ইনশিয়া নালাওয়ালা
আজও পৃথিবী বর্ণবাদ, বিদ্বেষ আর অজস্র পূর্বধারণার ভারে ক্লান্ত, যেন এক পুরোনো যন্ত্রণা বয়ে চলা সভ্যতা। তবু এই অন্ধকারের ভেতরেই কোথাও কোথাও দেখা যায় মানুষে মানুষে বিভাজন মুছে দেওয়ার, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভেদাভেদকে সংলাপের সেতুবন্ধনে বাঁধার এক আন্তরিক চেষ্টা। বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে সেই প্রচেষ্টা কখনো কখনো বাস্তবতার রূপ নিয়েছিল—যা আজও আমাদের সামনে এক নিঃশব্দ আহ্বানের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
বসনিয়ার ইতিহাসে আলিয়া ইজেতবেগোভিচ এমনই এক নাম, যিনি সময়ের কঠিন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে একটি জাতির মর্যাদা ও অস্তিত্বকে রক্ষার সংগ্রামে নিজেকে নিবেদন করেছিলেন। যুদ্ধ, নিপীড়ন আর ভয়াবহ সহিংসতার মধ্যেও তিনি হারাননি দৃষ্টির স্বচ্ছতা, কিংবা মানুষের প্রতি আস্থার শেষ দীপশিখা। প্রতিবেশী শক্তিগুলোর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ছিল গভীর নৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের জটিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভেতর তিনি যে নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সংঘাতের মধ্যেও সংলাপের সম্ভাবনা থাকে আর বিপর্যয়ের মাঝেও মানুষ তার মর্যাদা পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখতে পারে।
আলিয়া ইজেতবেগোভিচ (৮ আগস্ট ১৯২৫ – ১৯ অক্টোবর ২০০৩) ছিলেন বসনিয়ার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক ব্যক্তিত্ব। তিনি আইনজীবী, ইসলামি চিন্তাবিদ ও লেখক হিসেবে যেমন পরিচিত, তেমনি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৯৯২ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে তিনি দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার প্রেসিডেন্সির সদস্য হিসেবে ২০০০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে যুক্ত ছিলেন।
তিনি পিডিএ (Party of Democratic Action) দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম সভাপতি ছিলেন, যা বসনিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি লেখালেখিতেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য Islam Between East and West এবং The Islamic Declaration যা ইসলামি চিন্তাজগতে ব্যাপক আলোচিত ও প্রভাবশালী রচনা হিসেবে পরিচিত।
আলিয়া ইজেতবেগোভিচ ১৯২৫ সালের ৮ আগস্ট বসনিয়ার বোসানস্কি শামাক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। তাঁর পরিবার সামাজিকভাবে সম্ভ্রান্ত বংশের হলেও আর্থিকভাবে ছিল দুর্বল। পিতার দিক থেকে তাঁর বংশধারা ছিল বেলগ্রেডের এক প্রাচীন ও অভিজাত পরিবার—ইজ্জত-বেগ জাহিচের উত্তরসূরি, যিনি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সার্বিয়া থেকে উসমানীয় শাসন প্রত্যাহারের পর বসনিয়ায় এসে বসতি স্থাপন করেন।
পারিবারিক ইতিহাসে নানা ঐতিহাসিক পরত জড়িয়ে আছে। তাঁর পিতামহ উস্কুদারে সৈনিক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় এক তুর্কি নারীকে বিবাহ করেন, এবং পরে পরিবার নিয়ে বোসানস্কি শামাকে স্থায়ী হন। বলা হয়, তাঁর দাদা শহরের মেয়রও হয়েছিলেন এবং এক সংকটময় সময়ে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বহু মানুষের প্রাণরক্ষা করেছিলেন।
তাঁর পিতা মুস্তফা কামাল ছিলেন হিসাবরক্ষক এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সেনাবাহিনীর হয়ে ইতালীয় ফ্রন্টে যুদ্ধ করেন, যেখানে তিনি গুরুতর আহত হন। সেই আঘাত তাঁকে দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে দুর্বল করে রাখে। পরবর্তী সময়ে আর্থিক সংকটে পরিবারটি এক পর্যায়ে দেউলিয়াত্বের মুখেও পড়ে। পরে তারা সারায়েভোতে স্থানান্তরিত হন, যেখানে আলিয়া একটি তুলনামূলক সেক্যুলার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন ও শিক্ষালাভ করেন।
যৌবনে তিনি ১৯৪১ সালে “ইয়ং মুসলিমস” নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন, যা মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়ে এই তরুণ আন্দোলন নানা রাজনৈতিক ধারার মাঝে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তখন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মত ও বিতর্ক তৈরি হয়, যদিও অনেক অভিযোগ ও দাবির পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি একবার সার্ব রাজকীয় চেটনিকদের হাতে আটক হন, তবে পারিবারিক অতীতের মানবিক ভূমিকার কারণে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয় বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে যুদ্ধ শেষে কমিউনিস্ট যুগোস্লাভিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগ আনা হয় এবং ১৯৪৬ সালে তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কারাবাসের আগেই তিনি সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। কারামুক্তির পর তিনি ধীরে ধীরে আবারও রাজনৈতিক জীবনে ফিরে আসেন এবং পরবর্তী দশকগুলোতে তাঁর চিন্তা, সংগঠন ও নেতৃত্ব বসনিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে যায়।
