লেখক: মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানী
ভাষান্তর: হুসাইন আহমাদ খান
নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন গুণাবলির কথা পবিত্র কুরআন আমাদের জানিয়েছে। এ সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য নবিজির ﷺ শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। এই গুণাবলির মধ্যে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো, তিনি বিশ্বজগতের জন্য রহমত। কুরআন বলছে, ‘আর আমি আপনাকে জগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।’ এই ঘোষণার ব্যাপকতা ও সার্বজনীনতা বিবেচনা করলে দেখা যায়, নবিজির ﷺ রহমত নির্দিষ্ট দেশ ও স্থানের পরিধি অতিক্রম করে সমগ্র জগতকে অন্তর্ভুক্ত করে। একইসাথে যুগ ও সময়ের সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে বেষ্টন করে কেয়ামত পর্যন্ত সময়কালকে। এটা কোনো সাধারণ দাবি নয়। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, ইতিহাস যার সম্পর্কে এমন দাবি করতে পারে। এই দাবি যতটা মহান ও মর্যাদাশীল ততটাই বাস্তবভিত্তিক এবং তাঁর জন্য উপযুক্ত। মহানবির ﷺ রহমতের পরিধি সমগ্র বিশ্বে বিস্তৃত; জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিদ্যমান তাঁর আদর্শ। কিন্তু আমরা এই নিবন্ধে বর্তমান যুগে মানবজাতির প্রতি তাঁর রহমতের বিশেষ কিছু দিকের উপর আলো ফেলবো।
প্রথমত, মহানবি ﷺ মানবজাতিকে আল্লাহর তাওহিদ ও একত্ববাদের শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করা একটি সাধারণ জিনিস বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কুফরী, নাস্তিকতা, শিরক ও সৃষ্টিপূজার বিরুদ্ধে এ এক মহাবিপ্লবের ঘোষণা। আল্লাহকে অস্বীকার করাটা মানুষকে দায়িত্বজ্ঞানহীন, পাপের ক্ষেত্রে দুংসাহসী ও বস্তুবাদী করে তোলে। কেননা তার মাঝে জবাবদিহিতার ভয় থাকে না। দুনিয়া তার জন্য শুধুই ভোগবিলাসের ক্ষেত্র হয়ে যায়। কেমন যেন সে আল্লাহর দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে ভোগ-বিলাসের দাস হয়ে যায়! শিরক মানবজাতির জন্য অপমানস্বরূপ। কেননা মুশরিকরা তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ জিনিসের সামনে মাথানত করতে লজ্জাবোধ করে না। তারা সৃষ্টিকর্তার পরিবর্তে সৃষ্টির কাছে লাভ-ক্ষতির আশা রাখে। এজন্য তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় ব্যক্তিপূজার মনোভাব। মুহূর্তে মুহূর্তে রিক্তহস্ত হওয়ার আশঙ্কা তাদেরকে গ্রাস করে নেয়। তাদের অন্তরে আসন গেড়ে বসে ভয় ও ভীতি। অপরদিকে মানবজাতির সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের সঙ্গে জড়িত। তাওহীদ গ্রহণের অর্থ হচ্ছে এই ঘোষণা করে দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সামনে আমার মাথা অবনত হবে না। এটা সমগ্র মহাবিশ্বের উপর মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন। কুরআন আমাদের জানিয়েছে, আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে দিয়ে হজরত আদম আ.-কে সেজদা করিয়েছেন। এভাবে প্রকাশ পেয়েছে মানুষের মর্যাদা ও আভিজাত্য। যে ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করে, সে ঈমান রাখে যে, কোনো সৃষ্টি তার উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। এভাবে তাওহীদপন্থিদের মাঝে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভয় ও ভালোবাসা তৈরি হয়। আর এই ভয় ও ভালোবাসা তাদের মাঝে জাগ্রত করে দায়িত্ববোধ। সে মনে করে, দুনিয়া সংক্ষিপ্ত, ভোগবিলাসে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। বরং এটা একটি পরীক্ষা─এখানে খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। সুতরাং তাওহীদ ও একত্ববাদের বিশ্বাস মানবজাতির জন্য এক মহান রহমত, যা মহানবির ﷺ মাধ্যমে লাভ হয়েছে।
