মূল : ড. আবদুল আজিম ইসলাহী
তরজমা : মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ইসলামি অর্থনীতির অগ্রগামী চিন্তাবিদদের অন্যতম। প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি ইংরেজি, উর্দু, আরবি, ফরাসি ও তুর্কি ভাষায় ইসলামি অর্থনীতি-সম্পর্কিত অসংখ্য প্রবন্ধ ও গ্রন্থ-পর্যালোচনা রচনা করেন। আলোচ্য সংকলনে তাঁর ইংরেজি ভাষায় লিখিত ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ও বই-পর্যালোচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এগুলো কালানুক্রমিকভাবে সাজানো হয়েছে; যার প্রথমটি ১৯৩৬ সালে এবং সর্বশেষটি ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়। ইসলামি অর্থনীতি সম্পর্কে তাঁর সামগ্রিক চিন্তাধারা বোঝার আগে এসব রচনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় জানা প্রয়োজন।

১. “Islam’s Solution of the Basic Economic Problems: The Position of Labour” (মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যার ইসলামি সমাধান: শ্রমিকের অবস্থান)

১৯৩৬ সালে প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ে ড. হামিদুল্লাহর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রচনা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রবন্ধেই তিনি প্রথম “Islamic Economics” বা “ইসলামি অর্থনীতি” পরিভাষাটি ব্যবহার করেন, যা পরবর্তীকালে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানশাস্ত্রের পরিচায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রবন্ধের সূচনায় তিনি পাশ্চাত্যের laissez-faire (রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা) অর্থনীতির সমালোচনা করেন। একজন দক্ষ অর্থনীতিবিদের মতো তিনি এ মতবাদের সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করেন এবং দেখান যে ইসলামি অর্থনীতি কীভাবে মুক্তবাজার-নির্ভর এই দর্শন থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। একই সঙ্গে তিনি সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদকেও সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেন; পরবর্তীতে এ বিষয়ে তিনি Islam and Communism (১৯৫০) নামে একটি পৃথক গ্রন্থও রচনা করেন।

ড. হামিদুল্লাহর মতে, বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকেই বিশ্ব এমন এক নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজন অনুভব করছিল, যা পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয়ের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে সক্ষম। তাঁর ভাষায়, অবাধ পুঁজিবাদ (laissez-faire) এবং সমাজতন্ত্র উভয়ই চরমপন্থী অবস্থান; আর ইসলাম এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রদান করে, যা দক্ষতা (efficiency) ও ন্যায়বিচার (equity)-এর সমন্বয় ঘটাতে পারে।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

এই প্রবন্ধে তিনি ইসলামি অর্থব্যবস্থার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও মৌলিক নীতিমালা আলোচনা করেছেন। বিশেষত কৃষিক্ষেত্রে বিদ্যমান ভূমি ও মানবিক সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি যৌথ-শেয়ারভিত্তিক কৃষি-প্রতিষ্ঠান (joint-stock companies in agriculture)-এর ধারণাকে সমর্থন করেন। কৃষি অর্থনীতি নিয়ে তিনি পৃথকভাবে লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন; তবে তাঁর প্রকাশিত রচনাবলির মধ্যে এ বিষয়ে কোনো স্বতন্ত্র গবেষণা পাওয়া যায় না।

এই প্রবন্ধটি শুধু ড. হামিদুল্লাহর অর্থনৈতিক চিন্তার সূচনা নয়; বরং ইসলামি অর্থনীতিকে একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে প্রতিষ্ঠার ইতিহাসেও এটি একটি মাইলফলক। এখানে আমরা তাঁর সেই বৌদ্ধিক প্রয়াসের সাক্ষাৎ পাই, যা ইসলামের অর্থনৈতিক শিক্ষাকে আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক সংকটের বিকল্প সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল।

২. “Property” (মালিকানা ও সম্পত্তির অধিকার)

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো Muslim Conduct of the State। গ্রন্থটির জার্মান সংস্করণ ১৯৩৫ সালে বার্লিন থেকে প্রকাশিত হয় এবং ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৪১ সালে হায়দরাবাদ থেকে। পরবর্তীকালে এর একাধিক সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

গ্রন্থটির তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম “Property” (সম্পত্তি)। ইসলামি অর্থনীতির আলোচনায় সম্পত্তি ও মালিকানার প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের আগে মুসলিম গবেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা যায়নি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ড. হামিদুল্লাহর এই আলোচনা নিঃসন্দেহে পথিকৃৎসুলভ।

এই অধ্যায়ের বিশেষত্ব হলো, তিনি সম্পত্তির বিষয়টিকে কেবল ব্যক্তি-মালিকানা বা রাষ্ট্রীয় মালিকানার সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং ইসলামি রাজনৈতিক দর্শনের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। ফলে তাঁর আলোচনা একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, আইনগত, রাজনৈতিক ও সভ্যতাগত তাৎপর্যও বহন করে।

উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীন ফকিহগণের একটি মত ছিল যে উন্মুক্ত সমুদ্র (Open Sea) বা বৃহৎ জলরাশি কোনো রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় তা শত্রু-অঞ্চল (enemy territory)-এর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হতে পারে। ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ এই মতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, প্রাচীন যুগে মুসলমানদের নৌ-প্রযুক্তি সীমিত ছিল; ছোট পালতোলা জাহাজের সাহায্যে বিশাল সমুদ্রের ওপর কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল না। তাই ফকিহগণের এই মত আসলে প্রযুক্তিগত ও বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন।

ড. হামিদুল্লাহ’র বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি উদ্ভাসিত হয়: রাষ্ট্রের আইনগত কর্তৃত্ব সেই অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তিনি উদাহরণ দেন যে পরবর্তী যুগে উসমানীয় তুর্কিরা কৃষ্ণসাগরের (Black Sea) ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং মুসলিম আইনজ্ঞরা সেই কর্তৃত্বের বৈধতা স্বীকার করেছিলেন।

