মূল: ড. তৌসিফ আহমদ পার্রে
ইসলাম—ধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতা, মতাদর্শ এবং বিশ্বদর্শন হিসেবে—অতীত ও বর্তমানের অসংখ্য গ্রন্থে মুসলিম ও অমুসলিম লেখকদের আলোচনার বিষয় হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম নিয়ে রচিত গ্রন্থের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে আলেকজান্ডার নিশ Islam in Historical Perspective (২০২৫, পৃ. xv)-এ যথার্থই বলেছেন, “ইসলাম নিয়ে বইয়ের কোনো কমতি নেই”। এসব রচনায় অন্তর্দৃষ্টিগত ও বহির্দৃষ্টিগত, বৃহৎ ও ক্ষুদ্র পরিসর, সভ্যতাভিত্তিকসহ নানা ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
এই ধারারই সাম্প্রতিক সংযোজন জন টোলানের গ্রন্থটি। ফ্রান্সের নঁতের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক টোলান সপ্তম শতকের আরব থেকে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। তাঁর আলোচনার পরিসরও বিস্তৃত—এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন ভূখণ্ডে ইসলামের বিকাশ ও বহুমাত্রিক উপস্থিতি এতে উঠে এসেছে।
টোলান একজন পেশাদার ইতিহাসবিদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Saracens: Islam in the Medieval European Imagination (২০০২), Sons of Ishmael: Muslims through European Eyes in the Middle Ages (২০০৮), Saint Francis and the Sultan (২০০৯), সহলেখক হিসেবে Europe and the Islamic World: A History (২০১৩) এবং Faces of Muhammad: Western Perceptions of the Prophet of Islam from the Middle Ages to Today (২০১৯)।
জন টোলান তাঁর Islam: A New History গ্রন্থে ইসলামের পনেরো শতকের ইতিহাসকে কিছুটা দূরত্ব রেখে, তার সমৃদ্ধি, বৈচিত্র্য ও জটিলতার সামগ্রিক চিত্রে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর লক্ষ্য—ইসলাম ও তার ইতিহাসকে আমরা যেভাবে দেখি, সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা।
টোলান নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি মুসলিম নন, ধর্মতাত্ত্বিকও নন; তিনি একজন ইতিহাসবিদ। তাঁর মতে, গত তিন-চার দশকে ইসলামের সূচনাকাল নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু এসব সাম্প্রতিক গবেষণা এখনো সীমিতসংখ্যক বিশেষজ্ঞের পরিসরের বাইরে খুব বেশি পরিচিত নয়। এই নতুন গবেষণালব্ধ দৃষ্টিভঙ্গিকে সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি তাঁর গ্রন্থকে “ইসলামের এক নতুন ইতিহাস” হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
টোলানের গ্রন্থের কাঠামো ও মূল ভাবনা
ফরাসি ভাষায় ২০২২ সালে Nouvelle histoire de l’islam নামে প্রকাশিত গ্রন্থটির ইংরেজি সংস্করণ নিছক অনুবাদ নয়; বরং এটি পুনর্লিখিত ও সম্প্রসারিত সংস্করণ। বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসে বইটি তিনটি অংশে বিভক্ত—Foundations, Expansion ও Modernities—যার অধীনে রয়েছে মোট দশটি অধ্যায়।
প্রথম পর্ব: Foundations — ভিত্তি
প্রথম চার অধ্যায়ে ইসলামের সূচনালগ্ন ও প্রাথমিক বিকাশ আলোচিত হয়েছে—
-
The Quran and the Birth of a Community of Believers — কুরআন ও বিশ্বাসীদের সম্প্রদায়ের উদ্ভব
-
The Umayyad Dynasty and the Birth of an Imperial Religion — উমাইয়া সাম্রাজ্য ও ইসলামের সাম্রাজ্যিক রূপের বিকাশ
-
Abbasid Baghdad: Crucible of a Multiconfessional Civilisation — আব্বাসীয় বাগদাদ ও বহুধর্মীয় সভ্যতার বিকাশ
-
The Three Caliphates of the Year 1000 — বাগদাদ, কায়রো ও কর্ডোবার তিন প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত
এ অংশে খিলাফতের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি ধিম্মি, জিহাদের ধারণা, ইসলামী আইন, ধর্মতত্ত্ব, হাদিসচর্চা এবং সুফিবাদের উত্থান নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। রাবেয়া আল-আদাবিয়্যার আধ্যাত্মিক জীবন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
দ্বিতীয় পর্ব: Expansion — বিস্তার
পঞ্চম থেকে সপ্তম অধ্যায়ে একাদশ থেকে সপ্তদশ শতকের মুসলিম বিশ্বের পরিবর্তন ও বিস্তার তুলে ধরা হয়েছে—
-
Invasions and Reconfigurations of the Muslim World — ক্রুসেড, মঙ্গোলসহ বহিরাগত আক্রমণ এবং মুসলিম বিশ্বের পুনর্বিন্যাস।
-
The World of Ibn Battuta — ইবনু বতুতার ভ্রমণের মধ্য দিয়ে চতুর্দশ শতকের বিস্তৃত মুসলিম বিশ্বের চিত্র।
-
Muslim Empires — উসমানি, মুঘল, আচেহসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন মুসলিম সাম্রাজ্য।
ইবনু বতুতার ভ্রমণকাহিনী এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মরক্কো থেকে মক্কা, ভারত, চীন ও আফ্রিকা পর্যন্ত তাঁর যাত্রার মধ্য দিয়ে টোলান একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের ভৌগোলিক বিস্তার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং এক ধরনের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক সংযোগ তুলে ধরেছেন।
তৃতীয় পর্ব: Modernities — আধুনিকতার মুখোমুখি ইসলাম
অষ্টম থেকে দশম অধ্যায়ে ঔপনিবেশিকতা থেকে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাস আলোচিত হয়েছে—
-
Colonization and Its Discontents (1789–1918) — উপনিবেশবাদ ও তার প্রতিক্রিয়া।
-
Decolonization, Nationalism, and the Emergence of Political Islam — উপনিবেশমুক্তি, জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান।
-
Between Reform and Radicalism: Being Muslim in the 21st Century — সংস্কার, মৌলবাদ, রাজনৈতিক ইসলাম, মুসলিম নারীবাদ ও আধুনিক বিশ্বে মুসলিম পরিচয়ের নানা বিতর্ক।
টোলানের ইতিহাসচর্চার বৈশিষ্ট্য
টোলানের বইটি প্রচলিত অর্থে ক্রমপর্যায়ে সাজানো ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নয়। বরং তিনি নির্বাচিত ঘটনা, ব্যক্তি ও প্রবণতার মাধ্যমে পনেরো শতকের ইসলামী ইতিহাসের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরেছেন।
ইসলাম সম্পর্কে তাঁর মৌলিক ধারণাটি হলো—ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়; এটি একই সঙ্গে একটি সংস্কৃতি ও সভ্যতা, যার বিস্তার শত শত ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে। ফলে ইসলামের ইতিহাসকে কোনো একক ভূখণ্ড বা অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর যুগ নিয়ে আলোচনায় টোলান কুরআনকে প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখেছেন; পাশাপাশি হাদিস ও সীরাতের গ্রন্থগুলোকেও ব্যবহার করেছেন। তবে তিনি মনে করেন, পরবর্তী ঐতিহাসিক বর্ণনায় ঐতিহাসিক তথ্য ও ধর্মীয় স্মৃতি বা কিংবদন্তির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় অনেক সময় কঠিন। এখানেই তাঁর ইতিহাসবিদসুলভ সংশয়বাদী পদ্ধতি স্পষ্ট হয়।
বাগদাদ ও ইসলামী জ্ঞানচর্চা
আব্বাসীয় বাগদাদকে টোলান একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুধর্মীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে দেখিয়েছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন, প্রযুক্তি, সামাজিক বিজ্ঞান এবং একই সঙ্গে ফিকহ, কালাম, তাফসির ও হাদিসশাস্ত্র—বিভিন্ন জ্ঞানশাখার বিকাশে বাগদাদের ভূমিকা তিনি তুলে ধরেছেন।
একইভাবে দশম ও একাদশ শতকে বাগদাদ, কায়রো ও কর্ডোবার তিন প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফতের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে মুসলিম বিশ্ব রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হলেও মানুষ, পণ্য, জ্ঞান ও ধারণার চলাচল থেমে যায়নি।
