মূল : ইনতেজার হুসাইন
তরজমা : মাসুম বিন শাহাদাত

এক ছিল কাঠুরে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এক চিলতে কুঁড়েঘর বানিয়ে সে বাস করত। সেখানে কাঠুরে আর তার বউ, দুজনের সংসার ছিল সুখে-শান্তিতেই। ​

কিছুদিন পরেই সেই ঘর আলো করে এলো ফুটফুটে এক ছেলে। ঠিক যেন আকাশের চাঁদ! সেই হাসিখুশি আর ধবধবে ফর্সা শিশুটিকে দেখে বাবা-মার আনন্দের যেন আর সীমা রইল না। তারা আদর করে ছেলের নাম রাখল ‘মোতি’।

তারা বলত, ‘আমাদের ছেলে আসল মোতির চেয়েও অনেক বেশি দামি।’
মায়ের শখ বলে কথা! মোতির গলায় একটি মুক্তোর মালাও পরিয়ে দিল। মালাটা দেখতে ছিল ঠিক ফকির- দরবেশদের গলার মালার মতো।

একদিন হলো কী, কাঠুরে কাঠ কাটতে অনেক দূরে পাহাড়ের গহীনে চলে গেল। মোতির মা মোতিকে দিল দোলনায় ঘুম পাড়িয়ে। তারপর নিজে কাপড় ধুতে বাইরের ঝরনার ধারে চলে গেল। ছোট্ট মোতি তখন ঘরে একদমই একা।

​মোতির মা যখন কাপড় ধোয়ায় ব্যস্ত, হঠাৎ ঘর থেকে মোতির চিৎকার আর কান্নার শব্দ ভেসে এলো। মা তো ভীষণ ঘাবড়ে গেল! সে নিজের কুঁড়েঘরের দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে বলতে লাগল,
‘হায় আল্লাহ, রক্ষা করো! আমার বাচ্চার কী হলো গো? ওর কিছু হলে তো আমার স্বামী আমাকে মেরেই ফেলবে!’

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

সে যখন কুঁড়েঘরের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখতে পেল—
এক কালো ভাল্লুক মোতিকে জাপটে ধরে নিয়ে যাচ্ছে! দেখে তো মায়ের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ভাল্লুকটার পেছন পেছন দৌড়াতে লাগল আর চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘ওগো, কে কোথায় আছো! আমার বাছাটাকে বাঁচাও!’ কিন্তু কে বাঁচাবে? ​

ভাল্লুকটা মোতিকে নিয়ে পাহাড়ের গহীনে ঢুকে পড়ল। দুঃখিনী মা তার পিছু ছুটতে লাগল আর আর্তনাদ করতে লাগল, ‘হে লোকেরা, আমার মানিককে বাঁচাও!’

দেখো, কী কাকতালীয় ব্যাপার! ঠিক সেই সময় কাঠুরেও মাথায় লাকড়ির বোঝা আর কাঁধে কুড়াল নিয়ে পাহাড় থেকে বাড়ির দিকে ফিরছিল। যখনই সে তার স্ত্রীর আর্তনাদ শুনল, তাকিয়ে দেখল—

দুই পাহাড়ের মাঝখানের পথ দিয়ে একটা ভাল্লুক তার আদরের ছেলে মোতিকে জাপটে ধরে দৌড়ে পালাচ্ছে। কাঠুরে লাকড়ির বোঝাটা সেখানেই মাটিতে ফেলে দিল। তারপর হাতের কুড়ালটা শক্ত করে ধরে ভাল্লুকটার পিছু নিল। ​

ততক্ষণে শোরগোল আর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজনও সেখানে এসে জড়ো হলো। সবাই মিলে কাঠুরের সঙ্গে ভাল্লুকটার পিছু নিল। অত মানুষকে ধেয়ে আসতে দেখে ভাল্লুকটাও যেন ঘাবড়ে গেল। সে আরও জোরে দৌড়াতে লাগল। ​

