দাওয়াহ ও ইরশাদ বিভাগে অধ্যয়নরত প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ১৪২৭ হিজরিতে এবং পরবর্তীতে ১৪২৯ হিজরিতে নতুন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সামনে পাকিস্তানের গ্র্যান্ড মুফতি মুহাম্মদ রফি উসমানী তাঁর প্রারম্ভিক বক্তব্যে কিছু মৌলিক নসিহত পেশ করেছিলেন। দীনের দাওয়াত, ইসলাহ ও মানুষের সঠিক দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে এই নসিহতসমূহ একজন দায়ীর চরিত্র, মানসগঠন ও কর্মপদ্ধতির জন্য একগুচ্ছ নীতিগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দ্বীনি খিদমতের পথে যারা আত্মনিয়োগ করতে চায়, তাদের জন্য এসব উপদেশে যেমন রয়েছে ইলম ও আমলের ভারসাম্যের শিক্ষা, তেমনি রয়েছে ইখলাস, হিকমাহ, আখলাক, ধৈর্য ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণের সূক্ষ্ম দিকনির্দেশনা। সে কারণেই এই মূল্যবান নসিহতগুলোর সারসংক্ষেপ এখানে ভূমিকা হিসেবে সংযোজন করা হলো, যাতে পাঠক পরবর্তী আলোচনার বৌদ্ধিক ও আত্মিক প্রেক্ষাপট অনুধাবন করতে পারেন।
প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ!
দাওয়াত ও ইরশাদের কাজ অত্যন্ত মহান ও মর্যাদাপূর্ণ। পৃথিবীতে আগত সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের মৌলিক দায়িত্ব ছিল মানুষকে সতর্ক করা ও সুসংবাদ পৌঁছে দেওয়া। কুরআনুল কারিমে তাঁদের আগমনের উদ্দেশ্য হিসেবে বারবার ইনযার (সতর্কীকরণ) ও তাবশীর (সুসংবাদদান)-এর কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। আমরাও যে দ্বীনি ইলম অর্জন করছি, তার প্রকৃত লক্ষ্যও এই ইনযার ও তাবশীরের দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া।
কুরআন মাজিদের নিম্নোক্ত আয়াতেও দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য হিসেবে মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার কথাই বলা হয়েছে
فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
“তাদের প্রত্যেক দল থেকে কেন এমন একটি দল বের হলো না, যারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করবে এবং নিজেদের কওমের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের সতর্ক করবে, যাতে তারা সতর্ক হয়।” — (সূরা আত-তাওবা: ১২২)
নবীগণের গুণাবলি ধারণের প্রয়োজনীয়তা
যেহেতু দাওয়াতে ইলাল্লাহ বা মানুষের কাছে আল্লাহর দ্বীনের আহ্বান পৌঁছে দেওয়া মূলত নবী-রাসূলগণের কাজ, তাই যারা এ দায়িত্ব বহন করবেন, তাদের মধ্যেও নবীগণের চরিত্রগুণ ও নৈতিক বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হওয়া অপরিহার্য। একজন দায়ীর প্রথম ও প্রধান গুণ হওয়া উচিত তাকওয়া—অর্থাৎ আল্লাহভীতি, আত্মসচেতনতা এবং জবাবদিহিতার গভীর অনুভব।
এর পাশাপাশি সুন্নাহ ও উসওয়ায়ে হাসানাহকে জীবনের প্রতিটি স্তরে এমনভাবে ধারণ করতে হবে, যাতে ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক আচরণ, চিন্তাপদ্ধতি, লেনদেন, নৈতিকতা—সবকিছু নববী আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ মানুষ কেবল মৌখিক বয়ান বা আবেগঘন উপদেশে ততটা প্রভাবিত হয় না, যতটা প্রভাবিত হয় জীবন্ত আদর্শ ও বাস্তব চরিত্রে। বাস্তবিক অর্থে, দাওয়াতের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা হলো ব্যক্তিত্ব ও আমল।
