মূল : ইমতিয়াজ আহমেদ
তরজমা : হাফিদ মুবারক

ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিপুল পরিমাণ ইতিহাসগ্রন্থ ও গবেষণা রচিত হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, সেই ইতিহাসচর্চার বৃহৎ অংশে মুসলমানদের অবদান হয় প্রাসঙ্গিকতার আড়ালে চাপা পড়েছে, নয়তো অতি সংক্ষিপ্ত উল্লেখে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এই উপেক্ষা আরও প্রকট হয়েছে মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ এবং নেতৃত্বের অসংখ্য দৃষ্টান্ত ইতিহাসের মূলধারার বয়ানে প্রায় অনুপস্থিত। এর একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ মনমোহন কৌরের Women in India’s Freedom Movement গ্রন্থ। শত শত মুসলিম নারীর সংগ্রামী ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও সেখানে শুধুমাত্র অযোধ্যার বেগম হযরত মহল (১৮২০-১৮৭৯) এবং বি-আম্মা’র (মাওলানা শওকত আলী ও মাওলানা মুহাম্মদ আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের রত্নগর্ভা মা) নামই স্থান পেয়েছে। ফলে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মুসলিম নারীদের অবদান আজও আংশিকভাবে অনুদ্ঘাটিত, প্রান্তিকায়িত এবং ইতিহাস-রচনার প্রচলিত কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে।

১৮৫৭ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিম নারীদের আত্মত্যাগ ভারতীয় প্রতিরোধ-ইতিহাসের এক অনালোচিত অধ্যায়। মুজাফফরনগরের থানাভবনের বিপ্লবী কাজী আবদুর রহিমের জননী আসগরী বেগম ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বয়ং অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সংগ্রামে পরাজিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা তাঁকে জীবন্ত দগ্ধ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। একইভাবে হাবিবা ও রহিমীও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে গিয়ে বন্দি হন এবং পরবর্তীকালে ফাঁসির মঞ্চে শাহাদাত বরণ করেন। ইতিহাসবিদদের অনুমান, ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশবিরোধী মহাবিদ্রোহে ভারতের প্রায় ২২৫ জন মুসলিম নারী জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশের আত্মত্যাগ জাতীয় ইতিহাসের মূলধারার বয়ানে আজও যথার্থ স্থান লাভ করেনি।

ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস বি-আম্মা তথা আবিদা বেগম (মাওলানা মুহাম্মদ আলীর মাতা), আমজাদী বেগম (মাওলানা মুহাম্মদ আলীর সহধর্মিণী), নিশাতুন্নিসা (বেগম হাসরত মোহানী), সা’আদাত বানু কিচলু (ড. সাইফুদ্দীন কিচলুর সহধর্মিণী), বেগম খুরশীদ খাজা (এ. এম. খাজার সহধর্মিণী), জুলেখা বেগম (মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সহধর্মিণী), সীমান্ত প্রদেশের খাদিজা বেগম ও খুরশিদ সাহিবা, মেহর তাজ (খান আবদুল গাফফার খানের কন্যা), জুবাইদা বেগম দাউদী (বিহারের বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী শফি দাউদীর সহধর্মিণী), কানিজ সাজিদা বেগম (বিহার), মুনীরা বেগম (মাওলানা মাজহারুল হকের সহধর্মিণী), আসমত আরা বেগম, সুগরা খাতুন (লখনউ), আমিনা তাইয়াবজি (আব্বাস তাইয়াবজির সহধর্মিণী), বেগম সাকিনা লুকমানী (ড. লুকমানীর সহধর্মিণী ও বদরুদ্দীন তাইয়াবজির কন্যা), রেহানা তাইয়াবজি (আব্বাস তাইয়াবজির কন্যা), হামিদা তাইয়াবজি (শামসুদ্দীন তাইয়াবজির পৌত্রী), ফাতিমা তাইব আলী, সাফিয়া সা’দ খান, শাফাআতুন নিসা বিবি (মাওলানা হাবিবুর রহমান লুধিয়ানভির সহধর্মিণী), কুলসুম সিয়ানী (ড. জান মুহাম্মদ সিয়ানীর সহধর্মিণী), ফাতিমা ইসমাইল (হাজী ইউসুফ সোবহানীর কন্যা ও উমর সোবহানীর বোন), বেগম সুলতানা হায়াত আনসারী, জোহরা আনসারী প্রমুখ অসংখ্য মুসলিম নারীর অবদান ছাড়া কখনোই পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভারত বিভাগের পূর্বপর্যন্ত কংগ্রেসের পতাকাতলে পরিচালিত প্রায় প্রতিটি জাতীয় আন্দোলনেই তাঁরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

