মূল : আবুল মনসুর আহমদ
তরজমা : অনিন্দ্য রূপম খান
[আবুল মনসুর আহমদ আধুনিক বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এক বিশিষ্ট নাম একাধারে সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিক। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮ সালে এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৮ মার্চ ১৯৭৯ সালে। তাঁর জীবন ও কর্ম বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। এই নিবন্ধটি মূলত The Observer পত্রিকায় ২৭ এপ্রিল ১৯৬৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। গত ২৭ এপ্রিল ছিল আবুল কাশেম ফজলুল হক–এর ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক দর্শন ও চিন্তার প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে এই নিবন্ধটির অনুবাদ ‘পরম্পরা’ পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো। সম্পাদক]
এক.
আবুল কাশেম ফজলুল হক কোনো একক ব্যক্তি ছিলেন না—তিনি ছিলেন একটি চলমান প্রতিষ্ঠান। তাঁর সমালোচক ও অনুরাগী উভয় পক্ষই এই কথাটি উচ্চারণ করেছেন এবং তা অমূলক নয়। তবে “প্রতিষ্ঠান” অভিধাটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য খুব কম মানুষই সত্যিকার অর্থে অনুধাবন করেছেন। অধিকাংশের দৃষ্টিতে তিনি প্রতিষ্ঠান কেবল প্রচলিত অর্থে—এক বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব, ঘটনাবহুল জীবন, আপাতবিরোধী মতাদর্শ, দুর্বোধ্য স্ববিরোধিতা, দুঃসাহসী ও নির্লজ্জ অসঙ্গতি, গোপন দানশীলতার প্রায় উন্মত্ত প্রবণতা, মহিমান্বিত সাফল্যের পাশে অতল ব্যর্থতা এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তার মাঝেও শিশুসুলভ ভুলে পরিপূর্ণ এক বৈপরীত্যময় জীবন। যেন উত্তাল সমুদ্র—যেখানে মুক্তা ও কাদামাটি পাশাপাশি অবস্থান করে।
কিন্তু এই মূল্যায়নেও একটি মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে। ফজলুল হকের চরিত্রের দুটি গভীর বৈশিষ্ট্য প্রায়শই অনালোচিত থেকে যায়। প্রথমত, তাঁর অদম্য আত্মবিশ্বাস—প্রতিটি রাজনৈতিক বিরোধে তিনি বিশ্বাস করতেন, ভুলটি তাঁর প্রতিপক্ষের, তাঁর নিজের নয়। দ্বিতীয়ত, তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি—তিনি কখনো নিজের ভাগ্যের নিয়ন্তা হতে চাননি; বরং ঘটনাপ্রবাহ ও আকস্মিকতাকে নিজের জীবনের ভেতর কাজ করতে দিয়েছেন।
এই দুই বৈশিষ্ট্যকে একত্রে না দেখলে ফজলুল হকের জীবনকে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ তাঁর রাজনীতি কোনো সুসংহত মতাদর্শের রৈখিক বাস্তবায়ন ছিল না; বরং ইতিহাসের অনিশ্চয়তা, উপনিবেশিক সংকট, মুসলিম সমাজের পশ্চাৎপদতা, বাঙালি জাতিসত্তার উত্থান এবং ব্যক্তিগত অন্তর্দ্বন্দ্ব—এসবের এক জটিল সম্মিলন ছিল তাঁর রাজনীতিতে। তিনি নিজেকে ইতিহাসের নির্মাতা যেমন ভাবতেন, তেমনি ইতিহাসের অনির্দেশ্য স্রোতের কাছেও নিজেকে সমর্পণ করতেন।
ফলে আবুল কাশেম ফজলুল হক–এর জীবনকে কোনো একক রাজনৈতিক সূত্রে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে প্রবল আত্মবিশ্বাসী এবং ভাগ্যনির্ভর; একই সঙ্গে গণনেতা ও নিঃসঙ্গ ব্যক্তি; একই সঙ্গে মুসলিম জনসমাজের কণ্ঠস্বর এবং এক বৃহত্তর বাঙালি রাজনৈতিক কল্পনার ধারক। তাঁর জীবনের “অসঙ্গতি” আসলে সেই ঔপনিবেশিক যুগেরই প্রতিফলন, যেখানে জাতি, ধর্ম, শ্রেণি ও ভূরাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষে লিপ্ত।
এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে আবুল কাশেম ফজলুল হক কে কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক হিসাব–নিকাশের রাজনীতিক হিসেবে বোঝা যায় না; বরং তিনি অনেক বেশি পরিচালিত হতেন অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা। তাঁর জীবন ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমরা প্রায়ই বলেছি তিনি যুক্তির চেয়ে হৃদয়ের অনুসারী, বিবেচনার চেয়ে আবেগের প্রতি অধিক অনুগত। কিন্তু “অন্তর্দৃষ্টি” বা অন্তঃপ্রজ্ঞার প্রশ্নটি সচরাচর আলোচনায় আসে না।