শৈশব থেকেই তাঁর ভেতরে গড়ে উঠেছিল এক দৃঢ় নৈতিক বোধ—যেন অন্তরের গভীরে জ্বলে থাকা এক অবিচল দীপশিখা। জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি সংঘাতে তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের আসল শক্তি অস্ত্র বা ক্ষমতায় নয়; তা নিহিত থাকে নৈতিকতার ভিতরেই, সেই অদৃশ্য কিন্তু অটুট ভিত্তিতে।
তাঁর কাছে নীতি-নৈতিকতা ছিল জীবনের পথচলার দিকনির্দেশ, সংগ্রামের ভেতর জেগে ওঠা এক নিরব শক্তি। তিনি মনে করতেন, মানুষ যতক্ষণ নৈতিকতার আলোয় নিজের জীবনকে গড়ে তোলে, ততক্ষণ তার অস্তিত্ব অর্থহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে যায় না।
এই বিশ্বাসই তাঁর কাছে জীবনকে করে তুলেছিল লক্ষ্যপূর্ণ, গভীর ও অর্থবহ যেখানে জয়-পরাজয়ের বাইরেও থেকে যায় মানুষের অন্তর্গত সত্যের এক অনড় আহ্বান।
১৯৭০ সালে আলিয়া ইজেতবেগোভিচ “ইসলামিক ডিক্লারেশন” নামে একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ইসলাম, রাষ্ট্র এবং সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। এতে তিনি ইসলামী ঐতিহ্য ও আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার অগ্রগতির মধ্যে একটি সমন্বয়ের সম্ভাবনা খুঁজে দেখার চেষ্টা করেন।
ঘোষণাপত্রটি যুগোস্লাভিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত হওয়ায় দ্রুতই বিতর্কের জন্ম দেয় এবং পরবর্তীতে সরকার এটি নিষিদ্ধ করে। এতে তিনি কেবল বসনিয়া বা যুগোস্লাভিয়ার প্রসঙ্গ নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এক ধরনের ইসলামী পুনর্জাগরণের আহ্বানও উপস্থাপন করেন।
এই লেখাকে কেন্দ্র করে কমিউনিস্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে তিনি পূর্বের “ইয়ং মুসলিমস” সংগঠনকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। এই অভিযোগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ।
ঘোষণাপত্রে পাকিস্তানকে তিনি এমন একটি দেশের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন, যাকে মুসলিম বিশ্বে একটি সম্ভাব্য মডেল হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে একটি অংশে রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর মন্তব্য—যেখানে তিনি ইসলামী বিশ্বাস ও অ-ইসলামী রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে টানাপোড়েনের কথা বলেন—তা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
পরবর্তীকালে এই লেখাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে নানা ব্যাখ্যা ও সমালোচনা উঠে আসে। বসনিয়ার সার্ব জাতিগোষ্ঠী এবং তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এটিকে প্রায়শই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিছু পশ্চিমা লেখকও এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত হন।
তবে ইজেতবেগোভিচ নিজে বারবার স্পষ্ট করে বলেন, তাঁর বক্তব্যকে আক্ষরিক বা সরলভাবে না দেখে তৎকালীন রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক প্রেক্ষাপটে বোঝা উচিত এবং বসনিয়ার বাস্তবতার ক্ষেত্রে তিনি কোনো কঠোর ধর্মীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিকল্পনা করেননি। তবুও এই ঘোষণাপত্রকে ঘিরে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়ে গেছে।
ইজেতবেগোভিচ ১৯৪৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রথমবার গ্রেফতার হন। সে সময় তিনি এমন একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা মানবাধিকার ও ধর্মীয় অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিত। এই সম্পৃক্ততার কারণে তাঁকে বিভিন্ন অভিযোগে মোট আট বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালের এপ্রিল মাসে আবারও তাঁর বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই মামলায় তাঁর সঙ্গে আরও বারোজন বসনিয়াক কর্মীকে সারায়েভো আদালতে হাজির করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল “জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপ” ও “রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা” চালানো। অভিযোগের ভাষা ছিল রাজনৈতিকভাবে তীব্র ও বিস্তৃত যেখানে তাদেরকে সংগঠিতভাবে রাষ্ট্রবিরোধী মতাদর্শ ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।
