মুফতি সাদেকুর রহমান
এক.
পরকীয়া ব্যক্তির চারিত্রিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক জঘন্য প্রকাশ। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটি এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ধীরে ধীরে এটি মহামারীর রূপ ধারণ করছে। প্রযুক্তির বিস্তার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতার কারণে শহর, নগর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জ—সবখানেই এর প্রভাব দৃশ্যমান। এমনকি হীন স্বার্থ ও ভোগবাদী মানসিকতার প্রভাবে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশ থেকেও এ ধরনের সম্পর্ক আমদানি হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়—কেউ ব্রাজিল, কেউ লন্ডন কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিকের সঙ্গে অনলাইনে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে তুলছে। ফলে তারা বাংলাদেশে এসে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে।
দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের নৈতিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এ ধরনের ঘটনাকে ঘৃণার চোখে দেখার পরিবর্তে অনেকে তা আনন্দ ও আধুনিকতার নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যখন কোনো জাতির পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন তারা ধীরে ধীরে নিজেদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবোধ হারিয়ে ফেলে। একসময় তারা বিস্মৃত হয়ে যায় নিজেদের অতীত, মূল্যবোধ ও ইতিহাসের শিকড় সম্পর্কেও।
এই পরকীয়ার নির্মম শিকার হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা এবং পুরো পরিবারব্যবস্থা। পরকীয়ার বিষাক্ত ছোবলে একটি সুখী ও সুন্দর সংসার মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে কোনো সন্তান হারাচ্ছে তার প্রিয় মা বা বাবাকে, কোনো স্বামী হারাচ্ছে তার জীবনসঙ্গিনীকে, আবার কোনো মা হারাচ্ছে সন্তানকে ঘিরে গড়ে তোলা স্বপ্নময় পরিবার।
এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্র সকলেই। কিন্তু নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এর বিস্তার পুরোপুরি রোধ করা যাচ্ছে না। সমাজবিশ্লেষকদের মতে, এখনই যদি এ প্রবণতার লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে মুসলিম সমাজের পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য। তার জায়গায় পশ্চিমা ভোগবাদী আদর্শে গড়ে উঠবে এক নতুন সমাজব্যবস্থা, যেখানে পরিবার, সম্পর্ক ও নৈতিকতার ভিত্তি হবে অত্যন্ত দুর্বল। আর সেই পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা পশ্চিমা সমাজের বর্তমান পারিবারিক সংকটের দিকে তাকালেই সহজে অনুধাবন করা যায়।
পরকীয়া বলতে কী বোঝায়?
পরকীয়া হলো : বিবাহিত কোনো নারী বা পুরুষের স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত প্রেম, আবেগঘন সম্পর্ক বা অবৈধ ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়ে পড়া।
এটি বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। যেমন : সরাসরি সাক্ষাৎ, মোবাইল ফোনে অডিও-ভিডিও আলাপ, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গোপন চ্যাটিং বা বার্তা আদান-প্রদান, অতিরিক্ত আবেগীয় নির্ভরতা তৈরি করা কিংবা শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়ে পড়া।
অর্থাৎ বিবাহিত জীবনের বৈধ সম্পর্কের বাইরে অন্য কোনো নারী বা পুরুষের সঙ্গে প্রেম, আবেগ, অন্তরঙ্গতা বা যৌনসম্পর্ক স্থাপন করাই পরকীয়া।
পরকীয়ার কারণসমূহ
১. শারীরিক কারণ
পরকীয়ার পেছনে বিভিন্ন শারীরিক ও জৈবিক কারণও কাজ করে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য যেমন DRD4 জিনের কিছু ধরন কিছু মানুষের মধ্যে নতুন সম্পর্কের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রবণতা বাড়াতে পারে। যদিও এটি কোনোভাবেই পরকীয়ার বৈধতা দেয় না, তবে মানব আচরণ বিশ্লেষণে বিষয়টি আলোচিত হয়।