অথচ অন্তর্দৃষ্টি নিছক প্রবৃত্তি বা হঠকারী আবেগ নয়। এটি এমন এক গুপ্ত বোধের পথ, যার মাধ্যমে মানুষ কখনো কখনো সত্যের সান্নিধ্যে পৌঁছায় অথবা সত্য নিজেই মানুষের চেতনায় আকস্মিক আলোকরেখার মতো উদ্ভাসিত হয়। ফজলুল হকের বহুল আলোচিত অস্বাভাবিকতা, তাঁর আপাত-অসংগত আচরণ, রাজনৈতিক দোদুল্যমানতা কিংবা হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন এসবকে যদি এই অন্তঃপ্রজ্ঞার আলোয় পাঠ করা যায়, তবে তাঁর জীবন এক ভিন্ন অর্থ ধারণ করে।
তখন মনে হয়, তিনি যেন নিজেকে একটি ঐতিহাসিক দায় বা নিয়তির বাহক হিসেবে অনুভব করতেন। তাঁর রাজনীতি ছিল এক ধরনের অন্তর্লৌকিক বিশ্বাসের অনুসরণ। তিনি মনে করতেন, তাঁর ভেতরে এমন এক আহ্বান কাজ করছে, যা প্রচলিত রাজনৈতিক যুক্তির চেয়ে গভীরতর। আর সেই কারণেই তিনি প্রায়ই সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিন্তু নিজের অবস্থান সম্পর্কে কখনো দ্বিধাগ্রস্ত হননি।
খোলাসা করে বললে বলতে হয়, আবুল কাশেম ফজলুল হক এর জীবনকে বুঝতে হলে তাঁকে এক ধরনের অন্তঃপ্রজ্ঞাপ্রসূত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও দেখতে হবে যিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি একটি নির্দিষ্ট মিশনের জন্যই ইতিহাসে আবির্ভূত হয়েছেন৷
১৯৩৫ সালে এক মরণব্যাধি থেকে অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার পর আবুল কাশেম ফজলুল হক দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন “এত ভয়াবহ রোগ থেকে আমার এই আশ্চর্য আরোগ্য প্রমাণ করে, আল্লাহ আমাকে একটি মহৎ দায়িত্ব সম্পন্ন করার জন্যই জীবিত রেখেছেন।” যদিও তিনি এই উপলব্ধিকে প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেন ওই বিশেষ মুহূর্তে, বাস্তবে সম্ভবত বহু আগ থেকেই তাঁর ভেতরে এই বিশ্বাস সক্রিয় ছিল।
তবে সেই “মহৎ দায়িত্ব” সম্পর্কে তাঁর নিজের ধারণাও হয়তো সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট ছিল না। সম্ভবত ছিলই না। কারণ সে সময় তাঁর রাজনৈতিক মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল কলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর সঙ্গে সংঘাতে এবং বাংলার গভর্নর স্যার জন অ্যান্ডারসন সমর্থিত প্রার্থী খাজা নাজিমুদ্দিন এর বিরুদ্ধে পটুয়াখালীর নির্বাচনী লড়াইয়ে। নিঃসন্দেহে এই ঘটনাগুলো বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত ছিল।
কিন্তু ফজলুল হকের জীবনকে যদি তাঁর নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টির আলোকে পড়া যায়, তবে এসব ঘটনাও যেন বৃহত্তর কোনো নিয়তির তুলনায় গৌণ হয়ে পড়ে। কারণ তিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি অনুভব করতেন, ইতিহাস তাঁকে একটি বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান করছে।
এই কারণেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে সাধারণ বাস্তববাদী বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ ধরা যায় না। তাঁর অনেক সিদ্ধান্তই ছিল এমন, যা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ–ক্ষতির হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তিনি যেন নিজের জীবনকে একটি “ঐতিহাসিক মিশন”-এর পথে পরিচালিত এক অভিযাত্রা হিসেবে কল্পনা করতেন যেখানে ব্যক্তি ফজলুল হক ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হন এক প্রতীকী ঐতিহাসিক সত্তায়।
দুই.
কি সেই “ঐতিহাসিক মিশন”?
