মুসা আল হাফিজ

সায়্যিদুনা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর মহান সাধনাসম্পদকে আমরা এখনো আবিষ্কার করতে পারিনি পুরোটা। কম আবিষ্কৃত তাঁর অনন্য কাজের একটা হলো আল-ইনতিবাহাতুল মুফীদাহ আনিল ইশতিবাহাতিল জাদীদাহ।

গ্রন্থটি রচিত হয় এমন এক সন্ধিক্ষণে, যখন মুসলিম সমাজ পশ্চিমা আধুনিকতা, বস্তুবাদ ও যুক্তিবাদ-এর চাপে নিজেদের চিন্তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছিল। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা ও তথাকথিত বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যাপদ্ধতির প্রভাবে ধর্মীয় বিধানকে যুক্তির বিচারে যাচাই করতে গিয়ে সংশয়ে নিমজ্জিত হন বহু মুসলমান। থানভী (রহ.) এই গ্রন্থে সেই আকলসেন্ট্রিক (reason-centered) চিন্তাধারার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেন এবং ওহিভিত্তিক ইসলামি জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার বয়ান হাজির করেছেন।

গ্রন্থটির ভিত্তি হলো সপ্ত ‘উসূল’, যা ইসলামি জ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো নির্ধারণ করে। এই উসূলগুলো বুদ্ধি ও ওহীর সম্পর্কের পুরনো বিতর্কের একটি পরিশীলিত সুরাহা প্রস্তাব করে। যুক্তি, ওহি, অভিজ্ঞতা ও কুদরতের সম্পর্ক স্পষ্ট করে দেয়। এই উসূলগুলো বানান করে বুঝিয়ে দেয় যে, ইসলাম কেবল আবেগ বা অন্ধবিশ্বাস নয়; বরং এক দার্শনিকভাবে সংহত বিশ্বদৃষ্টি।

বইটি থানভীর মেজাজের ভারসাম্যের সুরে প্রগাঢ় কণ্ঠস্বরে বলতে থাকে, যুক্তি ও ওহির আন্ত:সম্পর্ক সংঘাতনির্ভর নয়, বরং উভয়ের মধ্যে পরিপূরক সম্পর্ক রয়েছে। বইটি ঘোষণা করে, বস্তুজগতের সীমা ছাড়িয়ে জ্ঞান ও অস্তিত্বের এক অদৃশ্য স্তর আছে, যেখানে মানববুদ্ধি পৌঁছাতে পারে না। কারণ মানববুদ্ধি ইন্দ্রিয়নির্ভর আর গাইবের জগত ইন্দ্রিয়াতীত। ফলে গাইবের ইলমের জন্য ওহীর আশ্রয় ছাড়া উপায় নেই।

গ্রন্থটিতে আছে ষোলোটি ইনতিবাহ। তাদের তাৎপর্যও গভীরতর। প্রত্যেক ইনতিবাহ-এ বিধৃত আছে আধুনিকতাবাদী চিন্তার এক বা একাধিক ত্রুটির উসূল ও নীতিভিত্তিক নিরসন।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

আধুনিকতার সঙ্গে বিতর্ক করেছেন আশরাফ আলী থানভী রহ.। এই বিতর্কে তিনি কোনো অন্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাননি; বরং আধুনিক যুক্তিবাদের অভ্যন্তরীণ সীমা ও নৈতিক শূন্যতাকে অনাবৃত করেছেন। তিনি দেখান, যুক্তি যদি কেবল ইন্দ্রিয়জ তথ্যের ওপর নির্ভর করে, তবে তা চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছতে অক্ষম। বস্তু (Matter) ও কুদরত (Nature) আল্লাহর সৃষ্ট, তারা নিজস্ব কোনো স্বাধীন সত্তা নয়। আধুনিকতা মানুষকে সৃষ্টির কেন্দ্র বানিয়ে খোদাকেন্দ্রীয়তা হারিয়েছে; ইসলাম তার উল্টো দিকের দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছে। এখানে মানুষ কেন্দ্রে বটে, কিন্তু সৃষ্টি জগতে সে আল্লাহর আদেশের অধীন। মানুষের খিলাফত ও দায়িত্ববোধের ফ্রেমওয়ার্কে সে নিয়ন্ত্রিত, এই ফ্রেমওয়ার্ক নিহিত আছে তার ফিতরাতে, এর রূপায়ন ঘটেছে খোদাপ্রদত্ব শরিয়ায়।