সত্যি বলতে, ভাল্লুকটা প্রায় মানুষের হাতের নাগালে চলেই এসেছিল, কিন্তু ছোট্ট মোতির কপাল খারাপ। সামনেই ছিল এক নদী। নদী পার হওয়ার জন্য তার ওপর আস্ত একটা গাছের গুঁড়ি সাঁকো হিসেবে রাখা ছিল। ​

ভাল্লুকটা চটপট সেই গুঁড়ির ওপর দিয়ে নদী পার হয়ে গেল। ওপাড়ে পৌঁছেই সে বুদ্ধি করে গুঁড়িটাকে টেনে নদীর পানিতে ফেলে দিল। ব্যস, এরপর চোখের পলকে পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।

​​লোকেরা নদীর পাড়ে গিয়ে দেখল, গাছের গুঁড়িটি স্রোতের তোড়ে ভেসে চলে গেছে অনেক দূরে। এখন তারা কীভাবে নদী পার হবে? নিরুপায় হয়ে সবাই পাড়ে দাঁড়িয়েই চিৎকার করতে লাগল। ​

ভাল্লুকটা ততক্ষণে মানুষের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে চলে গেছে। এই নদী থেকে বেশ কিছুটা দূরেই ছিল পাহাড়ের এক গভীর গুহায় তার আস্তানা।

সেখানে ছিল এক মা ভাল্লুক। আজই তার একটা বাচ্চা হয়েছে, কিন্তু জন্মের পরেই বাচ্চাটি মারা গেছে। সন্তান হারিয়ে সে ভীষণ মন খারাপ করে বসে ছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ভাল্লুকটি মোতিকে নিয়ে গুহায় ঢুকে বলল, ​‘এই দেখো, তোমার জন্য কত সুন্দর বাচ্চা নিয়ে এসেছি!’ মা ভাল্লুকটি বাচ্চাটির দিকে তাকাল। মোতির নিষ্পাপ মিষ্টি মুখ দেখে সে নিজের সন্তানের শোক একদমই ভুলে গেল।

সে মোতিকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিল এবং নিজের বুকের সাথে এমনভাবে লেপ্টে ধরল, যেন সে তারই ছেলে। এরপর থেকে মা ভাল্লুকটি মোতিকে নিজের সন্তান মনে করতে লাগল। সে একদম সত্যিকারের মা হয়ে মোতির যত্নআত্তি ও লালনপালন শুরু করল।

সেই ভাল্লুকটা ছিল বনের রাজা। বনের সব পশুপাখি যখন এই খুশির সংবাদটি শুনল, তারা সবাই নানারকম ফলমূল, শুকনো মেওয়া ও মৌচাকের মধু উপহার নিয়ে গুহায় এসে হাজির হলো।

ভাল্লুক রাজা তার গুহার সেই রাজপ্রাসাদ থেকে রাজকুমার মোতিকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। সে তার প্রজাদের দেখা দিল এবং সবার উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,

‘ওহে বনবাসী! শোনো, এ হলো আমার রাজকুমার। আমার উত্তরসূরি। আমার পর সেই হবে বনের রাজা!’ ​একথা শুনে বনের সব পশুপাখি আনন্দে মেতে উঠল আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল খুশির জয়ধ্বনি।

মোতি ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করল। রাজা ভাল্লুক আর রানি ভাল্লুক তাকে পরম আদরে লালন-পালন করতে লাগল। রাজা ভাল্লুক মোতিকে নিজ হাতে কুস্তি লড়তে শেখাল। কুস্তিতে সে এমনই পটু হয়ে উঠল, মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই যেকোনো পশুকে কাত করে ফেলত।

বানর ও শিয়ালকে তো মুহূর্তেই কুপোকাত করে ফেলত! ​‘বাহ্ রে আমার ভোলু পালোয়ান! তোমার বাহাদুরি দেখে তো অবাক!’ এভাবেই সময় কাটতে লাগল।

মোতি যখন কুস্তিতে ওস্তাদ হয়ে গেল, তখন হরিণ চাচা তাকে দৌড় শেখাতে শুরু করল। দৌড়ে হরিণ চাচা তো ছিল উস্তাদ, কিন্তু তার শিষ্য মোতিও কম নয়, সেও দারুণ কুশলী হয়ে উঠল। সে খরগোশের মতো দ্রুতবেগে দৌড়াত, আর বড় বড় সব নদী এক লাফেই পার হয়ে যেত।