অনেক সময় বিয়ের অল্পদিন পরই স্বামী বা স্ত্রী জীবিকার প্রয়োজনে বিদেশে বা দূরবর্তী স্থানে চলে যান। দীর্ঘ সময় আলাদা থাকার কারণে অপূর্ণ শারীরিক চাহিদা ও মানসিক দূরত্ব থেকে অনেকেই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। চাকরি, পেশা বা অন্যান্য কারণে দীর্ঘদিন পৃথক বসবাসও একই ধরনের সংকট তৈরি করে।
কখনো স্ত্রীর গর্ভধারণ, দীর্ঘ অসুস্থতা বা স্বামী-স্ত্রীর কারো শারীরিক সমস্যার কারণে দাম্পত্য জীবনের স্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতায় ব্যাঘাত ঘটে। এই অপূর্ণতা ও অতৃপ্তি থেকেও কেউ কেউ ভুল পথে পা বাড়ায়।
এ ছাড়া যৌন অসামঞ্জস্য, পারস্পরিক অস্বস্তি কিংবা দাম্পত্য সম্পর্কে শারীরিক তৃপ্তির অভাবও পরকীয়ার একটি কারণ হতে পারে। কিছু মানুষের যৌন চাহিদা তুলনামূলক বেশি হয়, যা তার সঙ্গী সবসময় পূরণ করতে সক্ষম হন না। ফলে তারা বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে আকর্ষণ খুঁজতে শুরু করে।
আবার কিছু মানুষের বিকৃত মানসিক বা যৌন প্রবৃত্তির কারণেও দাম্পত্য সম্পর্কে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ে এবং কেউ কেউ পরকীয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
২. মানসিক কারণ
পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ার পেছনে মানসিক ও আবেগগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক মানুষ মানসিক অস্থিরতা, একাকিত্ব, অবহেলার বোধ কিংবা আবেগগত শূন্যতা থেকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কিছু মানসিক রোগ—যেমন বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার—আক্রান্ত ব্যক্তিদের আচরণে অস্থিরতা দেখা যায়; ফলে তারা কখনো কখনো একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারে।
আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের কাছে চারিত্রিক সৌন্দর্যের চেয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্যের মূল্য বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে স্বামী বা স্ত্রী নিজের জীবনসঙ্গীকে শারীরিকভাবে আকর্ষণীয় মনে না করলে অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তে পারে। আবার সন্তান জন্মের পর শারীরিক পরিবর্তনের কারণেও অনেক দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়, যা কখনো কখনো পরকীয়ার দিকে ধাবিত করে।
পরকীয়ার আরেকটি কারণ হলো—বিবাহিত ব্যক্তিদের প্রতি সমাজের সন্দেহ তুলনামূলক কম থাকা। অনেক সময় বিবাহিত নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে মানুষ সহজভাবে নেয়। এই সামাজিক শিথিলতাই কখনো কখনো অনৈতিক সম্পর্কের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন যে, দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার ফলে তারা পরস্পরের প্রায় সব দিক সম্পর্কে অবগত হয়ে যায়। ফলে সম্পর্কের শুরুতে যে নতুনত্ব, উষ্ণতা ও আকর্ষণ থাকে, সময়ের সঙ্গে তা কিছুটা কমে আসে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কেউ কেউ এই একঘেয়েমি কাটানোর ভুল প্রয়াসে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে।
সাংসারিক ও পেশাগত ব্যস্ততার কারণেও দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। অনেক স্বামী বা স্ত্রী মনে করেন, তাদের জীবনসঙ্গী আর আগের মতো সময় দেয় না, প্রশংসা করে না, ভালোবাসা বা যত্ন প্রকাশ করে না। এই আবেগগত শূন্যতার সুযোগে অন্য কেউ সহানুভূতি বা মনোযোগ দেখালে তার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হতে পারে।
কিছু মানুষের মধ্যে এমন মানসিকতাও দেখা যায় যে, বিবাহিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে অন্য কারও সঙ্গে আবেগগত বা শারীরিক সম্পর্ক রাখা যাবে না। এই বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও পরকীয়া জন্ম নেয়। ইতিহাসে ক্ষমতা, ভোগবাদ ও অসংযমের কারণে বহু মানুষ এ ধরনের সম্পর্কে জড়িয়েছে।
আবার কেউ কেউ একাধিক সম্পর্ককে নিজের যোগ্যতা বা আধুনিকতার পরিচায়ক মনে করে। কৌতূহল, অবাধ ভোগের মানসিকতা কিংবা আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা থেকেও অনেকে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়। ডিভোর্সের পর নতুনভাবে সংসার শুরু না করে কেবল মানসিক বা শারীরিক চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যেও কেউ কেউ এ ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