এখানে হামিদুল্লাহর চিন্তার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। তিনি ইসলামি আইনকে স্থবির বা ইতিহাসবিচ্ছিন্ন বিধান হিসেবে দেখেননি; বরং পরিবর্তিত প্রযুক্তি, ভূরাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার আলোকে তার প্রয়োগগত মাত্রা অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই তাঁর “Property” শীর্ষক আলোচনা ইসলামি আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রতত্ত্বেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

৩. “Islamic Insurance” (ইসলামি বীমাব্যবস্থা)

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ইসলামি বীমা (Islamic Insurance) বিষয়ে লেখালেখির ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ইংরেজি ভাষায় ইসলামি বীমা সম্পর্কে লিখিত প্রথম গবেষকদের মধ্যে তিনি অন্যতম; অনেকের মতে, তিনিই এ বিষয়ে প্রথম ইংরেজি প্রবন্ধের রচয়িতা।

মূল প্রবন্ধটি ১৯৪৬ সালে রচিত হয় এবং পরে Muslim Year Book of India and Pakistan (১৯৪৮-৪৯)-এ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে কিছু সংশোধন ও পরিমার্জনসহ এটি Islamic Review (লন্ডন, মার্চ-এপ্রিল ১৯৫১) পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হয়। বর্তমান সংকলনে সেই সংশোধিত সংস্করণটিই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সে সময় হায়দরাবাদে কয়েকজন আলেম ও অর্থনীতিবিদ পারস্পরিক সহযোগিতা (mutuality)-ভিত্তিক একটি ইসলামি বীমা মডেল প্রণয়নের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। তবুও ড. হামিদুল্লাহর চিন্তা পরবর্তীকালে তাকাফুল (Takaful) ব্যবস্থার বৌদ্ধিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

ড. হামিদুল্লাহর মতে, বীমার মৌলিক উদ্দেশ্য হলো কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আপতিত ক্ষতি ও ঝুঁকির বোঝাকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টন করা, যাতে সেই ক্ষতির ভার এককভাবে কাউকে বহন করতে না হয়। তাঁর ভাষায়, বীমা এমন একটি ব্যবস্থা যা বিপদ বা আর্থিক ক্ষতির বোঝাকে বহু মানুষের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে প্রত্যেকের ওপর চাপ কমিয়ে আনে।

তবে তিনি প্রচলিত বাণিজ্যিক বীমা (conventional insurance) ব্যবস্থার সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, এতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা ইসলামি শরিয়াহর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষত রিবা (সুদ), গারার (অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা), মাইসির (জুয়া বা ভাগ্যের খেলা)।

এ কারণেই তিনি প্রচলিত বীমার বিকল্প হিসেবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে ইসলামি বীমা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আজকের বহু সমকালীন গবেষক তাকাফুল ব্যবস্থার যে তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থাপন করেন, ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ কয়েক দশক আগেই তার মৌলিক ধারণা তুলে ধরেছিলেন।

“ইসলামি বীমা” প্রবন্ধটি আধুনিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ইসলামি বিকল্প নির্মাণে ড. হামিদুল্লাহর সৃজনশীল ও দূরদর্শী চিন্তার একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। ইসলামী অর্থনীতির ইতিহাসে এটি তাকাফুল-চিন্তার অন্যতম প্রাচীন ও পথপ্রদর্শক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

৪. “Interest-Free Cooperative Lending Societies” (সুদবিহীন সমবায়ভিত্তিক ঋণ প্রতিষ্ঠান)

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ “Interest-Free Cooperative Lending Societies” ইসলামি অর্থনীতির ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ এতে তিনি শুধু সুদমুক্ত ঋণপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেননি; বরং আধুনিক যুগে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বাস্তব প্রয়োগের অন্যতম প্রাচীন নজিরও তুলে ধরেছেন।

অনেকের ধারণা, সুদমুক্ত অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বা মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ অর্থনীতির উত্থানের পর বিকশিত হয়েছে। কিন্তু ড. হামিদুল্লাহ ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন যে, এর অনেক আগেই ভারতীয় উপমহাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ গৃহীত হয়েছিল।

তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, হায়দরাবাদের একজন সুফি সাধক ১৮৯১ সালেই সুদমুক্ত সমবায়ী ঋণব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে হায়দরাবাদে এ ধরনের একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত সেগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়। এ তথ্য ইসলামি অর্থনীতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটি প্রমাণ করে যে সুদমুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো সাম্প্রতিক বা তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং তার একটি বাস্তব ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার রয়েছে।

এই প্রবন্ধে ড. হামিদুল্লাহ দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে সমাজের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের আর্থিক প্রয়োজন পূরণে সুদভিত্তিক ব্যাংকিংই একমাত্র পথ নয়। পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক সংহতি এবং সমবায়ী অংশগ্রহণের ভিত্তিতে এমন ঋণব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যা একদিকে শরিয়াহসম্মত, অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবেও কার্যকর।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ড. হামিদুল্লাহ এ বিষয়ে কেবল ইংরেজিতেই লেখেননি; তাঁর মৌলিক রচনা বা অনুবাদ আরবি, উর্দু, ফরাসি ও ফারসি ভাষাতেও প্রকাশিত হয়েছিল। এর ফলে তাঁর চিন্তা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীকালের ইসলামী ব্যাংকিং ও সুদমুক্ত অর্থায়ন-চিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রবন্ধটি ইসলামী অর্থনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামি আর্থিক ব্যবস্থার আধুনিক প্রয়োগ উনিশ শতকের শেষভাগ থেকেই মুসলিম সমাজে এর বাস্তব ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল। ড. হামিদুল্লাহ এই বিস্মৃত ইতিহাসকে পুনরুদ্ধার করে ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার ধারাবাহিকতাকে নতুনভাবে উন্মোচন করেছেন।

