সালমান আদীব

আমাদের আলেমগণ এখতালাফী মাসআলাসমূহ জনসম্মুখে আলোচনা করেন না, বরং সেগুলোকে যথাসাধ্য আলেমদের মজমা বা তালেবুল ইলমদের দরসেই সীমাবদ্ধ রাখেন।
এক্ষেত্রে তাঁদের যুক্তি– জনসম্মুখে এখতেলাফী মাসআলা আলোচনা করলে উভয় দিকের দালিলিক ভিত্তিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠলেও এখতেলাফী মাসআলার ক্ষেত্রে করণিয় কী সে ব্যাপারে সাধারণের ধারণা না থাকার ফলে তাদের মাঝে দীর্ঘদিন যাবত পালনীয় আমলের মধ্যেও সন্দেহ ঢুকতে শুরু করে। ফলত নির্দিষ্ট সামাজ বা এলাকায় ধর্মীয় শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সুনির্দিষ্ট মাযহাব কেন্দ্রিক যে ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি হয়, তাতেও বিশৃঙ্খলা বা ফেতনা তৈরি হয়।

অনেকে মনে করেন– আলেমদের এ প্রবণতা নতুন সৃষ্ট। এমনকি তারা মনে করেন– আলেমগণের এ প্রবণতা সাময়িকভাবে নয়া এখতেলাফ তৈরির পথ বন্ধ করলেও আদতে দীর্ঘ ও উগ্র এখতেলাফের পথকে খুলে দেয়।

শ্রদ্ধেয় শেখ মুজাহিদ ভাই তার দরসখানা – darskhana – এ তিন দিন আগে এমনই একটা লেখা লিখেছেন। লেখার শিরোনাম– “এখতেলাফি মাসালা জনসম্মুখে আলোচনার জরুরত”। এখানে তিনি হালের প্রেক্ষাপটে এখতেলাফি মাসআলাসমুহ আওয়ামের সামনে আলোচনার গুরুত্ব ও ফজিলত দালিলিক আকারে তুলে ধরেছেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছেন–
এক. হালে আমাদের পারস্পরিক যে অসহিষ্ণুতার মহামারি দেখা দিয়েছেন তা দূর করবার জন্যে এখতেলাফী মাসআলার আলাপ প্রয়োজন।
দুই. আমাদের ম্যান্টালিটিকে আরও ম্যাচুরড করবার জন্যে তা জরুরি।

উদ্দেশ্যের বিবেচনায় তার প্রস্তাবনাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্তু তিনিও আরও অনেকের মতো এখতেলাফী মাসআলাসমূহকে আলেমগণের মজমা ও তালেবুল ইলমদের দরসে সীমাবদ্ধ করে ফেলাটাকে নিন্দাবাদ করেছেন। পাশাপাশি এমন পদক্ষেপের পিছনে আলেমগণের ফেতনা ও বিভ্রান্তির আশঙ্কা প্রকাশ করাটাকে নতুন ও সাধারণ প্রবণতা হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি বলেছেন– “কিন্তু ইসলামের স্বর্ণালী যুগের ইতিহাস, ফিকহী মূলনীতি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখতেলাফ আড়াল করার চেয়ে তা যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করা সামাজিক সংহতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য অনেক বেশি জরুরি।”

তার এ কথা বাস্তব– এখতেলাফের যৌক্তিক ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্যে জরুরি। এ বাস্তবতাটা সমঝদার আলেমগণ অনেক আগেই উপলব্ধি করেছেন এবং এখতেলাফী মাসআলা আলোচনার উপযুক্ত পরিসরে তার যৌক্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থাপনাও করেছেন, করছেন। কিন্তু তারা জনসম্মুখে তা আলোচনা করেননি ফেতনার আশঙ্কায়৷