আজকের বিশ্বে আমরা একটি গভীর বৈপরীত্য প্রত্যক্ষ করি। বহু অমুসলিম ইসলামি শিক্ষার সৌন্দর্য, নৈতিক দর্শন এবং আধ্যাত্মিক আবেদন অধ্যয়ন করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন; কিন্তু একই সঙ্গে বহু মানুষ মুসলমানদের সামাজিক আচরণ, নৈতিক সংকট ও বাস্তব জীবনযাত্রা দেখে ইসলামের প্রতি বিরূপ ধারণাও পোষণ করছেন। অর্থাৎ ইসলাম তার আদর্শিক শক্তি দিয়ে মানুষকে আকর্ষণ করছে, কিন্তু মুসলমানের বাস্তব চরিত্র অনেক ক্ষেত্রে সেই আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে না।
এই সংকট মূলত একটি “নৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট” — যেখানে ইসলামের তাত্ত্বিক সৌন্দর্য ও মুসলিম সমাজের ব্যবহারিক বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ফারাক তৈরি হয়েছে। আর এ কারণেই একজন দায়ীর জন্য কেবল জ্ঞান বা বক্তৃতা যথেষ্ট নয়; বরং তাঁর জীবনকেই দাওয়াতের জীবন্ত দলিল হয়ে উঠতে হবে।
এ প্রসঙ্গে এক শিখ ব্যক্তির ঘটনা স্মরণ করা যায়
ঘটনাটি ছিল এ রকম একবার আমরা জার্মানি গিয়েছিলাম। ফিরে আসার আগের দিন কিছু সময় হাতে ছিল। ভাবলাম, বাচ্চাদের জন্য কিছু জিনিসপত্র কিনে নেওয়া যাক। সে উদ্দেশ্যে আমরা একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গেলাম। দোকানটির মালিক ছিলেন একজন শিখ ভদ্রলোক।
তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতা ও হাসিমুখে আমাদের সঙ্গে পরিচিত হলেন। যখন জানতে পারলেন যে আমরা পাকিস্তান থেকে এসেছি, তখন যেন আরও বেশি আনন্দিত হয়ে উঠলেন। বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল উর্দুতে অত্যন্ত ভদ্র ও অনুরোধপূর্ণ ভঙ্গিতে বললেন, “আপনারা কেনাকাটা শেষ করে যদি কিছু সময়ের জন্য আমার অফিসে আসেন, তাহলে খুব খুশি হব।”
আমরা সম্মতি দিলাম। কিন্তু কেনাকাটায় কিছুটা দেরি হয়ে গেল। এদিকে তাঁর পক্ষ থেকে দুই-তিনবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার বার্তাও এলো যেন আমরা ভুলে না যাই।
অবশেষে কেনাকাটা শেষে আমরা তাঁর অফিসে গেলাম। অফিসটি ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও নান্দনিকভাবে সাজানো। প্রতিটি জিনিস নিজ নিজ স্থানে এত পরিপাটি করে রাখা ছিল যে, তাঁর রুচিবোধ, শৃঙ্খলাচেতনা ও নান্দনিক মনন দেখে সত্যিই ভালো লাগল।
এরপর তিনি ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে আমার কাছে নানা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। আমি ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁর প্রশ্নগুলোর উত্তর দিলাম। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন। তারপর বললেন, “ইসলামের এই কথাগুলো আমার খুব ভালো লাগছে। আমি এগুলো মেনে নিতে প্রস্তুত। এখন আমাকে বলুন, ইসলাম গ্রহণ করতে হলে কী করতে হয়?”
আমি বললাম, “এটি খুবই সহজ। ইসলামে একটি কালিমা রয়েছে। এর অর্থ ও তাৎপর্য ভালোভাবে বুঝে, যখন একজন মানুষের অন্তরে এ বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে যায় যে এটি সত্য, তখন সে অন্তর থেকে তা গ্রহণ করে এবং মুখে সেই কালিমা উচ্চারণ করে।”
তিনি বললেন, “ঠিক আছে, তাহলে আপনি আমাকে সেই কালিমা পড়ে শুনিয়ে দিন। আমি ইসলাম গ্রহণ করতে চাই।”
এরপর আমি তাঁকে কালিমা পাঠ করালাম এবং তার অর্থও বুঝিয়ে দিলাম।
সে জিজ্ঞেস করল, “এখন আমাকে কী করতে হবে?”