ইজেতবেগোভিচের বিরুদ্ধে বিশেষভাবে আরও অভিযোগ আনা হয় যে তিনি ইরানে একটি মুসলিম কংগ্রেসে অংশগ্রহণ বা তার সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। এই বিচার শেষে সকল অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তাঁকে চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে এই রায় আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হেলসিঙ্কি ওয়াচসহ একাধিক মানবাধিকার সংস্থা দাবি করে যে, এই মামলা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং এতে সহিংসতা বা সশস্ত্র কার্যকলাপের কোনো সুস্পষ্ট অভিযোগ ছিল না। তাদের মতে, এটি ছিল মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক ভিন্নমতের বিরুদ্ধে দমনমূলক পদক্ষেপ।
পরবর্তীতে বসনিয়ার সুপ্রিম কোর্টও রায় পুনর্বিবেচনা করে জানায় যে অভিযুক্তদের কিছু কর্মকাণ্ডকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। এরপর তাঁর সাজা কমিয়ে বারো বছর করা হয়।
শেষ পর্যন্ত ১৯৮৮ সালে, প্রায় পাঁচ বছর কারাবাসের পর কমিউনিস্ট শাসনের অবসানকালীন সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে তিনি মুক্তি পান। দীর্ঘ কারাবাস তাঁর শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে, কিন্তু রাজনৈতিক জীবনে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল আরও দৃঢ় ও সক্রিয়।
১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে যুগোস্লাভিয়ায় যখন বহু-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার সূচনা ঘটে, তখন আলিয়া ইজেতবেগোভিচ এবং তাঁর সহযাত্রীরা ১৯৮৯ সালে “পার্টি অব ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন” (SDA) প্রতিষ্ঠা করেন। এই দলটি মূলত বসনিয়াক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। একই সময়ে দেশের অন্যান্য প্রধান জাতিগত গোষ্ঠী সার্ব ও ক্রোয়াটরাও—নিজ নিজ জাতিগত ভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করে, যথাক্রমে SDS এবং HDZ BiH।
১৯৯০ সালের প্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে SDA উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে এবং মোট ভোটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। একই নির্বাচনে সার্ব ও ক্রোয়াটদের প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয়তাবাদী দলগুলোও শক্ত অবস্থান লাভ করে, ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল দ্রুতই জাতিগত ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
সেই নির্বাচনে বসনিয়াক প্রার্থীদের মধ্যে ফিকরেত আবদিচ জনপ্রিয় ভোটে এগিয়ে ছিলেন, তিনি প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পান, আর ইজেতবেগোভিচ পান প্রায় ৩৭ শতাংশ ভোট। তবে বসনিয়ার সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্সি ব্যবস্থা ছিল সমষ্টিগত ও ঘূর্ণায়মান যেখানে তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠী থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হতেন।
এই কাঠামোর অধীনে সাত সদস্যবিশিষ্ট বহুজাতিক প্রেসিডেন্সি গঠিত হয়, যেখানে বসনিয়াক, সার্ব, ক্রোয়াট ও একজন যুগোস্লাভ প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে ইজেতবেগোভিচ পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা তাঁকে নতুন রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বে নিয়ে আসে।
এই সময়টি ছিল বসনিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল অধ্যায়—যেখানে গণতন্ত্রের সূচনা যেমন ঘটছিল, তেমনি জাতিগত বিভাজনের চাপও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ভঙ্গুর ক্ষমতা-ভাগাভাগির ব্যবস্থা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। প্রতিবেশী ক্রোয়েশিয়ায় সার্ব ও ক্রোয়াটদের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ফলে পুরো অঞ্চলে জাতিগত উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব বসনিয়ার ভেতরেও তীব্রভাবে অনুভূত হয়, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থান আরও অনমনীয় হয়ে ওঠে।
সংবিধান অনুযায়ী ইজেতবেগোভিচের প্রেসিডেন্সি নেতৃত্বে থাকার কথা ছিল সীমিত সময়ের জন্য, কিন্তু ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে এই ব্যবস্থাকে কার্যত স্থগিত রাখা হয়। যুদ্ধাবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বহু-জাতিগত শাসন কাঠামো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সংঘাতের বাস্তবতায় তা পুরোপুরি ভেঙে যায়।
