মূল : ড. জাভেদ আলী খান
তরজমা : মোহাম্মদ আবদুল্লাহ

এক.

২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমি তার প্রতিষ্ঠার একশ বছর পূর্ণ করে। উপমহাদেশের বৌদ্ধিক ইতিহাসে এটি একটি অগ্রগণ্য ইন্দো-ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিষ্ঠা এমন এক সময়ে হয়েছিল যখন ইউরোপীয় ধাঁচের সাহিত্য-একাডেমি ও গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের ধারণা ভারতবর্ষে সুপরিচিত হয়ে ওঠেনি।

এই একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শিবলী নোমানি (১৮৫৭–১৯১৪) ছিলেন উপমহাদেশীয় মুসলিম বৌদ্ধিক জগতের অন্যতম প্রধান নির্মাতা। ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব ও সভ্যতাচিন্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তাঁকে নিজ যুগের একজন অসাধারণ মনীষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

একটি গবেষণা-একাডেমি প্রতিষ্ঠার ধারণা তাঁর মনে প্রথম জন্ম নেয় কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) সফরের সময়। সেখানে ইউরোপীয় ও উসমানি জ্ঞান-প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠিত গবেষণা-পরিসর, প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্যচর্চা এবং জ্ঞান উৎপাদনের সুসংহত কাঠামো তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত সাধনার পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার বিকাশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, যেখানে গবেষণা, রচনা ও বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষিত ও বিকশিত হতে পারে। পরবর্তীকালে দারুল মুসান্নিফীন প্রতিষ্ঠা সেই উপলব্ধিরই বাস্তব রূপ হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে ১৯১০ সালের মার্চ মাসে নদওয়াতুল উলামার দিল্লি সম্মেলনে আল্লামা শিবলী নোমানি তাঁর এই পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি এমন একটি সুসংগঠিত গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন, যা ইসলামি জ্ঞানচর্চাকে কেবল ব্যক্তিগত অধ্যয়ন ও বিচ্ছিন্ন পাণ্ডিত্যচর্চার গণ্ডি থেকে বের করে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও ধারাবাহিক বৌদ্ধিক প্রকল্পে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হবে।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

এরপর ১৯১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ‘আল-হিলাল’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে এই পরিকল্পনাকে বৃহত্তর জনপরিসরে পরিচিত করে তোলেন। এর ফলে তাঁর চিন্তা শুধু শিক্ষিত অভিজাত মহলের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ক্রমশ সাধারণ শিক্ষিত সমাজের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। বলা যায়, এই লেখাটিই পরবর্তীকালে দারুল মুসান্নিফীন প্রতিষ্ঠার পক্ষে একটি বৌদ্ধিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

লখনউতে একাডেমিটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর আল্লামা শিবলী নোমানি শেষ পর্যন্ত আজমগড়ে, নিজের পরিচিত পরিবেশে, একটি আমবাগান এবং দুটি কাঁচা ঘরকে কেন্দ্র করে এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও অনাড়ম্বর সূচনা; কিন্তু ইতিহাসে বহু বড় বৌদ্ধিক উদ্যোগের মতোই এর শক্তি নিহিত ছিল ধারণা, দূরদর্শিতা এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর অঙ্গীকারে। পরবর্তীকালে এই বিনম্র সূচনাই উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা-প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।

পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব আর্থিক ভিত্তি গড়ে তোলার পূর্ব পর্যন্ত হায়দ্রাবাদ রাজ্য থেকে আল্লামা শিবলী নোমানি যে মাসিক ৩০০ রুপি অনুদান পেতেন, সেটিই একাডেমির পরিচালন ব্যয়ের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হবে। প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে এই অর্থনৈতিক সহায়তাই নবগঠিত প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল।

একাডেমির বিকাশে শিবলী পরিবারের অবদানও ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়রা সংলগ্ন ভূমি দান করেন, যার মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩,১৭২.৬৭ বর্গমিটার। এই জমির একটি অংশে প্রায় ৩,৬৫৬ বর্গমিটার এলাকায় পরবর্তীকালে একাডেমির স্থায়ী অবকাঠামো নির্মিত হয়। সময়ের প্রবাহে প্রতিষ্ঠানটির পরিসর আরও সম্প্রসারিত হয় এবং একাডেমি প্রাঙ্গণে ৪৩৬.২৬ বর্গমিটার আয়তনের একটি দোতলা সম্মেলন হল নির্মিত হয়। তৎকালীন রাজ্যসভার সদস্য শাবানা আজমির সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্প প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

তবে দীর্ঘ ইতিহাস ও বৌদ্ধিক মর্যাদা সত্ত্বেও দারুল মুসান্নিফীনের আর্থিক ভিত্তি কখনোই খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। আজও প্রতিষ্ঠানটি সীমিত সম্পদ ও স্বল্প আয়ের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হচ্ছে। এর আর্থিক উৎস প্রধানত ব্যক্তি-অনুদাননির্ভর, যদিও বিভিন্ন সময়ে সরকারি সহায়তাও লাভ করেছে। এক পর্যায়ে ভারত সরকার থেকেও একাডেমিটি আর্থিক অনুদান পেয়েছিল, যা এর কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