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

তাদের এ আশঙ্কা ও পদক্ষেপটা কারুর কাছে অমূলক মনে হলেও আদতে তা তারিখী প্রেক্ষাপটের উপর প্রতিষ্ঠিত তুরাসী পন্থারই অংশ। অর্থাৎ খাইরুল কুরুন থেকেই যুগে যুগে আলেমগণের সামনে এ বাস্তবতা ছিল– জনসম্মুখে এখতেলাফ নিয়ে আলোচনা করাটা আদতে বিভ্রান্তই বাড়ায়, এখতেলাফের তুষানলে হাওয়া দেয়। ইলমের নিয়মতান্ত্রিক চর্চা ছাড়া এখতেলাফের আলোচনা ম্যাচুরিটি সৃষ্টির ক্ষেত্রেও কোনো ভূমিকা রাখে না।

কাজী ইয়াজ রহ. তাঁর কিতাব “ترتيب المدارك
এর باب ما جاء عن السلف في وجوب الرجوع إلى عمل أهل المدينة, وإن خالف الأكثر” এ লিখেন– হযরত উমর রা. মদীনায় যে আমল প্রচলিত আছে কেউ যেনো এর বিপরীতে কোনো হাদীস বর্ণনা করতে যসতর্ক থাকে সে জন্য মিম্বারে উঠে বলেন–  “أحرج بالله على رجل روى حديثا العمل على خلافه”

প্রচলিত আমলের ক্ষেত্রে যেনো এখতেলাফ সৃষ্টি না হয় সেদিকে তাবেঈগণও খেয়াল রেখেছেন যথাযথ। ‘হজের সময় হাজীগণ আইয়ামে নহর পর্যন্ত মুহরিম থাকবে’ এমনটাই ছিল হযরত আবু বকর ও উমর রা. এর ফতোয়া, কিন্তু বিখ্যাত তাবেঈ উরওয়া ইবনে যুবায়ের একবার হযরত ইবনে আব্বাস রা. কে দেখলেন– তিনি ফতোয়া দিচ্ছেন যে, হাজিরা ইয়াওমে নহরের আগেই তাওয়াফের মাধ্যমে হালাল হয়ে যেতে পারবে। তখন উরওয়া বললেন “أضللت الناس يابن عباس” অর্থাৎ ইবনে আব্বাস আপনি তো মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। তবারানীর রেওয়ায়াত অনুযায়ী “طالما أضللت الناس” আপনি আর কত মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন!

ইবনে আব্বাস রা. তখন জবাব দিয়েছিলেন আমি তো রাসূলের হাদীসের উপরই আমল করছি ও ফতোয়া দিচ্ছি। অর্থাৎ একই বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই ধরনের আমল ছিল, তবে এক ধরণের আমল হযরত আবু বকর ও উমরের আমল ও ফতোয়ার কারণে প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভিন্ন ধরনের আমলের ব্যাপারেও যেহেতু হাদীস ছিল, তাই হযরত ইবনে আব্বাস সে অনুযায়ী ফতোয়া দিয়েছিলেন। অর্থাৎ এখতেলাফী মাসআলা আলোচনা করতে চেয়েছিলন, কিন্তু উরওয়া ইবনে যুবায়ের সেটা করতে দেননি। বরং তিনি ইবনে আব্বাসকে বাধা দিতে গিয়ে শব্দ ব্যবহার করেছেন “أضللت” যার অর্থ বিভ্রান্ত করা।

এখান থেকে সহজেই বোঝা যায়– বর্তমান আলেম সমাজ এখতেলাফি মাসআলা আলোচনা করতে গিয়ে সাধারণের “ভ্রান্ত” হওয়ার যে শঙ্কা করেন সেটাও কোনো ভুঁইফোড় বিষয় নয়, বরং খাইরুল কুরুনেও – যখন সধারণ মানুষও তাকওয়া পরহেজগারি ও ক্ষেত্রেবিশেষ ইলমেও এখনকার অজস্র আলেম থেকে অগ্রগামী ছিলেন— সেইম শঙ্কাটা ছিল। রাবীর বক্তব্য অনুযায়ী উরওয়া হযরত ইবনে আব্বাসকে ঝামেলার বিষয়টা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, এবং ইবনে আব্বাস রা. ও তাঁর মত থেকে সরে এসেছিলেন।