দাম্পত্য জীবনের নানা সমস্যা যেমন মতবিরোধ, মানসিক কষ্ট, অবহেলা কিংবা পারিবারিক দ্বন্দ্ব—অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করতে করতে কখনো আবেগগত নির্ভরতা তৈরি হয়। এই নির্ভরতাই একসময় পরকীয়ার রূপ নিতে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করা, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা বা পেশাগত ঘনিষ্ঠতা থেকেও সম্পর্কের গভীরতা তৈরি হয়, যা নিয়ন্ত্রণহীন হলে পরকীয়ায় রূপ নিতে পারে।
কখনো কখনো অতীতের প্রেম ভুলতে না পারার কারণেও বিবাহের পর মানুষ প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে পুনরায় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
৩. আর্থিক কারণ
অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক স্বার্থ, ভোগবিলাসের আকাঙ্ক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাও পরকীয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেখা যায়, কোনো প্রবাসীর স্ত্রীকে কেন্দ্র করে পরকীয়ার ঘটনা ঘটে; এর পেছনে অনেক সময় প্রবাসী স্বামীর পাঠানো অর্থে স্বচ্ছন্দ জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। আবার কখনো আর্থিকভাবে সচ্ছল কোনো ব্যক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কেউ নিজের বৈবাহিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করতেও দ্বিধা করে না।
তদ্রূপ, তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারীদের কেউ কেউ মানসিক নিঃসঙ্গতা, শারীরিক চাহিদা কিংবা আর্থিক নিরাপত্তার অভাবের কারণে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। কখনো দরিদ্র পরিবারের সুন্দরী নারীরা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় বিবাহিত ধনী পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
তবে এ বিষয়টি মনে রাখা জরুরি যে, দারিদ্র্য বা আর্থিক সংকট নিজে মানুষকে অনৈতিক করে তোলে না; বরং নৈতিক দুর্বলতা, আত্মসংযমের অভাব এবং পারিবারিক-সামাজিক অবক্ষয়ই মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে।
৪. সামাজিক কারণ
সমাজের মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও নৈতিক পরিবেশ মানুষের আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। যেসব সমাজে অবাধ যৌনতা, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ‘লিভ টুগেদার’ কিংবা অনৈতিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক বা ব্যক্তিস্বাধীনতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, সেসব সমাজে পরকীয়ার প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। মিডিয়া, বিনোদনজগৎ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন এসব বিষয়কে আকর্ষণীয় বা আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়, তখন অনেক মানুষ ধীরে ধীরে এর প্রতি মানসিকভাবে সহনশীল হয়ে ওঠে।
পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, সামাজিক দায়বদ্ধতার অবক্ষয় এবং লজ্জাবোধের সংকটও পরকীয়ার বিস্তারে ভূমিকা রাখে। যখন সমাজে বৈবাহিক সম্পর্কের পবিত্রতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের চর্চা কমে যায়, তখন মানুষ ব্যক্তিগত ভোগ ও ক্ষণিকের আবেগকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে। এর ফলে পরিবার ভাঙন, সন্তানদের মানসিক বিপর্যয় এবং সামাজিক অস্থিরতা ক্রমেই বাড়তে থাকে।
ভারতে পরকীয়ার বিস্তার ব্যাপক। গুজরাটের ডিরেক্টরেট অফ ফরেনসিক সায়েন্সেস (DFS)-এর একটি পুরোনো পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আদালত ও পুলিশের মাধ্যমে রেফার করা কিছু নির্দিষ্ট ডিএনএ (DNA) টেস্টের ক্ষেত্রে ৯৮% বা ৯০% পর্যন্ত পিতৃত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ার খবর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এটি গুজরাটের সামগ্রিক মাতৃত্ব বা পরকীয়ার পরিসংখ্যান নয়।