প্রকৃতপক্ষে, প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানকে নানাবিধ আর্থিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যে বিষয়টি একাডেমিকে টিকিয়ে রেখেছিল, তা হলো এর প্রতিষ্ঠাতার সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর রেখে যাওয়া বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার।

আল্লামা শিবলী নোমানি তাঁর জীবদ্দশাতেই একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিলেন এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় জমিও দান করে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, তিনি তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করে যেতে পারেননি। ১৯১৪ সালের ১৮ নভেম্বর তাঁর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের মুসলিম বৌদ্ধিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তবে তাঁর স্বপ্ন সেখানে থেমে যায়নি। বরং তাঁর শিষ্য, সহকর্মী ও অনুরাগীরা সেই স্বপ্নকে নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তা একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। পরবর্তীকালে দারুল মুসান্নিফীনের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ ছিল মূলত সেই বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারেরই বাস্তব প্রকাশ।

আল্লামা শিবলী নোমানির ইন্তেকালের মাত্র তিন দিন পর, অর্থাৎ ১৯১৪ সালের ২১ নভেম্বর, তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ শিষ্য ও সহচর মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহী রহ., মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি রহ., মাওলানা আবদুস সালাম নদবি রহ., মাওলানা মাসউদ আলী নদবি রহ. এবং মাওলানা শিবলী মুতাকাল্লিম নদবি রহ. আজমগড়ে তাঁর বাসভবনে সমবেত হন। শোকের সেই পরিবেশেই তাঁরা তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে “ইখওয়ানুস সাফা” নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

সংগঠনটির নাম নির্বাচনও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এটি নেওয়া হয়েছিল আব্বাসীয় যুগের বিখ্যাত বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন “ইখওয়ানুস সাফা”-এর নাম থেকে, যারা ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞান, দর্শন ও গবেষণার এক উজ্জ্বল ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। নামের এই নির্বাচন থেকেই নবগঠিত সংগঠনের বৌদ্ধিক অভিমুখ ও লক্ষ্য সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

পরবর্তীকালে এই “ইখওয়ানুস সাফা”ই দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমির সাংগঠনিক ও বৌদ্ধিক ভিত্তিতে পরিণত হয়। নবপ্রতিষ্ঠিত উদ্যোগটির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহী রহ. এবং প্রথম সম্পাদক (সেক্রেটারি) হন মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি রহ.। তাঁদের নেতৃত্বেই শিবলী নোমানির ব্যক্তিগত স্বপ্ন ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের রূপ নিতে শুরু করে।

উল্লেখযোগ্য যে, একই বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্সের অধিবেশনেও এই উদ্যোগ বিশেষ প্রশংসা লাভ করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠালগ্নেই দারুল মুসান্নিফীন উপমহাদেশের মুসলিম শিক্ষিত সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এবং একটি সম্ভাবনাময় বৌদ্ধিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে।

বস্তুত, দারুল মুসান্নিফীনের প্রতিষ্ঠা ছিল উপমহাদেশে ইসলামি জ্ঞানচর্চাকে ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্য ও বিচ্ছিন্ন সাধনার পরিসর থেকে সংগঠিত গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান উৎপাদনের স্তরে উন্নীত করার এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ। আল্লামা শিবলী নোমানির ইন্তেকালের পর তাঁর শিষ্যদের আন্তরিক প্রচেষ্টা এ সত্যই প্রমাণ করে যে, যুগান্তকারী চিন্তাবিদেরা কেবল গ্রন্থের উত্তরাধিকার রেখে যান না; তাঁরা এমন প্রতিষ্ঠানও নির্মাণ করে যান, যা তাঁদের চিন্তা, আদর্শ ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্যকে দীর্ঘকাল জীবিত রাখে।

১৯১৫ সালের ২৫ মে অনুষ্ঠিত ইখওয়ানুস সাফার প্রথম বার্ষিক সভা ছিল এই অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই সভায় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও সমাজনেতাদের সংগঠনের সদস্যপদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে ইখওয়ানুস সাফা কেবল শিবলীর ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের একটি উদ্যোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ক্রমশ বৃহত্তর মুসলিম মননজগতের প্রতিনিধিত্বশীল এক মঞ্চে পরিণত হতে শুরু করে।

নতুন সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আল্লামা শিবলী নোমানির পুত্র হামিদ হাসান নোমানি, মাওলানা হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানি, নওয়াব সৈয়দ আলী হাসান খান, অধ্যাপক আবদুল কাদির, কবি-দার্শনিক ড. মুহাম্মদ ইকবাল, নওয়াব ইমাদুল মুলক, মৌলবি সৈয়দ হুসাইন বিলগ্রামী, মাওলানা আবদুল্লাহ এমাদি, মাওলানা সৈয়দ কারামাত হুসাইন এবং মাওলানা আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদীর মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।