​​​​​মোতির বয়স যখন মাত্র আট বছর, তখন রাজা ভাল্লুক খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। তার অবস্থা এতটাই খারাপ হলো, বাঁচার আশা প্রায় ছেড়েই দিতে হলো। মোতি রাজার সেবা করল। সে বন উজাড় করে কত রকম ওষুধি গাছগাছড়া আর লতাপাতা খুঁজে নিয়ে আসত, কিন্তু কিছুতেই রাজা মশাই সুস্থ হচ্ছিল না। বরং দিনকে দিন তার অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগল।

একদিনের কথা। এক নেকড়ে একঝাঁক নেকড়ের ফৌজ নিয়ে রাজা ভাল্লুকের গুহার সামনে এসে হাজির হলো। সে সেখানে দাঁড়িয়ে রাজাকে হুংকার দিয়ে বলতে লাগল, ‘তুমি এখন বুড়ো আর অকেজো হয়ে গেছ! তোমার শরীরে আগের মতো জোর ও ক্ষমতা নেই। তাই বলছি, রাজসিংহাসন ছেড়ে দাও। এখন থেকে আমিই হব এই বনের রাজা।’

বুড়ো অসুস্থ রাজা নেকড়ের সেই দম্ভভরা কথা শুনে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে গুহার দরজায় এসে দাঁড়াল। সে তার দিকে চরম ঘৃণা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
‘তাই যদি হয়, তবে চলে এসো রণক্ষেত্রে!’

আসলে নেকড়েটা রাজা ভাল্লুকে অসুস্থ দেখে বাঘ বনে গিয়েছিল। কিন্তু রাজা ভাল্লুক যতই অসুস্থ হোক না কেন, সামান্য এক নেকড়ের কাছে তো আর হার মানতে পারে না। সে তখনই গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো লড়াই করার জন্য।

মোতির আগে থেকেই খুব রাগ হচ্ছিল। রাজা ভাল্লুককে উঠে দাঁড়াতে দেখে তার আত্মসম্মানবোধ জেগে উঠল। সে তখনই বুক টান করে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বাবা, আপনি কষ্ট করবেন না। এই অধম ও নিচ নেকড়েকে আমিই আগে দেখে নিচ্ছি।’

​কিন্তু রাজা ভাল্লুকের আভিজাত্যে তা সইল না। মোতি, যে এখনো ছোট, তার মতো একটা বাচ্চা ছেলে এই রক্তপিপাসু নেকড়ের সাথে লড়বে আর সে বসে বসে তামাশা দেখবে, তা হতে পারে না।​

সে বলল ​‘না বেটা, একদম না! আমি এখনো বেঁচে আছি আর এই বিদ্রোহীর মাথা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি।’

ভাল্লুক আর নেকড়ের মধ্যে কুস্তি শুরু হলো। প্রথম কৌশলেই সে নেকড়েকে তার শক্তিশালী বাহুতে ধরে মাথার ওপর তুলে ধরল। তারপর গর্জন করতে করতে বলল,
​‘বল রে পাপিষ্ঠ বিদ্রোহী! এখন তোর কী মতলব? একবার যদি তোকে পাহাড়ের নিচে আছাড় দিই, তবে তোর কোনো হাড়গোড় আর আস্ত থাকবে না!’

নেকড়ের বাহিনী যখন তাদের সর্দারের এই অবস্থা দেখল, তখন তারা সবাই মিলে একযোগে ভাল্লুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

ভাল্লুক রাজা এমনিতে অনেক শক্তিশালী হলেও একপাল নেকড়ের সাথে একা আর কতক্ষণই বা লড়বে? তারা সবাই ধাক্কা দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। বেচারা ভাল্লুক ধস্তাধস্তি করে হাপাতে লাগল।

তখন ​​মোতি এমন অদম্য তেজ আর কৌশলে লড়াই শুরু করল, নেকড়ের পাল দিশেহারা হয়ে পড়ল। তারা এতটাই ভীত হয়ে পড়ল, প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিকে পারল ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে পালাল।

মজার ব্যাপার কি জানো, যারা পালাচ্ছিল তাদের মধ্যে নেকড়েদের সেই সর্দার, যে কি না নিজেকে বনের রাজা দাবী করছিল, সে ছিল তাদের সবার আগে!

​রাজা ভাল্লুক ততক্ষণে অনেক বেশি আহত হয়ে পড়েছিল। মোতির এই সাহস দেখে সে পরম আদরে তার পিঠ চাপড়ে দিল আর গর্বের সাথে বলতে লাগল, ‘ছেলে, আজ তুমি যে বীরত্ব ও সাহসিকতা দেখিয়েছ তাতে আমি খুব খুশি হয়েছি। আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আজ থেকে তুমিই হবে এই বনের রাজা।

দেখো, আমার একটি কথা সবসময় মনে রাখবে, সর্বদা ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞা দিয়ে রাজ্য শাসন করবে। আর এই বনের অসহায়, ছোট দুর্বল প্রাণীদের এই হিংস্র রক্তপিপাসু নেকড়েদের হাত থেকে বাঁচাবে।’ ​এই কথাগুলো বলতে বলতেই বুড়ো রাজা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।

রাজা ভাল্লুকের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মোতি হলো বনের রাজা। বনের পশুপাখিরা আগে থেকেই তার ওপর খুব খুশি ছিল; এখন সে রাজা হওয়ায় তারা সবাই পরিণত হলো তার অনুগত প্রজায়।

​এবার মোতির আসল পরিবারের খবর নেওয়া যাক! সেখানে কী ঘটছিল আর তার বাবা-মার ওপর দিয়েই বা কী বয়ে যাচ্ছিল? কাঠুরে আর তার স্ত্রী তাদের ছোট্ট মোতিকে অনেক খুঁজেছিল। বনের কোণায় কোণায় তল্লাশি চালিয়েছিল, এমনকি গভীর কুয়াগুলোর ভেতরেও বাঁশ ঢুকিয়ে পরীক্ষা করেছিল।

কিন্তু মোতিকে কোথাও পাওয়া গেল না।
শেষমেশ তারা ধৈর্য ধরল। ​কিছুদিন পর কাঠুরের স্ত্রীর কোলে এক অপূর্ব সুন্দরী কন্যা এলো। সে যেন সাক্ষাৎ হীরা! তারা ভালোবেসে তার নাম রাখল, ‘নীলম’।

নীলমের বয়স যখন ছয় বছর হলো এবং সে কিছুটা বুঝতে শেখল, তখন একদিন তার মা তাকে কাছে বসিয়ে বলল, ​
‘মেয়ে, আমার কথাটি একটু মন দিয়ে শোন। তোর কিন্তু একটা বড় ভাইও ছিল। তার নাম ছিল মোতি। সে তখন মাত্র কয়েক দিনের শিশু, হঠাৎ এক ভাল্লুক এসে তাকে তুলে নিয়ে যায়। সেই দিন থেকেই সে নিখোঁজ। আমরা তাকে অনেক খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। তবে আমার বিশ্বাস, তোর ভাই মোতি নিশ্চয়ই বেঁচে আছে!’

​নীলম যখন শুনল, তার একটা বড় ভাই আছে, সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই তার খুব আফসোস হলো, আল্লাহ তাকে ভাই তো দিয়েছেন, কিন্তু তাকে এক ভাল্লুক তুলে নিয়ে গেছে!

মা তাকে আরও বলল, ​‘নীলম মা, আমার মন বলছে তোর ভাই মোতি বেঁচে আছে। একদিন সে নিশ্চয়ই তোর কাছে ফিরে আসবে। তার একটা চিহ্ন মনে রাখিস—

​তার গলায় মোতির একটা মালা আছে। ঠিক ওরকম আরেকটি মালা আমার কাছে আছে। সেই মালাটি আমি তোর গলায় পরিয়ে দিচ্ছি। যাতে কখনো যদি তোর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়, তবে তুই তাকে দেখা মাত্রই চিনে নিতে পারিস।’

​তার কিছুদিন পরের কথা। নীলম ফল পেড়ে আনার জন্য একটি পাহাড়ে চড়ছিল। কিন্তু সে ভালো ও মিষ্টি ফল কোথাও খুঁজে পাচ্ছিল না। তবে সেও ছিল এমন এক জেদি মেয়ে, সামনে চলতে শুরু লাগল। চলতে চলতে সে এক গভীর নির্জন বনের মধ্যে এসে পৌঁছাল।

নীলম এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল, তখনই পাশ থেকে একটি ঝরনা বয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল। সে সেদিকে তাকিয়ে যা দেখল, তাতে তো তার চোখ ছানাবড়া! ঝরনার পাশেই খুব সুন্দর এক কিশোর বসে আছে। আর তাকে ঘিরে আছে বানর, ভাল্লুক ও বনের আরও কত পশুপাখি!

​​ছেলেটিকে তার খুব পছন্দ হলো এবং ভেতরে ভেতরে সে তার প্রতি অদ্ভুত এক টান অনুভব করল। তাকে আরও ভালোভাবে দেখার জন্য সে কিছুটা এগিয়ে গেল। ছেলেটিকে তার আরও বেশি আপন আর প্রিয় মনে হতে লাগল।

​হঠাৎ নীলমের দৃষ্টি তার গলার ওপর পড়ল। সেই কিশোরের গলায় ঝুলছিল চমৎকার একটি মোতির মালা। নীলম নিজের গলার মালাটি একবার দেখল, তারপর সেই কিশোরের মালার দিকে তাকাল। এবার সে পুরোপুরি নিশ্চিত হলো, দুটো মালা হুবহু একই রকম!

সে খুশিতে এই বলে নেচে উঠল, ​‘আহা! এতো দেখছি আমার ভাই!’ তারপর চিৎকার করে ডাকতে লাগল, ‘মোতি, মোতি ভাইজান!’ মোতি তার ডাক শুনে খুবই অবাক হলো। জ্ঞান হওয়ার পর সে কখনো মানুষের কণ্ঠস্বর শোনেনি।

মেয়েটি কী বলছে, সে কিছুই বুঝতে পারল না। সে শুধু বিস্ময়ে হা করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এমন সময় দেখল, হঠাৎ এক পাশ থেকে একটা নেকড়ে এসে মেয়েটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মেয়েটি বাঁচার জন্য হাত-পা ছুড়ল, প্রাণপণে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু হিংস্র নেকড়ের শক্তির কাছে পেরে উঠল না।

নেকড়েটা নীলমকে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল এবং চোখের পলকে এক দিকে দ্রুত দৌড়ে পালাল। ​তা দেখে একটি বানর খুব আফসোস করে বলতে লাগল,
‘আহা! কত মিষ্টি একটা মেয়ে। বেচারি মেয়েটি পাহাড়ের পাদদেশে তার বাবা-মায়ের সাথে থাকে। এই গহীন বনে কেন যে এলো! নেকড়েটা ওকে নিয়ে গেল। ওই রক্তপিপাসু নেকড়েটা নির্ঘাত মেয়েটিকে মেরে ফেলবে। আমাদের এখনই কিছু একটা করা উচিত, ওকে নেকড়ের মুখ থেকে বাঁচাতে হবে!

মোতিরও অসহায় মেয়েটির জন্য খুব মায়া হলো। সে তক্ষুনি উঠে দাঁড়াল। তার সাথে তার সকল বন্ধুবান্ধব ও সাহায্যকারী পশুপাখিরাও উঠে দাঁড়াল এবং সবাই মিলে নেকড়েটিকে ধাওয়া করতে শুরু করল। ​অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে নেকড়েটা মেয়েটিকে মুখে কামড়ে ধরে পাহাড়ে চড়ে গেছে, আর মোতি ও তার সঙ্গীরা পড়ে আছে নিচের উপত্যকায়।

পথে একটি নদী পড়ল, যার ওপর কাঠের একটি পুল ছিল। মোতির পরিকল্পনা ছিল, ওই পুল দিয়ে নদী পার হয়ে ওপাশের পাহাড় দিয়ে উঠবে এবং নেকড়েটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরবে।

কিন্তু নেকড়েটিও ছিল ভারি ধূর্ত ওস্তাদ! সে পাশেই থাকা একটি গাছ থেকে বোলতার বাসা ভেঙে মোতির সঙ্গী বানরটির ওপর ছুঁড়ে মারল। ঝাঁকে ঝাঁকে বোলতা বানরটিকে জাপটে ধরল এবং হুল ফুটিয়ে বেচারাকে লাল করে দিল।

যন্ত্রণায় বানরটি চিৎকার করতে লাগল। সে এতটাই ঘাবড়ে গেল, নিজের ভারসাম্য হারিয়ে পুলের ওপর থেকে পা পিছলে সোজা নদীতে গিয়ে পড়ল। এই অবস্থায় মোতি ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।
এখন তার সামনে বড় প্রশ্ন দেখা দিল, সে কি তার পরম বন্ধু বানরটিকে নদী থেকে উদ্ধার করবে, নাকি নেকড়েটিকে তাড়া করবে, যাতে মেয়েটিকে বাঁচানো যায়

​​মোতি ভাবল, আগে নিজের বন্ধু বানরটিকে বাঁচানো উচিত। তাই সে এক মুহূর্ত দেরি না করে নদীতে ঝাঁপ দিল। দ্রুত সাঁতরে বানরটির কাছে পৌঁছাল এবং অনেক কষ্টে তাকে টেনেহিঁচড়ে তীরের নিরাপদ জায়গায় তুলে আনল।

​ততক্ষণে নেকড়েটি মেয়েটিকে নিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল। মোতি যখন তার সাথীদের নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাল, সেখানে নেকড়ের নামগন্ধও ছিল না। মোতি পাহাড়ের এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করে নেকড়েটিকে খোঁজার চেষ্টা করল, কিন্তু সব চেষ্টাই বৃথা গেল।

​অবশেষে তার নজর পড়ল একটি পাথরের ওপর। সেখানে চমৎকার একটি মোতির মালা পড়ে আছে। সে মালাটি তুলে নিল। সে যখন মালাটিকে ভালো করে দেখল, তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। কারণ সে নিজের গলায় যে মালাটি পরে আছে এই মালাটি হুবহু তারই মতো!

​তার পাশেই বানরটি দাঁড়িয়ে ছিল। সে-ও মালাটির দিকে গভীরভাবে তাকাল। তারপর মোতিকে বলল,
​‘জাঁহাপনা, আমার মনে হচ্ছে মেয়েটি আপনার বোন। কারণ দুটো মালার হুবহু একই রকম হওয়া এটাই প্রমাণ করে, সে নিশ্চিতভাবেই আপনার বোন। তাছাড়া ওই মেয়েটির চেহারার সাথেও আপনার চেহারার অনেক মিল আছে।

বানরের কথা শুনে মোতির খুব দুঃখ হলো, ভীষণ রাগও হলো। সে ভাবল, সে এই বনের রাজা, অথচ একটা নেকড়ে তার বোনকে তুলে নিয়ে গেছে। মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করল, যেভাবেই হোক বোনকে নেকড়ের হাত থেকে উদ্ধার করবে। সে তখনই তার বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ঈগলকে ডেকে পাঠাল।
তাকে আদেশ দিল, ‘জলদি যাও, খুঁজে বের করো ওই নেকড়েটা মেয়েটিকে নিয়ে কোথায় লুকিয়ে আছে!’

ঈগল ডানা ঝাপটে উঁচুতে উঠে পাহাড়ের ওপর দিয়ে উড়তে লাগল। সে তীরের বেগে গেল আর ঝড়ের বেগে ফিরে এসে বলল, ‘জাঁহাপনা, ওই যে বড় গম্বুজটা দেখছেন, তার ওপাশেই একটা পাহাড় আছে। ​সেই পাহাড়ের চূড়ায় আছে একটি দুর্গ। সেখানেই নেকড়ে সর্দার থাকে, যে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে গেছে। সে একটি বুরুজে মেয়েটিকে বন্দি করে রেখেছে।’

