
জন টোলান—মার্কিন ইতিহাসবিদ ও নঁতের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক। ইসলাম, মধ্যযুগীয় ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্ব এবং মুসলিম-খ্রিস্টান-ইহুদি সম্পর্কের ইতিহাস তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাঁর সাম্প্রতিক গ্রন্থ Islam: A New History from Muhammad to the Present ইসলামের দেড় হাজার বছরের ইতিহাস, বৈচিত্র্য ও পরিবর্তনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার প্রয়াস। এই সাক্ষাৎকারে ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস, বহুত্ব এবং সমকালীন বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

কেন ইসলাম নিয়ে ইতিহাস লিখতে আগ্রহী হলেন? বিশেষ করে ২০২৫ সালে এসে কেন?
জন টোলান: সাধারণ পাঠকদের জন্য ইসলাম নিয়ে অনেক বই রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই ইসলামের ইতিহাস নিয়ে সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলোকে উপেক্ষা করে। সাধারণত সেসব বইয়ে সপ্তম শতকের আরবে ইসলামের আবির্ভাব এবং প্রথম খলিফাদের বিজয়ের মাধ্যমে তার দ্রুত বিস্তারের একটি প্রচলিত বয়ানই পুনরাবৃত্তি করা হয়।
এই বয়ানে নিঃসন্দেহে কিছু সত্য রয়েছে। তবে এর প্রধান ভিত্তি এমন কিছু উৎস, যেগুলো আব্বাসীয় খিলাফতের সময়—অর্থাৎ মুহাম্মদ ﷺ-এর ইন্তেকালের প্রায় দুই শতাব্দী পর—রচিত হয়েছিল। ফলে মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর সাহাবিদের সম্পর্কে এসব উৎসে যা বলা হয়েছে, তার অনেকটাই তাঁদের প্রকৃত অভিজ্ঞতার পরিবর্তে এসব গ্রন্থের আব্বাসীয় লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে।
গত চল্লিশ বছরে ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক, কুরআন-গবেষকসহ বিভিন্ন শাস্ত্রের গবেষকেরা লিখিত ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন যে প্রাথমিক মুসলিম সমাজ ছিল অত্যন্ত জটিল ও বৈচিত্র্যময়। ‘ইসলাম’ নামের ধর্মীয় ঐতিহ্যটিও একাধিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপাদানের পারস্পরিক সংমিশ্রণ ও বিকাশের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল।
ইসলাম একটি বিশ্বধর্ম। তাই আমার ইতিহাসের সূচনা আরব থেকে হলেও, প্রাথমিক মুসলিম বিজয় ও উমাইয়া-আব্বাসীয় বিশাল সাম্রাজ্যের উত্থান বর্ণনার পাশাপাশি আমি পাঠককে নিয়ে গিয়েছি ইন্দোনেশিয়ায়—যা বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ এবং যেখানে ২৪ কোটিরও বেশি মুসলমান বাস করেন। গিয়েছি ভারতীয় উপমহাদেশে—পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে বিশ্বের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে। গিয়েছি পশ্চিম আফ্রিকায়—বর্তমানে নাইজেরিয়ায় বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ইরান, তুরস্ক এবং আরও বহু অঞ্চল।
ইসলাম যেমন বহুবিধ সংস্কৃতি, ভাষা ও জনগোষ্ঠীর ধর্ম, তেমনি এর প্রকাশও অসাধারণ বৈচিত্র্যময়।
আপনার বইয়ের অন্যতম আকর্ষণীয় অধ্যায় ষষ্ঠ অধ্যায়, যা প্রায় সম্পূর্ণভাবে চতুর্দশ শতকের পর্যটক ইবনু বতুতার ভ্রমণকাহিনির ওপর ভিত্তি করে রচিত। তাঁকে নিয়ে একটি পূর্ণ অধ্যায় লেখার কারণ কী?