তাঁদের অন্তর্ভুক্তির ফলে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও ধর্মীয় চিন্তার বিভিন্ন ধারা একটি অভিন্ন লক্ষ্যে এসে মিলিত হয়। এর মাধ্যমে এমন একটি জ্ঞানচর্চার পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে, যেখানে মতের বৈচিত্র্য ও পাণ্ডিত্যের সমন্বয় এক নতুন সৃজনশীল শক্তির জন্ম দেয়।

ফলত, দারুল মুসান্নিফীনের কর্মকাণ্ড নতুন গতি ও ব্যাপ্তি লাভ করে। গবেষণা, রচনা এবং বৌদ্ধিক সাধনার যে যাত্রা একটি ছোট পরিসরে শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী গবেষণা-প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ভিত্তি নির্মাণ করে।

১৯১৫ সালের ২১ জুলাই ইখওয়ানুস সাফা আনুষ্ঠানিকভাবে দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমিকে একটি নিবন্ধিত সমিতি (Registered Society) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। প্রতিষ্ঠাকালেই এর গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছিল যে, এটি হবে একটি সম্পূর্ণ সাহিত্যিক ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, যার মূল উদ্দেশ্য হবে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, গ্রন্থপ্রণয়ন এবং মুসলিম বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও বিকাশ।

পরবর্তী দশকগুলোতে একাডেমিটির পরিচালনা ও পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে উপমহাদেশের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব যুক্ত হন। তাঁদের মধ্যে ভারতের দুই সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. জাকির হুসাইন এবং ফখরুদ্দীন আলী আহমদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁরা উভয়েই একাডেমির ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি কেবল আলেম, গবেষক ও সাহিত্যিকদের পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও রাষ্ট্রনায়কদের কাছেও একটি মর্যাদাপূর্ণ বৌদ্ধিক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি লাভ করে।

এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে একাডেমির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ভারতের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি। পরিচালক হিসেবে রয়েছেন ড. জাফরুল ইসলাম খান এবং উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. ফখরুল ইসলাম ইসলাহী। তাঁদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি তার শতবর্ষব্যাপী জ্ঞানচর্চার উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে এবং গবেষণা, প্রকাশনা ও বৌদ্ধিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উপমহাদেশের ইসলামি চিন্তার জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে।

দুই.

আল্লামা শিবলী নোমানির চিন্তায় ‘দারুল মুসান্নিফীন’ ছিল মুসলিম সমাজের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং জ্ঞানভিত্তিক আত্মনির্মাণের এক সুদূরপ্রসারী প্রকল্প। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানকেন্দ্র গড়ে তোলা, যা একদিকে ইসলামি ঐতিহ্য ও জ্ঞানচর্চার সেবা করবে, অন্যদিকে মুসলিম সমাজকে সমকালীন বৈশ্বিক জ্ঞানপরিসরের সঙ্গে সৃজনশীল ও সক্রিয় সংলাপে যুক্ত করবে।

একাডেমির অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল এমন একদল গবেষক ও মনীষী তৈরি করা, যারা সংগঠিত গবেষণা, রচনা ও জ্ঞান-উৎপাদনের মাধ্যমে ইসলামি বৌদ্ধিক ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে প্রণালীবদ্ধভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবেন। শিবলীর দৃষ্টিতে জ্ঞানচর্চা ছিল ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি মৌলিক বৌদ্ধিক উপকরণ, কেবল অতীত সংরক্ষণের মাধ্যম নয়।

তিনি বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে উনিশ ও বিশ শতকে প্রাচ্যবাদী (Orientalist) গবেষণা ইসলামি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে নানাবিধ প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখোমুখি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে একাডেমির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল প্রাচ্যবাদী ব্যাখ্যা ও সমালোচনার বিপরীতে গবেষণানির্ভর, যুক্তিনিষ্ঠ এবং একাডেমিকভাবে গ্রহণযোগ্য জবাব নির্মাণ করা। অর্থাৎ এটি ছিল এক ধরনের বৌদ্ধিক আত্ম-অবস্থান নির্মাণের (intellectual self-articulation) প্রকল্প, যা প্রমাণ ও বিশ্লেষণভিত্তিক জ্ঞানচর্চার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

একই সঙ্গে শিবলী নোমানি মনে করতেন, মুসলিম সমাজের জন্য পাশ্চাত্যের আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া অপরিহার্য। এই কারণে একাডেমির আরেকটি লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা জ্ঞানধারার গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ সম্পর্কে মুসলমানদের সচেতন করা এবং তাদের মধ্যে সমকালীন জ্ঞানবোধ ও গবেষণামুখী মানসিকতার বিকাশ ঘটানো।