যদিও নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগেও বহু নবি তাওহীদ প্রচার করেছেন─অনেক সংস্কারকও শিরক মুছে ফেলার দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন, কিন্তু নূহ আ. থেকে শুরু করে নবিজি ﷺ পর্যন্ত সর্বদাই মানবজাতির উপর শিরকের প্রাধান্য ছিলো। এমনকি তাওহীদের আওয়াজ নিয়ে যেসব ধর্মের উত্থান ঘটেছিলো, কালপরিক্রমায় সেগুলোই শিরকের রঙে রঙিন হয়ে পড়ে। ইহুদিরা মূলত তাওহীদপন্থি ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে ইহুদীদের কিছু সম্প্রদায় হযরত উজাইর আ.-কে আল্লাহর শরিক সাব্যস্ত করেছে। অপরদিকে খ্রিস্টানরা তো হযরত ঈসা আ.-কে খোদার আসনে বসিয়ে দিয়েছে! হিন্দুধর্মেও একেশ্বরবাদের উপাদান রয়েছে। কিন্তু তারা নিজেদের জন্য অগণিত দেবতা তৈরি করে নিয়েছে। বৌদ্ধধর্মের ভিত্তি তাদের ভাষ্যকারদের মতে, খোদাকে অস্বীকার করার উপর। কিন্তু বৌদ্ধধর্মের অনুসারীরা স্বয়ং বুদ্ধের উপাসনা শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু মহানবি ﷺ তাওহীদের ভিত এমনভাবে স্থাপন করেছেন─কেয়ামত পর্যন্ত এটি একটি প্রভাবশালী মতবাদে পরিণত হয়েছে। এমনকি যেসব ধর্ম শিরকের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিলো, সেগুলোতেও এমন আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছিলো, যা তাওহীদের প্রতি আহ্বান জানায়।
মহানবির ﷺ রহমতের দ্বিতীয় নিদর্শন হলো, ‘মানব ঐক্য’র ধারণা। নবিজির ﷺ আগমনের পূর্বে দুনিয়ার প্রায় সকল সভ্যতা ও ধর্মে মানুষে মানুষে প্রভেদ ছিলো। তাদের মধ্যে কিছু মানুষ ছিলো জন্মগত সম্মানিত, আর কিছু মানুষ তুচ্ছ ও অপদস্থ। ইয়াহুদিরা বনি ইসরাইলী ও অ-বনি ইসরাইলীদের মাঝে পার্থক্য করতো। যে ব্যক্তি ইয়াকুব আ.-এর বংশ থেকে জন্মলাভ করতো, তাকে মনে করতো সম্মানিত। ইরানিদের বিশ্বাস ছিলো, যে রাজবংশে জন্মগ্রহণ করে সে খোদার বিশেষ ও ঘনিষ্ঠ বান্দা হয়ে থাকে। বরং তারা হলো খোদার পরিবারের সদস্য! ভারতের অবস্থা ছিলো সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদেরকে চার ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিলো। তাদের ধারণা অনুযায়ী, কিছু মানুষ ছিলো ঈশ্বরের মাথা থেকে সৃষ্ট, কিছু মানুষ বাহু থেকে, কিছু মানুষ উরু থেকে আর কিছু মানুষ পা থেকে। এদেরকে যথাক্রমে ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, ক্ষত্রিয় ও শূদ্র বলা হতো। শূদ্র’রা এমনই এক হতভাগ্য গোষ্ঠী যে, সম্মিলিত ও জাতিগত নিপীড়নের এমন উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই পাওয়া যাবে। শিক্ষার দরজা তাদের জন্য ছিল বন্ধ। তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে তুচ্ছ ও অপমানজনক কিছু পেশা। তারা উচ্চ বর্ণের মানুষদের জন্য জন্মসূত্রে দাস। কমবেশি এমনই ছিলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিভিন্ন জাতির ধর্মীয় অবস্থা।