এই সময়ে সার্ব ও ক্রোয়াট জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতি ঘটে। বসনিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য বজায় রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যখন ১৯৯১ সালে স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হয়। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা খুব শিগগিরই একই ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে।
এই উত্তাল সময়ে ইজেতবেগোভিচ শুরুতে একটি শিথিল কনফেডারেশন কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষার চেষ্টা করেন এবং ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান। তাঁর অবস্থান ছিল একটি সার্বভৌম বসনিয়ার বিনিময়ে শান্তি বিসর্জন দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু শান্তির বিনিময়ে সার্বভৌমত্বও ত্যাগ করা যাবে না এমন এক কঠিন রাজনৈতিক দ্বিধার মধ্যে তিনি অবস্থান করছিলেন।
১৯৯২ সালের শুরুর দিকে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে: বসনিয়াক ও ক্রোয়াটরা স্বাধীন রাষ্ট্র চাইলেও সার্বরা মূলত সার্বিয়া-নিয়ন্ত্রিত যুগোস্লাভ কাঠামোর মধ্যেই থাকতে আগ্রহী ছিল। ফলে পরস্পরবিরোধী জাতীয়তাবাদী লক্ষ্যগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে ইজেতবেগোভিচ রাজনৈতিক চাপের কথা উল্লেখ করে পরিস্থিতিকে এমন এক দ্বন্দ্ব হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে দুটি ভয়াবহ বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হচ্ছে যার কোনোটিই সহজ বা গ্রহণযোগ্য নয়।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পর্তুগিজ কূটনীতিক হোসে কুতিলেইরো একটি প্রস্তাব দেন, যা পরে লিসবন পরিকল্পনা নামে পরিচিত হয়। এতে বসনিয়াকে একটি ত্রিজাতিক ক্যান্টোনাল রাষ্ট্রে রূপান্তরের কথা বলা হয়। প্রাথমিকভাবে তিন পক্ষই এতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ইজেতবেগোভিচ তাঁর অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ান এবং বসনিয়ার বিভাজনের যেকোনো পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি বসনিয়ার ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থানে পৌঁছান, যা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে আরও জটিল ও সংঘাতমুখী করে তোলে।
১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলিয়া ইজেতবেগোভিচ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গণভোটের আহ্বান জানান, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সার্ব সদস্যরা এটিকে সংবিধানবিরোধী বলে সতর্ক করে এবং এটি রাষ্ট্র বিভক্তির দিকে একপা অগ্রসর হওয়া হিসেবে আখ্যায়িত করে।
গণভোটে প্রায় ৬৩ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করে এবং এর মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ স্বাধীনতার পক্ষে মত দেয়। তবে বসনিয়ান সার্ব জনগোষ্ঠী মূলত এই গণভোট বয়কট করে। সংবিধানগতভাবে রাষ্ট্রের মর্যাদা পরিবর্তনের জন্য তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর সর্বসম্মত সম্মতি প্রয়োজন ছিল এমন যুক্তিও তখন সামনে আনা হয়। পাশাপাশি আরও একটি সাংবিধানিক বিকল্প ছিল, যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ জনগণের সম্মতিতে যুগোস্লাভ ফেডারেশন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যেত, যদিও সেটিও বাস্তব রাজনৈতিক বিভাজনকে দূর করতে পারেনি।
তবুও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র গণভোটের ফলাফলকে কার্যত স্বীকৃতি দেয়। এরপর ১৯৯২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বসনিয়ান পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়, এবং ৩ মার্চ ইজেতবেগোভিচ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কার্যকরভাবে আসে ৭ এপ্রিল, যখন পশ্চিমা বিশ্ব নতুন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদান করে।
এই সময়েই পরিস্থিতি দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়। সার্ব ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ইজেতবেগোভিচের ধারণা ছিল, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর শান্তিরক্ষী বাহিনী দ্রুত মোতায়েন করা হবে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। ফলে দুর্বলভাবে সজ্জিত সরকারি বাহিনী এক শক্তিশালী সামরিক জোটের মুখোমুখি হয়ে পড়ে এবং বহু অঞ্চল দ্রুতই সার্ব বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে পূর্ব বসনিয়ায় বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। গ্রাম ও শহর দখলের পর সেগুলো লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়, এবং বহু মানুষ আটক বা নিহত হয়। নারীদের ও পুরুষদের আলাদা করে বন্দিশিবিরে রাখা হয় যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা গুরুতর অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়।