এ ছাড়া তিনি ইসলামি চিন্তাকে এমন ভাষা ও পদ্ধতিতে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন, যা আধুনিক শিক্ষিত সমাজের কাছে অধিকতর বোধগম্য ও গ্রহণযোগ্য হয়। তাঁর দৃষ্টিতে কুরআনের ব্যাখ্যা ও অনুধাবনও হওয়া উচিত যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্নাবলির আলোকে। ফলে কুরআনচর্চাকে আধুনিক যুক্তিবোধ ও প্রমাণনির্ভর আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টাও একাডেমির বৌদ্ধিক লক্ষ্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং বৈজ্ঞানিক মনন গড়ে তোলাও তাঁর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। তিনি মনে করতেন, ধর্মীয় জ্ঞান ও আধুনিক বিজ্ঞানকে পরস্পর-বিরোধী হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাদের মধ্যে একটি সৃজনশীল ও পরিপূরক সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তিনি ভারতীয় সমাজের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর দৃষ্টিতে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সৌহার্দ্য, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সহাবস্থানের সংস্কৃতি বিকাশ করা সামাজিক প্রয়োজন তো বটেই, সেইসঙ্গে একটি বৌদ্ধিক ও নৈতিক দায়িত্বও। এ কারণে একাডেমির লক্ষ্যসমূহের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের চেতনা বিকাশকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তাঁর কাছে জ্ঞানচর্চা ছিল সমাজ নির্মাণ, সভ্যতা গঠন এবং ভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।

তিন.

দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমির প্রথম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা ছিল আল্লামা শিবলী নোমানির কালজয়ী গ্রন্থ “সিরাতুন নবী”। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন ও কর্মকে কেন্দ্র করে রচিত এই মহাগ্রন্থটি দীর্ঘদিন ধরে উপমহাদেশে নবীজীর জীবনী বিষয়ক সর্বাধিক বিস্তৃত, প্রামাণ্য ও গবেষণানির্ভর রচনা হিসেবে স্বীকৃত। ইসলামি ইতিহাস, হাদিস, সিরাত ও সভ্যতার উপাদানসমূহকে সমন্বিত করে এই গ্রন্থ সিরাত-সাহিত্যে একটি নতুন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে।

প্রকাশের পরপরই গ্রন্থটি উপমহাদেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া জাগায়। শুধু ভারতবর্ষেই নয়, এর প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম প্রকাশের মাত্র দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার কপি বিক্রি হওয়া সে সময়ের প্রকাশনা-বাস্তবতায় একটি ব্যতিক্রমী ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি স্পষ্ট করে যে, মুসলিম সমাজের মধ্যে গবেষণানির্ভর ও উচ্চমানের সিরাত-সাহিত্যের প্রতি একটি গভীর ও বিস্তৃত আগ্রহ বিদ্যমান ছিল।

পরবর্তীকালে একাডেমি ধারাবাহিকভাবে ইসলামি ইতিহাস, জীবনীসাহিত্য ও সভ্যতা-গবেষণার ক্ষেত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ করে। এসব রচনা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মূল্যবান জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হয়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে

“সিরাতে আয়েশা” — উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর জীবন ও অবদান বিষয়ক গবেষণা

“সিরাতে উমর ইবন আবদুল আজিজ” — খোলাফায়ে রাশেদার আদর্শের উত্তরসূরি উমাইয়া খলিফা উমর ইবন আবদুল আজিজ (রহ.)-এর জীবনী

“আরদুল কুরআন” — কুরআনে বর্ণিত ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক অঞ্চলসমূহ নিয়ে গবেষণা

“সিয়ারুস সাহাবাহ” — সাহাবায়ে কেরামের জীবন, কর্ম ও অবদান বিষয়ক রচনা

“শি’রুল আজম” — ফারসি সাহিত্য ও কাব্য-ঐতিহ্য নিয়ে শিবলীর গবেষণাধর্মী কাজ

“রুকাআতে আলমগীরি” — মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের পত্রাবলি

“তারিখে ইসলাম” — ইসলামি ইতিহাস বিষয়ে গবেষণাধর্মী রচনা

সময়ের প্রবাহে দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমি একটি সুসংগঠিত গবেষণা ও প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ইসলাম, মুসলিম সভ্যতা, ইতিহাস, জীবনী, সাহিত্য এবং ইন্দো-মুসলিম বৌদ্ধিক ঐতিহ্য বিষয়ক দুই শতাধিকেরও বেশি (প্রায় ২৫৭টির অধিক) গ্রন্থ প্রকাশ করেছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশই বহু খণ্ডে বিস্তৃত বৃহৎ গবেষণা-প্রকল্প।

চার.