জনসম্মুখে এখতেলাফি মাসআলা বর্ণনা না করার এ সিলসিলা পরবর্তী যুগেও বিদ্যমান ছিল। যেমন ইমাম মালেক রহ. বলেন– কাজী মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর ইবনে আমর ইবনে হাযাম একবার কোনো একটা বিষয়ে ফায়সালা করলেন, তখন তাঁর ভাই আব্দুল্লাহ যে কিনা প্রচুর হাদীস জানতেন– তিনি তার ভাইকে নিন্দা করে বললেন– এ ব্যাপারে তো হাদীস আছে, তা সত্ত্বেও তুমি হাদীস অনুযায়ী কেনো ফায়সালা করলে না? কাজী মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর জবাব দিলেন– মানুষ তো এ হাদীস সম্পর্কে জানে না। অর্থাৎ তিনি মানুষের মঝে প্রচলিত ও পরিচিত আইন দিয়ে ফায়সালা করেছিলেন। বিপরীতে হাদীস থাকলেও সেটাকে তিনি এখতেলাফী মাসআলা হিসেবে উল্লেখ করেননি৷

আমি বিস্তর গবেষণা করিনি, তবে যতটুকু মুতালা করেছি তাতে মনে হয়েছে– মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এমন আলাপ আলোচনা, বিশেষত এখতেলাফী মাসআলার আলোচনা মদীনায় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। এ কারণেই হয়তো ইমাম মালেক বলেছেন–
لم يكن بالمدينة قط إمام أخبر بحديثين مختلفين
অর্থাৎ “মদীনায় এমন কোনো ইমাম আসেননি যিনি পরস্পর বিরোধী দু’টি হাদীস বর্ণনা করেছেন”

ইমাম মালেক নিজে ফিকহের পাশাপাশি হাদীসেরও ইমাম ছিলেন তা সত্ত্বেও তিনি এখতেলাফ বা ফেতনার ভয়ে অনেক হাদীস বর্ণনা করতেন না। ইমাম শাফেঈ বলেন– ইমাম মালেককে একবার বলা হল– সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা ও যুহরীর কাছে তো আমরা এমন অনেক হাদীসই শুনেছি, যেগুলো আপনার কাছ থেকে শুনিনি। ইমাম মালেক জবাবে বললেন
وأنا كل ما سمعته من الحديث أحدث به؟ أنا إذا أريد أضلهم
ইমাম মালেকও এখানে উরওয়া ইবনে যুবায়েরের মতো “ضلال” বা ‘ভ্রান্তি’ শব্দ ব্যবহার করেছেন।

এ প্রসঙ্গে খলীফা মনসুর, মতান্তরে আবু জাফর অথবা হারুনুর রশীদের সঙ্গে ইমাম মালেকের সে ঘটনাও বিখ্যাত। যখন খলীফা ‘মুয়াত্তা’কে রাষ্ট্রীয় গ্রন্থ বানিয়ে সেটাকে খেলাফতের সকল অঞ্চলের উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তখন ইমাম মালেক খলীফাকে এ কাজ না করবার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
মুজাহিদ ভাই এ ঘটনাকে এখতেলাফী মাসআলা আলোচনার পক্ষে দলীল হিসেবে এনেছেন তার লেখায়। কিন্তু বাস্তবে এটি এখতেলাফী আলোচনা যেনো না করা হয় তার পক্ষেরই দলীল। করণ ইমাম মালেক যখন খলীফাকে এ পরামর্শ দেন, তখন ইরাকে নকল ও আকলের সমন্বয়ে গঠিত ইমাম আবু হানীফার মাযহাবের উপর ভিত্তি করে “মাদরাসাতু আহলির রায়” সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। মিসরে সুসংহত হয়ে গেছে ইমাম লাইস ইবনে সা’দের মাযহাব৷ শামে প্রচলিত হয়ে গেছে ইমাম আওযাঈ’র মাযহাব৷ এসব অঞ্চলে মুয়াত্তার কারণে নতুন করে এখতেলাফের চর্চা শুরু হোক ইমাম মালেক তা চাননি, তাই তিনি খলীফাকে বলেছিলেন–
إن ذهبت تحولهم مما يعرفون إلى ما لا يعرفون، رآوا ذلك كفرا!