দেশের স্বাধীনতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁরা কারাবরণ করেছেন, অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, লাঠিচার্জের নির্মম নির্যাতন সহ্য করেছেন এবং নানাবিধ দুঃখ-কষ্ট বহন করেছেন। তাঁদের জীবনসংগ্রাম জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ—যা ইতিহাস থেকে অস্বীকার বা মুছে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিম নারীদের অসামান্য অবদানের সাক্ষ্য মহাত্মা গান্ধীর Collected Works-এও সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

আপনার ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে যোগাযোগ করুন

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের ভূমিকা নিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে শান্তিময় রায়ের Freedom Movement and Indian Muslims, পি. এন. চোপড়ার Role of Indian Muslims in the Struggle for Freedom, কান্তা চৌবের Muslims and Freedom Movement in India এবং আঞ্চলিক গবেষণার ক্ষেত্রে মুজাফফর ইমামের Role of Muslims in the National Movement ও হাসান ইমামের Indian National Movement বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে বিষয়টি অত্যন্ত বিস্তৃত; তাই এ বিষয়ে এখনও একটি সর্বাঙ্গীণ, সুসংবদ্ধ ও ব্যাপক গবেষণাকর্মের প্রয়োজন রয়ে গেছে।

জাতীয় আন্দোলন ও মুসলমানদের অবস্থান

জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, জাতীয়তাবাদী জাগরণে মুসলমানদের কোনো ঘাটতি ছিল না। ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে তারা অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছে। কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে ব্রিটিশদের ভারত থেকে বিতাড়িত করা সম্ভব ছিল না; বরং সকল শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের মানুষের নিরলস সংগ্রামের ফলেই ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত ভারত ত্যাগে বাধ্য হয়।

ভারতে ব্রিটিশ আধিপত্য বিস্তারের প্রাথমিক পর্যায়েই ফরায়েজি আন্দোলন এবং ওহাবি আন্দোলন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পরিকল্পনাকে গভীরভাবে ব্যাহত করেছিল। সংগঠিতভাবে ব্রিটিশ শাসন উৎখাতের লক্ষ্যে পরিচালিত প্রথমদিককার শক্তিশালী আন্দোলনগুলোর মধ্যে এ দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আন্দোলনের কর্মীরা অসীম সাহসিকতার সঙ্গে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। এ কারণেই তাঁদের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদূত বা প্রাথমিক যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাঁরা নতুন ঔপনিবেশিক শাসকদের দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করেছিলেন, তাদের উপযুক্ত জবাব দিয়েছিলেন এবং এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের স্থায়িত্ব চিরস্থায়ী নয়।

লেখক পরিচিতি : ইমতিয়াজ আহমেদ। ভারতের Illume Academy-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO)। প্রতিষ্ঠানটি তরুণদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি শিক্ষামঞ্চ, যেখানে উদ্ভাবনী শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমে তাদের বিচক্ষণ চিন্তাশক্তি, দৃঢ় নৈতিক চরিত্র এবং কার্যকর নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের লক্ষ্যে কাজ করা হয়।

আপনার মন্তব্য জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.