্রদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘আসাম-বেঙ্গল জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া’-র প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান সম্পাদক ছিলেন।
আলেম সমাজের নেতৃত্বের ওপর তাঁর গভীর আস্থা ছিল। ১৯৩৯ সালে কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে নিখিল বঙ্গ মৌলভী অ্যাসোসিয়েশনের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে তিনি বলেন—
“আলেমশ্রেণী ব্যতীত অন্যশ্রেণীর লোকের নেতৃত্বাধীন ইসলামের তথা মুসলিম জাতির উন্নতির পথ প্রশস্ত হওয়ার উপায় আছে বলে বিশ্বাস করি না। যে নেতা স্বয়ং শরিয়তের বিধি-বিধানের অধীন থাকবেন না, কুরআন-হাদিস মতে বলবেন না, তার পক্ষে মুসলমানের নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকার থাকতে পারে না।”
একই বক্তব্যে তিনি সতর্ক করে বলেন যে মুসলমানদের আত্মপ্রতিষ্ঠা ও আত্মনির্ভরশীলতার পরিবর্তে ক্ষুদ্র ধর্মীয় মতভেদ নিয়ে আলেম সমাজ ব্যস্ত থাকলে ইসলামের ভিত্তি দুর্বল হবে এবং মুসলিম জাতির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে।
তাঁর এই চিন্তার পেছনে ছিল একটি সুস্পষ্ট সামাজিক বিশ্লেষণ। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ এবং দৈনন্দিন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে আলেম সমাজের ভূমিকা ও সাধারণ মানুষের ওপর তাঁদের প্রভাব বিবেচনা করে তিনি মনে করতেন, আলেমদের সংগঠিত করে সমাজের বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে সচেতন করা গেলে তাঁরা সামাজিক পুনর্গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।
সাহিত্য, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক জাগরণ
সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তিনি জাতীয় জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতেন। প্রত্যেক জেলায় সাহিত্য সমিতির শাখা, পাঠাগার ও পুস্তকালয় প্রতিষ্ঠার ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। পাশাপাশি স্থানীয় ইতিহাস, প্রাচীন কীর্তি, ওলি ও সাহিত্যিকদের জীবনী সংগ্রহের আহ্বান জানান।
তাঁর মতে মাতৃভাষার প্রতি অনাগ্রহ মুসলিম সমাজের অনগ্রসরতার অন্যতম কারণ। তাই মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে বাংলা ভাষা ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটানো জরুরি। প্রায় শতবর্ষ আগে তিনি যে শিক্ষা, সাহিত্য ও জাতীয় জাগরণের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাতে তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়।
১৮৯৮ সালে কলকাতায় নিখিল ভারতীয় মোছলেম শিক্ষা সমিতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সময় থেকেই বাংলা অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তার ও ইসলাম প্রচারের উপায় নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা গভীরতর হতে থাকে। তিনি নিজেই লিখেছেন—
“১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় নিখিল ভারতীয় মোছলেম শিক্ষা সমিতিতে যোগদানের সুযোগ পাইয়াছিলাম। তখন হইতে আমার অন্তর বাঙলাদেশের শিক্ষা বিস্তার ও ইসলাম প্রচারের উপায় সম্বন্ধে নানা বিষয়ও চিন্তাধারা উদ্ধেলিত হইতেছিল।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ১৮৯৮ সালে কুমেদপুর থেকে কলকাতার ইসলাম প্রচারক মাসিক পত্রিকায় ইসলাম মিশন সম্পর্কে একটি বিস্তৃত প্রবন্ধ লেখেন এবং পরবর্তী সময়ে ‘আল-এসলাম’-এর পাতায় তাঁর ইসলাম প্রচারবিষয়ক প্রবন্ধগুলো পুনর্মুদ্রিত হয়।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিন্তা
ইসলামাবাদীর সমাজসংস্কারের ধারণা শুধু শিক্ষা ও ধর্মীয় জাগরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সমাজের নিচের স্তর থেকে অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা।
কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের উন্নয়নের পাশাপাশি মুসলিম সমাজ যেসব পেশাকে অবহেলা করত, সেসব পেশার প্রতিও আগ্রহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল—
“মুসলমানরা বড় দায়িত্বের পাশাপাশি যদি কর্মকার, শিল্পী, গোয়ালা, নানা হালাল ব্যবসায় অবলম্বন করে তাহাও দেশেরই সেবা। ইহাতে হিন্দুদের অসন্তোষের কোন কারণ নাই।”
অর্থাৎ উৎপাদনশীল শ্রম, কারিগরি পেশা ও বৈধ ব্যবসাকে তিনি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতেন।
রাজনৈতিক জীবন ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর রাজনৈতিক জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল মাতৃভূমির স্বাধীনতা এবং পশ্চাৎপদ মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্জাগরণ। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন।
প্রথম দিকে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯২০ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। চট্টগ্রামে কাজেম আলী মাস্টার ও মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী জে. এম. সেনগুপ্তের উপদেষ্টা ছিলেন। মহিমচন্দ্র দাশ ও ত্রিপুরাচরণ চৌধুরী ছিলেন তাঁদের প্রধান সহযোগীদের মধ্যে। ১৯২০ সালের ৮ নভেম্বর মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্ররা ধর্মঘট করলে জে. এম. সেন হলে ধর্মঘটি ছাত্র ও জনসাধারণের বিশাল সভায় সভাপতিত্ব করেন মাওলানা ইসলামাবাদী।
১৯২১ সালে তিনি খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের অন্যতম স্থপতি ছিলেন তিনি। ত্রিশের দশকে তিনি বঙ্গীয় কৃষক-প্রজা পার্টিতে যোগ দেন এবং দলটির সহসভাপতির পদ অলংকৃত করেন। ১৯৩৭ সালে কৃষক-প্রজা পার্টির মনোনয়নে চট্টগ্রাম দক্ষিণ (মধ্য) নির্বাচনী এলাকা থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৩০ সালে তিনি আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে কারাবরণ করেন। একই সময়ে তিনি যুবসমাজকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। ১৯৩০ সালের এক যুব সম্মেলনে তিনি বলেন—
“মন ও শরীর নিয়ে এই দুই বস্তু লইয়াই মানুষ, শরীরকে সবল ও স্বাস্থ্যবান রাখার জন্য শরীর চর্চা ও ব্যায়াম কৌশলই প্রধান অবলম্বন… আত্মরক্ষা, এছলাম রক্ষা, মোছলেম জাতির স্বার্থ সংরক্ষণকল্পে ব্যায়াম চর্চার জন্য এছলাম ধর্মে কঠোর বিধান আছে। তাই তোমরা মুক্তি সংগ্রামের জন্য নানাভাবেই প্রস্তুত হও।”
পরবর্তী সময়ে তিনি কংগ্রেসের অহিংস নীতির প্রতি আস্থা হারিয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি সমর্থন জানান এবং ফরোয়ার্ড ব্লকে যোগ দেন।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে সম্পর্ক
ইসলামাবাদীর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ভারত ছাড় আন্দোলন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতি তাঁর সমর্থন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী তৎপরতায় সক্রিয় হন। ১৯৪২-৪৩ সালে তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল—বর্তমান বাংলাদেশ ও আসাম—কেন্দ্রিক সংগঠনের প্রধান সংগঠক ও সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেতাজির চট্টগ্রাম সফরের সময় কর্ণফুলী নদীর মোহনার দেয়াং পাহাড়ে মাওলানা ইসলামাবাদীর সঙ্গে তাঁর গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই এলাকায় ইসলামাবাদী ইসলাম মিশন এতিমখানার শাখা, পশুপালন খামার, মৎস্য খামার, কৃষি খামার এবং জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন।
এর আগে তিনি তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি হস্তান্তর করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের গোপন কেন্দ্র হিসেবে একটি বৃহৎ খামারবাড়ি স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নজরে আসে।
১৯৪৪ সালের ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে প্রথমে দিল্লির লালকেল্লায় বন্দি রাখে এবং পরে পাঞ্জাবের মিয়াওয়ালি জেলে স্থানান্তর করে। বিভিন্ন বর্ণনায় মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু ও অন্যান্য নেতার সঙ্গে তাঁর কারাবন্দিত্বের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মিয়াওয়ালি কারাগারে গোপন তথ্য আদায়ের উদ্দেশ্যে তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়। প্রায় এক বছর কারানির্যাতন ভোগের পর তিনি মুক্তি পান।
কারাজীবনের নির্যাতনের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থা ভেঙে পড়ে এবং মুক্তির পর কলকাতায় তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। নিজের আত্মজীবনীতে ব্রিটিশ নির্যাতন সম্পর্কে তিনি লিখেছেন—
“বৃদ্ধ বয়সে আমার ওপর যেভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন ব্রিটিশ সরকার করেছে, পৃথিবীর কোনো সভ্য জাতির ইতিহাসে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে না… আমরা স্বাধীন হবো এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সেই স্বাধীনতা ভোগ করবে—এটি আমার বিশ্বাস।”
ভাষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্য
মাওলানা ইসলামাবাদীর রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তায় মাতৃভাষা বাংলা বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। তিনি মনে করতেন, মাতৃভাষার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলা সম্ভব। ‘আল-এসলাম’ পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন—
“মাতৃভাষার সাহায্যে দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে একতা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃভাব বর্ধনের চেষ্টা করাই দেশবাসীর নেতা ও সাহিত্য সেবকগণের প্রধান কর্তব্য।”