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘মানব ঐক্য’র ধারণা পেশ করেন। বাতিল করে দেন জন্মগতভাবে উন্নত ও অনুন্নত এবং উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট হওয়ার ধারণা। তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন─ কোনো অনারবের উপর কোনো আরবের, কোনো কৃষ্ণাঙ্গের উপর কোনো শ্বেতাঙ্গের, শুধু বংশ ও রংয়ের কারণে কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, বরং শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হচ্ছে ব্যক্তির তাকওয়া এবং তার আমল। এই ঘোষণা আরবের সম্ভ্রান্ত গোত্রের লোকদের আর হাবশা ও রোমের বেলাল ও সুহাইব রা.-কে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বরং এই অনারব ক্রীতদাস─যাদেরকে অবজ্ঞার চোখে দেখা হতো─আরবের নেতারা পর্যন্ত তাদের দেখে ঈর্ষান্বিত হয়েছিলো। এমনকি উমর ফারুক রা.-এর মতো মহান সাহাবিও তাদেরকে ‘সরদার’ বলে সম্বোধন করতেন। নবিজির ﷺ শিক্ষার ফলশ্রুতিতে ইসলামের যতা প্রসার ঘটতে থাকে, বৈষম্যের শৃঙ্খল ততটাই ভেঙ্গে গুড়িয়ে পড়তে থাকে। সর্বত্র স্লোগান ওঠে মানবিক সাম্যের। দুনিয়াতে জন্মগত নির্যাতিত ও অপদস্থ জাতিগোষ্ঠী মুক্তি পেতে থাকে। আর যদি কোন মানবগোষ্ঠী তাদের বর্বরতা ও শক্তি দিয়ে এই নিপীড়নের ধারা অব্যাহতও রাখে, তাহলেও তারা চারদিক থেকে অন্যদের কটূক্তি ও নিন্দার পাত্রে পরিণত হয়। তাদের বিরুদ্ধে মজলুমদের আওয়াজ তোলার সুযোগ তৈরি হয়। এটা নবিজির ﷺ এমন রহমত─যা থেকে কোনো অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারে না।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ‘মানব ঐক্য’র এই ধারণাটি জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রভাব ফেললো। সব ধরণের পেশার দ্বার সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত হলো। অবসান ঘটলো পেশার অপমান ও অবমাননা। জ্ঞানের আলো সকলের মাঝে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়লো। প্রত্যেকেই জ্ঞানার্জনের অধিকার পেলো। সামাজিক জীবনে সকলের জন্য মর্যাদাপূর্ণভাবে জীবনযাপনের পথ তৈরি হলো। বাস্তবায়ন হলো অপরাধ ও শাস্তির ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার। প্রত্যেকের জন্য নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার সুযোগ লাভ হলো। এই ‘মানব ঐক্য’র ধারণা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেললো রাষ্টব্যবস্থার উপর। ইসলামের আগে রাজতন্ত্র সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক দিগন্তে ছেয়ে গিয়েছিলো। প্রয়োগিকভাবে অন্য কোনো রাষ্ট্রধারণা তখনকার যুগে বিদ্যমান ছিলো না। ইসলামের সূচনাপর্বে বিদ্যমান প্রভাবশালী সবগুলো সাম্রাজ্যে রাজতন্ত্র কায়েম ছিলো। রোমে রাজতন্ত্র ছিলো। ইরানে রাজতন্ত্র ছিলো। হাবশায় রাজতন্ত্র ছিলো। ইয়েমেনে রাজতন্ত্র ছিলো। ভারত ও চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট-বড় একাধিক রাজা ছিলো। ফলে পুরো বিশ্ব ছিলো রাজতন্ত্রের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা এবং স্বৈরাচারের নখেরর অধীনে। গ্রিসের দার্শনিক যে গণতন্ত্র উপস্থাপন করেছিলেন, সেখানে সরকার গঠনের অধিকার ছিলো ‘অভিজাত’ শ্রেণীর, সাধারণ মানুষ সেখানে অংশগ্রহণ করতে পারতো না। ইসলামের উপস্থাপিত মানব ঐক্য ও সাম্যের ধারণা বংশানুক্রমিক পরম্পরায় ক্ষমতা ও নেতৃত্বের পালাবদলের ভিত ধসিয়ে দিলো। প্রাধান্য পেলো গণতন্ত্রের ধারণা। তাই বর্তমানে প্রায় সমগ্র বিশ্ব গণতান্ত্রিক, যা মূলত ইসলামি খেলাফত নীতি থেকে ধার করা। এই গণতন্ত্র নিজের সমস্ত ভ্রান্তি ও ত্রুটি সত্ত্বেও মানব ঐক্য ও সাম্যের পতাকাবাহী। এমনকি আজ রাজতন্ত্রের অস্তিত্বও নেই বা থাকলেও শুধু সাংবিধানিক ও প্রতীকীরূপে নিঃশ্বাস গুণছে। আর যদি জোরপূর্বক কোনো রাজতন্ত্র বহাল থেকেও থাকে, তাহলে সেটা বিশ্বদরবারে ঘৃণ্য ও নিন্দনীয় হয়ে আছে!