৫. প্রযুক্তিগত কারণ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, যোগাযোগ রাখা এবং সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে। এই সহজলভ্যতা অনেক ক্ষেত্রে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার পথও প্রশস্ত করছে।
অন্যদিকে, গণমাধ্যম ও অনলাইন কনটেন্টে সম্পর্ক-সংক্রান্ত অতিরঞ্জিত বা স্বাভাবিকীকৃত উপস্থাপনাও মানুষের মানসিকতায় প্রভাব ফেলছে। বারবার এমন বিষয় দেখার ফলে অনেকেই পরকীয়াকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য আচরণ হিসেবে ভাবতে শুরু করছে, যা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে।
ফলে প্রযুক্তির এই দিকগুলোর পাশাপাশি এর অপব্যবহারও পরকীয়ার বিস্তারে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে।
ইসলামের প্রতিকারচিন্তা
এটি একটি স্বীকৃত বাস্তবতা যে ইসলাম একটি সার্বজনীন জীবনব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সকল সমস্যার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বিদ্যমান। ইসলাম যে নীতিমালা ও জীবনদর্শন প্রদান করেছে, তা নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি শক্তিশালী ও বাস্তবভিত্তিক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এসব নীতিমালার কাঙ্ক্ষিত ফল তখনই অর্জিত হয়, যখন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সকল স্তরে তা আন্তরিকভাবে বাস্তবায়িত হয়।
গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলাম পরকীয়া প্রতিরোধে মূলত দুই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করেছে—
প্রথমত, কিছু আচরণ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে, যা অনৈতিক সম্পর্কের পথ বন্ধ করে দেয়।
দ্বিতীয়ত, পারিবারিক সম্পর্ককে সুদৃঢ়, ভারসাম্যপূর্ণ ও ভালোবাসাপূর্ণ করার জন্য কিছু ইতিবাচক নির্দেশনা প্রদান করেছে, যা দাম্পত্য জীবনে স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করে।
প্রথম প্রকারের বিস্তারিত আলোচনা
ইসলাম পরকীয়ার পথ বন্ধ করার জন্য এমন সব বিষয় থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে, যেগুলো অনৈতিক সম্পর্কের সূচনা করতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—পরনারী বা পরপুরুষের প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়া, বেগানা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা, কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলা এবং সামাজিক শালীনতা ভঙ্গ করে এমন আচরণ। এসব বিষয়কে ইসলাম নৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করে তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র।”
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন,
“মুমিন নারীদেরও বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে…”
(সূরা আন-নূর: ৩০–৩১)
এই আয়াতে “সৌন্দর্য প্রকাশ” বলতে উদ্দেশ্য হলো নারীর এমন শারীরিক ও অলঙ্কারিক সৌন্দর্য যা সাধারণভাবে পরপুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটি পোশাক, অলঙ্কার, চলাফেরা বা আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে—যা অনৈতিক আকর্ষণ ও ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন:
“তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান কর এবং জাহেলি যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না…” (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
এখানে “জাহেলি যুগের প্রদর্শন” বলতে উদ্দেশ্য হলো—অশালীনভাবে নিজেকে প্রকাশ করা, অতিরিক্ত সাজসজ্জা প্রদর্শন, আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে প্রকাশ্যে চলাফেরা করা এবং এমন আচরণ যা সমাজে অনৈতিক আকর্ষণ ও ফিতনা সৃষ্টি করে।
সারকথা হচ্ছে, ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজকে এমন সব আচরণ থেকে দূরে থাকতে বলে, যা ধীরে ধীরে অনৈতিক সম্পর্ক বা পারিবারিক ভাঙনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, তাহলে কি ইসলাম নারীকে চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করতে বলে এবং তাকে কোনো কর্মের অধিকার দেয় না?