আমি বললাম, “ইসলাম গ্রহণের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নামাজ। আমি তাকে নামাজ, গোসল এবং অজুর নিয়ম সম্পর্কে বুঝিয়ে দিলাম।”
সে বলল, “আপনি তো কাল পাকিস্তান ফিরে যাবেন। আমাকে কিছু বই দিয়ে যাবেন, যাতে আমি নিজে নিজে পথনির্দেশনা পেতে পারি।”
আমি আমার মেজবান, মাওলানা কারী এহসান সাহেব যিনি দারুল উলূম করাচিরই একজন প্রাক্তন ছাত্র তাঁকে ফোন করে পুরো পরিস্থিতি জানালাম। অনুরোধ করলাম যেন তিনি নামাজ শেখার একটি বই এবং ‘তাফসির মা‘আরিফুল কুরআন’-এর প্রথম খণ্ড নিয়ে আসেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি এসে পৌঁছালেন। আমি তাকে বললাম, “চলুন, আমরা সবাই মিলে দোয়া করি। এই মুহূর্তে আপনার দোয়া অধিক গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” আমি তাকে একটি হাদিসও শুনালাম—যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে, আল্লাহ তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। অর্থাৎ এখন তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র অবস্থায় আছেন।
এরপর আমরা সবাই মিলে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও বিনয়ের সঙ্গে দোয়া করলাম।
তারপর আমি বললাম, “মুবারক হোক। এই মুহূর্তে আপনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম মুসলমান, কারণ আপনার অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে গেছে।”
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, “আমি কি তাহলে মুসলমান হয়ে গেছি?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ, আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন।”
তিনি কিছুক্ষণ নীরব হয়ে চিন্তা করলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, “না, আমি মুসলমান হতে চাই না।”
আমি বিস্মিত ও কিছুটা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”
তিনি বললেন, “আপনি যে ইসলাম সম্পর্কে বললেন, তা আমার ভালো লেগেছে, আমি সবই মানি। কিন্তু আমি অনেক মুসলমান দেখেছি—তাদের আচরণ ভালো নয়। আমি মুসলমান হতে প্রস্তুত নই। আমি কি এমন হতে পারি না যে আমি ইসলাম গ্রহণ করব, কিন্তু মুসলমান হব না?”
এই কঠিন প্রশ্নের উত্তরে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
তার শেষ কথা ছিল “আমি শিখ, গুরু গোবিন্দ সিংয়ের অনুসারী, আমি মুসলমান নই।”
পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও আর সাক্ষাৎ হয়নি। কিছুদিন আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এই ঘটনাটি বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো একটি গভীর বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
আজ আমাদের ব্যক্তিজীবন, সামাজিক আচরণ ও সামষ্টিক চরিত্রের যে প্রতিচ্ছবি মানুষ প্রত্যক্ষ করছে, তা অনেক ক্ষেত্রে সেই আদর্শিক চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত—যা নবী-রাসূলগণ ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনে দেখা যেত। তাঁদের চরিত্রের সৌন্দর্য, নৈতিক দৃঢ়তা এবং আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ মানুষকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করত; তাঁদের জীবন ছিল দাওয়াতের জীবন্ত দলিল।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক সময় আমাদেরই আচরণ, আমাদের নৈতিক বিচ্যুতি ও সামাজিক অসংগতি মানুষের মনে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করছে এমনকি কারো কারো মধ্যে বিরূপতাও সৃষ্টি করছে।