৫. “Political Significance of Zakah” (যাকাতের রাজনৈতিক তাৎপর্য)

এই সংকলনের পঞ্চম প্রবন্ধের শিরোনাম “Political Significance of Zakah”। এ প্রবন্ধে ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে যাকাতের অবস্থান, কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছেন।

সাধারণত যাকাতকে কেবল একটি ধর্মীয় ইবাদত বা ব্যক্তিগত দান হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ড. হামিদুল্লাহ এর পরিসরকে আরও বিস্তৃতভাবে অনুধাবন করেছেন। তাঁর মতে, যাকাত ইসলামি রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামোর একটি মৌলিক ভিত্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর অর্থনৈতিক উপকরণও।

তিনি যাকাতকে রাষ্ট্রীয় রাজস্বের (public revenue) একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর দৃষ্টিতে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মুসলমানদের কাছ থেকে আদায়যোগ্য প্রধান এবং মৌলিক কর হলো যাকাত। অর্থাৎ ইসলামি অর্থব্যবস্থায় যাকাত শুধু দারিদ্র্য বিমোচনের উপায় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, সম্পদ পুনর্বণ্টন এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় উপাদান।

তবে ড. হামিদুল্লাহ রাষ্ট্রের আর্থিক প্রয়োজনকে সম্পূর্ণভাবে যাকাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি মনে করেন, যদি রাষ্ট্র কোনো জাতীয় সংকট, যুদ্ধ, দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তাহলে সরকার অতিরিক্ত কর আরোপ করতে পারে কিংবা যাকাতের হার সাময়িকভাবে বৃদ্ধি করার বিষয় বিবেচনা করতে পারে। তবে এটি হবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির জন্য, স্বাভাবিক নীতি হিসেবে নয়।

এই প্রবন্ধে হামিদুল্লাহ যাকাতকে একটি গতিশীল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান (dynamic economic institution) হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, যাকাত সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে, সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভবন রোধ করে এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক ব্যবধান কমাতে সহায়তা করে। ফলে এটি ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারেরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

যাকাত সম্পর্কে হামিদুল্লাহর আরও কিছু স্বতন্ত্র ও মৌলিক মতামত ছিল, যা তিনি তাঁর অন্যান্য রচনায় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এসব মত ইসলামি রাজস্বনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এ কারণেই “যাকাতের রাজনৈতিক তাৎপর্য” প্রবন্ধটি ইসলামি অর্থনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তাপ্রসূত অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

৬. “Islam and Communism” (ইসলাম এবং কমিউনিজম)

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলোর মধ্যে “Islam and Communism” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন বিশ্ব রাজনীতি পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের দ্বন্দ্বে বিভক্ত, তখন তিনি ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কমিউনিজমের মৌলিক ধারণাগুলোর মূল্যায়নের চেষ্টা করেন।

গ্রন্থের শুরুতেই তিনি তাঁর উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে বলেন—এই সংক্ষিপ্ত গবেষণার লক্ষ্য হলো, কমিউনিজমের শিক্ষাকে ইসলাম কতটুকু পর্যন্ত গ্রহণ বা সহ্য করতে পারে, তা নির্ণয় করা।

ড. হামিদুল্লাহ দেখান যে কমিউনিজম একক কোনো মতবাদ নয়; এর বিভিন্ন রূপ রয়েছে, যেমন, মার্কসবাদ (Marxism), লেনিনবাদ (Leninism), স্ট্যালিনবাদ (Stalinism), টিটোবাদ (Titoism) এবং মাওবাদ (Maoism)। তিনি কার্ল মার্কস ও ভ্লাদিমির লেনিনের মূল রচনাগুলো বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, শাস্ত্রীয় বা প্রকৃত কমিউনিজম মূলত বস্তুবাদী দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফলে একজন আদর্শ কমিউনিস্টের পক্ষে আল্লাহ, নবী-রাসুল, ঐশী বিধান এবং পরকাল সম্পর্কে বিশ্বাস রাখা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব নয়।

তবে ড. হামিদুল্লাহ ইসলাম ও কমিউনিজমের সম্পর্ককে কেবল বিরোধের দৃষ্টিতে দেখেননি। তিনি মনে করেন, ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা বা শাসনব্যবস্থাকে চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় রূপে নির্ধারণ করে দেয়নি। বরং মুসলিম সমাজ যুগে যুগে নিজেদের প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী শাসনব্যবস্থার রূপ নির্ধারণ করতে পারে।

একইভাবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসলাম কিছু বিষয়ে কমিউনিজমের সঙ্গে আংশিক মিল খুঁজে পেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ—অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, দরিদ্রের অধিকার সংরক্ষণ, সম্পদের অতি-কেন্দ্রীভবন প্রতিরোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা—এসব ক্ষেত্রে ইসলাম ও কমিউনিজমের মধ্যে কিছু অভিন্ন লক্ষ্য বিদ্যমান। তবে ইসলাম কখনোই ব্যক্তিগত মালিকানার সম্পূর্ণ বিলোপ, ধর্মহীনতা কিংবা শ্রেণিসংগ্রামকে মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করে না।

ড. হামিদুল্লাহর মতে, ইসলামি অর্থনীতি একটি মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা। এটি একদিকে অবাধ পুঁজিবাদের সীমাহীন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে সাম্যবাদের কঠোর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির চরমতাকেও প্রত্যাখ্যান করে। তাঁর ভাষায়, ইসলামের গুরুত্ব অর্থনৈতিক দিকের চেয়ে নৈতিক ও মানবিক দিকের ওপর বেশি। অর্থনীতি ইসলামের কাছে লক্ষ্য নয়; বরং ন্যায়, মানবকল্যাণ ও নৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম।

