মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী আল আজহারী রহ.
আমার একাত্তর বছরের জীবনে দেখা লাখ লাখ মানুষের মধ্যে তিনটি মহাসমাবেশ রয়েছে, যা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে সংঘটিত হলেও তিনটিই অবিস্মরণীয় এবং উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর প্রথমটি হলো ১৯৭১ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের রমনা রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ভাষণ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশ। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক মহাসমাবেশ।
এর পরেরটি হলো ১৯৮১ সালের জুন মাসের ৩রা বা ৪ঠা তারিখে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজা উপলক্ষে শেরেবাংলা নগরে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশ। এটি ছিল নেহাতই তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডে মুষড়ে পড়া দেশবাসীর তার প্রতি সমবেদনা ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।
তৃতীয় মহাসমাবেশটি অনুষ্ঠিত হলো ৬ই এপ্রিল ২০১৩ তারিখে। এই তিনটির পেছনে যে তিন ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ কার্যকরী ছিল, তারা যে গণমানুষের মনে জাদুকরী প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন তিনি ন্যায্যভাবে গোটা পাকিস্তানের নির্বাচিত জাতীয় নেতা। তাই কেবল পূর্ব-পাকিস্তানেরই নয়, তখন তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক প্রভাবশালী নেতা—মুফতি মাহমুদ, ওয়ালি খান, মাওলানা আহমদ নূরানি এমনকি মাওলানা মওদুদির মতো বিরোধী নেতা দ্বারাও সমর্থিত ছিলেন। এদের প্রত্যেকেই নির্বাচিত জাতীয় নেতা শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ্যভাবে বিবৃতি দিয়েছিলেন।
অনেকেই জুলফিকার আলী ভুট্টোর হুমকিকে উপেক্ষা করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে ঢাকাও এসেছিলেন। সুতরাং তার বক্তব্য শোনার আগ্রহে পতঙ্গের মতো লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসবে—এটাই ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। বহির্বিশ্বের প্রচার মাধ্যমগুলোও এ ব্যাপারে অত্যন্ত কৌতূহলী ছিল। কারণ, এই সময় একটি নতুন জাতির অভ্যুদয় হতে যাচ্ছে, তা তারা বেশ ভালোভাবে আঁচ করতে পারছিল। তাই প্রচুরসংখ্যক বিদেশি সাংবাদিকও সে মহাসমাবেশ প্রত্যক্ষ করতে ছুটে এসেছিলেন।
মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেই একাত্তর সালেই, যখন আমাদের প্রায় জাতীয় নেতাদের অনুপস্থিতকালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ারূপে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গোটা জাতির মধ্যে আশার আলো ও প্রাণসঞ্চার করেছিলেন, তখনই গোটা জাতিরই কেবল নয়, গোটা বিশ্বেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনিই সর্বপ্রথম বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করে বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও মুসলিম রাষ্ট্ররূপে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তার শাহাদাতের অব্যবহিত পরে, রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ের হজ প্রতিনিধিদলের সদস্যরূপে জেদ্দার রাজপ্রাসাদে আমরা যখন তৎকালীন সৌদি বাদশাহ খালিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে মিলিত হই, তখন তিনি আমারই হাতে হাত ধরা অবস্থায় অত্যন্ত আবেগঘন ও বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বলেছিলেন, “আপনারা কী করে জিয়াউর রহমানের মতো মুসলিম বিশ্বের এক সম্ভাবনাময় নেতাকে এভাবে হত্যা করতে পারলেন?”
তিনি আরও বলেছিলেন, “এই মাত্র কিছুদিন আগে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত ইসলামি শীর্ষ-সম্মেলনে তিনি যখন তিন ঘণ্টাব্যাপী অনবদ্য ভাষণ দিচ্ছিলেন, আমরা মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রপতিরা অবাক হয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলাম এবং পরস্পরে বলাবলি করছিলাম, আল্লাহ মুসলিম বিশ্বকে একজন নতুন যোগ্য নেতাই দান করেছেন। তার আয়ু যে এত অল্প হবে, তা তো আমরা কম্পানাই করতে পারিনি।”
আমাদেরই একজন রাষ্ট্রপতির ব্যাপারে স্বয়ং সৌদি বাদশাহর এরূপ উচ্ছ্বসিত মন্তব্য শুনে আমরা যুগপভাবে বিস্মিত ও গর্বিত হয়েছিলাম। আমাদের মুখে কোনো জবাবই সরছিল না। রাজদরবার থেকে ফিরে এসে যখন আমাদের সৌদিপ্রবাসী অন্যান্য বাঙালি ভাইদের বললাম, তখন তারা জানালেন—বাদশাহর মুখে যা শুনে এসেছেন, তা আসলে এখানের সকলের মনোভাবের প্রতিধ্বনি। জিয়া হত্যার পর তিন দিন পর্যন্ত আমরা ঘর থেকে বেরোতে পারিনি। আমাদের দেখলেই সৌদিরা বলত, “বাঙালি হারামি।” (উল্লেখ্য, সৌদিরা হারামি বলতে ডাকাতকে বোঝায়)
সর্বশেষের এই মহাসমাবেশ ও লংমার্চেও যিনি মহানায়ক—শাইখুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফি রহ.  তার সঙ্গে আমার পরিচয় বঙ্গবন্ধু ও শহিদ জিয়ার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার অনেক আগে, ১৯৬৬ সালে, যখন তিনি যুবক আর আমি কিশোর। তারই সহপাঠী, পীরভাই ও অন্তরঙ্গ বন্ধু সিলেটের মাওলানা আমীনুদ্দীন শায়খে কাতিয়া মরহুমের সফরসঙ্গীরূপে ওই সময় হাটহাজারী সফরে গেলে, তৎকালীন হাটহাজারী দারুল উলুমের মুহতামিম হজরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব রহ-এর আদেশে আমাকে সেদিন ওই সুপ্রাচীন মাদরাসাটির কয়েক হাজার ছাত্র-শিক্ষকের সম্মুখে বক্তৃতা দিতে হয়েছিল। দৈনিক আজাদে আমার সে বক্তৃতার রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছিল। তাই হজরত মাওলানা আহমদ শফীর সঙ্গে পরিচয় ও হৃদ্যতার সম্পর্ক বহু পুরোনো।
প্রথমোক্ত দুজন রাষ্ট্রপতি হলেও আমার প্রতি তাদেরও যথেষ্ট আন্তরিকতা ছিল—যা আমার বিভিন্ন প্রবন্ধে ইতিপূর্বেই এসেছে। তারা দুজনই ঘাতকের নির্দয় বুলেটের শিকার হয়েছেন। দোয়া করি, হজরত মাওলানাকে আল্লাহ অন্তত আদর্শগতভাবে বিপর্যস্ত বাঙালি মুসলমানদের তরীকে কূলে না ভিড়ানো পর্যন্ত দীর্ঘায়ু দান করুন। আমিন।
অরাজনৈতিক মহাসমাবেশ
অরাজনৈতিক মহাসমাবেশ হিসেবেই কেবল নয়, এই শেষোক্ত মহাসমাবেশটিই যেন সর্বাধিক মাহাত্ম্যপূর্ণ। কেননা, এর পেছনে কোনো পার্থিব-প্রাপ্তির সম্পর্ক নেই। শুধু তাই নয়, এর পেছনে যেভাবে আন্তর্জাতিক ইসলামবিরোধী চক্রের বলিষ্ঠ অপপ্রচার দেখা গেছে এবং সরকারি মহলের নানারূপ হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে—বিশেষত, বিগত অল্প কিছুদিনের মধ্যে যেভাবে নির্বিচারে ১৭০ জন দাড়ি-টুপিপন্থীকে হত্যা করা হয়েছে—এমন সময়ে এরূপ একটি লংমার্চ ও মহাসমাবেশে অংশগ্রহণ ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