এই কারণেই মূল শিক্ষা এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে দাওয়াতের আগে দাওয়াতদাতার আত্মশুদ্ধি অপরিহার্য। অর্থাৎ আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে নবী করিম ﷺ, সাহাবায়ে কেরাম এবং সালাফে সালেহিনের আখলাক, তাকওয়া ও আদর্শিক জীবনচর্যা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
কারণ দাওয়াত হচ্ছে চরিত্র, নৈতিকতা ও জীবনের সামগ্রিক বাস্তবতার মাধ্যমে প্রকাশিত একটি জীবন্ত সত্য।
দাওয়াত ইলাল্লাহর দুটি পদ্ধতি
দাওয়াত ইলাল্লাহ বা আল্লাহর পথে আহ্বানের মূলত দুটি পদ্ধতি রয়েছে কথার মাধ্যমে দাওয়াত (দাওয়াতে কওলি) এবং কাজের মাধ্যমে দাওয়াত (দাওয়াতে আমলি)।
কথার মাধ্যমে দাওয়াত আবার দুই ভাগে বিভক্ত: বক্তৃতা (তাকরির) এবং লিখনী (তাহরির)। অর্থাৎ একটি ভাষার মাধ্যমে সরাসরি উপস্থাপন, আর অন্যটি কলমের মাধ্যমে চিন্তা ও বার্তা প্রকাশ। তাই একজন দায়ীর জন্য অপরিহার্য হলো নিজের মাতৃভাষা এবং সেই ভাষার প্রচলিত বাগধারা, রীতি ও অভিব্যক্তির ওপর পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করা।
কারণ দাওয়াত যতটা সঠিক, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তার প্রভাবশীলতা। একজন ব্যক্তি যদি নিজের এলাকায় গিয়ে স্থানীয় ভাষায় কথা বলেন, তবে তা মানুষের হৃদয়ে অনেক গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। পক্ষান্তরে, অপরিচিত ভাষায় বলা বক্তব্য অনেক সময় শ্রদ্ধা ও মনোযোগ অর্জন করলেও তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হয়ে থাকে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি আমি চিত্রাল অঞ্চলে গিয়ে ওয়াজ করি, তাহলে সম্ভবত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে মানুষ আমার কথা মন দিয়ে শুনবে এবং সম্মানও প্রদর্শন করবে। কিন্তু ভাষাগত দূরত্বের কারণে আমার বক্তব্যের গভীর প্রভাব হয়তো সেই পরিমাণে তৈরি হবে না, যতটা হতো স্থানীয় ভাষাভাষী কোনো আলেমের বক্তব্যে।
তাই প্রত্যেক দায়ীর জন্য জরুরি হলো নিজের ভাষায় বাগ্মিতা, প্রাঞ্জলতা এবং অভিব্যক্তির দক্ষতা অর্জন করা। আর যদি দাওয়াতের কাজ নিজ দেশের বাইরে অন্য অঞ্চলে করতে হয়, তাহলে সেখানকার ভাষা শেখার পূর্ণ চেষ্টা করা উচিত—সেই এলাকার সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি এবং কথ্য অভিব্যক্তির সঙ্গেও পরিচিত হওয়া প্রয়োজন।
এই নীতির ভিত্তি কুরআনুল কারিমে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ
“আমি কোনো রাসূলকেই তাঁর কওমের ভাষা ছাড়া প্রেরণ করিনি, যাতে তিনি তাদের কাছে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।” (সূরা ইবরাহিম: ৪)
দাওয়াত ইলাল্লাহর দ্বিতীয় রূপটি হলো তাহরির বা লেখনীর মাধ্যমে দাওয়াত। একজন দায়ীর লেখা অবশ্যই পরিচ্ছন্ন, নিয়মিত এবং নীতিসম্মত হওয়া উচিত। লেখার ভেতরে থাকতে হবে বাগ্মিতা, প্রাঞ্জলতা ও নান্দনিকতার স্পষ্ট ছাপ। কারণ লেখা যদি অগোছালো, অশুদ্ধ বা অরুচিকর হয়, তবে পাঠক প্রথম দৃষ্টিতেই বিমুখ হয়ে যেতে পারে তার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যে ব্যক্তি নিজের লেখাই শুদ্ধভাবে উপস্থাপন করতে পারে না, সে আমাকে কী শেখাবে?