১১শ–১৭শ শতাব্দী
দ্বিতীয় অংশ ‘বিস্তার’ (Expansion)-এ টোলানের বইটি ১১শ থেকে ১৭শ শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় সাত শতাব্দীর ইতিহাসকে ৫–৭ নম্বর অধ্যায়ে আলোচনা করেছে। এই অধ্যায়গুলোতে যথাক্রমে ১১শ থেকে ১৩শ শতাব্দীর “মুসলিম বিশ্বের আক্রমণ ও পুনর্বিন্যাস” (অধ্যায় ৫, পৃ. ৯৭–১১৫), ১৪শ শতাব্দীর “ইবন বতুতার বিশ্ব” (অধ্যায় ৬, পৃ. ১১৬–১৩৯), এবং ১৪শ থেকে ১৭শ শতাব্দীর “মুসলিম সাম্রাজ্যসমূহ” (অধ্যায় ৭, পৃ. ১৪০–১৬৪) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে অটোমান সাম্রাজ্য, যেখানে বিশেষভাবে সুলতান সুলায়মান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট ও তাঁর উত্তরসূরিদের অবদান তুলে ধরা হয়েছে (পৃ. ১৪২–১৫৩); “ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সালতানাতসমূহ”, যেমন মুঘল সাম্রাজ্য, আচেহ সালতানাত প্রভৃতি (পৃ. ১৫৩–১৬০); এবং পশ্চিম আফ্রিকার শাসক রাজবংশসমূহ (পৃ. ১৬০–১৬৪)।
এই সময়কালকে টোলান মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয়-রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পাশাপাশি তার বৈচিত্র্যের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছেন—যে বৈচিত্র্যকে তিনি প্রকৃত অর্থেই “অসাধারণ ব্যাপক বৈচিত্র্য” (tremendous diversity) হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এই বৈচিত্র্য আরও বৃদ্ধি পায়। এর একটি দৃষ্টান্ত হলো উত্তর দিক থেকে বিভিন্ন আক্রমণকারীর আগমন—তুর্কি, ‘ফ্রাঙ্ক’ (ক্রুসেডের সময় আগত ইউরোপীয় খ্রিস্টান) এবং মঙ্গোলরা। এসব আগমন মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে “বিরাট অস্থিরতা ও বিপর্যয়” সৃষ্টি করেছিল (পৃ. ৯৭)।
১৪শ শতাব্দীর ঘটনাপ্রবাহের ক্ষেত্রে—যে সময় “ইসলামের বিশ্ব মরক্কো থেকে সুমাত্রা এবং মালি থেকে ভলগা নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল” (পৃ. ১১৬)—এর এক “অত্যন্ত আকর্ষণীয় প্রত্যক্ষ বিবরণ” পাওয়া যায় মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তে। তিনি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্র ও প্রাণকেন্দ্র “তাঞ্জিয়ার থেকে মক্কা ও বাগদাদ” পর্যন্ত ভ্রমণ করেন (পৃ. ১১৯–১২৪), এবং “আফ্রিকা থেকে চীন” (পৃ. ১২৪–১৩১) ও মালি পর্যন্তও সফর করেন (পৃ. ১৩১–১৩৩)।
টোলানের মতে, ইবন বতুতার ভ্রমণকাহিনি ‘রিহলা’ পাঠ করলে তাঁর নানা পরিচয় আমাদের সামনে ফুটে ওঠে—“তীর্থযাত্রী, বিশ্বভ্রমণকারী এবং একজন সুন্নি মুসলিম, যিনি বিভিন্ন ধর্মের নারী-পুরুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন” (পৃ. ১৩৪)। তাই টোলান যথার্থভাবেই তাঁর ভ্রমণ ও অবদানকে “ইবন বতুতা: তীর্থযাত্রী, পণ্ডিত ও মুসলিম—ধর্মীয় বৈচিত্র্যের মুখোমুখি” শিরোনামের অধীনে তুলে ধরেছেন (পৃ. ১৩৪–১৩৯)। এভাবেই টোলান ইবন বতুতার বিবরণকে “চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগের মুসলিম বিশ্বের সমৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যের একটি চিত্র অঙ্কনের অনন্য সাক্ষ্য” হিসেবে ব্যবহার করেছেন (পৃ. ১১৭)।
এই অংশে তিনি আরও আলোচনা করেছেন ৫ নম্বর অধ্যায়ে “ক্রুসেড ও মুসলিম বিশ্বে ‘ফ্রাঙ্কদের’ আগমন” (পৃ. ১০১–১০৫), “রিকনকুইস্তা ও খ্রিস্টান স্পেনে অধীনস্থ মুসলিমদের অবস্থান” (পৃ. ১০৮–১০৯) এবং “ক্রুসেডের পাল্টা অভিযান ও সালাহউদ্দিনের উত্থান” (পৃ. ১০৯–১১১) বিষয়ে। আর ৭ নম্বর অধ্যায়ে রয়েছে “সুলায়মান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট” (পৃ. ১৪৯–১৫৩) এবং মুঘল সম্রাট আকবরের দীন-ই-ইলাহী (পৃ. ১৫৪–১৫৫) নিয়ে আলোচনা।