কিন্তু সেই “মিশন” কী ছিল? আবুল কাশেম ফজলুল হক–এর জনজীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে গভীরভাবে তাকালেই তার উত্তর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মুসলিম বুদ্ধিজীবী সমাজের কাছে তিনি ছিলেন মুসলিম বাংলার সর্বাঙ্গীন নবজাগরণের প্রধান মুখ। শিক্ষাবিদদের কাছে তিনি ছিলেন বাংলার শিক্ষাবিস্তারের এক মহান পৃষ্ঠপোষক তাঁর শিক্ষক স্যার আশুতোষ মুখার্জী–এর পরেই যার নাম উচ্চারিত হতো। আবার হিন্দু শিক্ষিত সমাজের কাছেও তিনি ছিলেন মুসলিম নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্বদের একজন যদিও বর্ণহিন্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাঁর ভাষা ছিল সবচেয়ে নির্ভীক ও আপসহীন।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়–এর মতো উদার ও বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির চিন্তকের কাছে ফজলুল হক ছিলেন একসঙ্গে প্রকৃত মুসলমান এবং প্রকৃত বাঙালি; অর্থাৎ ভবিষ্যৎ বাংলার আদর্শ মানবপ্রতিমা। আর ক্ষুধার্ত, বঞ্চিত কৃষকসমাজের কাছে তিনি ছিলেন “ডাল-ভাতের মসীহা” দৈনন্দিন জীবনের মুক্তিদাতা।
এই বহুমাত্রিক গ্রহণযোগ্যতার কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন “শেরে বাংলা” বাংলার মানুষের সিংহ। কিন্তু এই উপাধির তাৎপর্য শুধু ‘জনপ্রিয়তায়’ এমনটা ভাবলে ভুল হবে; বরং এর তাৎপর্য এই সত্যে যে, তিনি নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণি, সম্প্রদায় বা অভিজাত গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে ভাবেননি। তিনি ছিলেন জনগণের মানুষ আর জনগণও তাঁকে নিজেদেরই একজন বলে অনুভব করত।
এই সম্পর্কটিই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে সেই বহুল উদ্ধৃত উক্তিতে “ফজলুল হক ছিলেন বাংলা আর বাংলা ছিল ফজলুল হক।” এখানে ব্যক্তি ও ভূখণ্ড, নেতা ও জনসমষ্টি, ইতিহাস ও চেতনা—পরস্পরের মধ্যে এক ধরনের প্রায় জৈবিক সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, “জনগণ” শব্দটি তাঁর কাছে কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, যা প্রয়োজনমতো ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁর কাছে জনগণ মানে ছিল বাংলার কৃষক, প্রান্তিক মানুষ, সাধারণ জনতা—যাদের জীবন-বাস্তবতা উপনিবেশিক শোষণ, জমিদারি নিপীড়ন এবং শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতার মধ্যে আবদ্ধ ছিল।
সম্ভবত এখানেই তাঁর “মিশন”-এর প্রকৃত অর্থ নিহিত ছিল। তিনি ইতিহাসে নিজের ভূমিকা খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলার নিপীড়িত মুসলমান কৃষকসমাজ এবং বৃহত্তর বাঙালি জনজীবনের মধ্যে—তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে।
আব্রাহাম লিংকন যদি গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করে বলে থাকেন “জনগণের সরকার, জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা,” তবে একই রূপকে আবুল কাশেম ফজলুল হক–এর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়। তিনি ছিলেন “সাধারণ মানুষের শেরে বাংলা; সাধারণ মানুষের জন্য এবং সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেই উদ্ভূত।”
এই বর্ণনার গভীরে রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক সত্তার মৌলিক চরিত্র। তিনি কেবল জনতার প্রতিনিধি ছিলেন না; বরং তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের উৎসই ছিল বাংলার সাধারণ মানুষ বিশেষত কৃষক, নিম্নমধ্যবিত্ত, প্রান্তিক মুসলমান ও অবহেলিত জনসমাজ। তাঁর নেতৃত্ব কোনো অভিজাত রাজনৈতিক বৃত্তের ভেতর নির্মিত হয়নি; এটি গড়ে উঠেছিল বাংলার মাটি, ক্ষুধা, বঞ্চনা ও সামাজিক বাস্তবতার ভেতর থেকে।
এই কারণেই তাঁর জনপ্রিয়তা নিছক নির্বাচনী সাফল্যের ফল ছিল না। বাংলার মানুষ তাঁর মধ্যে নিজেদের আকাঙ্ক্ষা, ক্ষোভ ও ভবিষ্যতের স্বপ্নের প্রতিফলন দেখতে পেত। তিনি জনগণকে রাজনৈতিক ভাষা দিয়েছেন আর জনগণ তাঁকে দিয়েছে “শেরে বাংলা” নামের ঐতিহাসিক বৈধতা।