মহানবির ﷺ রহমতের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জ্ঞানার্জনে উৎসাহ প্রদান। পড়ালেখা ও শিক্ষা অর্জন থেকে বিমুখ সমাজ সকলের কাছেই তিরস্কৃত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহ্যত উম্মী বা নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞানার্জনের প্রতি সর্বদা উৎসাহিত করে গেছেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে জাগতিক ও উর্ধ্ব-জাগতিক জ্ঞানের মাঝে খুব বেশি তারতম্য করেননি। শ্রেণীবৈষম্য মিটিয়ে দিয়ে ব্যাপক করেছেন জ্ঞানার্জনকে। মানবজাতির উপকারী প্রতিটি জ্ঞান লাভের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন। হাদিসে এসেছে, ‘নবিজি ﷺ ফজরের সলাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিযিক এবং কবুলযোগ্য আমল প্রার্থনা করি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৯২৫) আরও বলেছেন, যেখানেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা পাওয়া যায়, সেখান থেকেই তা লুফে নাও, যেভাবে মানুষ তার হারানো জিনিস পেয়ে লুফে নেয়। (দেখুন তিরমিজি: ২২৮)
নবিজি ﷺ বদর যুদ্ধে বন্দী মুশরিকদের পণ হিসেবে মুসলিম শিশুদের শিক্ষাদান নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি মদিনার ইহুদিদের বিদ্যানিকেতন ‘বাইতুল মাদারিস’ পরিদর্শন করেন, যা জ্ঞানের ক্ষেত্রে তার উদার হৃদয় ও খোলা মনের পরিচয় বহন করে। এতে শুধু ইলম ও জ্ঞানচর্চার সূচনাই ঘটেনি; বরং অবৈজ্ঞানিক পরিবেশে বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। ভেঙে পড়েছে কুসংস্কারের শৃঙ্খল। শিরক যেহেতু সৃষ্টিকে স্রষ্টার আসনে বসায়; ফলে স্রষ্টার মাহাত্ম্য ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, তাই শিরক জ্ঞান ও গবেষণার বিকাশ এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর তাওহীদ যেহেতু স্রষ্টাকে উপযুক্ত মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে, সৃষ্টির দাসত্বকে নাকচ করে; এজন্য মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তুর উপর আলোচনা-পর্যালোচনা ও চিন্তা-গবেষণার পথ খুলে যায়। একজন মানুষ জ্ঞানে যত বেশি অগ্রসর হয় এবং মহাবিশ্বের আবরণ তার সামনে যত বেশি উন্মোচিত হয়, সে ততবেশি কুসংস্কার থেকে দূরে সরে যায়। এজন্য ইসলাম জ্ঞান ও গবেষণার পথ খুলে দিয়েছে। হৃদয় থেকে মুছে দিয়েছে সৃষ্টির ‘অতিরঞ্জিত মাহাত্ম্য’। ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে কুসংস্কারের পর্দা। ইসলামের পূর্বে মানুষ নারীদেরকে, প্রাণীদের মধ্যে গাধাকে, পাখিদের মধ্যে উল্লুককে, মাসের মধ্যে সফর ও শাওয়ালকে, দিনের মধ্যে বুধবারকে অশুভ মনে করতো। সফলতা-ব্যর্থতার আশা রাখতো নিজেদের লিখিত পাশার উপর। অশুভত্বের এই কুসংস্কারের মধ্যে আরও অনেক কিছু আরবে পাওয়া যেত। বরং হিন্দুস্তানে বড় বড় ব্যক্তিত্বের মাঝে এখনও পাওয়া যায়। এমনকি ইউরোপের মানুষেরাও ব্যাপকভাবে এতে নিমজ্জিত।
ইসলামের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কুসংস্কারগুলো দূর করেছেন। তিনি প্রায়োগিকভাবে স্পষ্ট করেছেন, লাভ-ক্ষতি কোনো জীবজন্তুর সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং সবকিছু আল্লাহর হাতে। এছাড়াও যেসকল বিষয়কে ‘অশুভ’ মনে করা হতো সেগুলোও তিনি সুস্পষ্টভাবে বাতিল ও অমূলক ঘোষণা করেছেন। এটা নবিজির ﷺ রহমতের উল্লেখযোগ্য একটি দিক। এর মাধ্যমে তিনি মানবজাতিকে কুসংস্কারের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে জ্ঞান ও গবেষণার জগতের পথ দেখিয়েছেন। এই পথনির্দেশনা গভীর গবেষণা ও নব উদ্ভাবনের দ্বার খুলে দিয়েছে, যার প্রমাণ ও সুফল আজ আমাদের সামনে।