আধুনিকতা ও আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জের মুখে ইসলাম ও মুসলিম সমাজ: ঔপনিবেশিকতা, জাতীয়তাবাদ ও সংস্কারবাদ থেকে র্যাডিক্যালিজম ও উদারবাদ
তৃতীয় অংশ ‘আধুনিকতা’ (Modernities)-তে ৮–১০ নম্বর অধ্যায়ে ১৮শ থেকে ২১শ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কাল আলোচনা করা হয়েছে। এখানে মূলত ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার, আধুনিক উপনিবেশমুক্তি এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামের ওপর এর প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৮ নম্বর অধ্যায় “ঔপনিবেশিকতা ও এর অসন্তোষ, ১৭৮৯–১৯১৮” (পৃ. ১৬৭–১৯৬)-এ ব্রিটিশ ভারত, অটোমান সাম্রাজ্যের বিভক্তি, বোনাপার্ট থেকে মুহাম্মদ আলী পর্যন্ত মিশরের ইতিহাস, ওয়াহাবি আন্দোলনের উত্থান, আলজেরিয়ায় ফরাসি দখল, মিশর ও অটোমান সাম্রাজ্যের সংস্কার ও পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কাজার ইরান, ১৯শ শতাব্দীর আফ্রিকায় ইসলাম ও রাষ্ট্রচিন্তা এবং আরব সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ বা নাহদা প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে।
৯ নম্বর অধ্যায় “উপনিবেশমুক্তি, জাতীয়তাবাদ এবং বিংশ শতাব্দীতে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান” (পৃ. ১৯৭–২২১)-এ আলোচিত হয়েছে “আরব থেকে মিশর: ওয়াহাবি ও মুসলিম ব্রাদারহুড (১৯২৫–১৯৪৯)” (পৃ. ২০০–২০৪), “ফ্রান্স ও তার সাম্রাজ্য: দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা, উপনিবেশে সাম্প্রদায়িকতা” (পৃ. ২০৪–২০৭), “উপনিবেশমুক্তি ও জাতীয়তাবাদ (১৯৪৫–১৯৬৭)” (পৃ. ২০৭–২১৬) এবং “রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান” (পৃ. ২১৬–২২১)।
শেষ অধ্যায় “সংস্কার ও র্যাডিক্যালিজমের মাঝখানে: ২১শ শতাব্দীতে মুসলিম হিসেবে বেঁচে থাকা” (পৃ. ২২২–২৫০)-এ দুটি প্রধান বিষয় রয়েছে। প্রথমত, বিশ্বায়ন ও ভূরাজনৈতিক সংকট মুসলিমদের সামনে যে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে (পৃ. ২২৪–২৩৩)। এরপর “ইসলামে সংস্কার ও বিতর্ক” (পৃ. ২৩৩–২৫০) অংশে ২১শ শতাব্দীতে ইসলামের বৈচিত্র্য ও গতিশীলতার পরিচায়ক বিভিন্ন সংস্কারবাদী চিন্তা ও প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে টোলানের অন্যতম প্রধান বক্তব্য হলো—২০শ শতাব্দীতে যেমন “রাজনৈতিক ইসলামের নতুন নতুন রূপের উত্থান” ঘটেছিল, তেমনি ২১শ শতাব্দীতে ইসলাম ও রাজনীতির সম্পর্ক কীভাবে সমন্বিত হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মতাদর্শের মধ্যে সংগ্রাম ও বিতর্ক চলছে (পৃ. ২২২)। তাঁর ভাষায়, ১৯শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ২১শ শতাব্দীর সূচনালগ্ন পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে ইসলাম ও আধুনিকতার সম্পর্ক নিয়ে গভীর বিতর্ক চলেছে: “মুসলিমদের কি ইসলামকে আধুনিকায়ন করা উচিত, নাকি উল্টোভাবে আধুনিকতাকে ইসলামায়িত করা উচিত?” (পৃ. ২৩৩)।
এই প্রশ্নের আলোচনায় টোলান গামাল আল-বান্না (১৯২০–২০১৩)-এর চিন্তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন; তাঁকে তিনি “প্রচলিত ইসলামের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের অন্যতম তীক্ষ্ণ সমালোচক” হিসেবে বর্ণনা করেছেন (পৃ. ২৩৬)। পাশাপাশি ইন্দোনেশীয় মুসলিম চিন্তাবিদ হারুন নাসুতিয়ন (১৯১৯–১৯৯৮)-এর “যুক্তিবাদী ধর্মতত্ত্বের চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করার” প্রচেষ্টা (পৃ. ২৩৯), মুহাম্মদ আরকুন (১৯২৮–২০১০)-এর চিন্তা এবং আমিনা ওয়াদুদের মতো মুসলিম নারীবাদী চিন্তাবিদদের আলোচনা করেছেন (পৃ. ২৪০)।
এ ছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিম অভিবাসন (পৃ. ২৪২) এবং আমেরিকা, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে ইসলামের বিভিন্ন রূপ নিয়েও আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলামও একরৈখিক নয়; বরং তা বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ (পৃ. ২৪৯)।
এই অংশে ৮ নম্বর অধ্যায়ে ওয়াহাবি আন্দোলনের উত্থান (পৃ. ১৭৪–১৭৭) এবং নাহদা বা আরব সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ (পৃ. ১৮৯–১৯৬); ৯ নম্বর অধ্যায়ে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান (পৃ. ২১৬–২২১); এবং ১০ নম্বর অধ্যায়ে পর্দা বা হিজাবের বিতর্ক (পৃ. ২৩৪–২৩৬), কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের ইসলাম এবং নেশন অব ইসলাম (পৃ. ২৪৪ ও পরবর্তী) প্রভৃতি বিষয়ও আলোচিত হয়েছে।
সমালোচকদের চোখে টোলানের বই
তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে ইসলামের ইতিহাস রচনা করলেও টোলানের বইটি সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা লাভ করেছে। Publishers Weekly বইটিকে “প্রাণবন্ত ও ব্যাপক পরিসরের একটি সমীক্ষা” হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, বইটির “চমৎকার ভৌগোলিক বিস্তার ও সূক্ষ্ম ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ” একে ইসলামকে ধর্ম ও সংস্কৃতি হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি **“দক্ষ ও অনন্য প্রতিকৃতি”**তে পরিণত করেছে।
Booklist বইটিকে ইসলামের অভ্যন্তরে “বৈচিত্র্য, সহনশীলতা ও বহুত্ববাদের পক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি” হিসেবে বর্ণনা করেছে। অন্যদিকে Kirkus Reviews বইটির গবেষণাভিত্তিক ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করে একে “সুপরিচিত গবেষণায় সমৃদ্ধ, বিস্তৃত পরিসরের একটি সংক্ষিপ্ত ইসলামের ইতিহাস” হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
একইভাবে, Spirituality and Practice-এ প্রকাশিত জন এম. সুইনির পর্যালোচনায় বইটিকে “সহায়ক ও অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ একটি গবেষণা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মতে, টোলান অঞ্চলভিত্তিকভাবে “ইসলামের ইতিহাস ও রাজনীতি” তুলে ধরেছেন এবং তা উপস্থাপন করেছেন সংক্ষিপ্ত, পাঠযোগ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী এক ভঙ্গিতে।
এ ছাড়া কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমধ্যসাগরীয় ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডেভিড আবুলাফিয়া, The Critic-এ টোলানের বইটির প্রশংসা করে একে “ইসলামী বিশ্বের ইতিহাসের অসংখ্য দিকের একটি সংক্ষিপ্ত, চিন্তাশীল ও সুলিখিত পরিচিতি” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সারসংক্ষেপে টোলানের বই
ভূমিকায় টোলান উল্লেখ করেছেন যে তিনি “ইসলামের একটি নতুন ইতিহাস” লিখছেন—তবে মুসলিম বা ধর্মতাত্ত্বিক হিসেবে নয়, বরং একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে (পৃ. xiv)। বইয়ের শেষেও তিনি একই বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, একজন অমুসলিম ইতিহাসবিদ হিসেবে লেখা তাঁর এই ছোট্ট বইটি যেন পাঠকদের পনেরো শতাব্দী ও বিশ্বের সব মহাদেশজুড়ে ইসলামের বিপুল সমৃদ্ধি ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে—এটাই তাঁর আশা (পৃ. ২৫০)।
অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাস তুলে ধরে টোলান শেষ পর্যন্ত এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে, “বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিমদেরই ইসলামের ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়গুলো রচনা করতে হবে” এবং তাঁর আশা, বহুল আলোচিত “সভ্যতার সংঘাত” যেন বাস্তবে সংঘটিত না হয় (পৃ. ২৫০)।