প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই মাওলানা মাসউদ আলী নদবির তত্ত্বাবধানে একাডেমির জন্য একটি কেন্দ্রীয় ভবন এবং কর্মীদের আবাসনের উদ্দেশ্যে কয়েকটি আবাসিক কোয়ার্টার নির্মিত হয়। এর ফলে দারুল মুসান্নিফীন ধীরে ধীরে একটি ধারণাগত উদ্যোগ থেকে একটি সুসংগঠিত ও স্থায়ী গবেষণা-প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে শুরু করে।

ক্রমবর্ধমান গবেষণা ও প্রকাশনার চাহিদা এবং জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একাডেমিকে সাতটি পৃথক বিভাগে বিন্যস্ত করা হয়। এগুলো ছিল
১. সিরাতুন নবী বিভাগ — রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন, যুগ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি নিয়ে গবেষণা ও রচনা
২. গবেষণা বিভাগ — ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব ও সভ্যতা-সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম
৩. প্রকাশনা বিভাগ — গবেষণালব্ধ গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপির সম্পাদনা ও প্রকাশনা কার্যক্রম
৪. মাসিক “মাআরিফ” বিভাগ — একাডেমির সাময়িকী মাআরিফ সম্পাদনা ও প্রকাশনা
৫. গ্রন্থাগার বিভাগ — পাণ্ডুলিপি ও দুর্লভ গ্রন্থ সংরক্ষণ এবং গবেষকদের সেবা প্রদান
৬. ভবন ও অবকাঠামো বিভাগ — প্রশাসনিক স্থাপনা ও অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনা
৭. মুদ্রণ বিভাগ (Printing Press) — বই ও সাময়িকী মুদ্রণের জন্য নিজস্ব ছাপাখানা পরিচালনা

এই কাঠামোর ফলে দারুল মুসান্নিফীন একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্ঞান-প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। গবেষণা, তথ্যসংগ্রহ, পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা, পাঠ-সমালোচনা (textual collation), সংকলন এবং মুদ্রণ, জ্ঞান-উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াই একই প্রাঙ্গণে সমন্বিতভাবে সম্পন্ন হতো।

প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রন্থাগারের পরিসর ছিল সীমিত। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এটি একটি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় সংগ্রহশালায় পরিণত হয়। বিশেষভাবে মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদবির যুক্তরাজ্য সফর গ্রন্থাগারের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও গবেষণা-নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একাডেমি বহু নতুন গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের সুযোগ লাভ করে।

ক্রমে উপমহাদেশ ও বহির্বিশ্বের বিভিন্ন গবেষক, লেখক ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাঁদের প্রকাশিত গ্রন্থের সৌজন্য কপি পর্যালোচনা ও সংরক্ষণের জন্য একাডেমিতে পাঠাতে শুরু করেন। এর ফলে গ্রন্থাগারটি বইয়ের সংগ্রহশালা থেকে সমকালীন বৌদ্ধিক বিনিময়ের একটি সক্রিয় কেন্দ্রে পরিণত হয়।

প্রতিষ্ঠানের প্রারম্ভিক সংগ্রহে থাকা দুর্লভ পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মুনিসুল আরওয়াহ, আনিসুল আরওয়াহ, আকবরনামা, ফরহাঙ্গে জাহাঙ্গিরী, সির্‌রে আকবর, কাসাসুল আজায়িব, রওযায়ে তাজমহল, শরহে নাহজুল বালাগাহ, তাফসিরে আহমদিয়া, কিতাবুল মীযান এবং নিজামুল গরীব।

এসব পাণ্ডুলিপি ইসলামের ইতিহাস, ফারসি সাহিত্য, মুঘল ইতিহাস, তাফসির, ভাষাতত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিক চিন্তার বহুমাত্রিক ধারার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমানে দারুল মুসান্নিফীনের গ্রন্থাগার উপমহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ গবেষণা-গ্রন্থাগারে পরিণত হয়েছে। এখানে এক লক্ষেরও বেশি গ্রন্থ এবং প্রায় ৬৫০টি দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে এটি মুসলিম বৌদ্ধিক ঐতিহ্য, ইন্দো-ইসলামিক ইতিহাস এবং দক্ষিণ এশিয়ার জ্ঞান-সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণাগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। গবেষক, ইতিহাসবিদ ও উচ্চতর শিক্ষার্থীদের জন্য এটি আজও একটি অপরিহার্য জ্ঞানকেন্দ্র।

পাঁচ.

১৯৮২ সালে দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমির তৎকালীন সেক্রেটারি সাইয়িদ সাবাহুদ্দীন আবদুর রহমানের উদ্যোগে “ইসলাম ও প্রাচ্যবাদী গবেষণা” শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সে সময় ইসলামি ইতিহাস, সভ্যতা ও জ্ঞানচর্চা বিষয়ে প্রাচ্যবাদী (Orientalist) গবেষণার প্রভাব বিশ্বব্যাপী বৌদ্ধিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছিল। এই প্রেক্ষাপটে আয়োজিত সেমিনারটি ইসলামি অধ্যয়ন ও প্রাচ্যবাদ-সমালোচনার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক গবেষক ও চিন্তাবিদদের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বৌদ্ধিক সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করে।

পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে, তৎকালীন পরিচালক মাওলানা জিয়াউদ্দীন ইসলাহীর নেতৃত্বে এবং আলমী রাবেতায়ে আদব আল-ইসলামির সহযোগিতায় “জীবনীসাহিত্য ও জীবনচরিত রচনা” বিষয়ক আরেকটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামি সভ্যতা ও উপমহাদেশীয় জ্ঞান-ঐতিহ্যে জীবনীসাহিত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিষ্ঠিত ধারা হিসেবে বিবেচিত। এই সেমিনারে জীবনী-রচনার পদ্ধতি, ইতিহাসচেতনা, চরিত্র বিশ্লেষণ, দলিলনির্ভরতা এবং সাহিত্যিক উপস্থাপনার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।

উভয় সেমিনারেই দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট গবেষক, লেখক ও শিক্ষাবিদগণ অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁদের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। পরবর্তীকালে এসব প্রবন্ধ একাডেমি কর্তৃক গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এর ফলে সেমিনারগুলো সাময়িক একাডেমিক আয়োজনের সীমা অতিক্রম করে স্থায়ী গবেষণা-সম্পদে পরিণত হয়, যা ইসলামি অধ্যয়ন, প্রাচ্যবাদ-সমালোচনা এবং জীবনীসাহিত্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

ছয়.

দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমি উপমহাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি এমন এক মর্যাদা অর্জন করে, যেখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারকেরা নিয়মিতভাবে যাতায়াত করতেন এবং একাডেমির বৌদ্ধিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন।

১৯২১ সালের ১ মার্চ আল্লামা শিবলীর শিষ্য এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর একাডেমি পরিদর্শন করেন। পরের বছর, ১৯২২ সালের জুনে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য একাডেমিতে আগমন করেন। তাঁর এই সফরের সময় তৎকালীন উর্দু–হিন্দি ভাষা বিতর্ক নিয়েও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যা সে সময়ের ভারতীয় জনপরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে বিবেচিত ছিল।

পরবর্তী দশকগুলোতে একাডেমিটি উপমহাদেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততায় সমৃদ্ধ হয়। তাঁদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, মতিলাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, ইন্দিরা গান্ধী, রাম মনোহর লোহিয়া, হাসরত মোহানী, সুচেতা কৃপালিনী, চৌধুরী চরণ সিং, স্যার তেজ বাহাদুর সাপরু, ড. জাকির হুসাইন, ফখরুদ্দীন আলী আহমদ, হুমায়ুন কবীর, সরোজিনী নাইডু, ভি. ভি. গিরি, ভি. পি. সিং, এবং নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক আবদুস সালামসহ বহু দেশি-বিদেশি মনীষীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এদের উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততা একাডেমির বৌদ্ধিক মর্যাদাকে আরও বিস্তৃত ও সুদৃঢ় করে।

এই বিস্তৃত অংশগ্রহণ থেকেই স্পষ্ট হয় যে, দারুল মুসান্নিফীন উপমহাদেশীয় মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিকতার একটি প্রতীকী কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়, যেখানে রাজনীতি, সাহিত্য, শিক্ষা, ইতিহাস ও সভ্যতা-চিন্তার বিভিন্ন ধারা একত্রে মিলিত হয়েছে।

একাডেমির প্রতি শুভেচ্ছা ও সমর্থনের অংশ হিসেবে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, প্রথম যোগাযোগমন্ত্রী রফি আহমদ কিদওয়াই এবং ভোপালের নওয়াব হামিদুল্লাহ খানসহ আরও অনেকে একাডেমির আজীবন সদস্য হন।

বিশেষভাবে জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে একাডেমির সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক। উত্তর ভারতের সফরকালে তিনি একাধিকবার একাডেমিতে অবস্থান করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি একাডেমির বৌদ্ধিক মর্যাদা ও প্রভাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। সময়ের প্রবাহে দারুল মুসান্নিফীন ধর্মীয় ও সাহিত্যিক পরিসর অতিক্রম করে ভারতীয় বৌদ্ধিক ইতিহাসের বৃহত্তর প্রবাহে একটি স্থায়ী অবস্থান তৈরি করে।

সাত.

অল্প সময়ের মধ্যেই দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমি নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। এটি স্থানীয় গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের সীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক পরিসরেও পরিচিতি অর্জন করে। মিসর, সিরিয়া, মরক্কো, ফ্রান্স ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের গবেষক ও বিদ্বান ব্যক্তিরা তাঁদের গবেষণার প্রয়োজনে একাডেমির সহায়তা গ্রহণ করতে শুরু করেন।

এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় বরোদার মহারাজা গায়কওয়াড়ের উদ্যোগে। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব (Comparative Study of Religions) বিষয়ে একটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার সময় তিনি দিকনির্দেশনা ও পরামর্শের জন্য একাডেমির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এটি একাডেমির তাত্ত্বিক সক্ষমতা ও গবেষণাগত প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