হাফেজ ইবনে হাজার ‘ফাতহুল বারী’ তে হযরত আবু হুরায়রা, হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান ও হাসান রা. সম্পর্কে বলেছেন “তাঁরা মানুষের সামনে এমন অনেক কিছুই বলতে অপছন্দ করতেন– যা মানুষের মাঝে ফেতনা সৃষ্টি করে। ইমাম আহমদ সম্পর্কে লিখেছেন– তিনি মানুষের সামনে সেসব হাদীস বর্ণনা করতে অপছন্দ করতেন যা বাহ্যিকভাবে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবার বৈধতা দেয়৷ ইমাম আবু ইউসুফ, সম্পর্কে লিখেছেন– তিনি غرائب সংক্রান্ত আলোচনা অপছন্দ করতেন।

সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনা রহ. “تابع ما بين الحج والعمرة… الخ” হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন– আমি কখনো এ হাদীসটি বর্ণনা করার সময় “يزيدان في الأجل” অংশটুকু বাদ দিয়ে দি। কারণ আশঙ্কা আছে কাদেরিয়ারা এর মাধ্যমে হুজ্জত পেশ করবে, অথচ এর মধ্যে তাদের পক্ষে কোনো হুজ্জত নেই।

খাইরুল কুরুনের পরবর্তী সময়েও দেখা যায়– এখতেলাফী মাসআলাসমূহ সামনে নিয়ে এসে নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা এবং দালিলিকভাবে সাব্যস্ত ও প্রচলিত আমল-রীতিনিতির ক্ষেত্রে সন্দেহ তৈরি করবার প্রবণতাকে অপছন্দ ও ক্ষেত্র বিশেষ ইনকার করেছেন। যেমন– হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দীতে স্পেনে মুসলমানদের অধীনে যে ‘মুয়াহ্যিদীন’ সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, সেখানে মৌলিকভাবে প্রচলিত ছিল মালেকী মাযহাব। কিন্তু সেখানকার আমীর আব্দুল মুমিন ইবনে আলী কাইসী ইমাম ইবনে হাযামের মাযহাবের প্রতি ঝোঁক ছিল৷ এ ঝোঁকের বসেই তিনি মালেকী মাযহাবের সঙ্গে এখতেলাফ করে সরকারিভাবে জাহেরী মাযহাবকে সরকারী মাযহাব বানিয়ে দিতে চেয়েছিল, এবং তার প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে ঘোষণা করিয়েছিল– যে এর বাইরে যাবে তাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। তখন ইবনে যারকূন মালেকী আন্দালুসী (মৃ.৫৮৬) এর প্রতিবাদ করেন এবং তার সঙ্গে মুনাযারা করে মালেকী মাযহাবের প্রশিদ্ধ কিতাব ‘المدونة الكبرى‘ এর উপযোগ এবং দালিলিক বৈধতার ব্যাপারে বোঝাতে সক্ষম হন৷ তাকে একথাও বোঝাতে সক্ষম হন– এখানে এখতেলাফ করা উচিৎ নয়।