টোলানের সব বর্ণনা, ব্যাখ্যা বা ঐতিহাসিক ঘটনার বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত হওয়া সম্ভব নয়। তবু তাঁর অনুসন্ধিৎসু ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন উপস্থাপনা, বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস এবং ইসলামী ইতিহাসের সামাজিক-রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিস্তৃতি, বৈচিত্র্য ও জটিলতাকে এক মলাটে ধারণ করার দক্ষতা অস্বীকার করা কঠিন। মাত্র ২৫০ পৃষ্ঠায় পনেরো শতাব্দীর ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। টোলান তা উল্লেখযোগ্য দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। অবশ্য বইটির সীমাবদ্ধতা ও অসম্পূর্ণতার কথাও তিনি শুরুতেই স্বীকার করেছেন: “এই বই অবশ্যই আংশিক ও অসম্পূর্ণ; মুসলিম সভ্যতার জটিলতা ও বৈচিত্র্য তুলে ধরার জন্য আমি কেবল কয়েকটি উদাহরণ বেছে নিয়েছি” (পৃ. xv)।
তবে একজন মুসলিম পাঠক—এবং একই সঙ্গে একজন শিক্ষাবিদ—বইটির শিরোনামে “নতুন” (New) শব্দটির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। Islam: A New History নামটি এমন একটি অন্তর্নিহিত ধারণা তৈরি করতে পারে যে, ইসলামের ইতিহাস নিয়ে পূর্ববর্তী গবেষণা হয় পুরোনো, নয়তো যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয় এবং টোলানের গবেষণাই যেন সেগুলোকে সংশোধন, পরিমার্জন ও যথার্থতা প্রদান করছে। উপরন্তু, নির্বাচিত উদাহরণ ও ঘটনাবলির মাধ্যমে সমগ্র ইসলামী ইতিহাসকে ধারণ করার চেষ্টা করতে গিয়ে টোলান হয়তো এমন এক বিস্তৃত কাজের ভার নিয়েছেন, যা একজনের পক্ষে পুরোপুরি আয়ত্ত করা কঠিন।
এসব সীমাবদ্ধতা ও মতপার্থক্য সত্ত্বেও Islam: A New History শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য একটি মূল্যবান গ্রন্থ। বিশেষত ইসলামের ইতিহাসের বৈচিত্র্য, জটিলতা ও বহুমাত্রিকতাকে বোঝার ক্ষেত্রে বইটি বিস্তৃত তথ্য, অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বিশ্লেষণ, নানা দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমৃদ্ধ টীকার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করে। তবে মুসলিম পাঠকদের—বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের—বইটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও সতর্কতার সঙ্গে পাঠ করা অধিকতর ফলপ্রসূ হবে।
লেখক পরিচিতি: ড. তৌসিফ আহমদ পার্রে। ভারতীয় ইসলামি-গবেষক ও শিক্ষাবিদ। বর্তমানে তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (AMU)-এর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক। এর আগে তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের Higher Education Department-এ ইসলামিক স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ইসলাম ও গণতন্ত্র, দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য, আধুনিকতাবাদী ও সংস্কারপন্থী ইসলামি চিন্তা এবং সমকালীন কুরআন-গবেষণা। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Mediating Islam and Modernity: Sir Sayyid, Iqbal and Azad, Recent Trends in Qur’anic Scholarship, Decadence of Muslim Intellectualism, Islam and Democracy in the 21st Century এবং ২০২৫ সালে প্রকাশিত Perspectives on Interpreting Islam in the Contemporary Indo-Pak Subcontinent: Issues and Trends। পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাসচর্চার সমালোচনামূলক পাঠ নিয়েও তিনি কাজ করেছেন; ২০২৫ সালে Hamdard Islamicus-এ প্রকাশিত তাঁর “Islamic History through a Western Lens” প্রবন্ধটি এ ক্ষেত্রের উল্লেখযোগ্য কাজ।