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্কের সময়ও তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেন। তাঁর এই ভাষাচিন্তা পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের কর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আহমদ হোসাইনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম স্বজাতির কল্যাণচেতনা ও স্বজাত্যবোধের ক্ষেত্রে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন; সেই অনুপ্রেরণা তাঁকে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, তাঁর জাতীয়তাবোধ ছিল সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষনির্ভর নয়। তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা
মাওলানা ইসলামাবাদী নিজেকে দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের মুখপাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সমাজের নিম্নস্তরের মানুষকে সংগঠিত করা এবং তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথ তৈরি করা।
তাঁর চিন্তায় স্বাধীনতা সংগ্রাম, সামাজিক সংস্কার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় জাগরণ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ছিল। তিনি মনে করতেন, শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করলেই জাতির পূর্ণ মুক্তি সম্ভব নয়; শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, সামাজিক মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ও প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সাহিত্য ও গ্রন্থ রচনা
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী একাধিক ভাষায় ইসলামি সভ্যতা, মুসলিম ইতিহাস, শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও গণমানুষের অধিকার নিয়ে লিখেছেন। তিনি প্রায় ৪২টি গ্রন্থ রচনা করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—
১. ‘ভারতে মুসলিম সভ্যতা’ ২. ‘সমাজ সংস্কার’ ৩. ‘ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমান’ ৪. ‘ইসলাম জগতের অভ্যুত্থান’ ৫. ‘ভারতে ইসলাম প্রচার’ ৬. ‘সুদ সমস্যা’ ৭. ‘ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান’—৩ খণ্ড ৮. ‘ইসলামী শিক্ষা’ ৯. ‘কোরআন ও বিজ্ঞান’ ১০. ‘আত্মজীবনী’
তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য ছিল কেবল সাহিত্যচর্চা নয়; বরং মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়, শিক্ষা, রাজনৈতিক সচেতনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সামাজিক অধিকার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা।
সংগঠন, সমাজসংস্কার ও জনসেবা
মাওলানা ইসলামাবাদী অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম শিক্ষা কনফারেন্স, বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি, প্রাদেশিক মোছলেম শিক্ষা সমিতি, আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাংলা প্রভৃতি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব সংগঠনের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের বিচ্ছিন্ন ও ক্ষুদ্র শক্তিকে সংগঠিত করে সামাজিক অগ্রগতির শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চেয়েছেন।
তাঁর চিন্তায় সংগঠন, শিক্ষা ও সংবাদপত্র—এই তিনটি ছিল সমাজ গঠনের মৌলিক উপাদান। তাঁর কর্মজীবনের সূচনা থেকেই তিনি এই ধারণাকে বাস্তবে প্রয়োগের চেষ্টা করেন। তিনি বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, এতিমখানা, পাঠাগার ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেন।
রাজনৈতিক দর্শন ও সামাজিক আদর্শ
ইসলামাবাদীর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি, মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও আত্মনির্ভরতা, জাতীয় ঐক্য এবং সামাজিক ন্যায়। তিনি দলীয় সংকীর্ণতা ও বিদ্বেষমূলক রাজনীতির বিরোধিতা করতেন এবং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতেন।
তাঁর চিন্তায় ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক শিক্ষা পরস্পরবিরোধী ছিল না। বরং তিনি চেয়েছিলেন ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি ও সমাজনীতির সমন্বয় ঘটুক। একই সঙ্গে তিনি নারীশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা ও উৎপাদনশীল পেশায় মুসলমানদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।
কারাজীবন ও আত্মত্যাগ
ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কারাগারে অতিবাহিত হয়। ১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তিনি কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে সম্পর্ক ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ১৯৪৪ সালে পুনরায় গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় এক বছর কারাবন্দি থাকেন।
কারাগারে তাঁর ওপর নির্যাতনের ফলে শারীরিকভাবে তিনি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তবুও তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শ থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। তাঁর আত্মজীবনীতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে দৃঢ় প্রত্যয়ের প্রকাশ ঘটেছে, তা তাঁর আত্মত্যাগী রাজনৈতিক চেতনার পরিচায়ক।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
