আল মুজাহিদী
প্রত্যেক দার্শনিককে নিজের মতাদর্শের মধ্য দিয়ে বিশ্বাসী হয়ে উঠতে হয়। নিজের মধ্যে নিজের জিজ্ঞাসা সৃষ্টি করে সমস্যানিচয়ের সমাধান খুঁজে পেতে হয়। আর জিজ্ঞাসার ভেতর জবাব খুঁজতে গিয়ে যে সম্যক উপলব্ধির সূচনা করে তা থেকেই দর্শনের সৃষ্টি।
মানব সমাজের ভবিষ্যতের সামাজিক মানচিত্রটি কি প্রকৃতির হবে সেটা বলা খুবই দুষ্কর। বিরোধ বৈরিতা এবং ব্যাজস্তুতির ওপর যে বিশ্ব রাষ্ট্রপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত সে বিশ্ব সমাজ পরিবারের অস্তিত্ব যে কত ভঙ্গুর আপদগ্রস্ত সেটা বলাই বাহুল্য।
মৌলানা আবুল কালাম আজাদের দর্শনের যুগান্তকারী একটি উদ্ধৃতি দিয়ে আমার কথাটা শুরু করতে চাই। তিনি বলেন, ‘জীবন ও সত্তার তাৎপর্য উপলব্ধিই দর্শনের লক্ষ্য। মানুষ যেদিন আত্মসচেতন হয়ে চিন্তা করতে শুরু করল তার মনে সেদিন দু’টি প্রশ্ন প্রবল হয়ে দেখা দিলো; মানব জীবনের তাৎপর্য কি? যে বিশ্ব-সৃষ্টির মধ্যে মানুষের বাস তার স্বরূপই বা কি? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে মানুষ কতকাল নানাদিকে নানাভাবে হাতড়ে বেড়িয়েছে সে কথা আমরা জানি না, তবে খুঁজতে খুঁজতে যেদিন পথের হদিস পেল, তখন থেকে লক্ষ্য স্থির করে সে প্রশ্ন ও চিন্তার পথে অগ্রসর হতে চেষ্টা করেছে। সুসংবদ্ধ বিচার ও আলোচনার সেই থেকে শুরু। মানুষের বুদ্ধি যেদিন এই নতুন কর্মপন্থা অবলম্বন করল, সেই দিন দর্শনের জন্ম। দর্শনের ইতিহাসের সেই দিন গোড়াপত্তন হলো।’
এই যে জীবন ও সত্তার তাৎপর্যের কথা বলা হলো- জড় জগতের জড় সংসারে মানব জীবনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও অনন্য অবস্থাকেই এক অমোঘ ইঙ্গিত করা হলো। মানব আত্মার অন্য অভিযান অন্য অভিযাত্রার কথা বর্ণিত হলো। এ যাত্রার মধ্য দিয়ে মানুষ আবিষ্কার করতে থাকল তার নিজেকে। নিজেকে জানান এবং নিজেকে জগতে যথার্থভাবে উপযোগী করে তোলার নামই দর্শন। অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ দর্শনের তীর্থযাত্রার এক অতি অভিজাত যাত্রী। দীর্ঘকাল এ পথে বিচরণ করেছেন তিনি অসম্ভব সঙ্গত সংযমের মধ্য দিয়ে। জীবনের কাছে নিজেরই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি-
জীবন প্রভাতেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে আমি কোথা থেকে এলাম? কোথায় ছিল আমার পূর্বের বাসস্থান? কোথায়ই বা আমি ফিরে যাব? আমার চারদিকে যেসব জন্ত রয়েছে ওরা আমার শত্রু না মিত্র? আমার সম্মুখে যেসব লোক মৃত্যু মুখে পতিত হলো ওরা কোথায় গেল? তারা আবার আমাদের কাছে ফিরে আসবে না?