এদিকে ইজেতবেগোভিচ বহুজাতিক ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন বসনিয়ার ধারণা বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান, যদিও পরিস্থিতি ক্রমেই তার বিপরীত দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। বসনিয়ান ক্রোয়েটরা ধীরে ধীরে নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং পরে “হার্জেগ-বসনিয়া” নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত কাঠামো গঠন করে, যা সংঘাতকে আরও জটিল করে তোলে। ১৯৯৩ সালে বসনিয়াক ও ক্রোয়েটদের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়, যা যুদ্ধের ভেতরে আরেকটি যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করে।
এই জটিলতার মাঝেই ফিকরেত আবদিচ পশ্চিম বসনিয়ায় আলাদা একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠনের চেষ্টা করেন, যা অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আরও গভীর করে। একই সময়ে ইজেতবেগোভিচের সরকার মূলত দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম ছিল এবং প্রধানত বসনিয়াক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছিল।
যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি অবরুদ্ধ সারায়েভোতে অবস্থান করেন, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে শহরটি ঘেরাও অবস্থায় ছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াকে তিনি প্রায়ই ধীর ও অপর্যাপ্ত বলে সমালোচনা করেন এবং সহায়তার জন্য মুসলিম বিশ্বের দিকে মনোযোগ দেন। এই সময়ে বিদেশি মুসলিম স্বেচ্ছাসেবীরা বসনিয়ান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হন, যদিও তাদের উপস্থিতি নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে ধীরে ধীরে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার হয় এবং বসনিয়াক ও ক্রোয়েটদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সার্ব বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের সহযোগিতা আরও বাড়ায়। আন্তর্জাতিক চাপ, ন্যাটোর সীমিত সামরিক হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন শান্তি প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তিত হতে শুরু করে।
এই দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় বসনিয়ার ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করে, যেখানে রাজনৈতিক আদর্শ, জাতিগত বিভাজন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি এক জটিল ও করুণ সংঘাতের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়।
১৯৯৫ সালের নভেম্বরে ডেটন শান্তি চুক্তির মাধ্যমে বসনিয়ার যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলে আলিয়া ইজেতবেগোভিচ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার প্রেসিডেন্সির সদস্য হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন পর্বে প্রবেশ করেন। যুদ্ধ-পরবর্তী এই সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশের শাসন কাঠামোর ওপর নজরদারি জোরদার করে এবং “হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ” নামে একটি পদ সৃষ্টি করে, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তদারকির আওতায় আনা হয়। এর ফলে প্রেসিডেন্সি ও অন্যান্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে।
যুদ্ধোত্তর বাস্তবতার এই জটিল কাঠামোর মধ্যেও ইজেতবেগোভিচ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকেন। তবে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে তাঁর ভূমিকা সীমিত হয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালের অক্টোবরে, ৭৪ বছর বয়সে তিনি প্রেসিডেন্সি থেকে পদত্যাগ করেন।
তবুও বসনিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে অটুট থাকে। অনেকে তাঁকে স্নেহভরে “ডেডো” অর্থাৎ “দাদা” নামে ডাকতেন, যা তাঁর প্রতি এক ধরনের আবেগপূর্ণ শ্রদ্ধার প্রকাশ হিসেবে দেখা হতো। পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক দল জনসমর্থনের ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের সাধারণ নির্বাচনে আবারও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ফিরে আসে।
তাঁর শাসনকাল নিয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। কিছু পর্যবেক্ষক তাঁর নেতৃত্বকে জাতীয়তাবাদী প্রবণতা ও কেন্দ্রীভূত শাসনের বৈশিষ্ট্যযুক্ত বলে বর্ণনা করেছেন। তবে অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বিভক্ত একটি রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজনে এমন শাসনধারা অনেকাংশে সময়ের বাস্তবতারই প্রতিফলন ছিল।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন একদিকে যেমন স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, অন্যদিকে তেমনি যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের জটিল বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