জন টোলান: প্রথমত, তাঁর ভ্রমণ নিজেই একটি অসাধারণ গল্প। আর তিনি ছিলেন চমৎকার গল্পকার। ১৩২৫ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে মরক্কোর তাঞ্জিয়ার থেকে মক্কায় হজ পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের শহরে ফিরে আসতে তাঁর ২৪ বছর লেগে যায়।
তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রায় এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন—মালি থেকে চীন এবং মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমি থেকে পূর্ব আফ্রিকার জাঞ্জিবার পর্যন্ত। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে রয়েছে সফর করা বিভিন্ন অঞ্চল এবং সেখানে দেখা নারী-পুরুষের চমৎকার বর্ণনা। এর মাধ্যমে তিনি দারুল ইসলামের বিশালতা এবং তার বিপুল সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত ছবি তুলে ধরেছেন।
তবে একই সঙ্গে, আশ্চর্যজনকভাবে, তিনি এক ধরনের ঐক্যের চিত্রও তুলে ধরেছেন। ইবনু বতুতা ছিলেন মরক্কোর একজন বিদ্বান ফকিহ। মুসলিম বিশ্বের যেখানেই গেছেন, সেখানকার শাসকেরা তাঁকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। দিল্লি এবং পরে মালদ্বীপের কাজি হিসেবেও তিনি নিযুক্ত হয়েছেন।
কুরআন, হাদিস ও মুসলিম আইন সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন একজন আরব আলেমকে অনারব মুসলিম দেশের শাসকেরা বিশেষ মর্যাদা দিতেন।
আপনি ইসলামের পরিবর্তনশীল প্রকৃতি এবং সপ্তম শতকের আরব থেকে একবিংশ শতকের পৃথিবী পর্যন্ত এর ধারাবাহিক বিবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
জন টোলান: অন্য যেকোনো ধর্মের মতো ইসলামও নিরন্তর পরিবর্তনশীল। মুহাম্মদ ﷺ নিজেকে পূর্ববর্তী নবীদের—ইবরাহিম, মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীর—ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখতেন। তিনি ‘ইসলাম’ নামে একটি নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠার দাবি করেননি।
তাঁর ইন্তেকালের প্রায় ৬০–৭০ বছর পর দামেস্ককেন্দ্রিক উমাইয়া খলিফারা ‘ইসলাম’-কে একটি স্বতন্ত্র ও শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যিক ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যান। এর একটি কারণ ছিল এমন একটি বিশাল সাম্রাজ্যের ওপর নিজেদের আধিপত্যকে বৈধতা দেওয়া, যেখানে তখনও মুসলমানেরা সংখ্যালঘু ছিল।
পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইসলামের এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধীরে ধীরে বিকশিত ও পরিবর্তিত হয়, যা পরবর্তীকালে এর অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে—যেমন ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ, শরিয়াহ এবং জিম্মি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে অমুসলিম প্রজাদের সুরক্ষিত কিন্তু অধস্তন মর্যাদা দেওয়া হতো।
আমি এসবের ওপর গুরুত্ব দিই কারণ আমি ‘চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় ইসলাম’-এর ধারণাটিকে প্রশ্ন করতে চাই। সালাফি, ওয়াহাবি এবং অন্যান্য মৌলবাদী গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এই ধারণা ব্যবহার করে থাকে। তাদের কথিত লক্ষ্য হলো এমন একটি আদর্শ সমাজ পুনর্নির্মাণ করা, যা মুহাম্মদ ﷺ-এর মদিনার জীবনের সমাজের অনুরূপ।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইসলামকে চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় হিসেবে উপস্থাপন করার এই ধারণা ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ইসলামবিদ্বেষী উগ্র ডানপন্থীরাও প্রচার করে। তাদের কাছে ইসলাম চিরকালই নারীবিদ্বেষী, সহিংস ও পশ্চাৎপদ।
একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে আমার কাজ হলো এই ‘চিরন্তন ইসলাম’-এর মিথকে প্রশ্ন করা এবং ইসলামের চৌদ্দ শতকের ইতিহাসে যে বৈচিত্র্য ও জটিলতা রয়েছে, তা তুলে ধরা।
বইটির প্রচ্ছদ অনেক পাঠকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। সেখানে যে নারীকে দেখা যাচ্ছে, তিনি কে? তাঁকেই কেন বেছে নিলেন?