দীর্ঘ সংগ্রাম, কারাবাস ও নির্যাতনের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকে যায়। মুক্তির পর তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। জীবনের শেষ পর্যায়েও শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও জাতীয় চেতনা নিয়ে তাঁর চিন্তা অব্যাহত ছিল।
১৯৫০ সালের ২৪ অক্টোবর বহু স্বপ্ন ও কর্মপরিকল্পনা অসম্পূর্ণ রেখে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদের কবরস্থানে শায়িত আছেন।
মৃত্যুর পূর্বে তিনি নিজের সমাধির জন্য একটি কবিতা লিখে যান—
“পথিক : ক্ষণেকের তরে বস মোর শিরে ফাতেহা পড়িয়া যাও নিজ নিজ ঘরে। যে জন আসিবে মোর সমাধি পাশে, ফাতেহা পড়িয়া যাবে মম মুক্তির আশে। অধম মনিরুজ্জামান নাম আমার, এছলামাবাদী বলে সর্বত্র প্রচার।”
উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর জীবনকে কেবল একজন রাজনীতিক বা আলেমের জীবন হিসেবে মূল্যায়ন করলে তাঁর কর্মের ব্যাপ্তি যথাযথভাবে অনুধাবন করা যায় না। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন শিক্ষক, সংগঠক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, ধর্মপ্রচারক, সমাজসংস্কারক, রাজনৈতিক কর্মী ও আইনসভার সদস্য। শিক্ষা বিস্তার, সংবাদপত্র প্রকাশ, মুসলিম সমাজের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, নারীশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, মাতৃভাষার মর্যাদা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম—প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর কর্মতৎপরতার স্বাক্ষর রয়েছে।
শামসুজ্জামান খান তাঁর ‘মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী’ গ্রন্থে তাঁর শিক্ষা, সংগঠন, সাংবাদিকতা ও সংগ্রামের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর মূল্যায়নে, ইসলামাবাদী নানা সংগঠনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র ও বিক্ষিপ্ত শক্তিকে সঞ্চিত করে সামাজিক অগ্রগতির হাতিয়ারে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষা বিস্তার, জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, মোছলেম শিক্ষা সম্মেলন, আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাংলা প্রভৃতি কর্মসূচি সেই বৃহত্তর সামাজিক পরিকল্পনার অংশ ছিল।
সাহিত্য ও সাংবাদিকতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নিজ জাতি ও বৃহত্তর মুসলিম সমাজের জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন তিনি। প্রয়োজনে সাহিত্যচর্চা থেকে রাজনীতিতে, রাজনীতি থেকে শিক্ষা ও সমাজসংস্কারে এবং সেখান থেকে পুনরায় জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। এই বহুমুখী কর্মতৎপরতাই তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মনীষীতে পরিণত করেছে।
তাঁর স্মৃতি ও আদর্শ সংরক্ষণ এবং তাঁর চিন্তা ও স্বপ্নের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০০১ সালে ‘মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী গবেষণা পরিষদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সাংবাদিক সৈয়দ মোস্তফা জামাল ও ইতিহাস গবেষক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ-দীন এই সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপসংহার
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর জীবন ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক জাগরণ, সামাজিক সংস্কার, ধর্মীয় চেতনা এবং জাতীয় মুক্তির সমন্বিত সাধনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি পশ্চাৎপদ সমাজকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে হলে একই সঙ্গে শিক্ষা, সংগঠন, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সচেতনতার বিকাশ ঘটাতে হবে।
তাঁর কর্মজীবনের বিস্তৃতি এবং চিন্তার বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে তিনি কোনো একক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষা বিস্তার করেছেন, সাংবাদিক হিসেবে জনমত গঠন করেছেন, সংগঠক হিসেবে সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন, সমাজসংস্কারক হিসেবে নারীশিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার কথা বলেছেন, রাজনীতিক হিসেবে আইনসভায় ভূমিকা রেখেছেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে কারাবরণ ও নির্যাতন সহ্য করেছেন।
এই বহুমাত্রিক কর্মজীবনের মধ্য দিয়েই মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী বাংলা অঞ্চলের মুসলিম সমাজের জাগরণ ও বৃহত্তর জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করেছেন। তাঁর জীবন তাই কেবল অতীতের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়; শিক্ষা, সংগঠন, সামাজিক দায়বদ্ধতা, আত্মনির্ভরতা এবং জাতীয় চেতনার সমন্বিত সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।