এ গ্রন্থে ড. হামিদুল্লাহ দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে ইসলাম ও কমিউনিজমের মধ্যে কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাদৃশ্য থাকলেও তাদের দার্শনিক ভিত্তি এক নয়। কমিউনিজম যেখানে বস্তুবাদী বিশ্বদৃষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত, ইসলাম সেখানে আধ্যাত্মিকতা, নৈতিকতা ও ঐশী নির্দেশনার ভিত্তিতে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা নির্মাণ করতে চায়। তাই ইসলাম কমিউনিজমের কিছু অর্থনৈতিক উপাদান গ্রহণ করতে পারলেও তার মৌলিক বিশ্বদৃষ্টিকে গ্রহণ করতে পারে না।

৭. “Haidarabad’s Contribution to Islamic Economic Thought and Practice” (হায়দরাবাদের ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তা ও বাস্তব প্রয়োগে অবদান)

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর এই প্রবন্ধটি ইসলামি অর্থনীতির ইতিহাস ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ সম্পর্কে অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ ও আলোকদায়ী একটি রচনা। এতে তিনি হায়দরাবাদ রাজ্যের অর্থনৈতিক নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবন এবং ইসলামি অর্থনীতির প্রয়োগক্ষেত্রে এর অগ্রণী ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছেন।

ড. হামিদুল্লাহ দেখান যে, অনেক পশ্চিমা রাষ্ট্রের বিপরীতে হায়দরাবাদ রাজ্য ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের হাতে মুদ্রা ইস্যুর ক্ষমতা অর্পণ করেনি। বরং মুদ্রা ইস্যুর অধিকার রাষ্ট্রের হাতে, অর্থাৎ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকারের হাতে সংরক্ষিত ছিল। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ও জনস্বার্থভিত্তিক আর্থিক নীতি, যেখানে কিছু ধনী পুঁজিপতির ব্যক্তিগত মুনাফার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, হায়দরাবাদ ছিল প্রথম মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর একটি, যারা রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয়করণভিত্তিক (nationalization-based) মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করে। এটি ইসলামি অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

অন্যদিকে তিনি একটি তুলনামূলক পর্যবেক্ষণে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ডও ধীরে ধীরে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মুদ্রা ইস্যু ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়। যেখানে মুদ্রা ইস্যু আর ব্যক্তিগত ব্যাংকের হাতে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে আসে। এদিক থেকে হায়দরাবাদের নীতি সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রগামী ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

হায়দরাবাদ শুধু মুদ্রানীতিতেই নয়, পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই সেখানে তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা (triennial planning) এবং পরিকল্পিত বাজেট প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা আধুনিক উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এছাড়া, হায়দরাবাদে রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে এক ধরনের মিশ্র অর্থনীতি (mixed economy) গড়ে ওঠে। সেখানে মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের পুঁজিপতিরা রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে বিনিয়োগ ও অর্থায়নে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। এই অভিজ্ঞতাকে ড. হামিদুল্লাহ “হায়দরাবাদের ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক বিস্ময়” (enviable miracle of Haidarabad) হিসেবে অভিহিত করেন।

প্রবন্ধটিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সুদমুক্ত অর্থায়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গঠনের দৃষ্টান্ত। পাশাপাশি গারার (অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা) ও জাহালা (অজ্ঞতা/অস্পষ্টতা) থেকে মুক্ত বীমা ব্যবস্থার ধারণাও এখানে আলোচিত হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, ড. হামিদুল্লাহ ইসলামি অর্থনীতির একটি মৌলিক পদ্ধতিগত সমস্যা তুলে ধরেন—অর্থনীতিবিদ (economists) এবং ফকিহ (fuqaha)–দের মধ্যে জ্ঞানের বিভাজন। তাঁর মতে, আধুনিক অর্থনীতিবিদরা শরিয়াহর গভীর জ্ঞান রাখেন না, আবার ফকিহগণ আধুনিক অর্থনীতির বাস্তব কাঠামো সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন না। এই দুই জ্ঞানের সমন্বয় ছাড়া ইসলামি অর্থনীতি একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্র হিসেবে বিকশিত হতে পারে না।

এই সমস্যার সমাধানে তিনি হায়দরাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি উদাহরণ তুলে ধরেন, যেখানে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের যৌথ তত্ত্বাবধানে গবেষণা ও পাঠদান চালু করা হয়েছিল। তাঁর মতে, এই সমন্বিত পদ্ধতির ফল ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক এবং এটি ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার বিকাশে একটি কার্যকর মডেল হিসেবে কাজ করেছে।

৮. “A Suggestion for an Interest-Free Islamic Monetary Fund” (সুদমুক্ত ইসলামি মুদ্রা তহবিল প্রতিষ্ঠা : একটি প্রস্তাবনা)

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি আধুনিক ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তায় একটি দূরদর্শী ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তাব হিসেবে বিবেচিত।

এ প্রবন্ধে তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (International Monetary Fund – IMF)-এর অনুরূপ একটি সুদমুক্ত ইসলামি মুদ্রা তহবিল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, কেবলমাত্র সুদ (রিবা) নিষিদ্ধ করা ইসলামি অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়; বরং এর বাস্তব কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সুদবিহীন অর্থায়নের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ড. হামিদুল্লাহ উল্লেখ করেন, ইসলামই একমাত্র ধর্ম নয়, যা সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিতে ইসলামই একমাত্র ব্যবস্থা, যা এই নিষেধাজ্ঞার বাস্তব বিকল্প ও সমাধানও প্রদান করেছে। তিনি কুরআনের (সূরা আল-বাকারা ২:২৭৫–২৭৯ ইত্যাদি) আয়াতসমূহের প্রতি ইঙ্গিত করে দেখান যে সুদের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান নৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত নির্দেশনার অংশ।

তিনি যুক্তি দেন যে, সুদমুক্ত ঋণব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংগঠিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর মতে, একটি সংগঠিত সমাজে রাষ্ট্রই সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান, যা সুদ ছাড়াই জনগণকে ঋণ দিতে সক্ষম—ব্যক্তিগত পুঁজিপতিরা নয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, সুদমুক্ত ঋণব্যবস্থা একটি বাস্তব রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক দায়িত্ব, যা অতীতেও মুসলিম রাষ্ট্রগুলো বিভিন্নভাবে পালন করেছে। তাই তিনি মনে করেন, আধুনিক যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ড. হামিদুল্লাহ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি সুদমুক্ত ইসলামি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল মুসলিম দেশগুলোকে বৈদেশিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা থেকে মুক্ত করতে পারে এবং তাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সহায়তা করতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বিদেশি আর্থিক আধিপত্য ও অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।

ড. হামিদুল্লাহর এই ধারণা পরবর্তীকালে আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয় ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (Islamic Development Bank – IDB) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, যা ১৯৭৫ সালে জেদ্দায় প্রতিষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন মুসলিম দেশে সুদমুক্ত ব্যাংকিং ও ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও তাঁর চিন্তার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

৯. “Budgeting and Taxation in the Time of the Prophet” (নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে বাজেট ও করব্যবস্থা)

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর এই প্রবন্ধটি ইসলামি রাষ্ট্রের আর্থিক প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক রচনা। এতে তিনি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা কীভাবে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছিল, তা বিশ্লেষণ করেন।

ড. হামিদুল্লাহর মতে, প্রাথমিক ইসলামি রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক প্রশাসনের একটি ধীর ও ক্রমবিবর্তনশীল (gradual evolution) প্রক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। শুরুতে সমাজে আর্থিক নীতি ছিল মূলত উপদেশ, নৈতিক আহ্বান ও স্বেচ্ছাসেবামূলক দানের ওপর নির্ভরশীল। পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠে, যেখানে দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে কার্যকর করা হতো।

তাঁর ভাষায়, এই বিবর্তন শুরু হয়েছিল অনুপ্রেরণা ও পরামর্শ (persuasion and recommendation) দিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে সমাজের পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্ধারিত দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন করা হতো।

এই আলোচনায় তিনি যাকাতকে কেন্দ্রীয় রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর মতে, যাকাত ইসলামি রাষ্ট্রের প্রাথমিক বাজেট ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। তিনি যাকাতের সংগ্রহ, প্রশাসনিক কাঠামো এবং এর ব্যয়ের খাতসমূহ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেন, যা ইসলামি অর্থনীতির প্রাথমিক রাষ্ট্রীয় নীতির একটি বাস্তব রূপ নির্দেশ করে।

ড. হামিদুল্লাহ দেখাতে চান যে, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় অর্থনীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে বিকশিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে নৈতিক নির্দেশনা ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে।

এই প্রবন্ধে তিনি ইসলামি অর্থনীতির ঐতিহাসিক ভিত্তি ও প্রশাসনিক বিকাশের ধারাকে নতুন দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেন, যা পরবর্তী আলোচনায় আরও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হবে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

১০. “The Economic System of Islam” (ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা)

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর বিখ্যাত গ্রন্থ Introduction to Islam-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো “The Economic System of Islam”। এখানে তিনি আধুনিক শিক্ষিত পাঠকের সামনে ইসলামের সামগ্রিক রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেন, যার একটি অপরিহার্য অংশ হলো অর্থনৈতিক জীবন।

মানবজীবনের অর্থনৈতিক দিককে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিয়ে তিনি ইসলামি অর্থনীতির বিভিন্ন মৌলিক বিধান ও কাঠামো বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উত্তরাধিকার (inheritance) ব্যবস্থা, ওসিয়ত বা উইল (bequests)-এর গুরুত্ব, সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত সীমিত ওসিয়তের যৌক্তিকতা, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও ব্যয়ের কাঠামো।

তিনি যাকাতকে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান রাজস্ব উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন এবং এর বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, যাকাত একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম্পদ বণ্টন নিশ্চিত হয়।

এছাড়া তিনি সামাজিক বীমা (social insurance) বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁর প্রস্তাব হলো বীমা ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যা পারস্পরিক সহযোগিতা (mutuality)-এর ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এবং যেখানে সুদ (interest), অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা (gharar) এবং জুয়া বা ঝুঁকিভিত্তিক লেনদেন (game of chance/maysir) থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত থাকবে। কেবল এই ভিত্তিতেই প্রচলিত বীমা ব্যবস্থার ত্রুটি এড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

ড. হামিদুল্লাহর মতে, প্রচলিত বীমা ব্যবস্থা এবং পশ্চিমা ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রধান ত্রুটি হলো একপাক্ষিক ঝুঁকি (one-sided risk) যেখানে ঝুঁকির ভার কেবল এক পক্ষের ওপর পড়ে। এর বিপরীতে ইসলামি অর্থনীতিতে পারস্পরিকতার নীতি (principle of mutuality) একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি করে।

এই নীতিই আবার সুদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ ইসলামি অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো একটি বিকল্প, গঠনমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক দর্শন উপস্থাপন করে।

এ প্রবন্ধে ড. হামিদুল্লাহ ইসলামি অর্থনীতিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য একসাথে কাজ করে একটি টেকসই ও মানবিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলে।

১১. “Revenue and Calendar” (রাজস্ব ও ক্যালেন্ডার)

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ১৯৮০ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের বাহাওয়ালপুরে অবস্থিত ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বারোটি ধারাবাহিক বক্তৃতা প্রদান করেন। এই বক্তৃতাগুলো পরবর্তীতে উর্দু থেকে অনূদিত ও সম্পাদিত হয়ে আফজাল ইকবালের সম্পাদনায় “The Emergence of Islam” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে “Revenue and Calendar” হলো একাদশ বক্তৃতা।

এই বক্তৃতাটি ইসলামি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সময়-নির্ধারণ (fiscal timing) নিয়ে গভীর আলোচনা উপস্থাপন করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসলামি অর্থনীতির বিস্তৃত ক্ষেত্র থেকে তিনি বিশেষভাবে রাজস্ব ব্যবস্থাকে বক্তৃতার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেছেন, যা তাঁর দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির কেন্দ্রীয় গুরুত্বকে নির্দেশ করে।

ড. হামিদুল্লাহ দেখান যে ইসলামি রাষ্ট্রে কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে চন্দ্রবর্ষ (lunar calendar) এবং সৌরবর্ষ (solar calendar) উভয় ব্যবস্থাই ব্যবহৃত হয়, তবে সম্পদের প্রকৃতি অনুযায়ী সময় নির্ধারণ ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি-কর নির্দিষ্ট মৌসুমে সংগ্রহ করা হয়, আর অন্যান্য কর ভিন্ন সময়সূচি অনুসরণ করে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বছরের কোনো সময়ই সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে পড়ে না—যা কেবল সৌরবর্ষভিত্তিক ব্যবস্থায় ঘটে না।

তিনি চন্দ্রবর্ষ ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুবিধার দিকও তুলে ধরেন। যেহেতু চন্দ্রবর্ষ সৌরবর্ষের তুলনায় প্রায় ১১ দিন ছোট, তাই ৩০ বছরের একটি চক্রে রাষ্ট্রীয় কর আদায়ের সংখ্যা বেড়ে যায়। অর্থাৎ সৌরবর্ষ অনুসরণকারী রাষ্ট্র যেখানে ৩০ বছরে ৩০ বার কর সংগ্রহ করে, চন্দ্রবর্ষভিত্তিক ব্যবস্থা অনুসরণকারী রাষ্ট্র সেখানে একই সময়ে ৩১ বার কর সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।

এই অতিরিক্ত এক বছরের রাজস্বকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুবিধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর ভাষায়, একজন অর্থমন্ত্রী কি এমন অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন?

এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ইসলামি অর্থনীতির অন্তর্নিহিত প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় আর্থিক পরিকল্পনার একটি সূক্ষ্ম দিক উন্মোচন করেন। তাঁর মতে, সময়-ব্যবস্থাপনা (calendar system) সরাসরি রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত উপাদান।

১২. “Financial Administration in the Muslim State” (মুসলিম রাষ্ট্রে আর্থিক প্রশাসন)

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর এই প্রবন্ধটি ইসলামি রাষ্ট্রের আর্থিক প্রশাসনের একটি মৌলিক দিক—রাষ্ট্রীয় ব্যয়নীতি ও জনঅর্থব্যবস্থার (public finance) ওপর কেন্দ্রীভূত। প্রবন্ধে তিনি তাঁর আলোচনা মূলত কুরআনের একটি আয়াত, সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করেছেন। এই আয়াতে যাকাতের অর্থ ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত আটটি খাতের উল্লেখ রয়েছে।

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর মতে, এই আয়াত ইসলামি রাষ্ট্রের ব্যয়নীতির (law of state expenditure) একটি মৌলিক সাংবিধানিক নির্দেশনা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সংগৃহীত সম্পদ কোন কোন শ্রেণির মানুষের কল্যাণে ব্যয় হবে, তার একটি নীতিগত কাঠামো এখানে নির্ধারিত হয়েছে।

প্রবন্ধে তিনি যাকাতের প্রাপকদের বিভিন্ন শ্রেণি এবং তাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁর দৃষ্টিতে, যাকাতের উদ্দেশ্য দরিদ্রের তাৎক্ষণিক সহায়তার তো বটেই; একইসঙ্গে এটি সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য, সামাজিক সংহতি এবং ন্যায়ভিত্তিক সম্পদবণ্টন নিশ্চিত করার একটি কার্যকর ব্যবস্থা।

প্রবন্ধের উপসংহারে ড. হামিদুল্লাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যাকাত মূলত একটি কর (tax) এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মুসলমানদের ওপর যাকাত ছাড়া অন্য কোনো বাধ্যতামূলক কর আরোপ করা হয়নি।

এই মতামত ইসলামি অর্থনীতি ও জনঅর্থব্যবস্থা বিষয়ে তাঁর অন্যতম স্বতন্ত্র অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রে করব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, যাকাতের ভূমিকা এবং অতিরিক্ত কর আরোপের বৈধতা নিয়ে ইসলামি অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক বিদ্যমান।

এ প্রবন্ধে ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ যাকাতকে ইবাদতের পাশাপাশি ইসলামি রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো, জনকল্যাণনীতি এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর ইসলামি অর্থচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এবং পরবর্তী গবেষণার জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভিত্তি।

১৩. Public Finance — এস. এ. সিদ্দিকী

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর আলোচিত ত্রয়োদশ রচনা আসলে একটি গ্রন্থ-সমালোচনা (Book Review)। এখানে তিনি অর্থনীতিবিদ এস. এ. সিদ্দিকী-র Public Finance গ্রন্থের মূল্যায়ন করেছেন।

ড. হামিদুল্লাহ উল্লেখ করেন যে, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইসলামি জনঅর্থব্যবস্থা (Islamic Public Finance) বিষয়ে এটি ছিল দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এর আগে ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল Nicolas P. Aghnides-এর Mohammedan Theories of Finance নামক গবেষণা, যা Mohammedan Theories of Finance শিরোনামে পরিচিত। তবে ড. হামিদুল্লাহ মনে করেন, সময়ের পরিবর্তনের কারণে সেই গ্রন্থটি তখন অনেকাংশে পুরোনো ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি এস. এ. সিদ্দিকীর Public Finance গ্রন্থকে ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ক সীমিত সাহিত্যভাণ্ডারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাগত সংযোজন বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের গবেষণা ইসলামি জনঅর্থব্যবস্থার আধুনিক পুনর্মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