একাডেমির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার একটি প্রতীকী অভিব্যক্তি পাওয়া যায় মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বক্তব্যে। তাঁকে যখন এই প্রতিষ্ঠানের অনারারি ফেলো হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন— “আমি এই প্রতিষ্ঠানের জন্য কুলি হিসেবেও কাজ করতে আগ্রহী।” এই বক্তব্য একাডেমির প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও একে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

একাডেমির প্রাথমিক সাফল্য সম্পর্কে নওয়াব ইমাদুল মুলক মৌলবি সৈয়দ হুসাইন বিলগ্রামী, সাইয়িদ সুলাইমান নদবিকে লেখা এক পত্রে মন্তব্য করেন “দারুল মুসান্নিফীন কোনো সার্টিফিকেটের মুখাপেক্ষী নয়। এটি এমন একটি কাজ সম্পাদন করছে, যা এ পর্যন্ত ভারতে কখনোই সম্পাদিত হয়নি।”

২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে একাডেমির শতবর্ষ উপলক্ষে ভারতের সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (Press Information Bureau) একাডেমি সম্পর্কে একটি মূল্যায়ন প্রকাশ করে। সেখানে একে ভারতের প্রাচীন জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা একটি আধুনিক গবেষণা-প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আজমগড়ের পুরনো অংশে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি আধুনিক গবেষণা-সংস্থার কাতারে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। এর ক্ষুদ্র কিন্তু নিবেদিতপ্রাণ গবেষকগোষ্ঠী জ্ঞানচর্চাকে কেবল পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের জীবন-নির্বাচন হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই আত্মনিবেদিত বৌদ্ধিক চর্চা অনেকাংশে প্রাচীন ভারতের নালন্দা ও তক্ষশীলার মতো জ্ঞানকেন্দ্র, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কায়রো ও মধ্য এশিয়ার ট্রান্সঅক্সিয়ানা (মাওয়ারাউন্নাহার) অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গবেষণা-সংস্কৃতির স্মৃতিকে নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।

আট.

দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমির মাসিক সাহিত্য ও গবেষণাধর্মী পত্রিকা “মাআরিফ” ১৯১৬ সালের জুলাই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে। এই সাময়িকী ইসলামি ও পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উপমহাদেশীয় গবেষণা-পরিসরে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে।

শুরু থেকেই “মাআরিফ” ভারতীয় ও ইসলামি ইতিহাস, শিল্প-সংস্কৃতি, কুরআনিক স্টাডিজ, সাহিত্য, শিক্ষা, বই-সমালোচনা এবং গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে একটি নির্ভরযোগ্য গবেষণা-ফোরাম হিসেবে নিজস্ব অবস্থান গড়ে তোলে। এর বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য এবং গবেষণার মান এটিকে একটি ধারাবাহিক বৌদ্ধিক সংলাপের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই পত্রিকার সম্পাদকীয় দায়িত্বে বিভিন্ন সময়ে উপমহাদেশের খ্যাতিমান আলেম ও গবেষকগণ যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি, মাওলানা শাহ মুইনুদ্দিন আহমাদ নদবি, সাইয়িদ সাবাহুদ্দীন আবদুর রহমান, মাওলানা জিয়াউদ্দিন ইসলাহী এবং ইশতিয়াক আহমদ জিল্লিসহ আরও অনেকে।

বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট গবেষক ড. জাফরুল ইসলাম খান।

নয়.

যদিও দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরাসরি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, তবুও এর বৌদ্ধিক পরিমণ্ডল থেকে একাধিক চিন্তাবিদ ও লেখক উপমহাদেশের জাতীয় আন্দোলনের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটি একদিকে গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠলেও, অন্যদিকে উপনিবেশিক যুগের বৌদ্ধিক-রাজনৈতিক প্রবাহের একটি পরোক্ষ অংশীদার হিসেবেও ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তার সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পটভূমিতে এই প্রতিষ্ঠানের একটি পরোক্ষ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল।

স্যার সৈয়দ আহমদ খান এবং আল্লামা শিবলী নোমানির পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করে, যেখানে কিছু মুসলিম বুদ্ধিজীবী দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমিকে একটি সম্ভাব্য বৌদ্ধিক ও নৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন। তবে এই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব কার্যক্রমের একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। একাডেমির নেতৃত্বে থাকা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি মূলত একজন গবেষক ও সাহিত্যিক ছিলেন; তাঁর বৌদ্ধিক ক্ষেত্র ইতিহাস, ধর্ম ও সাহিত্যচর্চায় সীমাবদ্ধ ছিল এবং তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না।

একাডেমির সাংগঠনিক কাঠামো ও বিধিমালা এটিকে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখত। ফলে প্রতিষ্ঠানটি একটি বৌদ্ধিক কেন্দ্র হিসেবে যতটা সক্রিয় ছিল, রাজনৈতিক আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক অংশীদার হিসেবে ততটা ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে সাইয়িদ সুলাইমান নদবি তাঁর বৌদ্ধিক অবস্থান থেকে নৈতিক ও বৌদ্ধিক প্রশ্নে মত প্রকাশ করলেও সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।

অন্যদিকে একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মাওলানা মাসউদ আলী নদবি তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করতেন এবং মতিলাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো সমকালীন জাতীয় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় করতেন।

আরও একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন মাওলানা সৈয়দ রিয়াসত আলী। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে মিসরে অবস্থানকালে ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তনে বাধ্য হন। পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী নেতা মাওলানা আবদুর রাজ্জাক মালিহাবাদীর সান্নিধ্য তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে আরও প্রভাবিত করে এবং তিনি কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

একইভাবে অধ্যাপক সৈয়দ নাজীব আশরাফও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং জনসমাবেশে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করতেন।

দশ.