সরকারের অনুগ্রহধন্য ও সমর্থনপুষ্ট রাম-বাম-নাস্তিকরা যখন নজিরবিহীনভাবে বন্ধের দিন আবার রাতের বেলা হরতাল আহ্বান করে বসল, সরকারদলীয় বাস মালিক সমিতিই শুধু নয়, খাস সরকারি পরিবহন রেলগাড়ির সমস্ত যাত্রা বাতিল করে দিয়ে এবং দক্ষিণ বাংলার প্রধান পরিবহন মাধ্যম—লঞ্চ-স্টিমার পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়ে গোটা বাংলাদেশকে রাজধানী থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ালো, তখন একেবারে জীবন বাজি রাখা ছাড়া, দেড় হাজার বছর পূর্বেকার সেই সাহাবায়ে কেরামের ঈমানি শক্তি ছাড়া এতে অংশগ্রহণ করা সম্ভব ছিল না।
ঈমানের এরূপ মহাপরীক্ষা এ জাতির জীবনে আর কোনোদিনই আসেনি। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লামা আহমদ শফীর সময়োপযোগী ডাকে সাড়া দিয়ে তার নেতৃত্বে এদেশের ঈমানদার জনগোষ্ঠী সে মহা-পরীক্ষায় নির্দ্বিধায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে জাতি ঈমানের এ মহাপরীক্ষা দিতে ময়দানে নামতে সাহস সঞ্চার করতে পেরেছে, তাদেরকে আর পৃথিবীর কোনো শক্তিই দাবিয়ে রাখতে পারবে না। এটি আমাদের সরকার, প্রশাসন এবং যারা পরিচালনা করছে, তাদেরও অনুধাবন করা উচিত।
এ প্রসঙ্গে, নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক ধর্মীয় নেতৃত্বের খেদমতে আমার একটি বিনীত আরজও আছে। নিরুপদ্রব থাকার উদ্দেশ্যে এই যে আপনারা বারবার বলছেন, “আপনারা তৎপরতা একান্তই নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক ধর্মীয় খেদমত,”—তাতে কি অসৎ ও বেঈমান প্রতিপক্ষ আপনাদের বিন্দুমাত্র রেয়াত দিয়েছে? স্মর্তব্য,
لا يَرْقُبُوْنَ فِي مُؤْمِنٍ إِلَّا وَلَا ذِمَّةٌ
ওরা কোনো ঈমানদারের ব্যাপারে আত্মীয়তার বা অঙ্গীকারের মর্যাদার ধার ধরে না। (সুরা তাওবা: ১০)
তারা কি মাসাধিককাল ধরে যেভাবে দু-দুটি জাতীয় হাসপাতালের ছয় হাজার জীবনসংকটগ্রস্ত রোগী এবং দুটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও চার-চারটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মধ্যখানে উচ্চ ধ্বনিসম্পন্ন মাইকে অহরহ গর্জনরত কয়েক হাজার তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীকে আহার্য ও পানীয় এবং ভ্রাম্যমাণ টয়লেট সুবিধা জুগিয়ে দিয়েছে? এ লাখ লাখ নিঃস্বার্থ দূর-দূরান্ত থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মুমিনদের কি তারা একবেলাও এসব সুবিধা সরবরাহ করেছে? তাহলে আপনারা কেন এরূপ কৈফিয়ত দিয়ে নিজেদের অযথাই ছোট করছেন?
লক্ষণীয়, রাজনৈতিক গরজে অন্ধ-সরকার দলীয় নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত পরিবেশবাদী ও সুশীল সমাজও একেবারে চোখ বুজে রইলেন! কেউ একটিবারের জন্যও ভাববার ফুরসত পেলেন না যে, জীবনসংকটগ্রস্ত হাজার হাজার রোগী একান্তই প্রাণরক্ষার আশায় লাখ লাখ টাকা খরচ করে দেশের সেরা দুটি হাসপাতালে ছুটে এসেছেন, আর এতগুলো যুবক-যুবতীর জিঘাংসামূলক ‘ফাঁসি ফাঁসি’ কর্কশ স্লোগান ও উন্নাত কোরাসগান তাদের কাছে কী প্রাণান্তকর ঠেকেছিল!