লেখার শুদ্ধতা কেবল শৈল্পিক বিষয় নয়, বরং দাওয়াতের গ্রহণযোগ্যতার মৌলিক শর্ত।
বর্তমান যুগে যোগাযোগ ও প্রচারের প্রধান মাধ্যম হলো সাংবাদিকতা বা মিডিয়া। তাই এই ক্ষেত্রটির জ্ঞান অর্জনও জরুরি। প্রচার-প্রসারের প্রধান দুটি ধারা রয়েছে প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া।
প্রিন্ট মিডিয়ায় দাওয়াতের জন্য প্রয়োজন লেখার শৈল্পিক উৎকর্ষ, অর্থাৎ সাহিত্যিক সৌন্দর্য, বাগ্মিতা এবং চিন্তার সুস্পষ্টতা। আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রয়োজন ভাষার স্বচ্ছতা, প্রাঞ্জলতা এবং উচ্চারণগত সাবলীলতা। অর্থাৎ একটির ভিত্তি কলম, অন্যটির ভিত্তি কণ্ঠস্বর।
এই দুই ক্ষেত্রেই একজন দায়ীর দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ওয়াজ-নসিহত, জনসম্মুখে বক্তব্য, দাওয়াতি সাক্ষাৎ ও আলোচনার ক্ষেত্রেও এই দক্ষতাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দাওয়াতের তৃতীয় ও সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো আমল বা বাস্তব চরিত্র। অর্থাৎ দায়ী নিজেই দাওয়াতের জীবন্ত উদাহরণ হয়ে ওঠা। কারণ মানুষের হৃদয়ে সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলে কথা নয়—বরং চরিত্র ও আচরণ।
তবে এই আত্মগঠন ও চরিত্র সংশোধনের জন্য একজন মুরব্বি বা মুছলিহের প্রয়োজন অপরিহার্য। এমন ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে থাকা জরুরি, যারা নিজেরা পূর্ববর্তী নেককার ও বুযুর্গদের থেকে আত্মশুদ্ধি ও তরবিয়ত অর্জন করেছেন।
এটি আল্লাহর সাধারণ নিয়ম—যেমন শরীরের রোগ কেবল চিকিৎসকই নিরাময় করতে পারেন, তেমনি আত্মার ব্যাধিও কোনো রূহানি মুরব্বি ও মুছলিহের তত্ত্বাবধান ছাড়া দূর হয় না।
ইহসানের গুরুত্ব
এতক্ষণ পর্যন্ত আপনারা যে জ্ঞান অর্জন করেছেন তা মূলত “ফিকহে জাহির”—অর্থাৎ বাহ্যিক বিধানসমূহের জ্ঞান। কিন্তু এর বাইরে আরেকটি স্তর রয়ে গেছে, যাকে বলা হয় “ফিকহে বাতিন” বা অন্তর্গত জ্ঞান। শরিয়তের পরিভাষায় একেই বলা হয় ইহসান। সাধারণ ব্যবহারে এটিকেই “তাসাউফ” বলা হয়ে থাকে। তবে যেহেতু এ শব্দটি কখনো কখনো সমালোচনার ক্ষেত্রও হয়ে দাঁড়ায়, তাই একে ইহসান নামেই অভিহিত করা অধিকতর সমীচীন।
প্রিয় শিক্ষার্থীরা!
আমরা যখন তাখাসসুস ফিল ইফতা–তে ভর্তি হই, তখন আমাদের মরহুম পিতা মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) প্রায়ই এ কথাটি বলতেন।
এক পর্যায়ে আমরা বিনয়ের সঙ্গে আরজি পেশ করলাম আপনি যদি নিজেই আমাদের বাইআত গ্রহণ করতেন, কারণ আপনার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও আত্মিক টান রয়েছে। কিন্তু আব্বাজান (রহ.) বললেন, পিতা ও সন্তানের মধ্যে এ ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই তিনি আমাদের হযরত ডা. আবদুল হাই আরিফী (রহ.)–এর হাতে বাইআত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করলেন এবং নিজেই আমাদের তাঁর হাতে সমর্পণ করলেন।
হযরত ড. আরিফী (রহ.) প্রায়ই বলতেন এখনকার যুগ আর কঠিন রিয়াজত ও দীর্ঘ মুজাহাদার যুগ নয়। মানুষ এখন আগের মতো কঠোর সাধনা সহ্য করতে সক্ষম নয়। তাই তিনি আমাদের জন্য তুলনামূলক সহজ কিছু আমলের নির্দেশনা দিতেন এবং সেই অনুযায়ীই আমাদের তারবিয়ত করতেন।
আমার পিতা যখন সংশোধনমূলক আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)–এর কাছে যেতেন, তখন আরজ করেন হুজুর! আমার আকাঙ্ক্ষা হলো সুলুক ও তাসাউফের পথে অগ্রসর হওয়া, কিন্তু শুনেছি এ পথ অত্যন্ত কঠিন; দীর্ঘ রিয়াজত, কষ্টসাধ্য সাধনা প্রয়োজন। আমি শারীরিকভাবে দুর্বল, সময়ও খুব সীমিত; অধিকাংশ সময়ই পড়াশোনা ও অধ্যাপনায় ব্যস্ত থাকি। এ অবস্থায় কি আমার জন্য এ পথে কিছু অংশ গ্রহণ করা সম্ভব?