অর্থাৎ আবুল কাশেম ফজলুল হক এর রাজনীতি ওপর থেকে জনগণের ওপর আরোপিত কোনো নেতৃত্ব নয়; বরং জনগণের জীবনজগতের ভেতর থেকেই উৎসারিত এক ঐতিহাসিক জননেতৃত্ব।
অনেক রাজনীতিক গণতন্ত্রের ভাষণ দিয়েছেন, গণতন্ত্র নিয়ে লিখেছেনও; কিন্তু আবুল কাশেম ফজলুল হক–এর মতো গণতন্ত্রকে জীবনের ভেতর ধারণ করে বেঁচে ছিলেন খুব কম মানুষই। অনেক রাষ্ট্রনায়ক “সাধারণ মানুষ”-এর কথা বলেছেন; কিন্তু সাধারণ মানুষের মাঝখানে, তাদের মতো করেই জীবনযাপন করেছেন—এমন উদাহরণ ইতিহাসে বিরল।
তাঁর চরিত্রের যে বৈশিষ্ট্যটি তাঁকে জনসাধারণের সঙ্গে একাত্ম করেছিল, তা হলো তাঁর নিজের জীবনের উত্থান-পতন, আলো-অন্ধকার, সাফল্য-ব্যর্থতার নাটকীয় প্রবাহ। সাধারণ মানুষের জীবনে এই অস্থিরতা আসে সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে। কিন্তু ফজলুল হকের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল ভিন্ন। চাইলে তিনি সহজেই প্রতিষ্ঠিত, নিরাপদ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক এক অভিজাত জীবন বেছে নিতে পারতেন। তাঁর মেধা, শিক্ষা ও রাজনৈতিক দক্ষতা তাঁকে যেকোনো উচ্চপদে দ্রুত পৌঁছে দিতে সক্ষম ছিল।
কিন্তু তিনি যেন সচেতনভাবেই সেই নিরাপদ উচ্চবিত্ত জীবনকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি এমন কোনো সাফল্য চাননি, যা তাঁকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ক্ষমতা তাঁর কাছে কখনো আত্মতৃপ্তির আশ্রয় ছিল না; বরং ছিল মানুষের স্বীকৃতির এক সামাজিক অঙ্গীকার। তিনি কোনো পদকেই মূল্যবান মনে করতেন না, যদি তা জনগণের হৃদয় থেকে উৎসারিত না হয়।
এই কারণেই তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সংঘর্ষের ইতিহাস। তিনি সুবিধাবাদী আপসের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। কংগ্রেস যখন উপমহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি, তখনও তিনি তার সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন। গভর্নরদের সঙ্গে বিরোধ করে মন্ত্রিত্ব ছেড়েছেন। এমনকি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ–এর সঙ্গেও সংঘাতে অবতীর্ণ হয়েছেন, যদিও মুসলিম লীগকে বাংলার গণমানুষের দলে পরিণত করার পেছনে তাঁর নিজের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে বড়।
অর্থাৎ আবুল কাশেম ফজলুল হক–এর রাজনৈতিক জীবনকে কেবল সাফল্য বা ব্যর্থতার সরল মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল এক অস্থির, দ্বন্দ্বময়, কিন্তু গভীরভাবে জনমুখী অভিযাত্রা যেখানে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে জনগণের সান্নিধ্যই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিচয়।
আবুল কাশেম ফজলুল হক কখনো দুর্বল প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে সংঘাতে অবতীর্ণ হননি; বরং ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন অধিক শক্তিশালী পক্ষকেই। তাঁর রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের চরিত্র ছিল ঊর্ধ্বমুখী ক্ষমতার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠিত আধিপত্যের বিরুদ্ধে।
এ কারণেই তাঁর সংঘর্ষগুলো ছিল এক ধরনের নৈতিক আত্মপ্রত্যয়ের বহিঃপ্রকাশ। প্রতিটি দ্বন্দ্বে তিনি বিশ্বাস করতেন তিনি সঠিক অবস্থানে আছেন এবং তাঁর প্রতিপক্ষই ভুলের প্রতিনিধিত্ব করছে। আপস বা কৌশলী নীরবতার চেয়ে তিনি মুখোমুখি সংঘর্ষকে অধিক মর্যাদার মনে করতেন।
আর এখানেই তাঁর ব্যক্তিত্বের এক গভীর ট্র্যাজেডি ও মহত্ত্ব একসঙ্গে ধরা পড়ে। তিনি কখনো নিজের করা কাজের জন্য ততটা অনুতপ্ত হতেন না, যতটা হতেন সেই কাজগুলোর জন্য, যা তিনি করতে পারেননি। অর্থাৎ তাঁর বেদনা ছিল অপূর্ণতায় ও অসম্পন্ন সম্ভাবনায়; ব্যর্থতায় ও পরাজয়ে নয়।
এই মনস্তত্ত্বই আবুল কাশেম ফজলুল হক কে প্রচলিত অর্থে কেবল একজন রাজনীতিকের সীমায় আবদ্ধ রাখেনি। তিনি এমন এক ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন, যিনি নিজের জীবনকে নিরাপত্তার স্থিরতায় নয়, বরং সংঘর্ষ, ঝুঁকি ও অসমাপ্ত স্বপ্নের ভেতর অর্থপূর্ণ করে তুলতে চেয়েছিলেন।
তিন.