এর উত্তরে বলা যায় না, ইসলাম নারীকে ঘরবন্দি করে রাখার নির্দেশ দেয়নি; বরং নারীকেও প্রয়োজন ও যোগ্যতা অনুযায়ী বৈধভাবে কর্মের অধিকার দিয়েছে। তবে সেই কর্মজীবন যেন নৈতিকতা, নিরাপত্তা ও শালীনতার কাঠামোর মধ্যে থাকে ইসলাম সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর কর্মজীবন নিষিদ্ধ নয়; বরং তা এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত যাতে তার মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে। এ জন্য কিছু মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি।
১. কর্মস্থল নিরাপদ হওয়া
ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী নারীর জন্য এমন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, যেখানে তার জীবন, সম্পদ এবং সম্মান সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত থাকে। কর্মস্থলে কোনো ধরনের হয়রানি, অনৈতিক চাপ বা নিরাপত্তাহীনতা থাকবে না।
এ দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের; পাশাপাশি পরিবার ও সমাজও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করবে, যাতে নারীর জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হয়।
২. শালীন পোশাক ও শালীনতা বজায় রাখা
নারী শালীন ও মর্যাদাপূর্ণ পোশাক পরিধান করে কর্মস্থলে যাতায়াত করবে। এমন পোশাক এড়িয়ে চলা উচিত, যা অপ্রয়োজনীয় আকর্ষণ সৃষ্টি করে বা শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে।
এটি নারীর নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় সহায়ক। শালীনতা বজায় থাকলে অনেক সামাজিক অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়।
৩. প্রয়োজনে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ
কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলা বা যোগাযোগ করা যেতে পারে। তবে তা হবে দায়িত্বকেন্দ্রিক, সংযত ও ভদ্র ভাষায়, অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা বা আকর্ষণ সৃষ্টি করে এমন ভঙ্গি পরিহার করে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“তোমরা কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, যাতে অন্তরে রোগ আছে এমন ব্যক্তি প্রলোভিত না হয়; বরং সঙ্গত কথা বলো।”
(সূরা আল-আহযাব: ৩২)
ইসলাম নারীকে কর্মজীবন থেকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং মর্যাদা, নিরাপত্তা ও নৈতিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো—নারীর অধিকার সংরক্ষণ, পারিবারিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সমাজকে অনৈতিকতা থেকে নিরাপদ রাখা।
দ্বিতীয় প্রকারের বিস্তারিত আলোচনা
এ অংশ আবার দুই ভাগে বিভক্ত।
এক. ইসলাম স্বামী-স্ত্রীকে খোদাভীরুতা, আখেরাতমুখীতা, আত্মজবাবদিহিতা, কষ্টসহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, ধৈর্য, অল্পে তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতার মতো মহৎ গুণাবলি অর্জনের নির্দেশ দিয়েছে। কারণ দাম্পত্যজীবনের স্থায়িত্ব কেবল বাহ্যিক সম্পর্কের উপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে আত্মিক বন্ধন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আল্লাহভীতির উপর।
স্বামী-স্ত্রী যদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের জবাবদিহিতার অনুভূতি হৃদয়ে ধারণ করে, তাহলে তারা সহজে অন্যায় সম্পর্কে জড়াবে না। তারা উপলব্ধি করবে—দুনিয়ার প্রতিটি কাজের হিসাব একদিন মহান রবের সামনে দিতে হবে। এ অনুভূতি মানুষকে গোপন ও প্রকাশ্য সকল পাপ থেকে বিরত রাখে।
আল্লাহ তাআলা বলেন
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, এবং প্রত্যেক ব্যক্তি লক্ষ্য করুক সে আগামী দিনের জন্য কী প্রেরণ করেছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।”
(সূরা আল-হাশর : ১৮)
দাম্পত্যজীবনে মতভেদ, দুঃখ-কষ্ট, আর্থিক সংকট কিংবা মানসিক চাপ আসতেই পারে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী যদি ধৈর্য, সহমর্মিতা ও সহানুভূতির সঙ্গে একে অপরকে ধারণ করে, তবে সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং বাইরের কোনো ব্যক্তি সেই সম্পর্কে অনুপ্রবেশের সুযোগ পায় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
“তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। যদি তাদের কোনো বিষয় তোমাদের অপছন্দ হয়, তবে হতে পারে তোমরা এমন একটি বিষয় অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।”
(সূরা আন-নিসা : ১৯)
একজন মু’মিন স্বামী বা স্ত্রী সংসারের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রাচুর্য-অভাব সবকিছুকেই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা মনে করে ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করে। তারা নিজেদের প্রাপ্ত নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে এবং একে অপরকে অবমূল্যায়ন না করে বরং আল্লাহর আমানত হিসেবে বিবেচনা করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
« لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ »
“কোনো মুমিন পুরুষ যেন তার স্ত্রীকে সম্পূর্ণ অপছন্দ না করে। তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য কোনো স্বভাব অবশ্যই পছন্দ হবে।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৬৯)
সন্তানকেও তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত মহান নেয়ামত ও আমানত হিসেবে দেখে। তাই সন্তানদের সুশিক্ষিত ও সুশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাকে তারা ইবাদত মনে করে। এ দায়িত্ববোধ দাম্পত্যজীবনকে আরও দৃঢ় করে এবং পরকীয়ার মতো ধ্বংসাত্মক প্রবণতা থেকে দূরে রাখে।
মূলত, যে পরিবারে আল্লাহভীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য ও ভালোবাসা বিদ্যমান থাকে, সে পরিবারে পরকীয়ার মতো ব্যাধি সহজে প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য মানসিক আশ্রয় হয়ে ওঠে; ফলে পরপুরুষ বা পরনারীর প্রতি আসক্ত হওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
দুই. পারস্পরিক ভালোবাসা ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ককে মজবুত ও প্রাণবন্ত রাখতে ইসলাম কিছু সুন্দর দিকনির্দেশনা দিয়েছে। দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, আন্তরিকতা, সম্মান ও যত্ন বজায় থাকলে পরকীয়ার মতো ধ্বংসাত্মক প্রবণতা থেকে দূরে থাকা সহজ হয়। এ জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই সচেতনভাবে কিছু বিষয় অনুসরণ করা প্রয়োজন।
যেমন— স্বামী কর্মস্থল থেকে ঘরে ফিরে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় সালাম দিয়ে প্রবেশ করবে। মাঝেমধ্যে স্ত্রীর জন্য উপহার বা হাদিয়া নিয়ে আসবে। স্ত্রীও হাসিমুখে তাকে বরণ করবে, তার খোঁজখবর নেবে এবং তার আরাম-আয়েশের প্রতি খেয়াল রাখবে। স্বামী বাইরে যাওয়ার সময় স্ত্রী তাকে আন্তরিকতার সঙ্গে বিদায় দেবে। পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করবে, একে অপরের জন্য দোয়া করবে এবং সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেবে।
বাসা-বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি রাখা, নিজেদের পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা এবং পরস্পরের পছন্দ-অপছন্দের প্রতি যত্নবান হওয়াও দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর উচিত একে অপরের সামনে নিজেকে সুন্দর ও পরিপাটি করে উপস্থাপন করা, যাতে দাম্পত্য সম্পর্কের আকর্ষণ অটুট থাকে।
এ ছাড়া স্ত্রীর গৃহস্থালির কাজে স্বামীর সহযোগিতা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে পারস্পরিক মমত্ববোধ ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়। হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও স্বামী-স্ত্রীর কিছু সময় একান্তে কাটানো, খোলামেলা কথা বলা, রোমান্টিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ করা এবং একে অপরকে মানসিকভাবে সময় দেওয়া প্রয়োজন।
মোটকথা, দাম্পত্য সম্পর্ককে দৃঢ়, আন্তরিক ও প্রাণবন্ত রাখতে হবে। এমন কোনো মানসিক বা শারীরিক দূরত্ব তৈরি হতে দেওয়া যাবে না, যার সুযোগে তৃতীয় কেউ সেই সম্পর্কে প্রবেশ করতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা ও বোঝাপড়াই একটি সুন্দর পরিবার ও সুস্থ সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি।
পরিশেষে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, আমাদের সমাজ থেকে পরকীয়ার মতো ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি দূর করতে হলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সকলকে সম্মিলিতভাবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নয়; বরং নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে ইসলামের দিকনির্দেশনা ও নীতিমালা অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষভাবে প্রতিটি নাগরিককে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। মানুষের অন্তরে খোদাভীরুতা, আখেরাতমুখিতা, জবাবদিহিতাবোধ এবং আত্মসংযমের মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। পরিবারকে হতে হবে আদর্শ চরিত্র গঠনের প্রথম পাঠশালা এবং সমাজকে হতে হবে সুস্থ মূল্যবোধের ধারক।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব হলো পরকীয়া ও পারিবারিক অবক্ষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ, প্রতারণা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও নৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
আল্লাহ তাআলা প্রতিটি দাম্পত্য জীবনকে সুখী, শান্তিময় ও বরকতময় করুন। প্রত্যেক স্বামী-স্ত্রীকে পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা ও ইসলামের বিধি-বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : মুফতি ও মুহাদ্দিস, শেখ জনুরুদ্দীন র. দারুল কুরআন মাদরাসা, চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ, ঢাকা।
sadekurrahman1989@gmail.com