২০০৩ সালের ১৯ অক্টোবর, নিজের বাড়িতে পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর আলিয়া ইজেতবেগোভিচ জটিল হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর বসনিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
তিন দিন পর, ২২ অক্টোবর সারায়েভোতে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এই শেষ বিদায়ে উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত ও আন্তর্জাতিক মাত্রার। বসনিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্রায় ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তুরস্কের গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ১০৫ জন সদস্যও এই জানাজায় অংশ নেন। দেশ-বিদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ—প্রায় ১০০,০০০ থেকে ১৫০,০০০ জন তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন। এছাড়া তাঁর পরিবার প্রায় ৪,০০০-এরও বেশি শোকবার্তা টেলিগ্রাম গ্রহণ করে। সেই সময়ে ৪০০-এরও বেশি সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন এবং অন্তত ৩৭টি টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
তাঁর মৃত্যুর পর সারায়েভোর একটি প্রধান সড়কের নাম পরিবর্তন করে তাঁর নামে নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা পূর্বে মার্শাল টিটোর নামে পরিচিত ছিল। একই সঙ্গে সারায়েভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।
পরিবারের মধ্য থেকেও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অব্যাহত থাকে। তাঁর পুত্র বাকির ইজেতবেগোভিচ এবং দুই নাতনি জেসমিনা ও মিরজেলা পরবর্তীতে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন।
তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর পর, ২০০৬ সালের ১২ আগস্ট সারায়েভোর কোভাচি কবরস্থানে তাঁর সমাধিতে একটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যাতে কবরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এই ঘটনার দায়ী ব্যক্তিদের পরিচয় কখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
আলিয়া ইজেতবেগোভিচ ছিলেন একজন চিন্তাশীল লেখক ও ইসলামি বৌদ্ধিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। তাঁর রচনাগুলোতে রাজনীতি, দর্শন, ধর্ম ও নৈতিকতার জটিল সম্পর্ক এক গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে উঠে এসেছে। কারাবাসের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও সভ্যতার প্রশ্ন সবকিছুই তাঁর লেখায় এক ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা ও বৌদ্ধিক অনুসন্ধানের রূপ পেয়েছে। বিশেষ করে “Islam Between East and West” বা “The Islamic Declaration”-এর মতো গ্রন্থগুলো তাঁকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত চিন্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। নিচে ইংরেজি ও বসনীয় ভাষায় রচিত তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ উপস্থাপন করা হলো—
Islam Between East and West — American Trust Publications (1985)
Inescapable Questions: Autobiographical Notes — Islamic Foundation (2003)
Izetbegović of Bosnia and Herzegovina: Notes from Prison, 1983–1988 — Greenwood Press (2001)
Notes From Prison (1983–1988)
The Islamic Declaration — SN (1991)
★ Bosnian (Bosanski)
Govori i pisma — SDA (1994)
Rat i mir u Bosni i Hercegovini — Biblioteka Posebna izdanja, Vijeće Kongresa bošnjačkih intelektualaca (1998)
Moj bijeg u slobodu: Bilješke iz zatvora 1983–1988 — Biblioteka Refleksi, Svjetlost (1999)
Islamska deklaracija — Mala muslimanska biblioteka, Bosna (1990)
তাঁর রাজনৈতিক জীবন যেমন সংগ্রাম ও বিতর্কে পূর্ণ, তেমনি তাঁর চিন্তাগত জীবনও গভীর নৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্নে সমৃদ্ধ। যুদ্ধ, বিভাজন ও সহিংসতার কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তিনি বারবার নৈতিকতা, সহাবস্থান এবং মানবিক মর্যাদার গুরুত্বের কথা বলেছেন।
দীর্ঘ কারাবাস, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র গঠনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে আলিয়া ইজেতবেগোভিচ বসনিয়ার ইতিহাসে গভীরভাবে প্রভাবশালী একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
লেখক পরিচিতি : স্টাফ রাইটার, গ্লোবাল নিউজ ৩৬০।