আল-ইনতিবাহাত-এর বৈশিষ্ট্য হলো, থানভী রহ. যুক্তির ব্যবহার করেছেন ইসলামের ভেতর থেকেই। তিনি কুরআন, হাদীস ও কালামি যুক্তির সংমিশ্রণে ‘আধুনিক ইলমুল কালাম’-এর এক রূপ নির্মাণ করেছেন। তাঁর লক্ষ্য বিতর্ক নয়, ইনতিবাহ অর্থাৎ চিন্তার জাগরণ ও অন্তর-বোধের পুনরুজ্জীবন। এভাবে গ্রন্থটি হয়ে ওঠেছে সমকালে ইসলামি চিন্তার আত্মগঠনমূলক প্রয়াস। এখানে ইসলামি দর্শন, তাসাউফ ও কালামের সমন্বয় ঘটেছে। মুসলিম চিন্তাজগতে যুক্তি ও ওহির সহাবস্থানের এক দৃষ্টান্ত রচিত হয়েছে।

রচিত হবার সময় যতোটা প্রাসঙ্গিক ছিলো গ্রন্থটি, আজও ততোটাই প্রাসঙ্গিক। বরং সেই প্রাসঙ্গিকতা আরো বেড়েছে। কারণ সমসাময়িক ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট- সেক্যুলারিজম, সায়েন্টিজম ও নিউ-এথিজমের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে মুসলিম জাহানকে। সেখানে ইসলামী চিন্তাপদ্ধতির তরফে ভাষা ও যুক্তিগঠনের জন্য থানভী রহ. আদর্শ রূপকল্প হাজির করেছেন।

আধুনিক সন্দেহবাদ, বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তিবাদকে ইসলামের অভ্যন্তরীণ জ্ঞানের শক্তি ও সংহতি দিয়ে মোকাবেলা না করলে ভালো করতে গিয়ে বহু খারাপ জন্ম নেয়। থানভীর পদ্ধতি সেই দিক থেকে ইসলামের নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো ও চিন্তাব্যবস্থাজাত মোকাবেলা, এই মোকাবেলার প্রয়োজনে তিনি ইসলামের জ্ঞান ও চিন্তাব্যবস্থার নেযামে কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। অনেকেই সেই কাণ্ড ঘটিয়েছেন এবং বিষবৃক্ষের ডালপালা কাটতে গিয়ে আরো কিছু বিষবৃক্ষের চারা রোপণ করেছেন। উসুলের আনুগত্য এবং শাসনের মধ্যে থাকলে এই সংকট তৈরী হতো না। থানভীর কাজে আমরা দেখি, প্রবল, সবল মোকাবেলা এবং ইসলামের চাহিদা ও মেজাজকে চালক বানিয়ে মোকাবেলার পথ।

আমি এ গ্রন্থটিকে তাঁর ‘বুদ্ধিবৃত্তিক কারামত’ হিসেবে শ্রদ্ধা করি। ‘মডার্নিজম: মুক্তি ও মোকাবেলা’ নামে বাংলায় বইটি প্রকাশিত হয়েছে স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মক্তব থেকে। কাজী একরাম বরাবরের মতো সাবলীল ও মেজাজ-সংগত অনুবাদ করেছেন। তার হাত থেকে আরো কল্যাণী কাজের প্রতীক্ষা থাকবে।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.