ইসলামের পূর্বে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীন ও দুনিয়াকে দুটি বিপরীত প্রান্তে রেখেছিলো। কিন্তু দীন ও দুনিয়ার এই বিভাজন ছিলো প্রকৃতির নিয়ম-বহির্ভূত। তারা বিবাহকে মনে করতো নিকৃষ্ট কাজ। খোদার নৈকট্য লাভের জন্য বৈরাগ্য জীবন গ্রহণ করা আবশ্যক বলে বিবেচনা করতো। নারী ও পুরুষের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক সকল অবস্থাতেই পাপ বলে মনে করতো। জীবিকা উপার্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রমকে ধর্মবিরোধী ও স্রষ্টার অসন্তুষ্টির কারণ বলে ধারণা করতো। এমনকি খ্রিস্টধর্মে সন্ন্যাসবাদের আধিপত্য এই পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে, গোসল করা, পবিত্র হওয়া, পরিষ্কার কাপড় পরিধান করা ও সুগন্ধি ব্যবহার করাকে আল্লাহর ইচ্ছার পরিপন্থী মনে করা হতো! এজন্য তারা টানা দশ বছর গোসল থেকে দূরে থাকতো। নবিজির ﷺ রহমতের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বৈরাগ্য ও সন্যাসবাদকে বিলুপ্ত করা। মহানবির ﷺ শিক্ষা হলো, শরিয়তের গণ্ডির মধ্যে অবস্থান করে দুনিয়াবি কাজ করাটাও দীনের একটি অংশ। দুনিয়াবি কাজকর্মে হালাল-হারামের পার্থক্য করার নাম দীন, দুনিয়াকে একেবারে ছেড়ে দেওয়া নয়! এজন্য তিনি বিবাহের নির্দেশ দিয়ে এটাকে তাঁর ও নবিদের সুন্নাত বলে ঘোষণা করেছেন। অপছন্দ করেছেন বৈরাগ্য অবলম্বন করাকে। জীবিকা উপার্জনকে মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য বলে জানিয়েছেন এবং তাতে উৎসাহিত করেছেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দিয়েছেন। এমন কোনো আদেশ দেননি, যা মানবপ্রকৃতির পরিপন্থী। বরং মানব প্রকৃতির সকল চাহিদা ও দাবিকে বৈধ রাখা হয়েছে। এমন কোন আদেশ দেয়া হয়নি, যা মানবপ্রকৃতির বিরুদ্ধে যায়।
এগুলোই হলো আল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বজনীন রহমতের কিছু দিক, যা মানব ইতিহাসে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। এগুলোর মাধ্যমে মানুষের যথাযথ মর্যাদা ও আভিজাত্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। নবিজির ﷺ মাধ্যমে মানবজাতি আজ লাভ করেছে ন্যায়, সাম্য ও পরস্পর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। তাঁরই উপলক্ষ্যে বিভক্তি ও বিভাজনের কৃত্রিম প্রাচীর ধ্বসে পড়েছে। তাঁরই উৎসাহে মানবজাতি কুধারণা ও কুসংস্কারের পরিবর্তে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা খাটিয়ে কাজ করতে শিখেছে এবং তাদের মধ্যে জেগে উঠেছে জ্ঞান ও গবেষণার প্রেরণা। তিনি মানুষকে করেছেন মধ্যপন্থী, ভারসাম্যপূর্ণ, প্রকৃতির নিয়মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ─ দান করেছেন এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের সমস্ত চাহিদা পূরণ করে। এই বিশ্বজগতের রহমত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি কেয়ামত পর্যন্ত মানবতা ও মানবজাতি কৃতজ্ঞ থাকবে, আর স্বীকৃতি দিতে থাকবে ‘আর আমি আপনাকে জগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি’ ঐশী বাণীর সত্যতার।