আব্দুল মুমিন কাইসীর পর তার নাতি ইয়াকুব ইবনে ইউসুফ ইবনে আব্দুল মুমিন ক্ষমতায় আসে। সেও জাহেরী মাযহাবের প্রতি অনুরাগী ছিল এবং ইমাম ইবনে হাযামেত কিতাবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আবশ্যক করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তখনও আলেমরা তাকে বাঁধা দেন। সে আলেমদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবু ইয়াহইয়া ইবনে মাওয়্যাক রহ. (মৃ. ৬৪২) তিনি ইবনে যারকূনের মতোই আমীর ইয়াকুবের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বোঝাতে সক্ষম হন– প্রচলিত মাযহাবের সঙ্গে এখতেলাফ করে নতুন আরেকটা মাযহাব ঢুকিয়ে দেওয়া সঙ্গত নয়।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (মৃ.৭২৮) ছিলেন ইলমের সমুদ্র। ইমাম আহমদের মাযহাবের দিকে তাঁর নিসবত হলেও তিনি আদতে ছিলেন মুজতাহিদ। যেহেতু
মুজতাহিদ ছিলেন, তাই তাঁর অনেক এমন ইজতিহাদ ছিল যেগুলো প্রসিদ্ধ চার মাযহাবের বিপরীত, ফিকহের পরিভাষায় যেগুলোকে ‘شذوذات وتفردات‘ হিসেবে ব্যক্ত করা হয়। তিনি যখন সিরিয়ায় ছিলেন, তখন তিনি তাঁর দরসগুলোতে তাঁর ইজতিহাদগুলো সাধারণের সামনে তুলে ধরতেন ও শামে প্রচলিত শাফেঈ ও হানাফী মাযহাবের মতগুলোকে খণ্ডন করতেন। ফলত তাঁর শাগরেদরা তাঁর ইজতিহাদের উপর ভিত্তি করে শাফেঈ ও হানাফীদের এবং আকীদাগতভাবে আশয়ারীদের বিরুদ্ধাচারণ করত৷ ক্ষেত্রবিশেষে তাদের বিরুদ্ধাচারণ তাকফির পর্যন্ত গড়াত। তাদের এসব এখতেলাফী কর্মকাণ্ড এক পর্যায়ে ফেতনায় রুপান্তরিত হয়, ফলে বাধ্য হয়েই শাফেঈ ও হানাফী কাজীদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া সহ তাঁর শাগরেদদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নি ষি দ্ধ করা হয়। অনেককে গ্রে ফ তা রও করা হয়।

সর্বযুগেই জনসম্মুখে এখতেলাফী মাসআলা বর্ণনার ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদ জুমহুর ও মূলধারার আলেমদের মনোভাব এমনই ছিল।

নিকট অতীত থেকে আমরা যদি নমূনা চাই, তাহলে শাহ আব্দুল আযীয দেহলভীর কথাই ধরতে পারি। তাঁর ফতোয়া সংকলন “فتاوى عزيزي” তে ‘ওয়াহদাতুল উজূদ’ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পর তিনি বলেন– যেহেতু এ মাসআলায় আলেমগণের এখতেলাফ আছে এবং মাসআলাও খুব গুরুগম্ভীর, সাধারণ মানুষ এর হাকিকত বুঝবার ক্ষমতা রাখে না, তাই সাধারণের সামনে এ নিয়ে কথা না বলাই উচিৎ৷

হালেও আমরা এর নমুনা পাই। শায়েখ সালেহ ফাওজানকে প্রশ্ন করা হয়– জনসম্মুখে এখতেলাফী মাসআলা আলোচনা করা উচিৎ কিনা? তিনি বলেন “আলেম ও তালেবুল ইলমদের সামনে করতে তো সমস্যা নেই, তবে সাধারণের সামনে করা জায়েয নেই।”

চাইলে আরও নমুনা উল্লেখ করা যাবে, তবে আশাকরি এতটুকুই যথেষ্ট। এর মাধ্যমেই পাঠকের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে– জনসম্মুখে এখতেলাফী মাসআলা আলোচনা করতে না চাওয়া এবং এর কারণ হিসেবে মানুষের মাঝে ফেতনা অ বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাকে চিহ্নিত করাটা আমাদের আলেমগণের কোনো সাধারণ প্রবণতা নয়, বরং তারিখী বাস্তবতার ভিত্তিতে তুরাসী পন্থা।

সূত্র:
شرح معاني الأثار للطحاوي ٢/١٨٩
المعجم الأوسط للطبراني ١/٤٢
فتح الباري لابن حجر ١/٢٣٦
ترتيب المدارك لقاضي عياض ١/٦٦
كتاب الجامع لابن أبي زيد ١٤٦
فتاوى عزيزي –

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.