জাতিসত্তার আত্মা-অন্বেষণ
আবুল কাশেম ফজলুল হক–এর জীবন ও রাজনৈতিক চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে যদি তাঁর সময়ের দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে একটি গভীর সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি ছিলেন এক অস্থির আত্মার মানুষ। আর এই অস্থিরতার মূল উৎস ছিল একটি “জাতীয় আত্মা”–র অনুসন্ধান।
তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবন যেন একটি প্রশ্নের চারদিকে আবর্তিত হয়েছে—বাঙালি মুসলমান আসলে কে? তার ঐতিহাসিক পরিচয় কী? তার আত্মিক ও রাজনৈতিক অবস্থান কোথায়?
এই জাতীয় আত্মার ধারণা তাঁর কাছে কোনো স্থির বা একরৈখিক বিষয় ছিল না। বরং তা বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছে কখনো পরস্পরবিরোধী, কখনো দ্বিধাগ্রস্ত, কখনো বিপরীতমুখী রূপে। কারণ একটি জাতির আত্মা, ব্যক্তিমানুষের আত্মার মতোই, কেবল বাহ্যিক আচরণের সমষ্টি নয়; এর একটি অন্তর্লোকও আছে একটি আত্মসচেতনতা, একটি ঐতিহাসিক অনুভব, একটি সম্মিলিত মানসিকতা।
কিন্তু আবুল কাশেম ফজলুল হক এর সময়কার বাঙালি মুসলমানের জন্য এই আত্মপরিচয় আবিষ্কার করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। বিশ্ব তখন ফরাসি ও আমেরিকান বিপ্লব-উত্তর জাতীয়তাবাদের নতুন ধারণায় রূপান্তরিত হচ্ছে। “জাতি” কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ভাষা, ভূখণ্ড, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাও জাতিসত্তার নতুন উপাদান হয়ে উঠছে।
এই বৈশ্বিক রূপান্তরের মুহূর্তে ভারতীয় মুসলমানরা বিশেষত বাংলার মুসলমানরা গভীর এক পরিচয়-সংকটে নিমজ্জিত ছিল। ১৮৫৭–এর ব্যর্থ স্বাধীনতা সংগ্রাম যাকে ঔপনিবেশিক ইতিহাস “সিপাহী বিদ্রোহ” কিংবা “ওহাবি আন্দোলন” নামে খর্ব করে দেখিয়েছে তার পর মুসলমান সমাজ রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব এবং সাংস্কৃতিকভাবে অবদমিত হয়ে পড়ে।
আর বাংলার মুসলমানদের অবস্থা ছিল আরও করুণ। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা ও নবগঠিত উপনিবেশিক ক্ষমতা-কাঠামোর ভেতর তারা ক্রমশ ক্ষমতাহীন, শিক্ষাবিমুখ ও সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। একসময়কার শাসকসমাজকে নতুন শাসকগোষ্ঠী এমন নির্মম ও পদ্ধতিগতভাবে বঞ্চিত করেছিল যে, তাদের জীবন, স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার অবশিষ্ট চিহ্নগুলোও প্রায় মুছে যেতে বসেছিল।
এই ঐতিহাসিক ক্ষত, এই সভ্যতাগত অপমান, এই আত্মপরিচয়ের সংকটের ভেতর থেকেই আবুল কাশেম ফজলুল হক–এর রাজনৈতিক চেতনার জন্ম। তাঁর সমগ্র জীবন তাই ছিল বাঙালি মুসলমানের হারানো আত্মা পুনরুদ্ধারের এক অন্তহীন অনুসন্ধান।
কল্পনা করুন এমন এক জনগোষ্ঠীকে, যারা মাত্র এক শতাব্দী আগে ছিল দেশের আলোকিত শাসক বিদেশি হিসেবে নয়, বরং এই মাটিরই সন্তান হিসেবে। আবার মাত্র পঞ্চাশ বছর আগেও যারা ছিল রাষ্ট্রভাষা ও জনভাষা উভয় ভাষাতেইশিক্ষা, সাহিত্য ও শিল্পের শিক্ষক। অথচ সেই জনগোষ্ঠীই মাত্র অর্ধশতকের ব্যবধানে পরিণত হলো এক নিরক্ষর জনসমুদ্রে, যারা দারিদ্র্যের জীর্ণ কুটিরে নির্বাক, নিঃসহায় জীবন যাপন করছে।
আর কল্পনা করুন সেই প্রতিশোধপরায়ণ শাসকদের নির্মমতাকে, যারা একের পর এক আইন ও নীতির মাধ্যমে যেমন ‘রিসাম্পশন পলিসি’ কিংবা ‘পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট’ বাংলার মুসলমান সমাজের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে নতুন নতুন আঘাত হেনে চলেছে।
এরপর ভাবুন সেই চূড়ান্ত অবমাননাকে যখন দীর্ঘ বঞ্চনার কিছুটা স্বীকৃতি হিসেবে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে ঢাকা রাজধানী করে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করা হলো; অথচ মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই সেই প্রদেশকে সম্পূর্ণ অমর্যাদাপূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা হলো। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯১১ সালে।