হযরত থানভী (রহ.) অত্যন্ত স্নেহভরে বললেন তুমি এ কেমন কথা বলছ? আল্লাহর পথ কি শুধু শক্তিশালীদের জন্য, দুর্বলদের জন্য নয়? যাদের সময় আছে শুধু তাদের জন্য, ব্যস্তদের জন্য নয়?
প্রকৃত কথা হলো আল্লাহর পথ সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে প্রত্যেকের জন্য পথচলার ধরন এক নয়।
বড়রা বলেছেন
طرق الوصول إلى الله بعدد أنفاس الخلائق
“আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ সৃষ্টির শ্বাস-প্রশ্বাসের সংখ্যার মতোই অসংখ্য।”
তারপর তিনি বললেন
ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নত যা প্রত্যেক মুসলমানই পালন করে সেগুলো তো স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে। কিন্তু আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য তিনি তিনটি মৌলিক নীতির কথা উল্লেখ করলেন। বললেন, এগুলো যদি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা যায়, ইনশাআল্লাহ পুরো সুলুক সহজ হয়ে যাবে।
প্রথমত: তাকওয়া অর্জন করা।
এর ব্যাখ্যা আলাদাভাবে বলার প্রয়োজন নেই। তবে তিনি বিশেষভাবে জোর দিয়ে বললেন—তাকওয়া শুধু নামাজ-রোজা বা বাহ্যিক আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অন্তর্গত কর্ম ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার ক্ষেত্রেও সমানভাবে অপরিহার্য।
দ্বিতীয়ত: লা-ইয়ানী (অপ্রয়োজনীয় ও নিষ্ফল) কাজ, কথা, আড্ডা ও সাক্ষাৎ থেকে বেঁচে থাকা।
তিনি ব্যাখ্যা করলেন লা-ইয়ানী বলতে এমন সব কাজ বোঝায়, যার মধ্যে না দীনী কোনো উপকার আছে, না দুনিয়াবি কোনো প্রয়োজন। গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের দৈনন্দিন কাজ, কথা ও সামাজিক মেলামেশার বড় একটি অংশই এমন কাজের কথা অল্প, আর অপ্রয়োজনীয় কথা ও সময় অপচয়ই বেশি। এই অতিরিক্ততা থেকেই বাঁচতে হবে।
তৃতীয়ত: সামর্থ্য ও সুযোগ অনুযায়ী প্রতিদিন কিছু পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত করা।
এরপর তিনি বললেন এই “নুসখা” বা পদ্ধতিতে এমন কী আছে যা অতি কষ্টসাধ্য বা সময়সাপেক্ষ? একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, এতে বরং শক্তি সঞ্চিত হয়। কারণ তাকওয়া মানুষকে বহু অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত রাখে, ফলে শক্তি অপচয় হয় না। আবার অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকলে সময় ও অবসর বেড়ে যায়, যা দ্বীনি ও ইলমি কাজে ব্যয় করা সম্ভব হয়।
এরপর তিনি বললেন এইটুকুই আপনার জন্য যথেষ্ট। তবে ইচ্ছা ও সুযোগ থাকলে সকাল-সন্ধ্যায় সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ একশ’ বার করে এবং ইস্তিগফার ও দরুদ শরীফ একশ’ বার করে পড়তে পার। আর নামাজের পর তাসবিহে ফাতিমি নিয়মিত আদায় করবেন।
তিনি আরও উপদেশ দিলেন যে কোনো কাজে যাওয়ার সময়, তা পড়াশোনা হোক বা দাওয়াত-তাবলিগ, অন্তত একবার বা সম্ভব হলে চল্লিশবার পড়বে:
“হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল, নি‘মাল মাওলা ওয়া নি‘মান নাসীর।”
এটি অত্যন্ত কার্যকর এক আমল।
তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন ১৯৬৪ সালে আমাকে একটি কাজে পাঠানোর সময় তিনি একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন
“এই দোয়া পড়ে যাবে।”
رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَلْ لِي مِنْ لَدُنْكَ سُلْطَانًا نَصِيرًا”