তবে প্রশংসার পাশাপাশি তিনি এ বইটির কিছু সমালোচনাও করেন। ড. হামিদুল্লাহর পর্যবেক্ষণ হলো, লেখক প্রাচীন ও ক্লাসিক্যাল ইসলামি সূত্রসমূহের (classical authorities) প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেননি। ফলে কোথাও কোথাও তিনি অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা পরবর্তী যুগের লেখকদের মতামতের ওপর নির্ভর করেছেন এবং এর কারণে কিছু সিদ্ধান্তে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

এই সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য ড. হামিদুল্লাহ বিশেষভাবে পরামর্শ দেন যে, লেখকের উচিত ছিল ইসলামি অর্থনীতি ও ফিকহুল-মুয়ামালাত বিষয়ে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পাদিত গবেষণাগুলো পর্যালোচনা করা। তাঁর মতে, সে সময় ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি অর্থনীতি ও জনঅর্থব্যবস্থা বিষয়ে যে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল, তা এ ক্ষেত্রের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান অবদান ছিল।

এই গ্রন্থ-সমালোচনায় ড. হামিদুল্লাহ একদিকে Public Finance গ্রন্থের গুরুত্ব ও অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, অন্যদিকে ইসলামি অর্থনৈতিক গবেষণায় ক্লাসিক্যাল উৎস, ঐতিহাসিক পদ্ধতি এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, ইসলামি অর্থনীতির একটি শক্তিশালী একাডেমিক ভিত্তি নির্মাণের জন্য আধুনিক অর্থনীতি ও প্রাচীন ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যে সেতুবন্ধন অপরিহার্য।

১৪. Conversion and the Poll Tax in Early Islam — Daniel C. Dennett, Jr. (প্রারম্ভিক ইসলামে ধর্মান্তর ও জিজিয়া কর)

এটি ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সমালোচনা। এখানে তিনি মার্কিন ইতিহাসবিদ Daniel C. Dennett Jr.-এর রচিত Conversion and the Poll Tax in Early Islam গ্রন্থের মূল্যায়ন করেছেন।

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ প্রথমেই লেখকের নিরপেক্ষতা, সহানুভূতিশীল মনোভাব এবং ন্যায়নিষ্ঠ গবেষণাপদ্ধতির প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, অল্প বয়সে (মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে) মৃত্যুবরণ করলেও ড্যানিয়েল ডেনেট ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস নিয়ে অত্যন্ত পরিণত ও বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা রেখে গেছেন।

তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণও করেন। তাঁর মতে, বইটির শিরোনাম কিছুটা বিভ্রান্তিকর। কারণ এটি কেবল জিজিয়া (Poll Tax) নিয়ে আলোচনা করেনি; বরং প্রারম্ভিক ইসলামি রাষ্ট্রের সামগ্রিক রাজস্বব্যবস্থা (revenue system) নিয়েই অধিকতর বিস্তৃত আলোচনা করেছে।

গ্রন্থটির একটি বড় শক্তি ছিল লেখকের আরবি ভাষাজ্ঞান। তিনি সরাসরি প্রাথমিক আরবি উৎস (primary sources) ব্যবহার করেছেন এবং সমকালীন অনেক পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদের মতামতকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেননি। বিশেষত তিনি বিখ্যাত জার্মান ও ইউরোপীয় গবেষক Julius Wellhausen, Carl Heinrich Becker এবং Leone Caetani-এর প্রচলিত ব্যাখ্যাকে সমালোচনামূলকভাবে পুনর্মূল্যায়ন করেছেন।

ড. হামিদুল্লাহর মতে, এই গ্রন্থটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি সেই বহুল প্রচারিত তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, যার দাবি ছিল যে উমাইয়া খিলাফতের পতনের প্রধান কারণ ছিল কর-নির্যাতন এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা। ডেনেট দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে ঐতিহাসিক বাস্তবতা এতটা সরল ছিল না এবং পূর্ববর্তী অনেক গবেষক পূর্বনির্ধারিত ধারণা নিয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যা করেছেন।

এই প্রসঙ্গে ড. হামিদুল্লাহ একটি মৌলিক পদ্ধতিগত সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর মতে, অনেক প্রাচ্যবিদ প্রথমে একটি অনুমান (hypothesis) দাঁড় করাতেন, তারপর সেই অনুমানকে সমর্থন করে এমন তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং যেসব ইসলামি ঐতিহাসিক উৎস তাঁদের মতের বিরোধিতা করত, সেগুলোকে অবিশ্বস্ত বলে প্রত্যাখ্যান করতেন। এমনকি কখনো কখনো একটি বাক্যের একটি অংশ গ্রহণ করে অন্য অংশ বর্জন করতেন। ড. হামিদুল্লাহর মতে, এ ধরনের পদ্ধতিতে যেকোনো মতামতই সহজে “প্রমাণ” করা সম্ভব।

গ্রন্থটির আরেকটি বিশেষত্ব হলো, লেখক ঐতিহাসিক গ্রন্থের পাশাপাশি প্রাচীন প্যাপিরাস (papyrus documents) বা প্রশাসনিক দলিলও ব্যবহার করেছেন। ড. হামিদুল্লাহ মনে করেন, এসব প্যাপিরাস দলিল বহু ক্ষেত্রে মুসলিম ঐতিহাসিক ও ফকিহগণের বর্ণনাকে সমর্থন করেছে। ফলে ইসলামি ঐতিহাসিক উৎসসমূহের প্রতি পূর্বের তুলনায় অধিক আস্থা রাখার যথেষ্ট কারণ সৃষ্টি হয়েছে।

ড. হামিদুল্লাহর চূড়ান্ত মূল্যায়ন ছিল অত্যন্ত উচ্চ। তাঁর মতে, এই গ্রন্থ দীর্ঘদিন ধরে একটি মানদণ্ডমূলক রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এজন্য তিনি বইটির আরবি, উর্দু, ফারসি ও ইন্দোনেশীয় ভাষায় অনুবাদেরও জোরালো সুপারিশ করেছিলেন।