যিনি দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ধারাবাহিকভাবে একটি দায়িত্বশীল ও মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি হলেন সাইয়িদ সুলাইমান নদবি—শিবলী একাডেমির প্রথম সচিব। তাঁর কর্মজীবনের সূচনা ঘটে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রভাবশালী পত্রিকা “আল-হিলাল”-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে। এই সংযোগ তাঁকে সমকালীন মুসলিম বৌদ্ধিক জাগরণের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।

১৯১৩ সালে কানপুরে একটি মসজিদের অংশ ব্রিটিশ প্রশাসন ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় জনরোষ সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়। এই প্রেক্ষাপটে সাইয়িদ সুলাইমান নদবি “আল-হিলাল”-এ “মাশহাদে আকবর” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন রচনা করেন, যেখানে উপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় সহিংসতার একটি তীব্র নৈতিক ব্যাখ্যা উপস্থাপিত হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক চাপের মুখে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

১৯১৮ সালে তিনি মাওলানা মাসউদ আলী নদবির সঙ্গে চিন্দওয়ারা কারাগারে বন্দী বিপ্লবী নেতা মুহাম্মদ আলী জওহরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই সময়ে তিনি আজমগড় জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই পর্বে তিনি খিলাফত আন্দোলনের সূচনালগ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন হিসেবে যুক্ত হন। পাশাপাশি কৃষক আন্দোলনেও তিনি নৈতিক সমর্থন ও লেখনীর মাধ্যমে অংশগ্রহণ করেন, যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রধান বিষয় ছিল।

১৯২০ সালে তিনি খিলাফত প্রতিনিধি দলের একমাত্র আলেম প্রতিনিধি হিসেবে লন্ডন সফর করেন। সেখানে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জসহ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এই আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁকে মুসলিম বিশ্বে একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

পরবর্তী সময়ে তিনি খিলাফত কমিটি ও কংগ্রেসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর জীবনযাপনে ছিল সচেতন সরলতা, যা সে সময়ের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিমণ্ডলে একটি নৈতিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো।

১৯২১ সালে আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। মহাত্মা গান্ধী তাঁর সম্পর্কে ইতিবাচক অভিমত প্রকাশ করেন। তাঁর নেতৃত্বে আজমগড় অঞ্চলে অসহযোগ আন্দোলন একটি সংগঠিত রূপ লাভ করে এবং স্থানীয় পর্যায়ে খিলাফত কমিটি ও পঞ্চায়েত কাঠামোর বিস্তার ঘটে।

১৯২৬ সালে হিজাজ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি খিলাফত কমিটির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সৌদি আরব সফর করেন এবং বাদশা আবদুল আজিজ আল সৌদ ও প্রিন্স ফয়সালের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনায় অংশ নেন। এই আলোচনাগুলো মূলত হিজাজের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্য-সংক্রান্ত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়।

পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে হজ পালনের উদ্দেশ্যে পুনরায় হিজাজ সফরকালে তিনি সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের আতিথেয়তা লাভ করেন এবং তাঁর সঙ্গে একাধিক আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতে অংশগ্রহণ করেন।

এগারো.

দারুল মুসান্নিফীন শিবলী একাডেমি আজমগড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। সাইয়িদ সুলাইমান নদবির ভাষায় এটি ছিল “ইমামুল হিন্দ হযরত আল্লামা শিবলী নোমানি”-র চিন্তা ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন। এই অর্থে একাডেমিটি মুসলিম জ্ঞানচর্চা ও নবজাগরণের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে, যা আধুনিক যুগে মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

একই সঙ্গে এটি উপমহাদেশীয় মুসলিম জ্ঞানপরম্পরার একটি বিশেষ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষায় সুপণ্ডিত আলেমগণ আধুনিক জ্ঞান ও বিশ্বপরিসরের সঙ্গে সংলাপ স্থাপনের চেষ্টা করেন। এই ধারার মধ্য দিয়ে মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে এক ধরনের পুনর্গঠনমূলক চিন্তার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যা পরবর্তী সময়ে গবেষণা ও সংস্কারমুখী আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

লেখক : অনারারি ফেলো, দারুল মুসান্নিফীন শিবলি একাডেমি, আজমগড়, ভারত।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.