আলহামদুলিল্লাহ, তিনি বলেন, এই দোয়া পড়ে আমি যে কাজে গিয়েছিলাম, যা সাধারণত মাসের পর মাস লাগার কথা ছিল, আল্লাহ তাআলার ফযল ও করমে তা মাত্র দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যায়।
তাই তিনি উপদেশ দিলেন যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরুর আগে এই দোয়া অবশ্যই পড়বে।
এছাড়া দরস, তাদরিস বা ওয়াজ শুরু করার আগে এই দোয়াটিও পড়ার তাকিদ দিলেন
“رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي، وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي، وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي”
ক্লাসিক নীতিসূত্র (কায়েদায়ে কুল্লিয়া)
সামগ্রিক নীতিটি হলো প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন (রুজু ইলাল্লাহ) বজায় রাখা।
হযরত সাইয়্যেদী ড. আরিফী (রহ.) প্রায়ই বলতেন ওযু করা, মসজিদে যাওয়া কিংবা কিবলার দিকে মুখ করে বসার মতো বিশেষ প্রস্তুতির অপেক্ষা করো না। বরং চলাফেরা, ওঠাবসা, নির্জনতা কিংবা ব্যস্ততা সব অবস্থাতেই নীরবে, আন্তরিকভাবে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে যাও। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে এক ধরনের অন্তর্মুখী সংলাপে পরিণত করো।
তাঁর ভাষায়, রুজু ইলাল্লাহই সফলতার চাবিকাঠি।
এর সঙ্গে আরেকটি মৌলিক শর্ত হলো—সুন্নাতে নববীর অনুসরণ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে সুন্নাহর অনুগত করা আবশ্যক। কিন্তু এই অনুগত্য কেবল বাহ্যিক অনুকরণে সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য প্রয়োজন অন্তরের পরিশুদ্ধি (ইসলাহে ক্বলব)।
আর এ অন্তরশুদ্ধি একা অর্জন করা যায় না। এজন্য প্রয়োজন হয় একজন পথনির্দেশক ও আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষকের অর্থাৎ মুরশিদের তত্ত্বাবধানে আত্মশুদ্ধির পথ অতিক্রম করা।
দাওয়াতের চিন্তা ও অন্তর্লীন ব্যাকুলতা
দাঈ (দাওয়াত প্রদানকারী ব্যক্তির) জন্য অপরিহার্য হলো—দাওয়াত ও তাবলিগের প্রতি এক গভীর আকর্ষণ, আন্তরিক টান ও অবিরাম ব্যস্ততা (শগফ ও শগাফাত)। এই ক্ষেত্রে আমাদের তাবলিগি সাথীদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য সত্যিই প্রশংসনীয়—তাঁদের ভেতরে দাওয়াতের একধরনের জীবন্ত স্পন্দন সবসময় সক্রিয় থাকে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, যতক্ষণ না মানুষের অন্তরে আমর বিল-মা‘রূফ ও নাহি আনিল-মুনকার–এর প্রতি সত্যিকারের ব্যথা, উদ্বেগ ও দায়বোধ জন্ম নেয়, ততক্ষণ তার কথার মধ্যে প্রভাব (তাসীর) সৃষ্টি হয় না।
একবার আমি তুবা মসজিদে জুমার নামাজ পড়ানো ও বয়ান করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কখনো একটি বই দেখি, আবার কখনো আরেকটি। এমন সময় আমাদের ভগ্নিপতি হযরত মাওলানা নূর আহমদ সাহেব (রহ.)—তৎকালীন দারুল উলূম করাচির সাবেক নাজিম—এলেন।
তিনি বললেন—
“তুমি যে কথা বয়ানে বলতে চাও, প্রথমে তার প্রয়োজন ও গুরুত্ব নিজের ভেতরে গভীরভাবে অনুভব করো। আর যদি আল্লাহর দিকে পূর্ণ প্রত্যাবর্তন (রুজু ইলাল্লাহ) থাকে, তবে তোমার কথায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রভাব সৃষ্টি হবে।”
যেখানে আঘাত, সেখানেই প্রলেপ
আমার মুর্শিদ, মুফরিদে রূহানী ও আরিফে বিল্লাহ হযরত সাইয়্যেদী ড. আরিফী (রহ.) প্রতিটি সুযোগে পরিস্থিতি অনুযায়ী অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ ও হৃদয়গ্রাহী কথা বলতেন।
একবার আমাকে একটি বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুরোধে বয়ান করার জন্য পাঠানো হলে তিনি আমাকে বিশেষভাবে কিছু উপদেশ দেন। তিনি বললেন,