জন টোলান: তিনি রাবেয়া আল-আদাবিয়্যা—অষ্টম শতকের ইরাকের বসরায় বসবাসকারী এক সুফি সাধিকা ও কবি। তাঁর আরবি কবিতার পঙ্ক্তি বিভিন্ন ভাষায় উদ্ধৃত, অনূদিত ও সংকলিত হয়েছে। সুফিবাদের অন্যতম মহান প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়। তাঁর জীবনকাহিনি এবং বিশেষত তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা কিংবদন্তি ইন্দোনেশিয়া থেকে মিসর ও তুরস্ক পর্যন্ত গল্প, উপন্যাস, গান ও চলচ্চিত্রকে অনুপ্রাণিত করেছে।
প্রচ্ছদের ছবিটি মুঘল সাম্রাজ্যের একজন অজ্ঞাতনামা শিল্পীর আঁকা। আনুমানিক ১৭২৫ সালের এই চিত্রে রাবেয়াকে মুঘল ভারতের সৌন্দর্যচেতনা অনুযায়ী উপস্থাপন করা হয়েছে—বড় কালো বাদামি চোখ, দীর্ঘ কালো চুল, মেহেদির রঙে রাঙানো খালি পা, লাল নখ, মুক্তার চুড়ি, হার ও কানের দুল। চারপাশের দৃশ্যটিও শান্ত ও মনোরম—নদীর তীরে সবুজ মাঠ, চাষের জমি এবং দূরে একটি মসজিদ।
মাথার চারপাশে জ্যোতির্বলয় নিয়ে সাধিকাটি একটি চাদরের ওপর শুয়ে প্রার্থনায় মগ্ন। তাঁর প্রসারিত হাতে একটি কাগজ তুলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে লেখা আছে—‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট; তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক।’ এটি কুরআনের (৩:১৭৩) একটি আয়াতের ভাবার্থ, যা কল্যাণ প্রার্থনা বা অকল্যাণ থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় মুসলমানেরা প্রায়ই উচ্চারণ করেন।
ছবিটি যেন আধ্যাত্মিক প্রশান্তি, আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ ও আস্থার এক প্রতিচ্ছবি। চারপাশের পৃথিবীর সৌন্দর্যও এখানে জান্নাতের সৌন্দর্যের এক পূর্বাভাস হয়ে উঠেছে।
এই ছবিটি একই সঙ্গে ইসলামের ঐক্য ও বৈচিত্র্য—দুই দিকই তুলে ধরে। এটি অষ্টাদশ শতকের উত্তর ভারতের চিত্র; মুঘল সম্রাটেরা ছিলেন শিল্পী ও মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মহান পৃষ্ঠপোষক। একই সঙ্গে তাঁরা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অমুসলিমদের সঙ্গে সহাবস্থানের পথও নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন।
মুঘল ভারত ছিল পারস্য সংস্কৃতির বৃহত্তর জগতের অংশ। এই প্রতিকৃতিও চতুর্দশ শতক থেকে বিকশিত সমৃদ্ধ পারস্য মিনিয়েচার চিত্রকলার ঐতিহ্যের অংশ। এই ধারায় ধর্মীয় ও পার্থিব—উভয় ধরনের বিষয়ই চিত্রিত হয়েছে; এমনকি মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবনও। এর মধ্য দিয়ে এটাও বোঝা যায় যে ইসলামের ইতিহাসে মানুষের ছবি আঁকার ওপর সর্বত্র একরকম নিষেধাজ্ঞা ছিল—এমন ধারণা সঠিক নয়।
অবশ্য এই চিত্রের রাবেয়া আল-আদাবিয়্যা ঐতিহাসিক রাবেয়া থেকে অনেক দূরে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী তিনি দরিদ্র পরিবারে জন্মেছিলেন; কোনো কোনো কিংবদন্তিতে তাঁকে এমনকি একজন দাসী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁর মালিক তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদা উপলব্ধি করে তাঁকে মুক্ত করে দেন।
তেমনি আমরা এখানে মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর সাহাবিদের সময়কার আরব থেকেও অনেক দূরে। অর্থাৎ এই ছবিটি আমাদের সামনে ইসলামের বহুবর্ণিল বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
কিন্তু একই সঙ্গে এটি শতাব্দী, ভাষা ও সংস্কৃতির সীমা অতিক্রম করা মুসলিম বিশ্বের এক ধরনের ঐক্যও প্রকাশ করে। কাগজে লেখা কুরআনের বাক্যটি আরব থেকে ভারত, এমনকি আজকের চীন বা ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত মুসলমানদের মুখে উচ্চারিত হয়। ইরাকের রাবেয়া আল-আদাবিয়্যার মতো ইসলামী আধ্যাত্মিকতার একজন মহান ব্যক্তিত্বকে চিত্রিত করাও সময় ও সংস্কৃতির মধ্যকার সংযোগের প্রতীক।