​এ কথা শোনা মাত্রই মোতি কোমর বেঁধে যুদ্ধের জন্য তৈরি হলো এবং তার বাহিনীকে রওনা হওয়ার আদেশ দিল। মুহূর্তের মধ্যে তার পেছনে বানর, ভাল্লুক, শিয়াল, খরগোশ, হরিণ-সহ বিশাল এক বাহিনী চলতে শুরু করল। ঈগল সবার আগে আগে উড়ে যাচ্ছিল আর পুরো বাহিনীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

চলতে চলতে পথের মধ্যে এক ঘন জঙ্গল পড়ল। হঠাৎ ঈগল দ্রুত মোতির কাছে ফিরে এসে বলল,​‘জাঁহাপনা, থামুন; সর্বনাশ হয়ে গেছে! বনে আগুন লেগেছে। যদি আমরা এখনই এই আগুন না নেভাই, তাহলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। বনের প্রতিটি গাছ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে!’

বনের অন্য প্রান্তেই ছিল নেকড়েদের সেই দুর্গ। মোতি ঈগলের মাধ্যমে নেকড়ে সর্দারের কাছে একটি বার্তা পাঠাল, ‘বনে ভয়াবহ আগুন লেগেছে। যদি এই আগুন এখনই নেভানো না হয়, তবে আমাদের সবারই অপূরণীয় ক্ষতি হবে। আমাদের নিজেদের মধ্যকার বিবাদ নাহয় পরে মিটিয়ে নেওয়া যাবে, এখন চলো সবাই মিলে আগে এই আগুন নেভাই।’

​নেকড়েরা মোতির প্রস্তাবে রাজি হলো। ফলে বনের ওপাশ থেকে নেকড়েরা আর এপাশ থেকে মোতি তার বাহিনী নিয়ে এগিয়ে চলল। তারা সবাই প্রথমে নদীতে নেমে ভালোভাবে ডুব দিল। এরপর ভেজা শরীরে ফিরে এসে ঘাসের ওপর গড়াগড়ি খেতে শুরু করল। তাদের ভেজা শরীরের স্পর্শে আগুনের তেজ কমতে শুরু করল।

​যে সময় পশুপাখিরা মিলে ঘাস ভেজাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে কয়েকজন কাঠুরে পাহাড়ের উপত্যকা থেকে দৌড়ে সেখানে এসে পৌঁছাল। ​সেই কাঠুরেদের মধ্যে মোতির বাবা ছিল সবার আগে। তারা দ্রুত সেই গাছগুলো কাটতে শুরু করল, যেগুলোতে আগুন লেগেছিল, যাতে আগুন বেশি ছড়াতে না পারে।

অনেক চেষ্টার পর আগুন নিভল। বনবাসী পশুপাখি আর কাঠুরেরা যখন স্বস্তির শ্বাস নিচ্ছিল, ঠিক তখনই দুর্গ থেকে ছোট্ট একটি মেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এসে মোতির বাবাকে জড়িয়ে ধরল। এই মেয়েটিই হলো নীলম। ​আসলে হয়েছিল কী, আগুন দেখে নেকড়েরা ঘাবড়ে গিয়েছিল, তারা বুরুজ ও দুর্গের ফটক—দুটোই খোলা রেখে এসেছিল। নীলম চুপিসারে বাইরে উঁকি দিয়ে তার বাবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সে দৌড়ে এলো এবং তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

বাবা যখন নিজের মেয়েকে জীবিত ও সুস্থ-সবল দেখতে পেল, তখন যেন প্রাণ ফিরে পেল। তাকে পরম আদরে বুকে টেনে নিল। এরপর নীলম খুশিতে চিৎকার করে তার বাবাকে বলতে লাগল, ‘বাবা, ওই দেখো! ওই যে মোতি ভাইজান!’

কাঠুরে খুব ভালো করে মোতির দিকে তাকাল এবং শেষমেশ তাকে চিনতে পারল। সামনে এগিয়ে গিয়ে সে মোতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর করল। তারপর বলল, ‘খোকা, বাড়ি চল। তোর মা তোকে অনেক মনে করে।’

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.