আর সেই সময়েই বিশ্ব ইতিহাসও ছিল অস্থির ইতালি ত্রিপোলিতে আক্রমণ চালাচ্ছে, বলকান অঞ্চলে উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে একের পর এক ভূখণ্ড ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে আর ইরান ও আফগানিস্তান কার্যত ব্রিটেন ও রাশিয়ার প্রভাববলয়ের অধীন হয়ে পড়ছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ নাগাদ ইউরোপের খ্রিষ্টান শক্তিগুলোর বিশেষত ব্রিটেনের নেতৃত্বে প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক পরাধীনতা সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এই বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ভারতীয় মুসলমানদের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভারতে ব্রিটিশ সরকারের মুসলিমবিরোধী মনোভাব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং তা ছিল একটি বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদী ও বৈশ্বিক নীতিরই অংশ।
এই উপলব্ধি থেকেই ভারতীয় মুসলমানদের পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মধারা গড়ে ওঠে যার ভিত্তি ছিল হিন্দু-মুসলিম বোঝাপড়া ও রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা। এই ধারার ভেতর দিয়ে একে একে আসে লখনৌ চুক্তি, খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চৌদ্দ দফা, সাইমন কমিশন বয়কট, গোলটেবিল বৈঠক এবং শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক পুরস্কার (Communal Award) পর্যন্ত পৌঁছানো এক দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা।
এই সকল আন্দোলন ও উদ্যোগের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য ছিল ভারতীয় মুসলমানদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও “জাতীয় আত্মা”কে একটি সর্বভারতীয় সমন্বয়ের প্রবাহে বিলীন হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের কল্পিত “বিশ্বভারতীয়” বৃহৎ আত্মার ভেতরে একটি একীভূত সাংস্কৃতিক সত্তায় হারিয়ে না গিয়ে মুসলিম ভারতের পৃথক ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।
এই সমগ্র রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবুল কাশেম ফজলুল হক ছিলেন কেন্দ্রীয় ও সক্রিয় এক চরিত্র। প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়, সমঝোতায় ও আন্দোলনে তিনি কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত ছিলেন। একই সঙ্গে বাংলার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃত্বও এই ধারার বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন কখনো সহযোগী হিসেবে, কখনো ভিন্ন অবস্থান থেকে, কিন্তু এই বৃহৎ রাজনৈতিক প্রবাহ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়।
পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের বিলুপ্তিকে ঘিরে যে উদাসীন নীরবতা এবং লখনৌ চুক্তির মাধ্যমে বাংলার মুসলমানদের স্থায়ীভাবে সংখ্যালঘু অবস্থায় মেনে নেওয়ার যে রাজনৈতিক সমঝোতা তা আবুল কাশেম ফজলুল হক কে গভীরভাবে হতাশ করেছিল। বিশেষত যখন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বেঙ্গল প্যাক্ট তাঁর জীবদ্দশায় সর্বভারতীয় কংগ্রেস কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হলো এবং তাঁর মৃত্যুর পর বাংলার কংগ্রেস তা বাতিল করে দিল তখন সর্বভারতীয় মুসলিম নেতৃত্বের নীরবতা তাঁর কাছে আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। তারা কোনো দৃশ্যমান প্রতিবাদ পর্যন্ত করেনি।
এই অভিজ্ঞতার ফলে ফজলুল হকের রাজনৈতিক অবস্থান ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র ধারায় রূপ নেয়। তিনি কখনোই বাংলার রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে সর্বভারতীয় রাজনীতির ভেতরে বিলীন করেননি। কংগ্রেস, খিলাফত বা মুসলিম লীগ যে কোনো মঞ্চেই তিনি সক্রিয় থাকুন না কেন, বাংলার প্রজা আন্দোলনের স্বতন্ত্র প্রবাহ তিনি কখনো পরিত্যাগ করেননি।
তাঁর কাছে এই দ্বৈত অবস্থান কোনো বৈপরীত্য ছিল না। একই সঙ্গে তিনি প্রজা পার্টির নেতৃত্ব দিতেন এবং বাংলার মুসলিম লীগের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। কারণ তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিতে “প্রজা” অর্থাৎ বাংলার কৃষকসমাজ এবং “মুসলমান” বিশেষত বাংলার মুসলমান জনসমাজ আলাদা দুই শ্রেণি ছিল না; বরং একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে অভিন্ন এক সামাজিক বাস্তবতা।
তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় বাংলার কৃষক ও বাংলার মুসলমান এই দুই পরিচয় মিলেই গড়ে উঠেছিল এক অভিন্ন ঐতিহাসিক সত্তা, যার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর রাজনৈতিক নৈতিকতার ভিত্তি।
আবুল কাশেম ফজলুল হক এর দৃষ্টিতে ইসলাম কোনো সংকীর্ণ সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের ধর্ম নয়; বরং তার অন্তর্নিহিত নৈতিক শক্তি সমতা-সৃষ্টিকারী। সামাজিক স্তরে ইসলাম যেমন মানুষের মধ্যকার শ্রেণিবিভাজনকে শিথিল করে, তেমনি ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক স্তরে বাংলার মাটিও এক ধরনের সমতামূলক শক্তি ধারণ করে।
এই ধারণার ভেতর দিয়ে তিনি ইসলাম ও বাংলার ভূপ্রকৃতির মধ্যে একটি প্রতীকী সাযুজ্য স্থাপন করেন। ইসলামে যেমন অভিজাততন্ত্রের জন্য কোনো স্থান নেই, তেমনি বাংলার সামাজিক-ঐতিহাসিক বাস্তবতাতেও প্রাসাদভিত্তিক ইউরোপীয় অভিজাত কাঠামোর স্থায়ী ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি এমনই ছিল তাঁর ব্যাখ্যা।
এই বৃহৎ ধারণার ভেতরেই তিনি “বাংলার আত্মা”র একটি স্বতন্ত্র রূপ কল্পনা করেন যা তাঁর কাছে কোনো বিমূর্ত জাতীয়তাবাদ নয়, বরং একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক বাস্তবতা। এই আত্মার সঙ্গে একাত্ম হয়েই তাঁর নিজের রাজনৈতিক ও মানসিক সত্তা গড়ে উঠতে চেয়েছিল।
এ কারণেই তিনি এমন কোনো রাজনৈতিক প্রকল্পকে গ্রহণ করেননি, যেখানে বাংলার স্বতন্ত্র আত্মা কোনো বৃহত্তর “ভারতীয় আত্মা”-র ভেতর বিলীন হয়ে যাবে তা বিভক্ত ভারত হোক বা অখণ্ড ভারত। তাঁর কাছে “অল-ইন্ডিয়া” ধারণাটি কখনোই একটি স্বতঃসিদ্ধ বাস্তবতা ছিল না; বরং তা ছিল একটি রাজনৈতিক নির্মাণ, যার সঙ্গে বাংলার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সরাসরি মিল ছিল না।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের বিষয়ে বারবার দ্বিধা ও অনীহা প্রকাশ করেছেন। কারণ তাঁর কাছে একটি সত্য স্পষ্ট ছিল যদি একক ভারতীয় আত্মার ধারণাই সমস্যাজনক হয়, তবে একক মুসলিম-ভারতীয় আত্মার ধারণাও সমানভাবে সমস্যাসঙ্কুল হয়ে পড়ে।
এই মৌলিক বোধ থেকেই তাঁর কংগ্রেস, খিলাফত কিংবা মুসলিম লীগ সব ধরনের সর্বভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান তাই কোনো একক দলের আনুগত্যে নয়; বরং বাংলার স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক আত্মাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল।
লাহোর প্রস্তাব
শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের আজীবনের স্বপ্ন যেন বাস্তব রূপ পেল ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে যে প্রস্তাব তিনি নিজেই উত্থাপন করেছিলেন। তাঁর কল্পনার বাংলার আত্মা সেখানে শুধু স্বীকৃতিই পায়নি, বরং এক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রূপও লাভ করেছিল। সে সময় তিনিই ছিলেন সবচেয়ে আনন্দিত মানুষ।
কিন্তু সেই আনন্দ ছিল ক্ষণস্থায়ী। তাঁর প্রাণের সন্তানস্বরূপ লাহোর প্রস্তাব যার মধ্যে নিহিত ছিল স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন খুব দ্রুতই পাকিস্তান আন্দোলনের উন্মত্ত ও ভ্রান্ত প্রচারণার ভেতর বিকৃত ও বিকলাঙ্গ হয়ে উঠতে থাকে।
তিনি স্পষ্টই বুঝতে পারছিলেন এর পরিণতি কী হতে যাচ্ছে। মুসলিম লীগের সরকারি প্রচারণা শেষ পর্যন্ত বাংলাকে বিভক্ত করবেই এবং তার ফল হবে একটি খণ্ডিত পূর্ব পাকিস্তান যা দূরবর্তী পাঞ্জাবের মতো এক বিদেশি ভূখণ্ড থেকে পশ্চিমাঞ্চলীয় মুসলিম অভিজাতদের শাসনের অধীন হবে।
এই বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন। শেরে বাংলা প্রতিবাদ করতে শুরু করলেন, মুসলিম লীগের সঙ্গে বিরোধে জড়ালেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ব্যক্তিগত ও খোলা চিঠি লিখলেন এবং শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগ ত্যাগ করলেন।