অবশ্য শিল্পী তাঁকে ঐতিহাসিক বাস্তবতার নিরিখে আঁকেননি; বরং অষ্টাদশ শতকের ভারতীয় সুন্দরী নারীর পরিচিত বৈশিষ্ট্যে তাঁকে উপস্থাপন করেছেন। একই সময়ে উত্তর ইউরোপের শিল্পীরা প্রথম শতকের ফিলিস্তিনি ইহুদি ঈসা (আ.)-কেও লম্বা, স্বর্ণকেশী ও নীলচোখের ইউরোপীয় পুরুষ হিসেবে আঁকতেন।
এক অর্থে এই ঐতিহাসিক অসামঞ্জস্যই অতীতের ব্যক্তিত্বকে দর্শকের কাছে আরও আপন করে তোলে। রাবেয়া কিংবা ঈসা (আ.)—তাঁরা যেন আমাদেরই মতো, আমাদের খুব কাছের মানুষ।
আর সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ হলো—এই ছবিটি ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত কিছু গতানুগতিক ধারণার বিপরীতে দাঁড়ায়। ইসলাম নিয়ে কথা হলেই আমরা প্রায়শই আরব পুরুষদের কথা শুনি; শুনি সহিংসতা, জিহাদ, পোশাক, খাদ্য ও জীবনযাপনের ওপর নানা বিধিনিষেধের কথা।
কিন্তু এই মিনিয়েচার আমাদের ইসলামের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি দেখায়—শান্তি, ধ্যান, পৃথিবীর সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধতা এবং আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থার এক ছবি।
২০২৫ সালের পাঠকেরা আপনার বই থেকে কী নিয়ে ফিরুক—আপনি কী আশা করেন?
জন টোলান: প্রথমত, আমি চাই বইটি নানা ধরনের পাঠকের কাছে পৌঁছাক। এমন মুসলমানদের কাছে, যারা নিজেদের ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে আরও জানতে চান; আবার এমন পাঠকদের কাছেও, যারা ইসলাম সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না কিন্তু এ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।
আমি চাই, এই বই তাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু প্রচলিত ধারণা ও স্টেরিওটাইপ দূর করতে সাহায্য করুক। প্রথমত, ইসলাম যে কতটা জটিল ও বৈচিত্র্যময়—এবং তার মৌলিক ধর্মগ্রন্থগুলোর ওপর ভিত্তি করে থেকেও কীভাবে তা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে—তা বোঝাতে চাই।
ইরানি বিপ্লবের পর নতুন নতুন রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান এবং ১৯৯০-এর দশক থেকে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদের আবির্ভাব এমন এক সময়ের সূচনা করে, যখন মুসলিম অভিবাসী-সমৃদ্ধ দেশগুলোতে একই সঙ্গে মুসলিমবিরোধী ও অভিবাসীবিরোধী উগ্র ডানপন্থারও উত্থান ঘটে।
এই সময়ে ঐতিহ্যবাদী ও নিজেদের সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বইয়ের শেষ অধ্যায়গুলোতে আমি তাঁদের কয়েকজনের কথা আলোচনা করেছি—মিসরের ফারাজ ফওদা, নাসর হামিদ আবু যায়দ ও জামাল আল-বান্না; সুদানের মাহমুদ মুহাম্মদ তাহা; ইন্দোনেশিয়ার হারুন নাসুতিয়ন ও নুরচোলিশ মাদজিদ; ফ্রান্সের মুহাম্মদ আরকুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নারী ইমাম আমিনা ওয়াদুদ প্রমুখ।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলের কিছু রাজনৈতিক দল মানুষের ভয়কে কাজে লাগিয়ে ইসলাম, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে একাকার করে দেখানোর চেষ্টা করছে। আবার অন্যরা উগ্রবাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে বলে থাকেন—ইসলাম একটি ‘শান্তির ধর্ম’, তাই ধর্মীয় উগ্রতার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু এই বক্তব্যও সরলীকৃত। ইসলামের বিভিন্ন রূপ—সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় থেকে সবচেয়ে যুদ্ধংদেহী পর্যন্ত—নবীজির ﷺ যুগ থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিদ্যমান ছিল। ইসলামের বিভিন্ন ধারার মধ্যে আজ যে সংঘাত ও টানাপোড়েন আমরা দেখি, তার শিকড় বহু শতাব্দী গভীরে প্রোথিত।
আমি আশা করি, আমার বই ইসলামের অতীতকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে—যাতে আমরা তার ভবিষ্যৎ নির্মাণে আরও বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারি।