মূল : হাসান আসকারী
তর্জমা : কাজী একরাম
সপ্রাণ জীবের ছবি নির্মাণের ওপর ইসলামের নিষেধাজ্ঞার ফলে, ইসলামি সভ্যতায় মূর্তিশিল্প কখনোই সেই মর্যাদা পায়নি, যা অন্যান্য সভ্যতায় দেখা যায়। বিশেষত আরবদের ক্ষেত্রে এই শিল্পের বিকাশ তুলনামূলকভাবে নিতান্তই অনুল্লেখ্য; ইরান ও হিন্দুস্তানের মুসলিম সভ্যতায় যেটুকু দেখা যায়, আরবদের মধ্যে তাও দৃষ্টিগোচর নয়। এর একটি কারণ অবশ্য ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা, তবে জাতিগত বৈশিষ্ট্যও এতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়।
সেমেটিক জাতির স্বভাবগতভাবেই আর্য জাতির মতো মূর্তিশিল্পের সঙ্গে গভীর আবেগ কোনো কালেই ছিল না। আরবরা তো বটেই, জাতিগতভাবে এমনকি ইহুদীদেরও এই শিল্পে কোনো উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য নেই। যদিও কিছু ইহুদি শিল্পী স্বতন্ত্রভাবে চিত্রকলা বা ভাস্কর্যে দক্ষতা অর্জন করেছেন, তা ব্যতিক্রমী ঘটনা। ইহুদীদের মূল কারবার ছিল সাহিত্যচর্চা, আরবদের ক্ষেত্রেও তাই; সাহিত্যই ছিল তাদের প্রধান ক্ষেত্র। ইহুদীদের কখনো কোনো রাষ্ট্র ছিল না এবং কোনো দেশেই তারা দীর্ঘ সময় নিরাপদে বসবাসের সুযোগ পায়নি। বিপরীতে, আরবদের সবসময় নিজস্ব দেশ ও নিজস্ব সরকারব্যবস্থা ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আরবরা স্কিয়া ও স্পেন পর্যন্ত বহু শতাব্দী ধরে শাসন করেছে। ফলে ইমারৎ নির্মাণ, নগর স্থাপন ও স্থাপত্য বিকাশের ব্যাপক সুযোগ তারা লাভ করে। অবয়বধারী আকৃতিতে কিছু সৃষ্টির যে মানবিক প্রবৃত্তি রয়েছে, ইসলামের বিধিনিষেধের কারণে তা চিত্রকলা বা ভাস্কর্যে নিঃসৃত হতে না পেরে নির্মাণশিল্পে প্রবাহিত হতে থাকে। যে সব মুসলিম শাসনব্যবস্থায় চিত্রকলা বা ভাস্কর্যের কিছু উপস্থিতি দেখা যায়, সেখানেও এর মর্যাদা সর্বদাই গৌণ থেকেছে। এইভাবে ইসলামি শিল্পকলার প্রধান ও মূলধারার বিকাশ ঘটেছে স্থাপত্যশিল্পে।
‘ইসলামি স্থাপত্য’শব্দবন্ধটি প্রায়শই ব্যবহার করা হয়; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, হিন্দুস্তান থেকে স্পেন পর্যন্ত ইসলামি স্থাপত্যের ভবনগুলো দেখলে এক ধরনের অভিন্ন নির্মাণশৈলী কোথাও পাওয়া যায় না। কোথাও কপটিক প্রভাব, কোথাও রোমান, কোথাও গ্রীক, কোথাও বাইজেন্টাইন, কোথাও ইরানী, আবার কোথাও হিন্দুস্তানী ছাপ স্পষ্ট। এমনকি হিন্দুস্তানের মধ্যেই ইসলামি ভবন-শৈলীতে নানাবিধ রীতি ও আদল দেখা যায়; উত্তরের মুঘল দালানগুলোতে ইরানি প্রভাব প্রাধান্য তো কাথিয়াওয়াড়ের ভবনগুলোয় হিন্দু উপাদানের অনুপাতই বেশি। যেভাবে আমরা নির্দিষ্ট রকমের স্তম্ভ, দরজা বা ছাঁচ দেখে গ্রীক বা রোমান স্থাপত্যকে শনাক্ত করতে পারি, সে অর্থে কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো বা রূপের ওপর ভিত্তি করে ‘ইসলামি স্থাপত্য’ বলে কিছু নেই। ইসলামি স্থাপত্য তাই কোনো বিশেষ রূপ বা আকৃতির নাম নয়; বরং এই রূপ-আকৃতির পেছনে সক্রিয় যে ভাবনা, চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি; তারই নাম ইসলামি স্থাপত্য।
এই দৃষ্টি-চেতনার সবচেয়ে লক্ষণীয় ও বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো, যেমনটা আমরা দেখেছি, এটি তাআসসুব তথা গোঁড়ামি ও অন্ধ পক্ষপাতিত্ব থেকে সর্বৈব মুক্ত। যে জাতির স্থাপত্যে যে উপাদানটিই মনে ধরেছে, উৎকৃষ্ট বলে মনে হয়েছে, মুসলমানরা তা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেছে। ইসলাম বলেছে, জ্ঞান ও সংস্কৃতি মুসলমানের উত্তরাধিকার; চীনেও যদি তা পাওয়া যায়, অর্জন করো। ইসলামি স্থাপত্যের বিশেষজ্ঞগণ এই নীতিকে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেছেন। পৃথিবীর কোনো গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা নেই, যার স্থাপত্য-ঐতিহ্য থেকে মুসলমানরা উপকার গ্রহণ করেনি। বাইজেন্টাইন স্থাপত্য থেকে মুসলমানরা মিনার গ্রহণ করেছে, হিন্দুস্তান থেকে গ্রহণ করেছে গম্বুজের রীতি, এমনকি হিন্দু প্রতীক ‘পদ্ম’ পর্যন্ত মসজিদের গম্বুজশীর্ষে শোভা পেয়েছে। দামেস্কে মসজিদ নির্মাণে তারা হিন্দুস্তানী স্থপতিদের কাজে লাগিয়েছে তো হিন্দুস্তানে ভবন নির্মাণের জন্য ইউরোপীয় শিল্পীদের আমন্ত্রণ করে তাদের পরামর্শ নিয়েছে। সংক্ষেপে, মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসলাম স্থাপত্যের ক্ষেত্রে সচেতনভাবে নিজেকে আন্তর্জাতিকীকরণ করেছে। সকল জাতিগত, বর্ণগত ও আঞ্চলিক সংকীর্ণতা অতিক্রম করে শিল্পকে শিল্প হিসেবেই দেখেছে এবং প্রতিটি কালচার থেকে মূল্যবান সবই গ্রহণ করেছে। অন্য কথায়, ইসলামি সভ্যতা ভৌগোলিক দূরত্ব, ধর্ম বা জাতীয়তার পার্থক্য নির্বিশেষে সকল জাতির উত্তরাধিকারকে মানবতার ঐতিহ্য বলে বিবেচনা করে—যা ইসলাম স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে। ইসলামি স্থাপত্যের এই নিরীক্ষা, উন্মুক্ততা ও নির্বাচনী মনোভাব এমনই এক অভিনব ও বিরল বৈশিষ্ট্য, যার সমতুল্য দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন।
ইসলামি স্থাপত্য বলতে সাধারণত মসজিদ, মকবারা ও শাহী প্রাসাদ বোঝানো হয়। তবে শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মীয় ইমারতগুলোর যে গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে, পার্থিব ভবনগুলোর গুরুত্ব ততটা নয়। প্রকৃতপক্ষে, ইউরোপের এক আধুনিক সভ্যতা ব্যতীত, প্রায় প্রতিটি সভ্যতায় উপাসনালয়গুলোর ছিল বিশেষ মর্যাদাগত অবস্থান; কিন্তু ইসলামি স্থাপত্যের কথা উঠলেই সবার আগে মানসপটে ভেসে ওঠে মসজিদের প্রতিচ্ছবি। মসজিদের প্রতি এই নিবিষ্টতার কারণ হলো, এটি মুসলমান জাতির গভীরতম জীবনবোধের প্রতিনিধিত্বকারী রূপ। আমাদের সামষ্টিক জীবনের সারনির্যাস প্রতিফলিত হয় এই মসজিদগুলোর স্থাপত্যের বিভিন্ন উপাদানে। মসজিদের দিকে প্রথম দৃষ্টিপাতেই অনুভব করা যায়- এটি নির্মিতই হয়েছে যত বেশি সম্ভব মানুষকে একত্রিত করার জন্য; বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমবেতভাবে। ইসলামি সভ্যতায় ‘সামষ্টিকতা’র ওপর যে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, মসজিদের স্থাপনা তারই পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করে।
অন্য ধর্মের উপাসনালয়গুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সেখানে প্রায়ই রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টির সচেতন প্রচেষ্টা থাকে। কোথাও সম্পূর্ণ অন্ধকার, কোথাও বা রঙিন কাচ-শিশার মধ্য দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করিয়ে ভেতরে এক ধরনের বিস্ময়-বিমূঢ়তা সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু ইসলামি ভবনে এই ধরনের রহস্যময় বাজিগরি বা ইন্দ্রজালসৃষ্টি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। মসজিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো এর মুক্ত বিস্তৃত প্রাঙ্গণ, যেখানে আলো-বাতাসের প্রবাহ সর্বাধিক। এর পেছনে একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে। আর তা হলো, ইসলামের সমগ্র দর্শন অস্পষ্টতা ও রহস্যবাদিতা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করে। ইসলাম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কালচারের আলো দিয়ে মানবমনকে সর্বোচ্চভাবে আলোকিত করতে চায়। মসজিদ সেই আদর্শের প্রতীক। মসজিদের এই আদর্শগত প্রভাব ইসলামি স্থাপত্যের অন্যান্য উপাদানেও— মাদ্রাসা, খানকাহ, প্রাসাদ বা জনপরিসরের স্থাপনায় লক্ষণীয়ভাবে দৃষ্টিগোচর হয়।
তদুপরি, ইসলামি ইমারতগুলোর নকশাচিত্র সাধারণত অত্যন্ত সাধাসিধে ও সুশৃঙ্খল। ইসলামি স্থাপত্য হিন্দু বা গোথিক ভবনের মতো জটিল, প্যাঁচানো ধাঁচ অনুসরণ করে না। এখানে নির্মাতা মৌলিক পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুত হন না, যা তিনি স্থির করেন, তার প্রতি শেষ পর্যন্ত যত্নশীল থাকেন। হিন্দু স্থাপত্যের দিকে তাকালে কখনো মনে হয় নির্মাতা মাঝপথে নতুন কিছু বুঝতে পেরে তা জুড়ে নিয়েছেন; কিন্তু ইসলামি স্থাপত্যে প্রতিটি খুঁটিনাটিই যেন আগে থেকেই সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত। ইসলামি নির্মাণশিল্পী সাময়িক প্রবণতা বা আবেগের অনুসরণ করেন না, বরং একটি যৌক্তিক ও ইউক্লিডীয় নকশার অধীনেই কাজ করে যান।
এই ইউক্লিডীয় নকশা কিছু মানুষের কাছে ভারী বলে বোধ হয়; বিশেষ করে ইউরোপের অনুর্বর যুক্তিবাদে ক্লান্ত মস্তিষ্কগুলোর কাছে। এদের কেউ কেউ তাজমহল দেখে এমন আপত্তি তোলে যে, ভবনটি মাঝ থেকে কেটে একটি অংশ সরিয়ে নিলেও বিশেষ পার্থক্য হবে না, কারণ দুই অংশই হুবহু একই এবং এতে কোনো অনন্য বৈচিত্র্য নেই। কিন্তু এই আপত্তি অত্যন্ত অনৈতিহাসিক ও অন্যায্য। কোনো সভ্যতার শিল্পকর্ম বিচার করতে হলে তার স্পিরিট ও মৌলচেতনাকে আগে বুঝতে হয়। যে সভ্যতা কোনো শিল্পকর্ম উপস্থাপন করেছে, তার স্পিরিট ও মর্মচেতনা না বুঝে আপত্তি করা সঙ্গত নয়। ইসলাম নিছক দার্শনিক বা সুফিদের ধর্ম নয়; বরং সাধারণ মানুষের ধর্ম। ইসলামের ভিত্তি অস্পষ্ট অনুভূতি বা অভিনব অভিজ্ঞতার ওপর নয়, বরং সর্বসাধারণের সহজাত ভিত্তি— বুদ্ধির ওপর এর প্রতিষ্ঠা। ইসলামের মূল আকিদা এতটাই পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ ও অকপট যে, সাধারণ মানুষও তা সহজেই ধরতে পারেন। এই কারণেই ইসলামি শিল্পকলায় আবেগের চেয়ে যুক্তি, আকস্মিকতার চেয়ে পরিকল্পনাই বেশি প্রাধান্য পায়। একই নীতি ইসলামি স্থাপত্যের নকশাচিত্রেও কার্যকর। এই যৌক্তিক বা ইউক্লিডীয় অবয়ব কোনো মানসিক বা আধ্যাত্মিক অসহায়ত্ব বা সম্বলহীনতার ফল নয়; বরং ইসলামি জীবনদর্শনের একটি মৌলিক ও সুগভীর ধারণার সাথেই এটি সম্পর্কিত।
ইসলামি স্থাপত্যের উপর তাওহীদের বিশ্বাসও গভীর ও শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছে। ইসলামি বিশ্বাস মতে, খোদা মানুষ ও প্রকৃতি উভয়ের চেয়ে উচ্চতর এক সত্তা, সে সত্তা এতই নিরঙ্কুশ, বিমূর্ত ও অদৃশ্য যে, তাঁর অস্তিত্বকে বস্তুগত কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। ইন্দ্রিয়শক্তি ও আবেগ-অনুভূতির মাধ্যমে তাঁর পরিজ্ঞান সম্ভব নয়, কারণ এই দু’টি শক্তির কার্যকরতা বস্তুগত আনুষঙ্গিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কেবল প্লেটোনিক বুদ্ধি (আকলে মহয) সামান্য নাগাল পায় খোদার। কাজেই শিল্পকলার মাধ্যমে খোদাকে উপলব্ধির জন্য (খোদা-ই যেহেতু মানবীয় অনুসন্ধানের শীর্ষবিন্দু হওয়া উচিৎ) অনুসরণ করতে হবে এই খাঁটি যৌক্তিকতাকে; ইন্দ্রিয়গত আবেগ-অনুভূতিকে নয়। এই নীতির ধারাবাহিক প্রতিফলনই ইসলামি স্থাপত্যের নকশাচিত্রকে যুক্তিভিত্তিক ও চিন্তাপ্রসূত করে তুলেছে।
এই মৌলিক নীতির দ্বিতীয় প্রভাব ছিল এই যে, ইসলামি স্থাপত্য সর্বদা আকারে-অবয়বে প্রকৃতিগততা থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করেছে। জগতের বড় বড় সভ্যতার বেশিরভাগ স্থাপত্যশিল্পই তাদের ভবনগুলোকে এমনভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছে যেন মনে হয় এটি স্বয়ং ভূগর্ভ থেকে উঠে এসেছে। এখানে ভবনের কাঠামো ও রেখাগুলো প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের আকার ও রেখার বিপরীত তো নয় বরং, এতটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া চাই যে ভবনটি ভূদৃশ্যের সাথে একীভূত হয়ে যায়। আপনি যদি দক্ষিণ ভারতের কোনো হিন্দু মন্দিরের দিকে তাকান, তবে তা দেখতে ঠিক আমগাছের গুচ্ছের মতো ঠেকবে। মন্দিরের সমস্ত বাঁক, উচুঁনিচু রেখা আমগাছের ঝাঁকে দেখা যাওয়া প্রাকৃতিক রূপেরই প্রতিরূপ।
কিন্তু ইসলামি স্থাপত্যশৈলী এর সম্পূর্ণ বিপরীত অভিমুখ অবলম্বণ করে। ইসলামি স্থাপত্য প্রকৃতির উপর মানুষের আধিপত্য ঘোষণা করে। একজন ইসলামি স্থপতি প্রকৃতির নির্দেশ মেনে চলেন না; তিনি বরং নিজের বুদ্ধির শক্তিতে প্রকৃতির প্যাটার্ন ছাড়াই সৃজন করেন নতুন কাঠামো; নতুন দৃশ্যচিত্র। হিন্দু স্থাপত্যে মানুষ হলো প্রকৃতির একটি অংশ, ইসলামি স্থাপত্যে মানুষ প্রকৃতির ঊর্ধ্বে উঠতে, প্রকৃতিকে অতিক্রম করতে সতত সচেষ্ট। ইসলামি স্থাপত্যশিল্প মানুষকে এক নতুন সাহস, এক নতুন আকাঙ্ক্ষা, এক নতুন আত্মবিশ্বাস শেখায়। ইসলামি স্থাপত্য অভিব্যক্তির ভাষায় এই বার্তা দেয় যে, মানুষ নিজের শক্তির জোরে আকাশের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে; প্রকৃতির মোহনীয়তা থেকে উপকৃত না হয়েও মানবাত্মা নিজেই সুন্দর ও মহৎ। ফলে ইসলামি স্থাপত্যে প্রকৃতি কখনও কখনও যদিও নৈপুণ্যের সঙ্গে অনুসৃত হয়েছে, যেমন কর্ডোবার মসজিদের স্তম্ভগুলোকে বিশ্বজুড়ে মহান স্থাপত্য-প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যে স্তম্ভগুলো দেখলে মনে হয় মরুভূমিতে সারি সারি খেজুরবৃক্ষ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই অনুসরণ প্রকৃতির প্রতি আনুগত্যপ্রদর্শন ও আত্মসমর্পণ নয় মোটেই; এমনকি প্রকৃতির অনুকরণ কখনোই ইসলামি স্থাপত্যের মৌলিক নীতি ছিল না।
ইসলামি স্থাপত্য দূর থেকেও প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক স্বকীয়তায় দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হয়; এটি নিজেকে কখনো প্রকৃতির সাথে বিলীয়মান হতে দেয় না। যেখানে প্রায় সব প্রাক-ইসলামি সভ্যতায় উপাস্য ছিল কোনো না কোনো প্রাকৃতিক শক্তি, ফলে তাদের স্থাপত্যেও প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য, সমন্বয় ও একীভবনের প্রবণতা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলামে খোদা সমগ্র প্রকৃতির স্রষ্টা; তাঁর উপাসকের জন্য প্রকৃতির খোশামুদি করার বা প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই। প্রকৃতি থেকে এই স্বকীয় বিচ্ছিন্নতা ও স্বাধীন স্বাতন্ত্র্যই ইসলামি স্থাপত্যের সর্বত্র প্রতিফলিত হয়েছে। হিন্দুস্তানে মুসলমানদের উপর ইরানি ও হিন্দু–উভয় প্রভাবই ছিল বলে সাধারণ ঘরবাড়ি বা বসতিগুলোয় এই বৈশিষ্ট্য তেমন স্পষ্ট নয়। কিন্তু স্পেনে আরবদের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, আরব সাম্রাজ্যের অবসানের বহু শতাব্দী পরও তাদের চিহ্ন পদে পদে দৃশ্যমান। স্পেনের মামুলি ধরনের বসতিগুলোও এমনভাবে নির্মিত যে, তাদের রূপ ও প্যাটার্ন প্রকৃতির বিপরীতে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান। মানুষের সাথে প্রকৃতির এই স্বাতন্ত্রিক বৈসাদৃশ্য কেবল ইসলামি স্থাপত্যেই নয়, অন্যান্য ইসলামি শিল্পকলাতেও ক্রিয়াশীল। মানুষ ও প্রকৃতির বৈপরীত্যকে ঊনবিংশ শতকের সাহিত্য-সমালোচনা ও অনুভূতিবাদী দর্শন নিন্দা করেছিল ঢের, কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে সেই নিন্দাবাদ আর টেকে না। কারণ বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শৈল্পিক ধারা- ইউক্লিডীয় চিত্রকলা- এই বৈপরীত্যেরই তরজমান। এই ইউক্লিডীয় চিত্রকলা ইসলামি প্রভাবের প্রত্যক্ষ ফল, যেহেতু এই শিল্পপ্রকরণটি বিশেষভাবে স্প্যানিশ চিত্রশিল্পীদের আবিষ্কার, আর স্প্যানিশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনই যাপিত হতো ইউক্লিডীয় বসতবাড়িতে। এছাড়া, স্পেনের আরবদের নির্মিত ভবনে প্রাচীরে উৎকীর্ণ আরবি শিলালিপিগুলো বিশুদ্ধ ইউক্লিডীয় চিত্রকলারই সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ।
মোদ্দাকথায়, ইসলামি স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো, মানুষ একটি পৃথক, স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সত্তা, যে প্রকৃতিকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে নিজের মস্তিষ্ক ও আত্মার সাহসে ভর করে খোদার দিকে উচ্চারোহণ করে যায়। যৌক্তিকতা, মহত্ত্ব, আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় প্রত্যয়, উচ্চ থেকে আরও উচ্চতর হওয়ার আকাঙ্খা- এই হলো ইসলামি স্থাপত্যসমূহের স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব।