বাংলাকে বিভক্তির হাত থেকে রক্ষার শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে তিনি মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে, কিন্তু কংগ্রেস ও হিন্দু সভাসহ অন্যান্য সব দলকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি প্রগতিশীল জোট মন্ত্রিসভা গঠন করেন।
কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এ সময়ের মধ্যে হিন্দুরাও বাংলাভাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল।
লাহোর প্রস্তাবের পরও তাঁর জাতীয় আত্মার সন্ধান থেমে যায়নি। বাংলার এই পরাজিত সিংহ কিছু সময় নিজের ক্ষতচিহ্ন চেটে নিলেও “ওয়াটারলু” মানেননি। তিনি আবারও তাঁর আদর্শের খোঁজে তীর্থযাত্রা শুরু করলেন যে আদর্শের প্রতি তাঁর ছিল গভীর ও অটল বিশ্বাস। তাঁর ব্যর্থতা তাঁকে “জ্ঞানী” করে তুলতে পারেনি, কারণ তাঁর কাছে শুধু জ্ঞানী হওয়াই জ্ঞানের পূর্ণতা ছিল না।
তাঁর পক্ষে নিজের জাতির আত্মার ভেতরের সেই অন্তর্দৃষ্টিকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। তাই ভাগ্যের ইশারাতেই তিনি আবারও সেই অনুসন্ধান চালিয়ে গেলেন। যদি অবিভক্ত বাংলা সেই আত্মার আধার না হয়, তবে পূর্ব বাংলা যা ছিল প্রকৃত বাংলা নিশ্চয়ই সেই আধার হতে পারে।
এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি নতুন উদ্যমে পথচলা শুরু করলেন। ভাষা আন্দোলনে, যা ছাত্র ও যুবকদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল, তিনি সেই আত্মার স্ফুলিঙ্গ খুঁজে পেলেন। সেই স্ফুলিঙ্গ আগুন জ্বালিয়ে দিল। আবারও শেরে বাংলার গর্জন শোনা গেল। তা জনগণের হৃদয়ের গভীর থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো সেই ধ্বনি পৃথিবী কাঁপিয়ে দিল। বাংলার মধ্যে একটি জাতীয় পরিচয় ও আত্মিক ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠছে বলে মনে হলো। মনে হচ্ছিল শেরে বাংলার স্বপ্ন বুঝি পূর্ণ হতে চলেছে।
কিন্তু না! তা ছিল কেবল একটি ভ্রান্ত প্রভাত একটি “সুবহে কাজিব”, সত্য প্রভাত “সুবহে সাদেক” নয়। আলো সরে গেল, অন্ধকার ঘন হয়ে এলো। ঝড় উঠল চারদিকে। ফজলুল হক আবারও হতাশ হলেন।
তবুও এই হতাশাগুলো তাঁকে তাঁর “জাতীয় আত্মার ক্ষুধা” থেকে নিরাময় করতে পারেনি যাকে তিনি বিনয়ের সাথে তাঁর “অমোচনীয় রোমান্টিকতা” বলতেন। কারণ তিনি কখনোই নিজেকে নিজের ভাগ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রক হিসেবে ভাবেননি। তাঁর অনুভব ছিল, তিনি শুধু ব্যক্তিগত ভাগ্যের জন্য নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যের জন্যই সংগ্রাম করছেন।
গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ এই মানুষটি তাঁর জনগণের ভাগ্য ও আত্মার অমরত্বে বিশ্বাস করতেন। তাই শেষ পর্যন্ত তিনি কাজ করে যেতে থাকলেন আশা ও অপেক্ষার সাথে, করণীয় কাজ করে, সামনে এগিয়ে যেতে যেতে।
শেষ পর্যন্ত এই মহান তীর্থযাত্রী তাঁর জাতির আত্মার সন্ধানে থাকা অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করলেন। তাঁর বৃদ্ধ দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, কিন্তু তাঁর তরুণ হৃদয় থেমে গেল না। তাঁর হাত নিথর হয়ে গেল, কিন্তু তিনি যে শিখা অনির্বাণ বহন করছিলেন তা নিভে যায়নি।
অস্থির সেই আত্মা, যে অর্ধ শতাব্দী ধরে একটি জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে পূর্ণতা দিতে চেয়েছিল কিন্তু জীবদ্দশায় তা পারেনি মৃত্যুর পরেও যেন সে তার পথের ধারের কবর থেকে নিজের জনগণকে আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে, সেই অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার জন্য।
এবং এই আহ্বানটি যে তিনি এখন দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের চত্বরে থেকে করছেন এবং তাঁর দুই মহান সহযোদ্ধাও (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিন) সেখানে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এটি এই ইঙ্গিত বহন করে যে, ন্যায়বিচার এবং তাঁর প্রাক্তন সহযোদ্ধারা তাঁর পক্ষেই অবস্থান করছেন।
তাহলে কি নতুন প্রজন্ম তাঁকে এবং জাতিকে ব্যর্থ করবে?



masha allah , lekha sundor silo