আমাদের মন্ত্রীদের অনেকেই মাশাআল্লাহ ডাক্তার, উকিল ও ব্যারিস্টার। হাইকোর্টও খুবই নিকটে, যেখান থেকে অনেক ব্যাপারে স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ জারি হয়ে থাকে।
পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ রাজত্বকে গোলাম আহমদ কাদিয়ানি আল্লাহর রহমত বলে অভিহিত করে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ‘হারাম’ ঘোষণা করেছিল। অনুরূপ বিদআতি মৌলবী আহমদ রেযা খাঁ বেরেলবি এবং তার সমচিন্তার তাবেদারি-প্রিয়রা ব্রিটিশভারতকে আল্লাহর ফযলে দারুল ইসলাম বলে অভিহিত করেছিল। আল্লামা ইকবাল তখন পরম আক্ষেপ ও ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন
মোল্লা কো জব মিল গায়ি সাজদে কী ইজাযত / নাদান নে সমঝ লিয়া কে হিন্দ মে ইসলাম হ্যায় আযাদ
(মোল্লা যখন পেয়ে গেল সেজদা দেওয়ার অনুমতি / হিন্দুস্তানে ইসলাম আজাদ—ভাবল নাদান সরলমতি)
হজরত মাওলানা আহমদ শফী সাহেব! আপনি বা আপনার উস্তাদ ও পীর-মাশায়েখগণ তো সেই দলের লোক নন। আপনারই উস্তাদ ও পীর—শাইখুল আরব ওয়াল আজম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানির কথা আমি চাইতে, আপনি নিশ্চয়ই ভালো জানেন। তিনি একাধারে মুহাদ্দিস, আধ্যাত্মিক জগতের গুরু এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রসেনা বীর মুজাহিদ ছিলেন।
ব্রিটিশ শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে, সেই প্রথম মহাযুদ্ধের সময় যখন বলা হতো “ব্রিটিশ রাজত্বে সূর্য অস্ত যায় না,” তিনি প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমাবেশে ফতোয়া দিয়েছিলেন—কোনো মুসলিম সন্তানের জন্য এটি বৈধ নয় যে, সে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে বলকানে গিয়ে মুসলিম ভাইদের বুকে গুলি চালাবে। এজন্য বিখ্যাত করাচি মামলায় তিনি ছিলেন এক নম্বর আসামি। একই মামলায় খেলাফত নেতা মাওলানা মুহাম্মাদ আলী ও অন্যান্য জাতীয় নেতার নামও ছিল। আদালতের সম্মুখে তার ঈমানদীপ্ত জবাবি ভাষণ সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে মাওলানা মুহাম্মাদ আলী শ্রদ্ধাভরে প্রকাশ্য কাঠগড়ায় তার পদচুম্বন করেছিলেন।
আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. জাতিকে যে ডাক দিয়েছিলেন, সেদিন যদি এই জাতির বোধোদয় হতো, তাহলে হয়তো আজকের এই দুর্দিন দেখা হতো না। সেই ডাকের মর্ম আজকের অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেননি; কিন্তু পদ্মা-মেঘনা-যমুনার এত পানি গড়িয়ে যাওয়ার পর, আজ যখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তখনও কি আপনারা কাফের-বেদীনের পুতুলদের কাছে সিজদার ইজাযত আর লংমার্চ ও সমাবেশের মৌখিক অনুমতি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবেন? তাদের অনুমতি ছাড়া মিসওয়াকের সঙ্গে সুন্নতি লাঠিটা হাতে রাখতেও ভয় পাবেন?
লংমার্চ ও মহাসমাবেশ-বিরোধী হরতাল আহ্বানকারী বাম-রাম নাস্তিকরা যখন আপনাদের লোকদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে বেদম প্রহার করছিল অথবা হজরত শাহজালালের সিলেট অভিযানকালে গৌড়-গোবিন্দের সমস্ত নৌকা বন্ধ করে দেওয়ার মতো বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে আগমনেচ্ছুদের পারাপার বন্ধ করেছিল, অথবা সার্থক লংমার্চ ও মহাসমাবেশ সম্পন্ন করে তাদের ফেরার পথে ‘অহিংস হরতালিরা’ হামলা চালাচ্ছিল—তাদের হাতে কি তখন শুধু লাঠি ছিল? না, ছিল আরও অনেক কিছুই।
তাহলে কেন আপনার অনুসারীদের সুন্নতি লাঠি থেকে নিরস্ত্র রেখে জালেমদের গজারি লাঠির শিকার বানানো হচ্ছে? তারা যে আমাদের বিনয়কে দীনতা বিবেচনা করে আরও উদ্ধত ও মারমুখী হয়ে ওঠে, এটা কি একবারও ভেবে দেখেছেন? আর এই আরবি প্রবচনটি খুবই প্রসিদ্ধ—
“تَكَبُّرُ مَعَ مُتَكَبِّرِينَ فِي حُكْمِ الْاِنْكِسَار”
অর্থাৎ, অহংকারী বেয়াদবের সঙ্গে অহংকার ও আত্মমর্যাদা প্রদর্শনই বিনয়।
সুতরাং, আগামীতে এ কথাটি মনে রাখাটাই কর্মীদের জন্য নিরাপদ। দেশের পুলিশ যখন ক্ষমতাসীনদের মনোরঞ্জনে ভদ্র প্রতিপক্ষকে ঠেঙ্গানোকে পদোন্নতির উপায় বলে বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত আর এ কারণে দুষ্কৃতিকারী ও সন্ত্রাসীদের হাতে সাধারণ মানুষ শয়নকক্ষ থেকে রাস্তা পর্যন্ত নিরাপদ নয়—তখন নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতি লাঠিটা হাতে রাখতে আমরা কুণ্ঠিত হই কোন যুক্তিতে?
রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি অবশ্যই আমাদের আলোচনার অন্তর্গত হতে হবে। নতুবা আমাদের ধর্মচর্চা জীবন-বিচ্ছিন্ন নিছক এক জড়তায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে—যা মানুষকে চলতে, বেঁচে থাকতে বা সভ্যতা টিকে রাখতে সাহায্য করবে না।
একেবারে নিকট প্রতিবেশী মায়ানমারে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নেতৃত্বে যে নির্মূল ও বিতাড়নের মহোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেই দৃশ্যের মুখোমুখি আমরা যদি গুলিতাড়িত মানুষদের জন্য আমাদের দরাজ কথাগুলো ধর্মীয় নেতাদের মুখ থেকে উচ্চারিত না করি, তবে বিশ্বের সম্মুখে আমরা কোন ইসলামিক আদর্শ বা মানবতার নিদর্শন উপস্থাপন করছি?
আমাদের মাদরাসাগুলোতে তাফসির পড়াতে গিয়ে বলা হয়:
فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ الله وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ
অর্থাৎ, “আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানমতে শাসন পরিচালনা করো, এবং মানুষের খেয়ালখুশি বা জনগণের সার্বভৌমত্বের অনুসরণ কোরো না।”
কিন্তু বাস্তব জীবনে যদি আমরা ময়দানকে শয়তানি-তাগুতি শক্তির ক্রীড়নীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে কেবল ‘ধর্মকর্ম’ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি, তাহলে এই শতকরা ৮৫–৯০% মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্রে এভাবে চুপচাপ থাকা কি ইসলাম অনুমোদন করে? ২% মানুষের সার্বভৌম রাষ্ট্রে আমরা ‘টু’ শব্দটি উচ্চারণ করে বন্ধু রাষ্ট্রের কর্ণধারদের বিব্রত বা অসন্তুষ্ট করবার সাহসও হারাব?
একচল্লিশ বছর পুরনো যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে যদি বিশেষ মুহূর্তে বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে দেশ ও জাতিকে গৃহযুদ্ধের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, অথচ বছরের পর বছর ধরে দাগি হত্যাকারী আসামিদের রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমা করে দেন, এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলাই আইন বা আদালত অবমাননা হয়ে যাবে—এমন কুফরি ধ্যান-ধারণা কি চুপচাপ মেনে নেওয়া যায়?
আমাদের লাখ লাখ সরলমনা মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে শেয়ার মার্কেটে টেনে নামিয়ে ফতুর করে ফেলা হচ্ছে; রাষ্ট্র তদন্ত করলেও প্রতিকার বা দোষীর প্রকাশনা সম্ভব হচ্ছে না। তাহলে আমরা আল-কুরআনের আদেশ:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ
এর বাস্তবায়ন কীভাবে করতে পারব
মুসলিম জনগোষ্ঠী যদি তাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার সমাধান আমাদের কাছ থেকে না পায়, তারা তাগুতি শক্তির ওপরই নির্ভর করবে। এটি কি কাম্য হবে? তাই দীন-দুনিয়ার সকল সমস্যা কুরআন-হাদিসের আলোকে আমরা নায়েবে-নবীদেরকেই জনগণের সামনে তুলে ধরব—নির্দ্বিধায়। কেবল নেতিবাচক আন্দোলন বা সংগ্রাম করেই আমাদের পেশাগত ও আদর্শগত দায়িত্ব পূর্ণ হবে না।
আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.