গ্রন্থটি ড. হামিদুল্লাহর দৃষ্টিতে কেবল জিজিয়া বিষয়ক একটি গবেষণা নয়; বরং ইসলামি রাজস্বব্যবস্থা, ঐতিহাসিক পদ্ধতি এবং প্রাচ্যবিদ্যার বহু প্রচলিত ধারণার একটি গভীর পুনর্মূল্যায়ন। এটি ইসলামি অর্থনৈতিক ইতিহাসচর্চায় একটি মাইলফলক গবেষণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

১৫. “Homo Economicus Islamicus”  ড. জে. হ্যান্স

এই প্রবন্ধটি মূলত ড. জে. হ্যান্স রচিত Homo Economicus Islamicus গ্রন্থের ওপর ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর একটি সমালোচনামূলক পর্যালোচনা। এখানে তিনি একদিকে গ্রন্থকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে স্বাগত জানিয়েছেন, অন্যদিকে বেশ কিছু মৌলিক ত্রুটিও চিহ্নিত করেছেন।

ড. হামিদুল্লাহ বিশেষভাবে সন্তোষ প্রকাশ করেন এই কারণে যে, অবশেষে অমুসলিম জগতও ইসলামি অর্থনীতির অনেক বিধানের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। বিশেষত সুদবিরোধী ইসলামি অবস্থানের যৌক্তিকতা পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের একাংশের কাছেও ক্রমশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছিল। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সুদের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে এমনকি প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ John Maynard Keynes-ও এমন কিছু মত প্রকাশ করেছিলেন, যা একসময় প্রচলিত অর্থনৈতিক মতবাদের কাছে প্রায় ‘ধর্মদ্রোহী’ বলে বিবেচিত হয়েছিল।

তবে প্রশংসার পাশাপাশি ড. হামিদুল্লাহ গ্রন্থটির কয়েকটি মৌলিক দুর্বলতারও সমালোচনা করেন। উদাহরণস্বরূপ, লেখক যাকাত শব্দের অর্থ করেছেন ‘মুক্ত হওয়া’ এবং ‘পবিত্র হওয়া’। ড. হামিদুল্লাহ এ ব্যাখ্যাকে অসম্পূর্ণ বলে উল্লেখ করে বলেন, যাকাতের প্রকৃত অর্থ শুধু ‘পবিত্রতা’ নয়; বরং ‘বৃদ্ধি’, ‘বিকাশ’ এবং ‘পরিশুদ্ধি’ উভয় ধারণাই এর মধ্যে নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ যাকাত সম্পদ কেবল শুদ্ধই করে না, বরং ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণও বৃদ্ধি করে।

এ প্রসঙ্গে তিনি মুসলিম বিশ্বের একটি দীর্ঘস্থায়ী বৌদ্ধিক সংকটের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ইসলামি অর্থনীতির বিকাশ ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো অর্থনীতিবিদ ও ফকিহগণের মধ্যে জ্ঞানের বিচ্ছিন্নতা। অর্থনীতিবিদেরা সাধারণত ইসলামি আইনশাস্ত্রে দক্ষ নন, আবার ফকিহগণও আধুনিক অর্থনীতির পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন না। ফলে উভয় ধারার জ্ঞানকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত গবেষণা-পরিসর গড়ে ওঠে না।

ড. হামিদুল্লাহ স্মরণ করেন যে, ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এই সমস্যার একটি অভিনব সমাধান বের করেছিল। সেখানে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপকদের যৌথ তত্ত্বাবধানে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এই আন্তঃবিষয়ক পদ্ধতির ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ছিল এবং ইসলামি অর্থনীতির বিকাশে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।

গ্রন্থকারের আরও কিছু মতামতেরও তিনি খণ্ডন করেন। যেমন, লেখক দাবি করেছিলেন যে কুরআনে শ্রমিক ও মূলধনের কোনো আলোচনা নেই অথবা শ্রমিক সংগঠন মুসলিম সমাজে সম্পূর্ণ নতুন ধারণা। ড. হামিদুল্লাহ ঐতিহাসিক ও পাঠভিত্তিক প্রমাণের মাধ্যমে দেখান যে, এই দাবিগুলো সঠিক নয়।

পর্যালোচনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ সম্ভবত রিবা-সংক্রান্ত হাদিসের ক্ষেত্রে তাঁর অভিনব অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা। তিনি উল্লেখ করেন, লেখক “স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, সমপরিমাণে” শীর্ষক বিখ্যাত হাদিসটির আলোচনা অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে করেছেন। অথচ আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে
“এক দিনারকে দুই দিনারের বিনিময়ে এবং এক দিরহামকে দুই দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করো না।”

ড. হামিদুল্লাহর মতে, এই নির্দেশনার মধ্যে শুধু সুদ-নিষেধের নীতি নয়, বরং মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা-বিনিময়ের অনৈতিক জল্পনামূলক ব্যবসার বিরুদ্ধেও একটি গভীর অর্থনৈতিক দর্শন নিহিত রয়েছে। আধুনিক অর্থনীতির যে সমস্যাগুলো আজও বিশ্বকে পীড়া দেয়, নবী ﷺ সেগুলোর প্রতিকারমূলক নীতির দিকনির্দেশনা বহু আগেই প্রদান করেছিলেন।

সার্বিকভাবে, এই পর্যালোচনায় ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ইসলামি অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন—ইসলামি অর্থনীতি একটি সমন্বিত বুদ্ধিবৃত্তিকক প্রকল্প, যেখানে ফিকহ, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান এবং অর্থনীতির পারস্পরিক সংলাপ অপরিহার্য। তাঁর বিশ্লেষণ ইসলামি অর্থচিন্তার ক্ষেত্রে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি, সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং যুগোপযোগী অর্থনৈতিক বোধের এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামিক ইকোনমিকস ইনস্টিটিউট, কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.