“মনে রেখো—কখনোই ‘ফরমায়েশি বক্তৃতা’ করবে না, অর্থাৎ পূর্বনির্ধারিত, যান্ত্রিক বা রুটিনধর্মী বক্তব্য দেবে না। বরং যেখানেই যাও, আগে দেখবে সেখানে আসল প্রয়োজন কী। কোন দুর্বলতা, কোন ব্যাধি বা কোন বৌদ্ধিক ও নৈতিক সংকট বেশি প্রকট—সেটিকেই লক্ষ্য করে আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলবে। যেখানে আঘাত, সেখানেই প্রলেপ লাগাবে।”
তিনি আরও বলেন,
বয়ান শুরু করার আগে নিজের নিয়তকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য খালিস করে নেবে এবং দোয়া করবে—
“হে আল্লাহ! আমাকে সত্যকে সত্য হিসেবে, যথার্থ নিয়তের সঙ্গে এবং যথার্থ পদ্ধতিতে উপস্থাপন করার তাওফিক দান করুন।”
এছাড়া তিনি সুন্নাহসম্মত দোয়াগুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন।
হযরতের দেওয়া এই নুসখা এমন এক ‘ইক্সির’ যার কার্যকারিতা বাস্তব অভিজ্ঞতায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে। যখনই এর ওপর আমল করার তাওফিক হয়েছে, তখনই তার ফল সামনে স্পষ্ট হয়েছে।
কারণ, যখন বক্তা মুখস্থ বুলি না আওড়িয়ে সময়, প্রেক্ষাপট ও বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেন, তখন তার বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই অধিক গভীরতা ও প্রভাব অর্জন করে। শ্রোতারা তখন সেই কথাই বেশি মনোযোগ, আগ্রহ ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে শোনে, যা তাদের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত। আর তখনই আল্লাহ তাআলা সেই কথার মধ্যে প্রকৃত প্রভাব সৃষ্টি করে দেন।
দাওয়াতের কাজে নবীগণের পদ্ধতি গ্রহণ করা
একজন দাঈর জন্য মৌলিক প্রয়োজন হলো—ওয়াজ, নসিহত, বক্তৃতা ও লেখালেখির ক্ষেত্রে সেই পদ্ধতি ও ভাষাশৈলী গ্রহণ করা, যাকে কুরআনুল কারিম নিজেই শিক্ষা দিয়েছে এবং যা বিভিন্ন নবীর জীবনের ঘটনাবলিতে উদাহরণ হিসেবে বারবার তুলে ধরেছে। গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কুরআন মাজিদ যেমন নামাজের বিস্তারিত বিধান সংক্ষেপে উল্লেখ করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছে দাওয়াত, ইরশাদ ও মানুষের হৃদয়ে প্রভাব সৃষ্টির পদ্ধতি নিয়ে।
ইনশাআল্লাহ, তাখাসসুস ফিদ-দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ–এর পাঠপর্বে আপনারা এই নববী উসূল ও দাওয়াতি মেথডলজি বিস্তারিতভাবে অধ্যয়ন করবেন।
সারকথা হলো—দাওয়াত ও ইরশাদের এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য মৌলিকভাবে পাঁচটি বিষয়ের প্রয়োজন:
প্রথমত:
বক্তৃতা ও লেখালেখিতে শক্তিশালী দক্ষতা অর্জন।
দ্বিতীয়ত:
নিজের আমল ও চরিত্রের সংশোধন এবং সুন্নাহর অনুসরণ।
তৃতীয়ত:
দ্বীনের দাওয়াতের প্রতি গভীর আগ্রহ, ব্যাকুলতা ও দায়বোধ।
চতুর্থত:
“যেখানে ক্ষত, সেখানেই প্রলেপ”—এই নীতিকে ধারণ করা; অর্থাৎ সমাজের বাস্তব সমস্যা ও প্রয়োজনকে লক্ষ্য করে কথা বলা।
পঞ্চমত:
দাওয়াতের ক্ষেত্রে নবীগণের পদ্ধতি, প্রজ্ঞা ও হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনাকে অনুসরণ করা।
ইনশাআল্লাহ, তাখাসসুস ফিদ-দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ–এ আপনারা এই পাঁচটি নীতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং আত্মিক দিকনির্দেশনা লাভ করবেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের সহায়ক ও অভিভাবক হোন।
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