মানুষ স্বপ্ন দেখে বলেই মানুষ স্বাপ্নিক। মানুষ তার অন্তর্দৃষ্টিতে কিছু দেখে বলেই সে দার্শনিক, দ্রষ্টা। এ রকম দেখার শক্তি কেবল প্রাণিকুলের ভেতর মানুষেরই আছে। যে স্বপ্ন মানুষ দেখে সে স্বপ্ন চরিতার্থ করার শক্তিও মানুষের আছে। অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষ ভাবতে পারে। তাকে ভাবতে হয়। ইহজাগতিক এবং পরজাগতিক যন্ত্রণার একটি অন্তঃস্রোত বয়ে যেতে থাকে মানুষের মানস নদীর ওপর দিয়ে। এ প্রবহমানতা তার জীবন অবধি সচল ও স্রোতস্বল থাকে। জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক চৈতন্যের মধ্য দিয়ে মানুষকে জীবনের পথ পরিক্রমণ করতে হয়। এমন নয় যে, একটি ছাড়া অন্যটি চলবে। মানব জীবনের চালিকা শক্তি হচ্ছে ‘জাগর চৈতন্য’। এই ‘জাগর চৈতন্য’-ই তার ধর্ম। এই জাগর চৈতন্যের যখন মৃত্যু ঘটে তখন মানুষ হিসেবে তার মনুষ্যত্বের বিকাশধারায় মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে। পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকের বিপর্যয় তাকে বিধ্বস্ত করে যেতে থাকে ক্রমাগত। মানুষের বিশ্বাসের উৎস কোথায়? এ বিশ্বাস প্রতিটি আগামীকালের জন্য। যে আগামীর চিরন্ময় গর্ভে একটি ভবিষ্যতের জন্ম। শতাব্দীর মতো বয়সী এই মানুষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ আগামীদিনের একটি শুভময় সমাজের আকাঙ্ক্ষায় এতদিন বেঁচে বর্তে ছিলেন। আমাদের ভেতর তাঁর জীবন দর্শনের সূক্ষ্ম বিন্দুটি একটি সমাজ বৃত্তের সম্পূরক স্পর্শক যেন। আমি অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের রামপুরার বাসায় গিয়েছিলাম জীবনে একটিবারই মাত্র। তাঁর সঙ্গে এত দেখা হয়ে যেত যে, বাসায় যাওয়ার অতটা তাগিদ পেতাম না ভেতর থেকে। ‘সভা-সমিতি, সেমিনার সিম্পোজিয়াম’ এসব শব্দ যেন একাকার হয়ে মিশে থাকত আজরফ সাহেবের প্রাত্যহিকতায়। তিনি, এক কথায়, সমাজের ‘অস্তিত্ব’ হয়ে গিয়েছিলেন। সমাজের মানসভূমিতে তিনি বিচরণ করতেন। সমাজের সকল অবস্থানের মানুষের সঙ্গে তার এক গভীর আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল। এ যেন বাংলারই এক শ্যামল-হরিৎ আত্মীয়তা। আজরফ ছিলেন এক বিশেষ অর্থে সমাজ মনস্ক মানুষ। তিনি ছুটে যেতেন সমাজের কাছে। সমাজের মানুষেরাও ছুটে আসত তার কাছে। এ সম্পর্কটা ছিল খুবই নিবিড় এবং নিরন্ধ্র। সহজ কথায় বলা যায়, তিনি হয়ে উঠেছিলেন সমাজেরই অস্তিত্ব পুরুষ।
আমি যেদিন প্রথম তার রামপুরার বাসায় যাই সেও বহুদিন আগের কথা। এ রকম বিশাল ব্যক্তিত্বের মানুষটিকে ঐ ছোট্ট একটি বাড়ির কামরা কি করে ধরে রাখত, কিংবা তাকে অবস্থান দিয়েছিল, আমি বুঝে উঠতে পারি না সেটা মোটেও। একটি ছোট্ট সংক্ষিপ্ত আঙিনায় একটি বনস্পতির আবির্ভাব, উদ্ভাস এবং বিকাশের মতো-তাঁর সম্পর্কে বলতে গেলে একথাটিই বলতে হয়।
অধ্যক্ষ আজরফ ছিলেন একজন দ্রষ্টা। তিনি দেখতে পারতেন। দেখতে পারতেন নিজেকে। পাশাপাশি অন্য আরও অনেককে। এই যে দেখার এক বিরল শক্তি অর্জন করেছিলেন তিনি এই শক্তিই ধীরে ধীরে তাঁকে করে তুলেছিলেন দ্রষ্টা থেকে একজন দার্শনিকে। তাঁর দর্শন মানুষের দর্শন। মনুষ্যত্বের দর্শন। জন্ম নিয়ে এসে কিছুকাল পৃথিবীতে থেকে গিয়ে আবার কোথায়ও হুট করে চলে যাওয়া-ই তো আর মানব জীবনের শেষ কথা নয়। এ ব্যাপারটি অধ্যক্ষ আজরফ ভালো করে জানতেন। সম্যকভাবে জীবনের একটা উদ্দেশ্য আছে। লক্ষ্য আছে এবং পূর্ণায়ত পরিণতিও আছে। অধ্যক্ষ আজরফ নিজেও এ শিক্ষা নিয়েছেন তাঁর দীর্ঘ পরিসরের জীবন চর্যার মধ্য দিয়ে। আবার তাঁর সমাজবাসীদের এ শিক্ষা নিয়ত দিয়ে যেতেন তিনি। কর্মময় জীবনের আস্থায় আস্থাশীল ছিলেন তিনি। তাঁকে বলা যায় কর্মষ্ঠ দার্শনিক পুরুষ। এ সমাজে যারা কর্তাগিরি করে বেড়ায় কাজের নামে তারা একেবারেই উদাসীন, অমনোযোগী। তাদের জন্য আজরফের কর্মময় জীবন এক অনুসরণীয় উদাহরণ। কর্তামি করে জগতে চলে যাওয়া যায়। কিন্তু তার সঙ্গে জীবন যায় না কখন। জীবনের যাত্রা কর্মের সঙ্গে। কর্মহীনতার মধ্যে নয়। প্রায় শতাব্দীর মতো সমান বয়সী আজরফ তাঁর জীবনদর্শন অথবা মানবদর্শনে এ সত্যটিকে কেবল প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন।
সন্দেহ সন্দিগ্ধতার একটি সহজবোধ মানুষের মনে বিচরণ করে কিন্তু সারাজীবন মানুষকে এই সন্দেহের ভেতর কাটানোর কোনো অর্থই হয় না। শত্রুদের অন্তর্ভূমি থেকে বিশ্বাসের কথাগুলো যদি অঙ্কুরিত হতে না পারে তাহলে এই সন্দেহের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণু জীবনের সমস্ত অবস্থানে প্রবেশ করে জীবন নামক ভুবনটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
সংশয় পদ্ধতিকে বাট্রান্ড রাসেল গ্রহণ করেছিলেন দর্শনের মূল পদ্ধতি হিসেবে। ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তের সঙ্গেও রাসেলের চিন্তার ঐক্য রয়েছে। রাসেল কথাটি স্বীকার করে এভাবে বলছেন-
“I think on the whole that the sort of method adopted by Descartes is right: That you should set to work to doubt things and retain only what you cannot doubt because of its clearness and distinctness.” [THE PHILOSOPHY OF LOGICAL ATOMISM-HONEIST 1918-19, PAGE 500]
মোটের ওপর আমি মনে করি যে, দেকার্ত যে ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, সেটাই সঠিক কোনো বিষয়ে সন্দেহ করেই কাজ শুরু করা উচিত এবং সেটা তো স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট যে সন্দেহ করা যায় না, কেবল সেটাই গ্রহণ করা সমীচীন।
সন্দেহাতীত কাল ও সত্য বলে আমরা কি বুঝব। ‘জগতে কি এমন কোনো জ্ঞান আছে, যা এত নিশ্চিত যে কোনো বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিই সন্দেহ করতে পারে না?
বার্ট্রান্ড রাসেল তার ‘The problems of philosophy’ গ্রন্থে এ কথাটি বলেছেন,
“Is there any knowledge in the world which is so certain that no reasonable man could doubt it?”
দর্শনে সন্দেহাতীত হয়ে নিশ্চিত সত্যে পৌঁছানোই একমাত্র লক্ষ্য। এটা এমন সত্য, যা নৈর্ব্যক্তিক পরম সত্য। রাসেল মনে করতেন সংশয় পদ্ধতি দার্শনিক সত্যে পৌঁছানোর জন্য অপরিহার্য। আজরফের ব্যাপারটি একেবারেই ভিন্নমাত্রিক। নিছক সন্দেহে নয় বরং বিশ্বাসের অন্তহীন যাত্রার সত্যে পৌঁছানো সম্ভব। সেই বিশ্বাসের অপর আলোক ধারার সমুজ্জ্বল ব্রাত্যপথে পরিভ্রমণ করে অধ্যক্ষ আজরফ আজীবন সত্যের রাজতোরণের সন্ধানী ছিলেন। তাঁর এ অনুসন্ধিৎসা কখনো সম্ভব হয়েছে তাঁর নিজস্ব নিঃসঙ্গ বলয়ে। আবার কখনো কিঞ্চিৎ সংঘবদ্ধতায়।
আজরফের দর্শন চিন্তায় একটা ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়। শৈশব থেকেই তাঁর জীবনে একটি দ্রোহীসত্তার উদ্ভব ঘটে। তাঁর সত্য অন্বেষার সভাটি ক্রমাগত জাগ্রত হতে থাকে। হতে থাকে উপবিপ্লবী, বিদ্রোহী, জাগরী ব্যক্তির স্বাধীনতা ‘আত্মার অমোঘ উদ্বোধন’ এবং মানবকল্যাণ এই চিন্তার স্তবক তাঁর সমগ্র জীবনকে এক মহা ঐক্যসূত্রে গ্রথিত ও সমুত্থিত করেছিল। অধ্যক্ষ আজরফ আমাদের জাতীয় জীবন বলয়ের এক নক্ষত্র। তার কোনো প্রভায় দিনের আলোর মতো আলোকিত হতে পারব আমরা। তিনি যে মনুষ্যত্বের দীপশিখাটি জাগিয়ে রেখে গেলেন সেই আলোক প্রভায় আমরা আমাদের সঙ্কট ব্যক্তিতে এবং আস্তিত্বিক অক্ষয়ের নিয়ত জেগে উঠতে পারব। সঠিক দিশায়। সুস্থ মানসিক প্রবর্তনায়। সামাজিক হিতেষণায়। মানবতার তীর্থযাত্রার এ যাত্রিক আমাদের যুগযাত্রার যে শান্তি সম্ভাবনা ও মাত্রা দিয়ে গেলেন সেটা অবিসংবাদিত এবং অতুলনীয়। উদার মানবতাবাদী এ মানুষটি তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা, দাঢ্যতা, ঋজুতায় সর্বতিনন্দিত। এদেশে এ আদর্শ এ চারিত্র্য বিরলপ্রজ।
অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আজরফ এমনই এক মানবতাবাদী মানুষ ছিলেন যিনি জাতির ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে সর্বজনীন চিন্ময় আত্মার অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি জীবনের মার্জিত ভাষা এবং দার্শনিকতার সমন্বিত শব্দবিন্যাসে একটি মানবিক সমাজের রূপরেখা রচনা করে গেলেন। যে সমাজটাকে বিষয়ে প্রকরণে ও প্রবর্তনায় উদার নিবিড় বিনয়ী এবং সনির্বন্ধ করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বর্তমান মানব সমাজের মুক্তির জন্য অনবদ্য জীবন দর্শন রচনা করে রেখে গেলেন আজরফ।
আমরা এখনো জেনেও যেন না জানার ভান করছি আমাদের সমাজে আজরফের মতো এমন ক্ষণজন্মা একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল। আমরা যে কোন সমাজের মানুষ? কোন ধাতু দিয়ে গড়া আমাদের স্বভাবের সত্তাটি আমি বুঝে উঠতে পারি না। বাংলাদেশের মাত্র একটি-দু’টি সংবাদপত্র ছাড়া বাকি সবই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান (STATE-INSTITUTION) পর্যন্ত কেমন নির্বাক, নিঃশব্দ নিরপেক্ষ উদাসীন রয়ে গেল এই মহান যুগ মানুষটির প্রতি, যা ভাবতে অবাক লাগে আমার।
এ নামের কোনো মানুষই যেন ছিলেন না আমাদের সমাজে, রাষ্ট্রে, কুত্রাপি। ধিক, এ অধঃপতিত স্বার্থ-প্রপীড়িত সমাজ মানস। ধিক সময়ের ক্ষুদ্রমনস্কতা।
যে সমাজ সূর্যের আলোর ছায়ায় বসবাস করেও, সূর্যের আলোক ঐশ্বর্য ও অবদান স্বীকার করে না সে সমাজের আলোর প্রত্যাশাও হয়তো একদিন ক্ষীয়মান ও স্থবির হয়ে পড়ে। আলো পেয়েও আলোরতি বৈরিতা ও কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন কোনো সুস্থ মানুষের লক্ষণ নয়। এ নির্বোধ বৈরিতায় সূর্যের তো কোনো ক্ষতি হওয়ার কারণ নেই। মানুষের সভ্যতা ও প্রগতির স্বার্থে আজরফ জীবন-দর্শন, সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতি-সমন্বিত যে গ্রন্থাবলি রচনা করে রেখে গেছেন সে থেকে এ সমাজের সচেতন মানুষ মানবিক ঐশ্বর্যময় এক আলোকিত পৃথিবীর সন্ধান পাবে, এ বিশ্বাস আমার অটুট।
অধ্যক্ষ আজরফ দর্শনকে জীবনের সঙ্গে জগতের সঙ্গে মেলাতে চেয়েছেন। দর্শন কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। যে ‘জড়সমাজ’ মানুষের যথার্থ সত্তা সম্বন্ধে সন্ধান করতে দেয় না- সেই জড়সমাজের নেতাদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি বা প্রত্যক্ষ বিরোধ তেমনভাবে কখনো গড়ে ওঠেনি। মননচর্চার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে এক উদার ও মার্জিত, শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের মাধ্যমে তিনি সামাজের পরিবর্তন ও সমাজ ব্যবস্থার রূপান্তর চেয়েছেন। অকাল অচেতন সমাজ কর্ণধারদের দ্বারা পরিচালিত এ জড়সমাজের যথার্থ মুক্তি ও বন্ধন মোচন করতে প্রয়াস পেয়েছেন তিনি। তাঁর সারাজীবনের সাধনাই ছিল এ জড়সমাজের অচলবস্থা দূর করা। জড়সমাজের কর্তারা জানেন না- এ সমাজের যৌক্তিক পরিণতি কি এবং কোথায়? মানব জীবনের উদ্দেশ্য ও সার্থকতা কি? এসব কিছুই চিন্তার অধিগম্য বিষয় নয় তাদের। জীবনের সঙ্গে সমাজের, মানব সত্তার সঙ্গে জীবনের কি সম্পর্ক এই মৌলিক জীবনাধা খুঁজে বের করে এনে এর একটা সুন্দর সমন্বয় ঘটানোর জ্ঞান অর্জন করা যায় না। গেলে-মানবজীবনের কোনো সার্থকতাই অর্জন করা যায় না। এই সত্যটি সম্পর্কে অধ্যক্ষ আজরফ আলোক দান করে গেছেন আমাদের। মানবসংস্কৃতির প্রধান হচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং মানবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সংযোগ ঘটানো। এই পরম জ্ঞান ও সত্য আমরা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি।
মানব জীবনের পরম উদ্দেশ্য আমরা সম্পাদন করতে পারি বর্তমান মানব জীবনেই। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের অনুবর্তা হয়ে মানুষ তার সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের অধিকারী হতে পারে।
‘মানব শারীর কাঠামো’ হচ্ছে এক অপূর্ব গতিশীল, জীবন্ত যন্ত্র। এই মানব শারীরকে অবলম্বন করে আমরা ‘নিত্য’ প্রাপ্ত হয়েছি। সংসার-সমুদ্র পাড়ি দেয়ার এ এক অত্যন্ত সুন্দর শকট। অত্যন্ত দুর্লভ এক তরণী। কি করে এ তরণীতে পাড়ি জমাব আমরা? আমাদের কাণ্ডারি কোথায়? পারানির কড়ি আছে, পাঞ্জেরি কোথায়?
প্রতিটি মানুষই তো এক একজন জীবন নাবিক। নাবিকী সওদাগরি সহজ সুন্দরভাবে পরিচালনার দায়িত্ব প্রতিটি মানুষেরই নিজের হাতে ন্যস্ত। কখনো বৈরী হাওয়ায়, কখনো অনুকূলে এই জীবনতরি ভেসে চলে। কাণ্ডারিকে হাল ধরতে হয় শক্ত হাতে, সাবধানে। মাস্তল সোজা করে দাঁড় করাতে হয়। তারপর কপিকল দ্বারা পাল খাটাতে হয়-আকাশ, আবহাওয়া দিগন্তের দিকে লক্ষ রেখে। সংসার-সমুদ্র পার হয়ে যেতে হবে আমাদের সবাইকে সফলভাবে, সার্থকভাবে এ থেকে কারুরই নিস্তার নেই। সাগরে জীবন জাহাজটি সঠিকভাবে ভেসে না চললে ভরাডুবি হবে সাগরের অতলগর্ভে। দুঃখময় খময় পরিণতি হবে তখন জীবনের। এই তো জীবন দর্শনের কথা। এই তত্ত্বটিই শিক্ষা দিয়েছেন আজরফ তাঁর পরিপার্শ্বের সমাজের মানুষকে। পারমার্থিক কালের আলোকের অভাব দেখে আজরফ বারবার তাঁর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। অন্ধকারের দানবদের ভ্রুকুটি দেখে তিনি শিহরিত হয়েছেন। মানবজীবনের সভাস্বরূপের জ্ঞানকে জ্ঞানের সারাতিসার চিন্তা করা যায়। জড়জগতের ভেতরে মানুষের সৃষ্টি উদ্ভব বিকাশ। তাই বলে মানুষ জড় বস্তু নয় কোনো। জড়জগতের বাসিন্দা সে। জড়জগতের ভেতর উদাসীন উদ্দেশ্যবিহীনভাবে মানুষ নিজেকে বিলীন করে দিতে পারে না। চরম উদ্দেশ্যটি পরম উদ্দেশ্যের সঙ্গে অন্তর্লীন করতে পারে সে। সৃষ্টির আদি ও অতীত উদ্দেশ্যও এটাই।
অধ্যক্ষ আজরফ এদেশের এবং উপমহাদেশের প্রবীণতম দার্শনিক শিক্ষাবিদ সুপণ্ডিত সমাজ ও সমাজ-ব্যবস্থার সমালোচক এবং সুসাহিত্যিক। মাত্র ক’দিন আগে তিনি আমাদের ধূলি ধূসর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন আরেক পৃথিবীর দিকে। সংসারের উঠোনোর আলো বাতাস ফেলে রেখে চলে গেলেন অন্য এক অনন্তের শাশ্বতের মহা পৃথিবীতে। যেখানে মানব মাত্রই একাকী এবং নিঃসঙ্গ। সেখানে সাথী কেবল নিঃশব্দ মৃত্তিকাপুঞ্জ সেখানে আর কারোর কোনো ডাক, মায়ার আহ্বান আবেগ তাঁকে স্পর্শ করবে না। অর্থাৎ স্পর্শ করবে না ইন্দ্রিয়ের আহ্বান। অতীন্দ্রিয় এক শব্দহীন, স্পর্শহীন, আলোহীন, অন্ধকারহীন, এক অনন্যপূর্ব ভুবনের বাসিন্দা এখন তিনি। তাঁর বিদেহী আত্মা এখন অনন্তের শান্তি কল্যাণ এবং মুক্তির দ্বারপ্রান্তে শায়িত। আমরা প্রার্থনা করব তাঁর জন্য কায়মনোবাক্যে তাঁর বিদেহী আত্মার পারলোকিক শান্তি কল্যাণ, মঙ্গল এবং মহাপরিত্রাণের জন্য।
লেখক পরিচিতি : একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, সাবেক ছাত্রনেতা, ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী ((১লা জানুয়ারি ১৯৪৩ – ১৯ জুন ২০২৬)। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন। কবিতা ছাড়াও তিনি গল্প, উপন্যাস, সমালোচনা ইত্যাদি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রেখেছেন। শিশু সাহিত্যেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য। বাংলা কবিতার ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত। সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ইতিহাস ও মৃত্তিকানির্ভর জীবনদর্শন তার কবিতাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা। এ কারণে তিনি ‘মৃত্তিকার কবি’ হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তিনি ছয়বার কারাবরণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও তাত্ত্বিক হিসেবেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সাহিত্যজীবনে তিনি ‘হেমলকের পেয়ালা’, ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’, ‘মৃত্তিকা, অতি মৃত্তিকা’, ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’ এবং ‘যুদ্ধ নাস্তি’সহ বহু আলোচিত কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন।



